মগধ সাম্রাজ্যর উথান ও পতনে বিভিন্ন রাজবংশের ভূমিকা

- September 04, 2019
খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে উত্তর ভারতে মহাজনপদ গুলির মধ্য সংঘর্ষ লেগে থাকত। কোশল, অবন্তী, বৎস ও মগধ ছিল এদের মধ্য প্রধান। শেষ পর্যন্ত মগধ অপর তিন শক্তিকে পরাজিত করে মগধ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। ড: রামশরণ শর্মা বলেন, মৌর্যদের উথানের পূর্ববর্তী দুই শতাব্দীতে মগধ সাম্রাজ্যর বিস্তৃতি সমকালীন ইরানীয় সাম্রাজ্যর বিস্তৃতির সঙ্গে তুলনীয়। মগধ সাম্রাজ্যের উথানের ক্ষেত্রে চারটি রাজবংশ অবদান স্মরণীয়। যথা - (১) হর্ষঙ্ক বংশ, (২) শিশুনাগ বংশ, (৩) নন্দ বংশ ও (৪) মৌর্য বংশ।
United Magadha Empire
১) হর্ষঙ্ক বংশ (Haryanka Dynasty ৫৪৫-৪৯৩ খ্রীষ্টপূর্ব): হর্ষঙ্ক বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিম্বিসার। তার সময় থেকে মগধের অগ্রগতি শুরু হয়। বিম্বিসার মগধের শক্তি বৃদ্ধির জন্য তিনটি পথ গ্রহণ করেন - বৈবাহিক সম্পর্ক, রাজ্য জয় ও মৈত্রী সম্পর্ক। বিম্বিসার কোশল রাজকন্যা কোশলদেবীকে বিবাহ করে কাশী লাভ করে এবং লিচ্ছবি রাজকন্যা চেল্লনা ও বিদেহের রাজকন্যা বাসবী-কে বিবাহ করে রাজ্য বিস্তার করে। দ্বিতীয়ত, পার্শ্ববর্তী অঙ্গ রাজ্য জয় করে মগধ রাজ্যর সীমানা বিস্তৃত করেন। তৃতীয়ত, তক্ষশিলা, অবন্তী প্রভূতি শক্তিশালী রাজ্যগুলির সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তুলে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচিত দেন।

বিম্বিসারের মৃত্যুর পর তার পুত্র অজাতশত্রু মগধের সিংহাসনে বসেন। কথিত আছে, অজাতশত্রু তার পিতা বিম্বিসার-কে হত্যা করেন। অজাতশত্রুর রাজত্বকাল ছিল যুদ্ধে ভরা। তিনি কোশল ও বৈশালী রাজ্যর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। অবশেষে কোশলের সঙ্গে সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। কোশল রাজ প্রসেনজিৎ তার কন্যা ভজিয়া কুমারীর সঙ্গে অজাতশত্রুর বিবাহ দেন এবং যৌতুক হিসেবে কাশী রাজ্যটি তার দখলে আসে। অজাতশত্রুর প্রধান কৃতিত্ব ছিল গঙ্গা ও শোন নদীর সঙ্গমস্থলে পাটালি গ্রাম দূর্গকে কেন্দ্র করে পাটালিপুত্র নগরীর নির্মাণ ও মগধের রাজধানী পরিবর্তন। অজাতশত্রুর পর হর্ষঙ্ক বংশের শাসকগণ ছিল উদয়ভদ্র বা উদয়িন, অনুরুদ্ধ, মুণ্ড ও নাগদশক।

২) শিশুনাগ রাজবংশ (Sishunaga Dynasty ৪৩০-৩৬৪ খ্রীষ্টপূর্ব): শিশুনাগ ছিলেন বৈশালীর রাজপুত্র। শিশুনাগ ছিলেন শিশুনাগ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। বেনারসের আমত্য শিশুনাগ হর্ষঙ্ক বংশের শেষ রাজা নাগদশক-কে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেন ৪৩০ খ্রিষ্টপূর্ব। তিনি সিংহাসনে বসে প্রথমে মগধের রাজধানী পাটালিপুত্র থেকে রাজগৃহে এবং পরে স্থায়ীভাবে বৈশালী-তে স্থানান্তরিত করেন। তিনি অবন্তী রাজ্যর প্রদ্যোত রাজবংশীয় রাজা অবন্তীবর্ধন-কে পরাজিত করেন।

শিশুনাগের পর সিংহাসনে বসেন তার পুত্র কালাশোক বা কাকবর্ণ। কালাশোক স্থায়ীভাবে মগধের রাজধানী পাটালিপুত্রে (বর্তমানে বিহার) স্থানান্তরিত করেন। কালাশোকের আমলে বৈশালী-তে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি অনুষ্ঠিত হয়। বানভট্ট-র হর্ষচরিত থেকে জানা যায়, মহাপদ্ম নামে শূদ্র বংশীয় ব্যক্তি কালাশোক ও তার দশ পুত্র-কে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মগধের সিংহাসন দখল করেন।

মহানন্দিন বা মহানন্দী শিশুনাগ রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন। সিংহলী বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশটীকা অনুসারে, শিশুনাগ রাজবংশের দ্বিতীয় রাজা কাকবর্ণ বা কালাশোকের দশজন পুত্রের নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন ভদ্রসেন, কোরণ্ডবর্ণ, মঙ্গুর, সর্বঞ্জহ, জালিক, উভক, সঞ্জয়, কোরব্য, নন্দীবর্ধন এবং পঞ্চমক। পুরাণে একমাত্র নন্দীবর্ধন বা মহানন্দিনের উল্লেখ রয়েছে। মহানন্দিনের শূদ্র গর্ভজাত পুত্র মহাপদ্ম নন্দ পিতাকে হত্যা করে মগধের সিংহাসন অধিকার করে নন্দ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।

৩) নন্দ রাজবংশ (Nanda Dynasty ৩৬৪-৩২৪ খ্রীষ্টপূর্ব): নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্ম নন্দ। পুরাণ, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে মহাপদ্ম নন্দ-কে শূদ্র বলা হয়েছে। পুরাণের মতে মহাপদ্ম নন্দ ছিলেন শিশুনাগ বংশের শেষ সম্রাট মহানন্দিন এবং শূদ্র রমণীর সন্তান। গ্রীক লেখক কুইন্টাস কার্টিয়ার শূদ্র মহাপদ্ম-কে নাপিত বলে উল্লেখ করেন। ড: রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় বলেন, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ ও পঞ্চম শতক সকলের সামনে এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বৈদিক ধর্মের ক্ষেত্রে ক্ষত্রিয় নেতারা নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন এবং ক্ষত্রিয় সাম্রাজ্যর ধ্বংস স্তূপের উপর শূদ্র সম্রাট মহাপদ্ম নন্দ আর্যাবর্তব্যাপী এক সাম্রাজ্য স্থাপন করেন। এই দুই ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ব্যাপার ছিল না (The Age of Imperial Unity, Edited by Dr. R. C. Majumdar, 2001, P. 33.)। বৌদ্ধ গ্রন্থে মহাপদ্ম নন্দ-কে উগ্রসেন (বিশাল বাহিনীর সেনাপতি) বলা হয়েছে। পুরাণে মহাপদ্ম নন্দ-কে একরাট বা একছত্র সম্রাট, সর্বক্ষত্রান্তক বা সকল ক্ষত্রিয় রাজার উত্তরাধিকারী, সর্বক্ষত্রিয়ছেত্তা এবং দ্বিতীয় পরশুরাম বলা হয়েছে। ড: রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, মহাপদ্ম নন্দ ছিলেন উত্তর ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট (The Age of Imperial Unity, P. 33.)।

মহাপদ্মের পর তার আট পুত্র মগধের সিংহাসনে বসেন। এদের একসঙ্গে নবনন্দ বলা হয়। মহাবোধিভামস থেকে জানা যায় নন্দ বংশের নয় জন রাজারা নাম - মহাপদ্ম নন্দ, পান্দুকা, পান্দুগাতি, ভুটাপালা, রাষ্ট্রপালা, গোবিশানকা, দশাশিদ্ধকা, কৈবর্ত, ধননন্দ। নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দ গ্রীক বীর আলেকজান্ডারের সমসাময়িক ছিলেন। তার বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। তিনি ছিলেন অত্যাচারী। এছাড়া জনসাধারণ তাদের নিচবংশজাত বলে মেনে নিতে পারেনি। এই অবস্থায় কৌটিল্যে নামক এক ব্যক্তির সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ধননন্দ-কে পরাজিত করে মগধের সিংহাসনে মৌর্য বংশের (৩২৪ খ্রীষ্টপূর্ব) প্রতিষ্ঠা করেন।

৪) মৌর্য বংশ (Mauryan Dynasty ৩২৪-১৮৭ খ্রীষ্টপূর্ব): মৌর্য বংশের সময়কাল ছিল খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪ থেকে ১৮৭ পর্যন্ত। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ভারতের প্রথম সাম্রাজ্যর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নন্দ বংশ-কে পরাজিত ও উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে গ্রিকদের বিতাড়িত করেন। তিনি একটি সুস্থ শাসন ব্যাবস্থা চালু করেন। চন্দ্রগুপ্তের বংশধরদের মধ্য সর্বশ্রেষ্ট ছিলেন অশোক। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে রাজ্য বিস্তার নীতিতে আগ্রহী ছিল না। তিনি ধর্ম বিজয় নীতি অনুসরণ করে একজন প্রজা কল্যাণ ও মানবতার শাসক রুপে বিশ্বে বন্দিত হন। অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। তার উত্তরাধিকারীগণ ছিল অযোগ্য ও দুর্বল ছিল। অবশেষে ১৮৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে শুঙ্গ বংশীয় সেনাপতি পুষ্যমিত্র মগধের মৌর্য বংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেন এবং মগধের সিংহাসনে মৌর্য শাসনের অবসান হয়।

গ্রন্থপঞ্জী (Reference):
1. জীবন মুখোপাধ্যায় - ভারতের ইতিহাস
2. D.N. Jha - Ancient India In Historical outline
3. D.D. Kosambi - The Culture and Civilization of Ancient India
4. Shailendra Nath Sen - Ancient Indian History and Civilization
5. Romila Thapar - History of India
Advertisement