বৈদিক যুগের ধর্মীয় বিশ্বাস

- September 13, 2019
আর্থিক ও সামাজিক জীবনে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ধর্মজীবনে পরিবর্তন আসে। প্রথমে আর্যরা ছিল যাযাবর ও পশুচারণকারী। পরবর্তীকালে তারা ধীরে ধীরে কৃষিজীবীতে পরিণত হয়, রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবং কিছু কিছু অনার্য ভাবধারা গ্রহণ করে। এইসব আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন তাদের ধর্মীয় চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দিক থেকে আর্য সভ্যতাকে দুভাগে ভাগ করা হয়— ঋক বৈদিক যুগ (১৫০০-১০০০ খ্রিঃ পূঃ) এবং পরবর্তী বৈদিক যুগ (১০০০-৬০০ খ্রিঃ পূঃ)।
Vedic Age Religion

ঋক বৈদিক যুগের ধর্ম

ঋকবৈদিক আর্যদের ধর্মীয় চিন্তাভাবনার একমাত্র উপাদান হল ঋগ্বেদ। ঋগ্বেদের অন্তর্ভুক্ত ১০২৮টি স্তোত্রে আদি আর্যদের ধর্মীয় ভাবনা বর্ণিত আছে। আর্যরা প্রাকৃতিক শক্তির উপাসনা করত। তাদের কাছে বৃষ্টি, চন্দ্র, সূর্য, সমুদ্র, পাহাড়, বজ্জ্রপাত, ঋতুর বর্ণময় বৈচিত্র্য এবং বিচিত্র জীবজগতের কোনও ব্যাখ্যা ছিল না। তারা মনে করত যে, প্রকৃতির এই রহস্যের অন্তরালে কোনও দৈবশক্তি কাজ করছে। তারা সর্বপ্রাণবাদ অর্থাৎ পৃথিবীর সকল বস্তু, এমনকী প্রকৃতির মধ্যেও প্রাণের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত। এই কারণে তারা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও দৃশ্যের উপর দেবত্ব আরােপ করে পূজার্চনার মাধ্যমে তাদের সন্তুষ্ট রাখতে সচেষ্ট হত।

ঋগ্বেদের ঋষিরা বিশ্বভুবনকে তিনভাগে বিভক্ত করেছেন। এই ভাগগুলিকে বলা হয় স্থান, লোক ও মণ্ডল। সকলের উর্ধ্বে যে মণ্ডল তার নানা নাম—দ্যুলােক, স্বর্গ, আকাশ বা আলােক। সকলের নীচে হল ভূলােক বা পৃথিবী। স্বর্গ ও পৃথিবীর মাঝে হল অন্তরীক্ষ, বায়ু বা মধ্যম মণ্ডল। বিভিন্ন দেবতা বিভিন্ন মণ্ডল বা লােকে বাস করেন। দৌঃ, বরুণ, সূর্য, বিষ্ণু হলেন লােকের দেবতা। ইন্দ্র, পর্জন্য, রুদ্র, মরুৎ হলেন ভূলােকের দেবতা। অগ্নি ও সােম হলেন অন্তরীক্ষের দেবতা। ঋগ্বেদে বহু দেবতার কথা বলা হলেও একেশ্বরবাদই হল ঋগ্বেদের মূল কথা, এবং ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলির অন্তর্নিহিত ভাবই হল একেশ্বরবাদ। স্থানভেদ ও কালভেদে একই দেবতা বিভিন্ন নামে পরিচিত।

ঋক বৈদিক যুগের দেবতাদের মধ্যে প্রাচীনতম হলেন স্বর্গের দেবতা ও পিতা দ্যৌঃ এবং পথিবীর দেবী মাতা পৃথিবী। খাদ্য, জল প্রভৃতি দ্বারা তারা মানব সমাজকে রক্ষা করতেন। ক্রমে এইসব দেবতাদের প্রভাব হ্রাস পায়। ক্রমে এইসব দেবতাদের স্থানে ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণ, সােম প্রভৃতি দেবতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঋক বৈদিক দেবমণ্ডলীতে ইন্দ্র সর্বশ্রেষ্ঠ স্থানের অধিকারী দেবরাজ। ঋগ্বেদে তার উদ্দেশ্যে ২৫০-টি স্তোত্র আছে। তিনি যুদ্ধ, বজ্র ও বৃষ্টির দেবতা। তিনি বজ্রের দ্বারা অসুরদের নিধন করে দেবতাদের রক্ষা করেন। বৃষ্টি ও আলাের দেবতা রূপে তিনি পৃথিবীকে শস্য শ্যামলা করেন। ঋগ্বেদে তিনি পুরন্দর অর্থাৎ তিনি শক্র বা দস্যুদের পুর বা দুর্গগুলি ধ্বংস করে তাদের বিনাশ সাধন করেন। তাকে বৃত্রঘ্ন বলা হচ্ছে, কারণ তিনি বৃত্র নামক দৈত্যকে হত্যা করে পৃথিবীর উপর জলধারা প্রবাহিত করে সৃষ্টিকে রক্ষা করেন। পণ্ডিতদের মতে তার পুরন্দর ও বৃত্রঘ্ন (জলাধার বা বাঁধ ধ্বংসকারী) নামকরণ হরপ্পা সভ্যতার নগর বা দুর্গ এবং জলাধার বাঁধগুলি ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়।

ঋক বৈদিক যুগের দেবমণ্ডলীতে ইন্দ্রের পরেই হলেন অগ্নি। ঋগ্বেদে তার উদ্দেশ্যে ২০০-টি স্তোত্র আছে। আর্যদের কাছে তখন আগুনের গুরুত্ব অপরিসীম। বন জঙ্গল পরিষ্কার করা এবং রান্নার কাজে আদিম মানুষের কাছে আগুন তখন অতি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া যজ্ঞে ঘূত বা হবি যা কিছু উৎসর্গ করা হয় তা ধোয়ার আকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে দেবতার কাছে চলে যায়। তাই মনে করা হত যে, অগ্নি হল দেবতা ও মানুষের মধ্যে যােগাযােগের মাধ্যম। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দেবতা হলেন বরুণ। তিনি পাপ পুণ্যের ধারক এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম রক্ষাকারী। চন্দ্র সূর্যের পথ পরিক্রমা, দিবারাত্রির আনাগােনা, ঋতুচক্রের আবর্তন—সবই তিনি করতেন। মিত্র হলেন সন্ধি, শপথ ও প্রতিজ্ঞা রক্ষার দেবতা, সোম বৃক্ষাদি, মরুৎ ঝড়, পর্জন্য বৃষ্টি, সূর্য আলােক, যম ধ্বংস এবং ধ্বংস এবং বায়ু বাতাসের দেবতা। ঋগ্বেদে কিছু দেবীর উল্লেখ আছে—যদিও তারা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদেরই প্রাধান্য বেশি ছিল। এই দেবীরা হলেন অদিতি, উষা, সাবিত্রী, সরস্বতী। অদিতি হলেন দেবজননী। সাবিত্রী হলেন সূর্যমণ্ডলের অধিষ্ঠাত্রী ও প্রাণদাত্রী। সরস্বতী হলেন নদীর দেবী। উষা হলেন প্রত্যুষ বা সূর্যোদয়ের পূর্বকালীন মুহূর্তের দেবী।

ঋক বৈদিক আর্যদের ধর্মাচরণের বিশেষ অঙ্গ ছিল প্রার্থনা, বলিদান ও যজ্ঞ। এই যুগের প্রথমদিকে প্রার্থনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। ব্যক্তিগতভাবে সব মানুষ সমবেতভাবে প্রার্থনা করত। বলিদান ছিল এই যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। পারিবারিকভাবে বা গােষ্ঠীগতভাবে বলিদান হত। দেবতার উদ্দেশ্যে তারা যজ্ঞ করত। যজ্ঞাগ্নিতে ঘি, মধু, মাংস, সােমরস প্রভৃতি উৎসর্গ করা হত।

পরবর্তী বৈদিক যুগের ধর্ম

পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য অর্থাৎ সামবেদ, যজুবেদ, অথর্ববেদ, সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ থেকে এই যুগের ধর্মীয় জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। আর্যরা পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে সম্প্রসারিত হলে তাদের মধ্যে নানা অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় ধ্যান ধারণা ও আচার অনুষ্ঠানের অনুপ্রবেশ ঘটে। এই পর্বে পূর্ববর্তী যুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ দেবতা স্থানচ্যুত হয়, বহু সাধারণ দেবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বহু নতুন দেব দেবীর আবির্ভাব হয়। ঋগ্বেদের যুগ ছিল বিভিন্ন দেবতা সংঘর্ষ ও সংঘাতের যুগ। সেই যুগে যুদ্ধের দেবতা ইন্দ্র ও অগ্নি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু কৃষিজীবী সমাজে তাদের গুরুত্ব ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। এই যুগের দেবমণ্ডলীতে তারাই প্রাধান্য পেলেন যারা মূলত প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের সঙ্গে যুক্ত—যাঁরা পৃথিবীকে উর্বর করেন, বৃষ্টি দেন, শস্য উৎপাদন ও গরু বৃদ্ধি করে। এই যুগে প্রজাপতি ব্রহ্মা, রুদ্র ও বিষ্ণু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই যুগের দেবমণ্ডলীতে প্রজাপতি ব্রহ্মা ছিলেন সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী। তিনি জীবজগতের স্রষ্টা ও রক্ষাকর্তা রূপে পরিগণিত হন। এই যুগে রুদ্র ও বিষ্ণু গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ঋগ্বেদের যুগে রুদ্র ছিলেন ধ্বংসের দেবতা, কিন্তু এই যুগে তিনি শিব বা মহাদেবে পরিণত হন। বিষ্ণু-র গুরুত্বও বৃদ্ধি পায়। তিনি জগতের পালনকর্তা এবং মানুষের মুক্তিদাতা হিসেবে চিহ্নিত হন। ঋক বৈদিক যুগের মতােই এই যুগের আর্যরাও একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা মনে করতেন যে রুদ্র, শিব, বিষ্ণু সবই প্রজাপতি ব্রহ্মার বিভিন্ন রূপ।

অনার্যদের সঙ্গে যােগাযােগের ফলে বেশ কিছু অনার্য ভাবধারা আর্য সমাজে প্রবেশ করে। মন্ত্ৰতন্ত্র, তুকতাক, ডাকিনী, যাদুবিদ্যা, ভূত-প্রেত-পিশাচ বিশ্বাসী এবং সাপ, গাছ, পাথর, গন্ধর্ব ও অপ্সরার উপাসনা প্রভৃতি পরবর্তী বৈদিক যুগের আর্যদের ধর্মীয় জীবনে প্রবেশ করে। এই যুগে যাগ যজ্ঞের গুরুত্ব ও জটিলতা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। পারিবারিক ও গ্রামীণ যাগ-যজ্ঞের পাশাপাশি অশ্বমেধ, রাজসূয় প্রভৃতি যজ্ঞ শুরু হয়। এর ফলে সমাজে পুরােহিতদের ক্ষমতা ও মর্যাদা যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং পুরোহিত সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস ঘটে। যজ্ঞ পরিচালনার সময় বিভিন্ন কাজের জন্য পৃথক পৃথক পুরােহিতের প্রয়ােজন হয়। হােত্রি মন্ত্রপাঠ করে দেবতাকে ডাকতেন। উদগাত্রী সামবেদ গাইতেন। অধ্বর্য পুঁথি ধরে মন্ত্র বলতেন এবং পুরােহিত মন্ত্রপাঠ করে যজ্ঞে হবি বা ঘৃত নিক্ষেপ করতেন।

পরবর্তী বৈদিক যুগ নতুন দার্শনিক তত্ত্ব কর্মফলবাদ ও জন্মান্তরবাদের উন্মেষ ঘটে। বলা হয় যে, মানুষকে তার কর্মের ফল বর্তমান জন্ম ও পরজন্মে ভােগ করতে হবে। বলা হয় যে, দেহের বিনাশ আছে, কিন্তু আত্মার মৃত্যু নেই। মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা অন্য দেহ ধারণ করে আবার জন্মগ্রহণ করে, এবং পূর্বজন্মের কৃতকর্ম অনুসারে তার জন্মের প্রকৃতি নির্ধারিত হয়। এই বিশ্বাস মানুষকে প্রভাবিত করে। কর্মফল ও জন্মান্তরবাদের এই চক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আত্মার মুক্তির জন্য আরণ্যক-এ ধ্যান এবং অথর্ববেদ-এ সন্ন্যাসের কথা বলা হয়। পতঞ্জলি কর্মফল খণ্ডন ও পুনর্জন্ম রােধের জন্য যােগসাধনার কথা বলেন। উপনিষদের ঋষি উদ্দালক জড়বাদের প্রচার করতে থাকেন। তিনি ঈশ্বর, পরজন্ম ও আত্মার অস্তিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন যে, দেহের বিনাশেই সব শেষ, সুতরাং সব সুখ ভােগ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পরবর্তীকালে এ থেকেই জন্ম নেয় চার্বাক-এর দেহবাদী দর্শন।