ভারতে তুর্কি বিজয়ের প্রভাব

- September 19, 2019
ভারতে তুর্কী বিজয়ের ফলে ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে গুরত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। (১) রাজপুত যুগের নগরগুলি ছিল জাতি প্রভাবিত। সেগুলি ছিল উচ্চশ্রেণির মানুষের বাসস্থান। সমাজের নিম্নশ্রেণি ও নিম্নবর্ণের মানুষের সেখানে স্থান ছিল না। তুর্কি যুগে নগরের দরজা উচ্চ-নিম্ন, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল, হিন্দু-মুসলিম এবং শ্রমিক-কৃষক, কারিগর সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সবাই এখানে একত্রে কাজ করত এবং জীবিকা অর্জন করত এখানে জাতিভেদ বা বর্ণ-বৈষম্যের কোনও স্থান ছিল না। ডঃ হাবিব এই ঘটনাকে নগর বিপ্লব (Urban Revolution) বলে অভিহিত করেছেন। এই যুগে একদিকে যেমন প্রাচীন নগর পাটলিপুত্র, কনৌজ, উজ্জয়িনী তাদের মর্যাদা হারায়, তেমনি অপরদিকে দিল্লি, লাহাের, আজমির, ফিরােজপুর, বদাউন, গৌড় প্রভৃতি নতুন নগরের উৎপত্তি হয়। নগরগুলির বিকাশের ফলে রাস্তাঘাটের উন্নতি হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
ভারতে তুর্কি বিজয়ের প্রভাব
(২) তুর্কি বিজয়ের ফলে ভারতের যুদ্ধরীতি ও সামরিক ব্যবস্থাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এতদিন পর্যন্ত সামরিক কাজে রাজপুত ও ক্ষত্রিয়দের একচেটিয়া অধিকার ছিল। তুর্কি বিজয়ের ফলে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে সামরিক কোনও যােগ্য মানুষই সৈনিকের বৃত্তি গ্রহণ করতে পারত। এতদিন ভারতীয় রাজন্যবর্গের কোনও স্থায়ী সেনাদল ছিল না। সেনা সরবরাহের জন্য তারা সামন্তদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তুর্কি শাসনে সুলতানের অধীনে সামন্তদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত স্থায়ী সেনাদল গঠিত হয়। পদাতিক বাহিনীর গুরুত্ব কমিয়ে অশ্বারােহী বাহিনীর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গতিশীলতা আসে। ভারতে মধ্য এশিয়ার রণকৌশল প্রবর্তিত হয়।

(৩) তুর্কী বিজয় ভারতীয় সমাজে গভীর ও ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করে। বর্ণভেদ ও স্পর্শদূষণ প্রথাদ্বয় ভারতীয় সমাজের অগ্রগতির পথ বন্ধ করেছিল। তুর্কি শাসন এই সমস্ত ব্যবস্থার মূলে কুঠারাঘাত করে। উচ্চশ্রেণির হাতে নিপীড়িত নিম্নশ্রেণির মানুষরা তুর্কি শাসনকে সহজেই মেনে নেয়। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ বিদেশি প্রভাব থেকে নিজ ধর্ম ও সমাজকে রক্ষার উদ্দেশ্যে নানা কাঠোর বিধি নিষেধ প্রবর্তন করে। এভাবেই পর্দা প্রথা ব্যাপকতর হয়। অপরদিকে ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হয় হিন্দু মুসলিম সমন্বয়ের উদ্যোগ। এইভাবে সমাজ জীবনে এক পরিবর্তনের সূচনা হয়।

(৪) বীরধর্ম অনুসারে রাজপুত রাজন্যবর্গ প্রতি বছর বিজয়া দশমীর দিন থেকে যুদ্ধ জয়ে বের হতেন। সারা শীতকাল ধরে এই যুদ্ধযাত্রা চলত। এই কালপর্বে তারা কারণে অকারণে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন। স্বাভাবিকভাবেই রক্তপাত ঘটত, মানুষের ধন-সম্পদ ও জীবন বিনষ্ট হত, দেশে শান্তি ও স্থিতি বলে কিছু থাকত না। তুর্কি শাসন এই অনাবশ্যক যুদ্ধ বন্ধ করে দেশে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠা করে।

(৫) তুর্কি বিজয়ের ফলে দিল্লী ভারতের রাজধানীতে পরিণত হয়। কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লিতে স্বাধীন সুলতানির রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ইলতুৎমিস দিল্লি নগরীতে বহু প্রাসাদ, মিনার, মসজিদ ও খানকায় সজ্জিত করেন। সমগ্র ইসলামীয়া জগতে দিল্লি নগরীর মহিমা ছড়িয়ে পড়ে। সড়কপথে দিল্লীর সঙ্গে সমগ্র ভারতের যােগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দিল্লীকে কেন্দ্র করে একটি সর্বভারতীয় চেতনা গড়ে ওঠে।

(৬) খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৌদ্ধ ধর্মের উত্থান ও প্রসারের ফলে বহির্বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে ভারতের যােগাযােগ স্থাপিত হয়। কুষাণ রাজ কণিষ্কের আমলে এই যােগাযোগ আরও বৃদ্ধি পায়। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ্যবাদের কর্তৃত্বের দিনে এই ব্যবস্থা অন্তহিত হয় এবং ভারত বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দ্বাদশ শতকে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটে। ভারতের সঙ্গে আবার মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এমনকী আফ্রিকারও ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ গড়ে ওঠে।

(৭) তুর্কী বিজয়ের ফল হিসেবে বৈদেশিক যােগাযােগের সুত্র ধরে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য বিস্তৃত লাভ করে। সুশাসন প্রবর্তন, শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, মুদ্রাব্যবস্থা ও শুল্কনীতি প্রবর্তনের ফলে দেশের অভ্যন্তরে বাণিজ্য বিস্তারলাভ করে। দিল্লীর সুলতানদের উদ্যোগে দেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শিল্পোন্নয়নের পথকে প্রশস্ত করে। এক কথায়, তুর্কি বিজয় ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

(৮) ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আসে। এতদিন ভারতীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। তুর্কি শাসন ভারতীয় প্রশাসনের ক্ষেত্রে ফারসি বা পারসিক ভাষা প্রচলন করে দেশে এক প্রশাসনিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। কেবলমাত্র ভাষাই নয়—ধর্ম, সাহিত্য ও শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় ও পারসিক উভয় ধ্যান-ধারণার সমন্বয়ে ভারতে এক নতুন ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

(৯) তুর্কি বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতীয় রাজ্যগুলিতে সামন্তপ্রথা প্রচলিত ছিল। এর ফলে ভারত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। তুর্কি শাসন ইক্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতে সামন্তপ্রথার উচ্ছেদ সাধন করে ভারতে একটি কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এই শাসনব্যবস্থার প্রধান ছিলেন স্বয়ং সুলতান।

(১০) হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর ভারত ইতিহাসে বিচ্ছিন্নতার সূচনা হয়। ভারতের বুকে পারস্পরিক বিবদমান অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্যের উত্থান ঘটে। তুর্কি বিজয়ের ফলে এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ভারতে আবার রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।