PayPal

হোসেন শাহী বংশের গুরত্ব ও অবদান

author photo
- Wednesday, September 04, 2019
বাংলার ইতিহাসে হোসেন শাহী রাজবংশ ৪৫ বছর শাসন করেন। এই সময় রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রে বাংলার উন্নতি ঘটে। ড: হাবিবউল্লাহ বলেন, হোসেন শাহী রাজবংশের শাসনকাল হল নজিরবিহীন শান্তি, সমৃদ্ধি ও বৃহৎ সামরিক বিজয়ের অধ্যায়। ঐতিহাসিক মমতাজুর রহমান তালুকদার তার Husain Shahi Bengal গ্রন্থে বলেন যে, হােসেনশাহি শাসনের বৈশিষ্ট্য ছিল বাংলার স্বাধীনতা, রাজ্যবিস্তার, প্রশাসনের সুদৃঢ়করণ এবং ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি।
Contribution of the Hussain Shahi Dynasty
রাজনৈতিক অবদান: আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বাংলার ছয় বছরের হাবসি শাসনের অবসান ঘটিয়ে, বাংলার শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও নসরত শাহের রাজত্বকাল ছিল শান্তি ও সমৃদ্ধির কাল। ঐতিহাসিক বি. এন. রায় হোসেন শাহের রাজত্বকালকে মধ্য যুগের বাংলার সর্বাপেক্ষা গৌরবজনক অধ্যায় বলে চিহ্নিত করেন। কামতারাজ্য, আসাম, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, বিহার প্রভূতি রাজ্যর বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে বাংলা নিজ রাজ্যর সীমা সম্প্রসারিত করে। হোসেন শাহী আমলে বাংলার সীমানা পশ্চিমে ত্রিহুত, দক্ষিণ পশ্চিমে উড়িষ্যার কিছু অংশ, উত্তর পূর্বে কুচবিহার ও দক্ষিণে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। নসরত শাহ মোঘল নায়ক বাবরের বিরুদ্ধে আফগান শক্তি জোট গঠন করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখে।

হুসেন শাহী সুলতানরা ছিলেন সম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা মুক্ত উদার মানবতাবাদী শাসক। হিন্দু মুসলিমদের সহযোগিতায় তারা উদার মানব ধর্মী ধর্ম নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ঐতিহ্য গড়ে তোলেন। হোসেন শাহের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন রূপ গোস্বামী (দবির খান), রাজস্ব মন্ত্রী সনাতন গোস্বামী (সাকর মল্লিক), সেনাপতি গৌর মল্লিক, মুদ্রা শালার অধিকর্তা অনুপ, দেহরক্ষী কেশব ছেত্রী, উজির গোপীনাথ বসু (পুরন্দর খাঁ), ব্যক্তিগত চিকিৎসক মুকুন্দ দাস প্রমুখ কর্মচারীর কথা বলা যায়। অনেক ঐতিহাসিক হোসেন শাহকে মধ্যযুগে বাংলার আকবর বলে অভিহিত করেন। কবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর হোসেন শাহকে কৃষ্ণের অবতার বলেছেন।

সাংস্কৃতিক অবদান: বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতির ইতিহাসে হোসেন শাহী আমল ছিল উল্লেখযোগ্য। হুসেন শাহ ও নসরত শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নবজাগরণ ঘটে (Husain Shahi Bengal, M. R. Tarafdar, P. 350.)। মালাধর বসু, শ্রীকর নন্দী, শ্রীধর, বিজয় গুপ্ত, কবিরঞ্জন, দামোদর, কবিন্দ্র পরমেশ্বর প্রমুখ সাহিত্যিকগণ হোসেন শাহের প্রশংসা ও পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করে। হোসেন শাহের আদেশে মালাধর বসু শ্রীমদভাগবত-এর বাংলা অনুবাদ করেন। এজন্য হোসেন শাহ মালাধর বসুকে গুণরাজ খাঁ উপাধি ও মালাধর বসুর পুত্রকে সত্যরাজ উপাধি দেন। বৈষ্ণব রূপ গোস্বামী সংস্কৃতিতে বিদগ্ধমাধব ও ললিত মাধব নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।

হোসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবিন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেন। রঘুনাথ, রঘুনন্দন, শ্রীচৈতন্য আবির্ভাব হয় হোসেন শাহী আমলে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যচরিতামৃত, বিপ্রদাস পিপিলাই-এর মনসামঙ্গল, জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেন। হোসেন শাহের মৃত্যুর পর জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস প্রমুখ বৈষ্ণব পদকর্তাদের আবির্ভাব হয়। হোসেন শাহের পুত্র নসরত বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য, স্মৃতি, ন্যায়শাস্ত্র এবং দর্শনের আলোচনায় নবদ্বীপ ছিল ভারত বিখ্যাত। হোসেন শাহী বংশের শাসনকালকে বাঙালি জাতির জাতীয় শাসনকাল বলে অভিহিত করা হয়।

হুসেন শাহী যুগে সংগীত ও হস্তলিপিবিদ্যার উন্নতি ঘটে। আরবী ও পারসিক ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি এবং বিভিন্ন মুদ্রায় হস্তলিপিবিদ্যার উন্নতির পরিচয় পাওয়া যায়। সমকালীন বাংলা কাব্যে কেদারা, ধানশ্রী, মল্লার, ভৈরবী প্রভূতি রাগ-রাগিণীর উল্লেখ আছে। উত্তর ভারতে প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারা বাংলায় প্রচলিত ছিল।

শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে হোসেন শাহী বংশের বিশেষ অবদান ছিল। হোসেন শাহের উদ্যোগে নির্মিত গৌড় নগরীর গুণমন্ত মসজিদ, দরমাবাড়ি মসজিদ ও ছোটো সোনা মসজিদ এবং নসরত শাহের আমলে নির্মিত কদম রসুল, বড়ো সোনা মসজিদ ও হোসেন শাহের সমাধিতে নির্মিত পান্ডুয়ার একলাখি মসজিদ হোসেন শাহী যুগের স্থাপত্য কীর্তির নিদর্শন।

ব্রাহ্মণ্য, বৈষ্ণব ও শৈবধর্ম ছাড়া হোসেন শাহী আমলে নাথ, ধর্মঠাকুর, মনসা ও চণ্ডী প্রভূতি আঞ্চলিক ধর্মমতের উদ্ধব হয়। হিন্দু-মুসলিম মিলিত ভাবে সত্যপির-এর পূজা প্রবর্তন হোসেন শাহের এক অন্যতম কীর্তি। হোসেন শাহের যুগে হিন্দু-মুসলিম একেত্রে সত্যপির, গঙ্গাদেবী, ওলাবিবি ও শীতলার পূজা শুরু করে।

অর্থনীতি অবদান: হােসেনশাহি রাজন্যবর্গের উৎসাহে বাংলায় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যেও জোয়ার আসে। সমুদ্রপথে ব্রহ্মদেশ, ইন্দো-চীন, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য চলত। পর্তুগিজ পর্যটক বারবােসা-র বিবরণ থেকে জানা যায় যে, এ সময় সমুদ্র উপকূল জুড়ে অসংখ্য শহর গড়ে ওঠে এবং সেগুলিতে নানা ধরনের কারিগরি পণ্যের কেনাবেচা চলত। এইসব পণ্যের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল নানা ধরনের বস্ত্র, রেশম, চিনি প্রভৃতি। বাংলার অভ্যন্তরে গৌড়, সােনারগাও, চট্টগ্রাম, হুগলির সপ্তগ্রাম ছিল উল্লেখযােগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র।

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচলন থাকলেও কৃষি ছিল বাঙালীর প্রধান জীবিকা। সমসাময়িক সাহিত্য ও বিদেশী পর্যটকের বিবরণীতে বাংলার অতুলনীয় সম্পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। হুসেন শাহের আমলেও বাংলাদেশে বছরে তিনবার ফসল হত। সাধারণভাবে বাঙালী ছিল পরিশ্রমী। বহু কষ্ট স্বীকার করেও জঙ্গল কেটে সে যুগে জমিকে চাষের উপযােগী করার নিদর্শন আছে। সরকারি রাজস্বের পরিমাণ ছিল খুবই কম। উৎপন্ন ফসলের এক-পঞ্চমাংশ মাত্র। পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে আগত চৈনিক রাজদূতের বিবরণ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে কৃষিজাত সম্পদের প্রাচুর্য ছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বহু অর্থাগম হত। পােশাক-পরিচ্ছদ ও মণিমুক্তাখচিত অলংকারের প্রাচুর্য দেখে চৈনিক রাজদূতেরা বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন।

তবে এই যুগে দারিদ্র্য যে একেবারে ছিল না তা নয়। দ্রব্যাদির দাম সস্তা হলেও সাধারণ কৃষক ও প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশার অবধি ছিল না। রাজকর্মচারীদের অযথা অত্যাচার ও উৎপীড়ন অব্যাহত ছিল। রাজস্বের টাকা দিতে না পারলে হিন্দুদের স্ত্রী ও সন্তানদের নীলামে বিক্রি করা হত। যুদ্ধকালে সৈন্যদের লুটপাট অব্যাহত ছিল। এক কথায় বলা যায় যে, বাংলার সামগ্রিক ইতিহাসে হােসেনশাহি বংশের শাসন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এই বংশের নাম চিরদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. জীবন মুখোপাধ্যায় - ভারতের ইতিহাস
2. অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ী - মধ্য কালীন ভারত
3. মমতাজুর রহমান তালুকদার - Husain Shahi Bengal, P. 350.
4. আব্দুল করিম - বাংলার ইতিহাস