দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক

- September 14, 2019
ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের কনিষ্ঠ ভাই মালিক রাজব-এর পুত্র। তার মাতা ছিলেন ভাট্টি রাজপুত রানামলের কন্যা নীলাদেবী। ফিরোজের পিতার মৃত্যু হলে তিনি গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের কাছে লালিত পালিত হন। সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলক তার কাকার পুত্র ফিরােজকে খুবই স্নেহ করতেন এবং তিনি সামরিক ও প্রশাসনিক কাজে শিক্ষা দিতেন। মহম্মদ বিন তুঘলকের মৃত্যুকালে (২০শে মার্চ, ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দে) ফিরোজ তার সঙ্গে সিন্ধুদেশের থাট্টায় ছিলেন। সুলতানের আকস্মিক মৃত্যুতে সিন্ধুদেশে সুলতানি সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রবল বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই অবস্থায় উপস্থিত আমির-ওমরাহ ও অভিজাতরা সুলতানের কাকার পুত্র ফিরােজ তুঘলক-কে সিংহাসনে বসার অনুরােধ জানান। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরােজ তুঘলক রাজি হন এবং ৪৬ বছর বয়সে সিন্ধুনদের পূর্বতীরে সেনা শিবিরে তার রাজ্যভিষেক হয়, ২৪শে মার্চ, ১৩৫১ খ্রিস্টাব্দে।
Sultan Firuz Shah Tughlaq
ফিরোজ শাহ তুঘলকের সিংহাসন লাভের বৈধতা: দিল্লীর সিংহাসনে ফিরােজের দাবির বৈধতা সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ আছে। মহম্মদ বিন তুঘলক মৃত্যুর পূর্বে ফিরােজকে তার উত্তরাধিকারী মনােনীত করে গিয়েছিলেন কিনা, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এদিকে সুলতানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ামাত্র সুলতানের সহকারী খাজা-ই-জাহান এক নাবালককে মৃত সুলতানের পুত্র হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে ফিরােজকে তার অভিভাবক হিসেবে কর্মসম্পাদনের জন্য আহ্বান জানান। আবার সুলতানের ভগিনী খোদাবন্দজাদা নিজ পুত্রকে পরবর্তী সুলতান মনােনীত করার দাবি উপাপন করে বিষয়টিকে আরাে জটিল করে তােলেন। বরানীর মতে, ফিরােজ সুলতান পদে মহম্মদ তুঘলক কর্তৃক মনােনীত হয়েছিলেন। কিন্তু উলসী হেগ নির্দিষ্ট তথ্যের অভাবহেতু বরণীর বক্তব্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, খাজা-ই-জাহান কর্তৃক মনােনীত ব্যক্তি ছিলেন সিংহাসনের বৈধ দাবিদার। আবার ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ মনে করেন, মহম্মদ তুঘলকের কোন পুত্রসন্তান বর্তমান থাকলে তার ভগিনী কখনােই নিজপুত্রের দাবি উত্থাপনের সাহস পেতেন না। তার মতে, উলসী হেগ ফিরােজকে জবরদখলকারী বলে যে অভিমত করেছেন, তা সঠিক নয়। কারণ সুলতানি আমলে নির্দিষ্ট কোন উত্তরাধিকারী আইন ছিল না। সিংহাসনের অধিকারী ফিরােজ ছিলেন বুদ্ধিমান ব্যক্তি। অভিজাত ও উলেমা সম্প্রদায় ফিরোজকে সমর্থন জানায় এবং খাজা-ই-জাহান সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করেন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের রাজতান্ত্রিক আদর্শ: ডঃ আর. পি. ত্রিপাঠী বলেন যে, ফিরােজ তুঘলকের সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে মুসলিম রাজতন্ত্রের বিবর্তনের একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তার পূর্ববর্তী সুলতান আলাউদ্দিন খলজি ও মহম্মদ বিন তুঘলক রাষ্ট্রীয় কার্যে উলেমা ও মুসলিম ধর্মগুরুদের কোনওভাবেই গুরুত্ব দিতেন না, শরিয়তের বিধানও তারা গ্রাহ্য করতেন না। রাষ্ট্রের পক্ষে যা মঙ্গলজনক তাই করতেন। ফিরােজ তুঘলক এই নীতি থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় কার্যে উলেমা ও শরিয়তের বিধানকে স্বীকৃতি দেন। তিনি খলিফার অনুমােদন অর্জন করেন এবং নিজেকে খলিফার ভৃত্য বলে ঘােষণা করেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, তিনি ধর্মাশ্রিত, রাজতন্ত্রের আদর্শ প্রবর্তন করেন। আসলে ধর্মীয় কারণ অপেক্ষা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণেই ফিরােজ তুঘলকের এই ধরনের ধর্মাশ্রয়ী তিনি রাজাদর্শ প্রবর্তনের প্রয়ােজন ছিল।

ফিরােজ তুঘলক উলেমা ও অভিজাতদের সমর্থন নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তাই তিনি তাদের সন্তুষ্টিবিধানে নজর দেন। ফিরােজ শাহ তুঘলক সিংহাসনে বসে অভিজাত ও উলেমা দুই সম্প্রদায়কে তাদের মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি জায়গির প্রথা পুনঃপ্ৰবর্তন করে অভিজাতদের মধ্যে অর্থ ও ধন সম্পদ বিলি করেন, তাদের উপর থেকে গুপ্তচরের নজরদারি তুলে নেন। তিনি উলেমা ও মৌলবিদের লুপ্তভাতা ও অধিকার পুনঃপ্রবর্তিত করেন এবং মাদ্রাসা ও মক্তবে তিনি প্রচুর নিস্কর জমি দান করেন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের অর্থনৈতিক সংস্কার: ফিরোজ শাহ তুঘলক অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রজাদের অবস্থা উন্নতির জন্য তিনি ২৪ রকমের অবৈধ কর বাতিল করেন। কোরানের নির্দেশ অনুযায়ী কেবলমাত্র চারটি কর ধার্য করেন - খারাজ, খামস, জিজিয়া ও যাকাত। এছাড়া তিনি সেচকর বা হক-ই-সার্ব আদায় করতেন। তিনি সেচকার্যের জন্য ৫টি খাল খনন করেন। তিনি খাটি সোনা ও রূপার মুদ্রা চালু করেন। তিনি স্বল্পমূল্যর মুদ্রা জিতল ও বিখ চালু করেন। ফিরোজ তুঘলক ইকতা ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করেন, এছাড়া বংশানুক্রমিক জাইগির প্রথা প্রবর্তন করেন। ফিরোজ শাহ সরকারি পরিচালনাধীন ৩৬টি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুরোনো কারখানাগুলো সংস্কার করেন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের জনহিতকর কার্যাবলী: ফিরােজ শাহ তুঘলক তার জনকল্যাণমূলক ও প্রজাহিতৈষী কার্যাবলীর জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি দিল্লিতে একটি কর্মসংস্থান সংস্থা (Employment Bureau) প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্রদের চিকিৎসার জন্য তিনি দিল্লিতে দার-উস-সফা নামে একটি দাতব্য চিকিৎসারলয় স্থাপন করেন। দুঃস্থ ব্যক্তিদের সাহায্যের জন্য তিনি দেওয়ান ই খয়রাত নামে একটি দাতব্য বিভাগ স্থাপন করেন। এ ছাড়াও তিনি দেওয়ান ই ইস্তিহক নামে একটি সরকারি বিভাগের পত্তন করেন। এর কাজ ছিল যােগ্য ব্যক্তিদের অর্থসাহায্য করা।

সুনির্মাতা হিসেবেও তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ফেরিস্তার মতে তিনি ৫০টি বাঁধ, ৪০টি মসজিদ, ৩০টি কলেজ, ২০টি প্রাসাদ, ১০০টি সরাইখানা, ২০০টি শহর, ৩০টি জলাধার, ১০০টি চিকিৎসালয়, ৫টি সমাধি সৌধ, ১০০টি স্নানাগার এবং ১৫০টি সেতু সহ অসংখ্য বাগান ও বিনােদন গৃহ নির্মাণ করেন। ফিরোজ শাহ তুগলকের নির্মিত শহরগুলি হল ফতেহাবাদ, হিসার, ফিরােজপুর, ফিরােজাবাদ ও জৌনপুর ইত্যাদি। তিনি মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মিত দুটি স্তম্ভের একটি মিরাট এবং খিজিরাবাদ থেকে দিল্লিতে এনে দিল্লী নগরীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের প্রশাসনিক সংস্কার: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তিনি বিচারব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন এবং এর ফলে বিচারব্যবস্থা অনেক বেশি মানবিক হয়ে ওঠে। তিনি পুর্বপুরুষদের আমলের নিষ্ঠুর দণ্ডদান প্রথা - অঙ্গচ্ছেদ করা, হাতির পায়ে পিষ্ট করা, বেত্ৰদণ্ড, অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা, মুণ্ডচ্ছেদ প্রভৃতি বাতিল করেন। কোরানের নির্দেশ অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালিত হত। মুফতি শরিয়তি আইনের ব্যখ্যা করতেন এবং কাজি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। ফিরােজ তুঘলকের শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি প্রচুর ক্রীতদাস ক্রয় করতেন। তিনি ক্রীতদাসদের রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষা ও মঙ্গলের জন্য পৃথক আমলাদের অধীনে একটি পৃথক দপ্তর খােলেন। ক্রীতদাসদের মধ্যে যারা শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল তিনি তাদের ধর্ম ও সাহিত্য বিষয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। অনেকে আবার কারিগরি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত এবং তারা সরকারি কারখানাগুলিতে নিযুক্ত হত।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের সামরিক কার্যকলাপ: ফিরোজ শাহ তুঘলক ছিলেন শান্তিবাদী শাসক। তিনি সমরনায়ক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেননি। ১৩৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা জয়ে অগ্রসর হন। ফিরােজ শাহ তুঘলক সসৈন্যে বাংলায় উপস্থিত হলে শামসুউদ্দিন ইলিয়াস শাহ দুর্ভেদ্য একডালা দুর্গের ভিতর থেকে প্রতিরােধ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ফিরােজ শাহ অভিযান অসমাপ্ত রেখেই রাজধানীতে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ১৩৫৯ খ্রিষ্টাব্দে শামসুউদ্দিন ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহের আমলে ফিরােজ শাহ তুঘলক আবার বাংলাদেশ আক্রমণ করেন। সিকান্দার শাহ তার পিতার মতই একডালা দুর্গে আশ্রয় নেন। ফিরোজ বহু দিন দুর্গ অবরুদ্ধ রেখেও দুর্গ দখল করতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই সন্ধি স্থাপন করে। তিনি বাংলার স্বাধীনতা মেনে নেন।

Advertisement
বাংলা থেকে ফেরার পথে বিহার হয়ে তিনি জাজনগর (বর্তমান উড়িষ্যা) আক্রমণ করেন। সলুতানি বাহিনীর আগমনে ভীত জাজনগরের রাজা তৃতীয় ভানুদেব পলায়ন করেন। সুলতান বিনা বাধায় পুরীতে প্রবেশ করে বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেন এবং বহু মূর্তি ভেঙে সাগরে নিক্ষেপ করেন। তার হাতে প্রচুর হিন্দু নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত রাজা ভানুদেব আত্মসমর্পণ করেন এবং কর হিসেবে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ হাতি দিতে সম্মত হন। জাজনগর অবশ্য দিল্লি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় নি।

১৩৬১ খ্রিস্টাব্দে ফিরােজ তুঘলক নগরকোটের বিরুদ্ধে এক অভিযান পাঠান। ছয়মাস অবরােধের পর নগরকোটের রাজা বশ্যতা স্বীকার করেন। দুর্গের অভ্যন্তরে জ্বালামুখী মন্দির ও রাজপ্রাসাদ লুণ্ঠন করে তিনি প্রচুর ধনরত্ন এবং ১৩০০ সংস্কৃত পুঁথি হস্তগত করেন।

ফিরােজ তুঘলকের রাজত্বকালে নিম্ন সিন্ধুর থাট্টার শাসক দিল্লি সুলতানির বিরুদ্ধে মােঙ্গলদের সঙ্গে হাত মেলালে সুলতান ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযান পাঠান। সিন্ধু রাজ জাম বাবানিয়া সর্বশক্তি দিয়ে প্রবল প্রতিরােধ গড়ে তােলেন। সুলতানি শিবিরে রসদের অভাব দেখা দেয়। খাদ্যাভাব ও মহামারিতে প্রচুর সেনা ও ঘােড়ার মৃত্যু হয়। নতুনভাবে শক্তি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভ্রান্ত সুলতান গুজরাট অভিমুখে যাত্রা করেন, কিন্তু পথভ্রষ্ট হয়ে কচ্ছের মরু অঞ্চলে ঢুকে সেখানে ছয়মাস অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। এখানে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে বহু সেনার মৃত্যু ঘটে। শেষে ১৩৬৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে সাহায্য আসার পর পুনরায় তিনি সিন্ধু আক্রমণ করেন। সিন্ধু রাজ আত্মসমর্পণ এং বাৎসরিক করদানে সম্মত হন।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের শেষ জীবন: ফিরােজ তুঘলকের শেষ জীবন সুখের ছিল না। বৃদ্ধ বয়সে তার জ্যেষ্ঠপুত্র ফতে খান এবং দ্বিতীয় পুত্র জাফর খান এর মৃত্যু হয়। সুলতান এতে খুবই ভেঙে পড়েন। এর ফলে অশীতিপর সুলতান তার তৃতীয় পুত্র মহম্মদ এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ সময় সুলতানের উজির বা খান-ই-জাহান সুলতানের সঙ্গে তার পুত্র মহম্মদের বিরােধ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত খান-ই-জাহান পলায়ন করেন এবং নিহত হন। পিতা ও পুত্র যৌথভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। অচিরেই তাদের মধ্যে মনােমালিন্যের সৃষ্টি হয়। পুত্র মহম্মদ বিদ্রোহ ঘােষণা করেন এবং পলায়নে বাধ্য হন। এই অবস্থায় সুলতান তার জ্যেষ্ঠপুত্র ফতে খানের পুত্র দ্বিতীয় গিয়াসউদ্দিন তুঘলক-কে ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তার উত্তরাধিকারী মনােনীত করেন। এর পর ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজ শাহ তুঘলক ভগ্নহৃদয়ে প্রাণত্যাগ করেন। আলাউদ্দিন খলজি নির্মিত ট্যাঙ্কের নিকটে তার সমাধিটি হাউজ খাস (নয়াদিল্লি) এ অবস্থিত। ১৩৫২-১৩৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজ শাহ নির্মিত একটি মাদ্রাসা সমাধির সাথে সংযুক্ত।

দিল্লি সুলতানির পতনের ফিরোজ শাহ তুঘলকের দায়িত্ব: দিল্লি সুলতানির পতনের জন্য ফিরোজ তুঘলকের দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে শান্তি, সংহতি ও পরিতৃপ্তি সত্ত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ফিরােজ শাহ অনুসৃত নীতি ও শাসনব্যবস্থা দিল্লি সুলতানির পতনকে বহুলাংশে ত্বরান্বিত করেছিল। (১) ফিরােজ তুঘলক তােষণ বা আপােষের নীতি গ্রহণ করায় সিংহাসনের মর্যাদা ও ক্ষমতা হ্রাস পায়। লেনপুল বলেন যে , ফিরােজ জনগণের ভালােবাসা, সম্ভবত শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ তাকে ভয় করত না। (২) অভিজাতদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে তিনি তাদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দেন, তাদের ঋণ মকুব করেন এবং ইকতা ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন করেন। এর ফলে শাসনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। ইতাদাররা নিজ নিজ এলাকায় স্বাধীন হয়ে ওঠে। (৩) তার সামরিক সংস্কার সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে দেয়। (৪) “ঐস্লামিক ধর্মরাজ্য" প্রতিষ্ঠা এবং উলেমাদের খুশি করতে গিয়ে তিনি অ-মুসলিমদের ভাবাবেগে আঘাত হানেন। জাতীয় সংহতি বিপন্ন হয়। (৫) তার ক্রীতদাস বাহিনী কালক্রমে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে অবস্থা জটিলতর করে তােলে। (৬) ব্যাপক দান খয়রাতের ফলে সাম্রাজ্যের আর্থিক বুনিয়াদ দুর্বল হয়ে পড়ে। (৭) বিচার ব্যবস্থায় দয়া ও মানবিকতার আমদানি করে তিনি নিষ্ঠুর দণ্ডপ্রথা রহিত করেন। এর ফলে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
Advertisement