বাংলার ফরায়েজী আন্দোলন

- September 25, 2019
ফরাজী কথাটি অর্থ ফরাজ অর্থাৎ আল্লাহের নির্দেশিত কর্তব্য। পূর্ব বাংলার ফরিদপুরের হাজী শরীয়ত উল্লাহ ও তার পুত্র দুদুমিঞা বা মহম্মদ মহসীন ছিলেন ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক। ফরায়েজী নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহ আরব দেশ থেকে তার মতবাদের প্রেরণা পান। ফরায়েজীগণ জুম্মার নামাজ বা ঈদের প্রার্থনায় আপত্তি করতেন। কারণ তাদের মতে, ইংরাজ শাসনের ফলে ভারত ছিল দার-উল-হারব। এখানে পবিত্র জুম্মা বা ঈদের প্রার্থনা করা উচিত নয় বলে তারা বিশ্বাস করতেন। এজন্য ফরায়েজীদের বে-জুম্মাওয়ালা বলা হত। ফরায়েজী আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, বাখরগঞ্জ প্রভূতি অঞ্চলে। বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের শুরু হয় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে।
faraizi movement in bengal

ফরায়েজী আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

ফরায়েজী আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল - ইসলাম ধর্মের কুসংস্কার দূর করে কোরান নির্দেশিত পথে ইসলাম ধর্মের সংস্কার করা। জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দরিদ্র কৃষক, কারিগর, তাঁতি প্রভৃতি সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করা। বাংলাদেশ থেকে ইংরেজ শাসন উচ্ছেদ করে ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজ বিরােধী এই ধর্মভিত্তিক আন্দোলনের মূল কথা হল ইসলামের আদি ও অকৃত্রিম আদর্শের পুনরুজ্জীবন ও বাংলাদেশকে দার-উল-ইসলামে পরিণত করা। অবশ্য এই আন্দোলন ইংরেজ ও জমিদার বিরােধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল।

ফরায়েজী আন্দোলনের হাজী শরীয়ত উল্লাহ ভূমিকা

হাজী শরীয়ত উল্লাহ ছিলেন ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক। তিনি ফরিদপুর জেলার বন্দরখােলা পরগণায় এক দরিদ্র তালুকদার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কা শরীফে গমন করেন এবং ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে ভারতে ফিরে আসেন এবং পূর্ব বাংলায় তার ধর্মমত প্রচার করেন। হাজী শরীয়ত উল্লাহ বলেন যে, প্রচলিত ইসলাম ধর্মে বহু কুপ্রথা ঢুকে গেছে। এজন্য তিনি ইসলামের শুদ্ধির কথা বলেন। তিনি জুম্মা প্রার্থনা ও ঈদের উৎসবের বিরােধিতা করেন। কারণ তার মতে, ইংরাজ অধিকৃত ভারতবর্ষ ছিল দার-উল-হারব। সুতরাং এই অবস্থায় ভারতে জুম্মা প্রার্থনা না করা উচিত বলে তিনি মনে করতেন। তিনি পীর বা মুরিদ শব্দের ব্যবহারে আপত্তি করেন। কারণ ফরাজী মতে সকল ফরাজী ছিল সমান। পীর ও মুরিদ কথার অর্থ ছিল প্রভু ও ভৃত্য। এজন্য তিনি এই শব্দ দুটি ব্যবহারে আপত্তি করেন। ফরাজীরা নিজেদের মধ্যে এক ভ্রাতৃত্ববােধ অনুভব করতেন। হাজী শরীয়ত উল্লাহ আদি-ইসলামীয় সমাজতন্ত্রবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। হাজী শরীয়ত উল্লাহের জনপ্রিয়তা এবং মুসলিম কৃষকদের মধ্যে তার প্রভাব দেখে পুরাতনপন্থী মুসলমান ও জমিদাররা শঙ্কিত হন। তাদের চাপে তিনি ঢাকা ছেড়ে ফরিদপুরে চলে যেতে বাধ্য হন। হাজী শরীয়ত উল্লাহের আন্দোলন ছিল সামাজিক ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন।

ফরায়েজী আন্দোলনের দুদুমিঞার ভূমিকা

দুদুমিঞা ১৮১৯ সালে অধুনা বাংলাদেশের মাদারিপুর মহাকুমার বাহাদুরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। হাজী শরীয়ত উল্লাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দুদুমিঞা বা মহম্মদ মহসীন মক্কা থেকে ফিরে এসে ফরাজী আদর্শ প্রচার করেন। তিন সর্বত্র প্রচার করেন যে, জমি আল্লাহের দান। সুতরাং জমিদারের কর ধার্য করার অধিকার নেই। তার মত দরিদ্র কৃষকদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি ফরায়েজী সংগঠন স্থাপন করেন। তিনি পূর্ব বাংলাকে একাধিক অঞ্চলে ভাগ করেন। প্রতি অঞ্চলের ওপর একজন খলিফা নিয়ােগ করেন। ফরায়েজীদের ওপর কোন অঞ্চলে আক্রমণ বা অত্যাচার হলে অন্য সকল কেন্দ্র থেকে তাদের সাহায্য দান করা হত। খলিফারা নিজ নিজ অঞ্চলে ফরায়েজীদের সঙঘবদ্ধ করেন। মামলা-মােকদ্দমা হলে মামলা চালাবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি অঞ্চলে নিজস্ব বিচার বিভাগ গঠিত হয়। প্রতি গ্রামের বৃদ্ধ ফরায়েজীকে নিয়ে বিচার সভা গঠন করা হয়। ইংরাজের আদালতে বা জমিদারের কাছে বিচার প্রার্থনা নিষদ্ধ করা হয়। ফরায়েজী কেন্দ্র থেকে লাঠিয়াল বাহিনী আত্তরক্ষার জন্যে গঠন করা হয়।

খলিফারা নিজ নিজ অঞ্চলের সংবাদ দুদুমিঞার কাছে নিয়মিত পাঠাতেন। কোন জমিদার বে-আইনী কর বসালে এবং উৎপীড়ন করলে সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ পাঠান হত। দুদুমিঞা ঘােষণা করেন যে, জমিদারদের দুর্গাপূজা কর দেওয়া হবে না। কারণ ফরায়েজীরা পৌত্তলিকতা মানেন না। এই কর আদায় উৎপীড়নমূলক। জমিদারদের বক্তব্য ছিল যে, দীর্ঘকাল ধরে এই কর আদায় করা হচ্ছে। জমিদারদের অন্যান্য বে-আইনী কর আদায়ে তিনি বাধা দেন।

ফরায়েজীদের উত্থান জমিদার শ্রেণী সুনজরে দেখেননি। জমিদাররা আশঙ্কা করেন যে, ফরায়েজীদের প্রভাবে গ্রাম সমাজে তাদের আধিপত্য নষ্ট হবে। চিরাচরিত উপকর প্রদানে আপত্তিকে তারা খারাপ লক্ষণ বলে মনে করেন। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ফরায়েজীদের সংগঠন জমিদারী ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিরূপে দেখা দিলে জমিদারদের ভয় দেখা দেই। এর ফলে জমিদারদের সঙ্গে ফরায়েজীদের সংঘাত দেখা যায়। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে দুদুমিঞা জমিদার, রক্ষণশীল মুসলমান ও জমিদারের সহকারী নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘােষণা করেন। দুদুমিঞা জমিদারদের জমি ছেড়ে সরকারের খাস জমিতে বসবাসের জন্যে কৃষকদের পরামর্শ দেন। জমিদারদের খাজনা বন্ধ করায় ফরিদপুর জেলায় জমিদারদের সঙ্গে নীলকরদের সংঘাত দেখা দেয়। দুদুমিঞ্যার নির্দেশে লাঠিয়ালরা জমিদারের পাইকদের বাধা দেয়। ফরাজী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কৃষক বিদ্রোহের চরিত্র গ্রহণ করে। ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে দুদুমিঞা ডানলপের নীলকুঠি আক্রমণ ও লুঠ করে। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে দুদুমিঞা গ্রেপ্তার হন ও উচ্চতর আদালতের নির্দেশে দুদুমিঞা মুক্তি পান। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সময় পুনরায় দুদুমিঞা গ্রেপ্তার করে আলিপুর জেলে রাখা হয়। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে বাহাদুরপুরে দুদুমিঞার মৃত্যু হয়।

ফরায়েজী আন্দোলনের প্রকৃতি

ফরায়েজী আন্দোলন শুদ্ধি ও মৌলিক সংস্কারের দ্বারা ইসলাম ধর্মকে গণধর্মে পরিণত করার লক্ষ্য নেয় এবং এই ধর্ম আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষক ও দরিদ্র শ্রেণীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা প্রচার করে। ফরায়েজী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য, ফরায়েজী আন্দোলনে কেবলমাত্র মুসলিম কৃষকরা আকৃষ্ট হননি, হিন্দু কৃষকরাও ফরায়েজী আন্দোলনকে সমর্থন জানান। রক্ষণশীল মুসলিম ও হিন্দু-মুসলিম জমিদারদের ফরাজী আন্দোলনের বিরােধী দেখা যায়। ডঃ বিনয় চৌধুরীর মতে, প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন থেকে ফরায়েজী আন্দোলন হিসেবে কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়। কিন্তু জমিদারী প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তির জন্যে ফরায়েজীরা কিছুই বলেননি। নীলচাষ প্রথারও সম্পূর্ণ বিলােপ তারা চাননি। তাদের লক্ষ্য ছিল সীমিত। ফরায়েজীদের সংহতির প্রধান উৎস ছিল তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাস। এই নৈতিক বিশ্বাসে এক সার্বজনীনতা ছিল। ফরায়েজীদের ব্রিটিশ বিরােধিতা ছিল খুবই অস্পষ্ট। সুপ্রকাশ রায়ের মতে, এজন্য ফরায়েজী আন্দোলন জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ণ বৈপ্লবিক রূপদান করেছিল।

ফরায়েজী আন্দোলনের ব্যর্থতা

ফরায়েজী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ ছিল সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যার ফলে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। শুধুমাত্র মুসলিমদের শুদ্ধি আন্দোলন দ্বারা সকল ফরাজী আন্দোলনের মুসলিমকে প্রভাবিত করা যাবে না একথা নেতারা বুঝেননি। দ্বিতীয়ত, ফরায়েজী আন্দোলনের নেতারা স্বাধীনতার ডাক দিয়ে সকল সম্প্রদায়ের লােকেদের ঐক্যবদ্ধ করেননি। তৃতীয়ত, আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সীমিত। জমিদারী প্রথার উচ্ছেদের জন্যে দাবী জানান হয়নি। চতুর্থত, ফরায়েজীরা জোর-জুলুম ও সন্ত্রাসের ব্যবহার করায় ফরায়েজী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা হারান। সর্বশেষে, দুদুমিঞার পর আর কোন উপযুক্ত নেতা না থাকায় ফরায়েজী আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। ফরায়েজী আন্দোলন ছিল একটি ধর্মভিত্তিক কৃষক আন্দোলন।

ফরায়েজী আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

হাজী শরীয়ত উল্লাহ ছিলেন ফরায়েজী আন্দোলনের উদ্যোক্তা। পরবর্তী সময়ে দুদু মিঞা এই আন্দোলনকে পরিচালিত করেন। উইলিয়াম হান্টারের মতে ফরায়েজী আন্দোলন ছিল শ্রেণি সংগ্রাম এবং এই আন্দোলনে দরিদ্র কৃষক সম্প্রদায় জমিদারদের শােষণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়। ডঃ শশীভূষণ চৌধুরীর মতে এটা জমিদার, নীলকর ও ইংরেজদের শােষণের বিরুদ্ধে আরম্ভ হলেও সাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করে। বঙ্গ ক্রটি সত্ত্বেও এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার কৃষক ও প্রজাস্বার্থ রক্ষার জন্য আইন প্রনয়নে বাধ্য হয়।