আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্য ও তাৎপর্য

- September 03, 2019
সামরিক শক্তি ও অর্থবলের দিক থেকে ইংরেজ ঔপনিবেশিক উপনিবেশবাসীদের তুলনায় অনেক বেশি শাক্তশালী ছিল। তথাপি এই অসম দ্বন্ধে উপনিবেশবাসীদের জয় সুনিশ্চিত হয়ে ওঠে নানাবিধ পারিপার্শ্বিক অনুকুল পরিক্ষিতির। উপযুক্ত নেতৃত্ব, ভৌগোলিক অবসথানগত সুবিধা এবং সমকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ইংল্যান্সের কিছুটা সংকটজনক অবস্থা আমেরিকাবাসীদের সাফল্যকে সুনিশ্চিত করে।
Surrender-of-Lord-Cornwallis-canvas-John-Laurens-1820
ভৌগােলিক কারণ: আমেরিকাস্ত ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং আমেরিকানদের নিকট ব্রিটিশ বাহিনীর আত্মসমর্পণ সত্যিই এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। আমেরিকার ভৌগোলিক প্রকৃতিই এই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। একদিকে ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকার দূরত্ব এবং অন্যদিকে উপনিবেশগুলিতে অভিযান পরিচালনা করার অসুবিধা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে বিশেষ সহায়তা করে। অল্পসংখ্যক ব্রিটিশ সেনা বড়াে বড়াে শহর ও নগর দখল রাখার জন্য যথেষ্ট হলেও বিদ্রোহী আমেরিকানদের পর্বত ও অরণ্যসংকুল ভূভাগে অনুসরণ করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর শিক্ষা ও সমরসজ্জা উন্নত হলেও নিজেদের শৈথিলাের জন্য স্বাধীনতাকামী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে ঔপনিবেশিকদের ধ্যানধারণা ইংরেজদের তুলনায় অধিক ছিল। ব্রিটিশ জনসাধারণও এই যুদ্ধের ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখায়নি। বরং, রাজা তৃতীয় জর্জ এবং তার প্রধানমন্ত্রীদের ঔপনিবেশিক নীতিকে ব্রিটিশ জনসাধারণের একটি বিশেষ অংশ প্রথম থেকেই সমর্থন করেনি। তারা পরােক্ষভাবে ঔপনিবেশিকদের সাফল্যই কামনা করেছে।

জাতীয়তাবােধ ও জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্ব: উপনিবেশিকদের সামরিক সংগঠন সম্পর্কেও ইংল্যান্ডের সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাহায্যেই তারা স্বল্পকালের মধ্যেই ঔপনিবেশিকদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু এ কথা সত্য যে সামরিক অভিজ্ঞতা, রসদ ও যুদ্ধৃেপকরণের অভাব হলেও ঔপনিবেশিকরা ছিলেন জাতীয়তাবােধে উদ্বুদ্ধ এবং যে-কোনাে আত্মত্যাগের সাহায্যে স্বাধীনতা অর্জন করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেনাপতি জর্জ ওয়াশিংটনের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, সততা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস ঔপনিবেশিকদের মনে যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঞ্চার করে তার বিরুদ্ধে দাড়ানাের ক্ষমতা ইংরেজদের ছিল না।

ইউরােপের শক্তিসমূহের বিরােধিতা: ঔপনিবেশিক যুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্পেন ও ফ্রান্সের যােগদান ও অর্থসাহায্য ঔপনিবেশিকদের সাহস ও শক্তি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি করে। ফ্রান্স ও স্পেনের সম্মিলিত নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের নিমকা দ্বীপ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। তা ছাড়া রাশিয়া, প্রাশিয়া, সুইডেন ও হল্যান্ড শক্তিজোট স্থাপন করতে থাকে। এই সর্বব্যাপী আক্রমণের ফলে ইংরেজদেরকে একসঙ্গে বহু স্থানে যুদ্ধ করতে হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে আয়াল্যান্ডের বিদ্রোহ এবং ভারতবর্ষে মহীশূর রাজ্যে হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের আক্রমণও ব্রিটিশ শক্তিকে ভীষণভাবে বিপর্যস্ত করে। নানাভাবে বিব্রত থাকার কারণে ইংরেজরা আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বশক্তি প্রয়ােগ করতে সক্ষম হয়নি।

ফ্রান্স ও স্পেনের সাহায্য: সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের ফলে ভারতবর্ষ ও আমেরিকায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক বিস্তৃতি বন্ধ হয়। এছাড়া কানাডা প্রভৃতি বহু স্থান ইংল্যান্ডের নিকট ছেড়ে দিতে হয়েছিল। স্বভাবতই ফ্রান্স ইহার প্রতিশােধ গ্রহণে উদগ্রীব ছিল। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ফ্রান্স অর্থ সাহায্য ও সামরিক সাহায্য দান করে ঔপনিবেশিকদের সাফল্য অর্জনের পথ সহজ করেছিল। স্পেন ফ্রান্সের ন্যায়ই ইংল্যান্ড বিদ্বেষী ছিল। ফ্রান্সের সঙ্গে যুগ্মভাবে স্পেন আমেরিকাবাসীকে সাহায্য দানে অগ্রসর হয়েছিল।

তাৎপর্য: আমেরিকার স্বাধীনতা লাভ আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। এই যুদ্ধের ফলে আমেরিকায় একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও জনগণের অধিকার ঘােষিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে যে বৈপ্লবিক আদর্শের জন্ম হয় বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রে প্রজাতান্ত্রিক আদর্শ রূপায়ণে তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভ করে আমেরিকাবাসী সর্বপ্রথম জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বিজয় সুচনা করে এক বৈপ্লবিক রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল। কালক্রমে এই স্বাধীন রাষ্ট্রই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিসম্পন্ন দেশে পরিণত হয়।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ইংল্যান্ডের মার্কেন্টাইল অর্থনীতির ব্যর্থতা প্রমাণিত হয় এবং ইংল্যান্ডের শাসকরা ঔপনিবেশিক শােষণ নীতির রূপ পরিবর্তন করে কিছুটা সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করে। ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ শাসননীতিতেও রাজার ব্যক্তিগত শাসনের পরিবর্তে পার্লামেন্টের প্রতি দায়িত্বশীল মন্ত্রীসভার পত্তন হয়। সুতরাং, দেখা যায় যে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধুমাত্র আমেরিকার পক্ষেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
Advertisement