খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের কারণ

- September 14, 2019
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক ভারতে ধর্মীয় আলােড়নের যুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই যুগে বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে নানা প্রতিবাদ দেখা দেয় ও বহু নতুন মতামতের উদ্ভব হয়। বৌদ্ধগ্রন্থ অনুসারে এই যুগে ভারতে ৬৩ টি প্রতিবাদী ধর্মের উত্থান ঘটে। জৈনগ্রন্থে এর সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লিখিত হয়েছে। এইসব ধর্মমতের মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধধর্ম সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
Cause of religious protest movement
ধর্মীয় কারণ: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের বহু পূর্বেই বৈদিক ধর্ম তার সরলতা ও পূর্বগৌরব হারিয়ে ফেলে। ব্যয়বহুল যাগযজ্ঞ, পশুবলি, দুর্বোধ্য ক্রিয়াকাণ্ড ও অনুষ্ঠান সর্বস্বতা, ধর্মীয় কার্যে ব্রাহ্মণ পুরােহিতদের অপরিহার্যতা এবং এর ফলে সমাজে তাদের প্রতিপত্তি ও ক্রমবর্ধমান দক্ষিণার চাহিদা প্রভৃতির ফলে ধর্ম প্রাণহীন হয়ে পড়ে এবং সমাজে এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বৈদিক সমাজের চতুরাশ্রম প্রথার ব্রহ্মচর্য ও গার্হস্থাশ্রমে মানুষের আপত্তি ছিল না, কিন্তু বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসের আদর্শ সবার কাছে গ্রহণীয় ছিল না। অপরদিকে, উপনিষদে যাগযজ্ঞ অপেক্ষা আত্মার মুক্তি, কর্মফল ও স্বাধীন চিন্তার আদর্শ প্রচারিত হতে থাকে। উপনিষদের ঋষিরা যাগযজ্ঞ ও দেবদেবীর উপাসনার নিন্দা করতে থাকেন। তারা বলেন যে, মানুষের জীবন জন্ম মৃত্যুর চক্রে বাধা এবং কর্মফলই মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান সর্বস্ব যাগযজ্ঞ নয়—সৎ কর্ম ও শুদ্ধ জীবনাচাই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। ধর্মীয় কার্যে পুরােহিত অপরিহার্য নয়—মানুষই নিজের ভাগ্য নিয়ামক। বলা বাহুল্য, এইসব কারণে সমাজে নতুন ধর্মীয় চিন্তা ও আদর্শের পথ প্রস্তুত হয় এবং সাধারণ মানুষ বৈদিক ধর্মে আস্থাহীন হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক ওল্ডেনবার্গ বলেন যে, গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের কয়েক শত বৎসর পূর্বেই ভারতীয় চিন্তাজগতে এমন এক আলােড়নের সৃষ্টি হয়েছিল, যা বৌদ্ধ ধর্মের পথ প্রস্তুত করে।

সামাজিক কারণ: বৈদিক সমাজের মধ্যেই ধর্মবিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল। বৈদিক সমাজ চারটি বর্ণে বিভক্ত ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা ছিল সবার উপরে। সমাজ ও রাষ্ট্রে তারা বিভিন্ন সুযােগ সুবিধা পেতেন। তারা রাজার কাছ থেকে নানা উপহার পেতেন, তাদের কোনও কর দিতে হত না। এমন অনেক সময় তারা শাস্তির উর্ধ্বে ছিলেন। ব্রাহ্মণদের পরেই ছিল ক্ষত্রিয়দের স্থান। তারা ছিলেন যােদ্ধা ও শাসক শ্রেণির মানুষ। তারা যুদ্ধ করতেন, রাজকার্য পরিচালনা করতেন ও রাজস্ব আদায় করতেন। এই যুগে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও বৈশ্যদের মর্যাদা হ্রাস পায় এবং অনেক সময় তাদের শূদ্রদের সঙ্গে এক করে দেখা হত। শুদ্রদের অবস্থা ছিল শােচনীয়। সমাজ ও ধর্মে ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া আধিপত্য রাজনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী ক্ষত্রিয়দের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় নি। এই কারণে পরবর্তী বৈদিক যুগ থেকেই সমাজে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধ দুজনেই ছিলেন ক্ষত্রিয় রাজকুমার। ডঃ দীনেশচন্দ্র সরকার বলেন যে, ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য ও আচার অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে গৌতম বুদ্ধ প্রথম প্রতিবাদ জানান এবং ভারতীয় জনজীবন ও চিন্তাজগতে নতুন পথের সন্ধান দেন।

ব্রাহ্মণ্য সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিল না। শহরের উৎপত্তির ফলশ্রুতি হিসেবে পতিতাদের আবির্ভাব হয়। ব্রাহ্মণ্য সমাজে পতিতারা ঘৃণ্য বলে বিবেচিত হত। গৌতম বুদ্ধ নারী সমাজ, পতিতা, দস্যু সকলকেই মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ধনী ব্যবসায়ী অনাথপিণ্ডক, দস্য অঙ্গুলিমাল, ব্রাহ্মণ সন্তান সারিপুত্ত ও মােগল্লায়ন, ক্ষৌরকার উপালি এবং পতিতা আম্রপালি — তিনি সকলেরই আধ্যাত্মিক পিপাসা নিবৃত্ত করেন, সামাজিক সাম্যের বাণী প্রচার করে সকলকে তিনি কাছে টেনে নেন এবং মঠে সন্ন্যাস গ্রহণের অধিকার দেন। এর ফলে বৌদ্ধধর্ম সমাজের নিম্নস্তরের মানুষদের কাছে গ্রহণযােগ্য হয়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক কারণ: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে নতুন ধর্মচিন্তার উন্মেষে উত্তর পূর্ব ভারতের গাঙ্গেয় উপত্যকার নতুন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে লােহার হাতিয়ারের সাহায্যে বন জঙ্গল পরিষ্কার করে এই অঞ্চলে কৃষিকার্য শুরু হয় এবং নতুন উপনিবেশ স্থাপিত হতে থাকে। গ্রামাঞ্চলে গহপতি নামে বৈশ্য সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য পশুপালন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বৈদিক ধর্মরীতিতেও বলিদান ছিল অপরিহার্য ও স্বাভাবিক। এই বলিদান প্রথার ফলে কৃষিকার্যের পক্ষে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল। সুতরাং নতুন এই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে স্থায়ী করার জন্য নির্বিচারে পশুহত্যা বন্ধ করা প্রয়ােজনীয় হয়ে ওঠে।

উত্তর পূর্ব ভারতে কৌশাম্বী, কোশল, কুশীনগর, বৈশালী, রাজগুহ, বারাণসী, চিরান্দ প্রভৃতি বহু নতুন নগর প্রতিষ্ঠিত হয়। এইসব নগরগুলিতে অসংখ্য কারিগর ও ব্যবসায়ী বাস করত। এই সময় তারা মুদ্রার ব্যবহার শুরু করেছিল। মুদ্রা ব্যবহারের ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি হয় এবং কারিগর ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যথেষ্ট ধনবান হয়ে ওঠে। বৈদিক আদর্শে পরিচালিত সমাজে ধনবান বৈশ্যদের কোনও সামাজিক মর্যাদা ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই তারা এমন এক ধর্মের অন্বেষণে রত ছিল, যে ধর্ম তাদের সামাজিক মর্যাদা দিতে সক্ষম। বলা বাহুল্য, জৈন ও বৌদ্ধধর্ম তাদের এই প্রয়ােজন মিটিয়েছিল। এই দুই ধর্মমতে জাতিভেদ প্রথার কোনও স্থান ছিল না। এই কারণে বৈশ্যরা এই দুই ধর্মমতের সমর্থক ছিল।

প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহের লেগে থাকত। যুদ্ধ ছিল কৃষিকার্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের অন্তরায়। এই দুই নতুন ধর্মমত অহিংসার বাণী প্রচার করে কৃষি ও ব্যবসা বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মশাস্ত্রে টাকা ধার দেওয়া, সুদ গ্রহণ করা ও সমুদ্রযাত্রা নিন্দনীয় ও পাপ বলে চিহ্নিত। বিভিন্ন ধর্মসূত্রগুলিতে টাকা ধার দেওয়া ও সুদ গ্রহণের নিন্দা করা হয়েছে। বৌধায়ন তীব্র ভাষায় সমুদ্রযাত্রার নিন্দা করেছেন—অথচ বাণিজ্যের প্রয়ােজনে এগুলি অপরিহার্য ছিল। বহু শ্ৰেষ্ঠী বা মহাজন সুদের কারবার করত এবং এটাই ছিল অনেকের জীবিকা। ব্রাহ্মণ্য সমাজ এগুলি ঘৃণার চোখে দেখত এবং সমাজের চোখে এইসব ব্যক্তিরা অপরাধী বলে বিবেচিত হত। স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্যরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরােধী হয়ে ওঠে এবং নতুন জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মমতকে সমর্থন করে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হয়।

এই সময় ব্যক্তিগত সম্পত্তি, ধন সম্পদের প্রাচুর্য, আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাত্রা, উন্নত মানের পােশাক, পরিবহন ও বাসস্থান এক শ্রেণির মানুষের মনে প্রবল বিতৃষার সঞ্চারণ করেছিল। বিলাসময় এই জীবনযাত্রা ত্যাগ করে তারা পূর্বের সহজ, সরল ও তপশ্চর্যাময় জীবনে ফিরে যেতে চাইছিল। বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম বিলাসিতার পরিহার ও তপস্বীর জীবনযাত্রার কথা প্রচার করে মানুষের এই চাহিদা মিটিয়েছিল। জৈন ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সােনা-রূপা স্পর্শের অধিকার ছিল না। শরীর ও আত্মাকে তৃপ্ত রাখার জন্য যতটুকু প্রয়ােজন, তারা ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করতে পারতেন। ডঃ ব্রতীন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায় বলেন যে, এই যুগে কৃষিকার্য ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের ফলে একশ্রেণির মানুষের হাতে প্রচুর সম্পদ জমা হয় এবং অপর শ্রেণির অবস্থা ক্রীতদাসের পর্যায়ে নেমে আসে। সমাজের বৃহত্তর অংশের লােকরা ছিল দরিদ্র, বঞ্চিত ও নিপীড়িত। ধনবন্টনের কোনও ব্যবস্থা বৈদিক সমাজে ছিল না। এর ফলে ধনী যেমন একদিকে ধনীই হত, অন্য দিকে দরিদ্র তেমনি দিন দিন দরিদ্রতর হত। বলা হত এ সবই কর্মফল। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজে এক গভীর সংকটের সৃষ্টি করে।
Advertisement