ব্রাহ্মণ্য ধর্মের উন্মেষ

- September 13, 2019
ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সূচনা ও বিকাশের পশ্চাতে সমকালীন আর্থ সামাজিক পরিস্থিতির গুরুত্ব অপরিসীম। আদি-বৈদিক সমাজ ছিল অর্ধ-যাযাবর ও পশুপালক। এই সমাজে উদ্বৃত্ত উৎপাদন বা শােষণের কোনও সম্ভাবনা ছিল না। পরবর্তী বৈদিক যুগে কৃষিকার্য ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ ঘটতে শুরু করে। হস্তশিল্প, বাণিজ্য ও বহির্বাণিজ্য শুরু হয়। বর্ণব্যবস্থা পরিণত রূপ ধারণ করে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে লােহার ব্যবহার, মুদ্রার প্রচলন ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি সমাজকে এক নতুন স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। সামাজিক উদ্বৃত্ত আহরণের জন্য বর্ণব্যবস্থা নতুন রূপ নিয়েছিল। ব্রাহ্মণরা সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান গ্রহণ করতে থাকে। শূদ্রদের অবস্থা শােচনীয় হতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এর ফলস্বরূপ এ সময় বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম, চার্বাক দর্শন, আজীবক, নিগ্ৰন্থ, জটিলক, পরিব্রাজক, মাণ্ডলিক, গৌতমক প্রভৃতি বেদ বিরােধী ধর্মমতের আবির্ভাব হয়। এইসব আঘাতের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বৈদিক ধর্মে পরিবর্তন দেখা দেয়। বৈদিক ধর্মই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে।
Rise of Brahmin
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক পর্যন্ত সময়কালকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকাশকাল রূপে চিহ্নিত করা হয়। ধর্মীয় চিন্তা ও চেতনার পার্থক্য লক্ষ করে পণ্ডিতরা এই যুগকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। (১) প্রথম পর্বের সময়কাল হল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত। (২) দ্বিতীয় পর্বের সময়কাল হল খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে সপ্তম শতক পর্যন্ত। প্রথম পর্বের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিফলন ঘটেছে বেদান্তের কল্পসুত্র এবং রামায়ণ ও মহাভারত। কল্পসূত্রের মধ্যে তিনটি হল ধর্মসংক্রান্ত-শ্রোতসূত্র, গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্র। দ্বিতীয় পর্বের প্রকাশ ঘটেছে বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র, তাদের টীকা ও পুরাণগুলির মধ্যে। স্মৃতিশাস্ত্র গুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল মনু স্মৃতি, নারদ স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, বৃহস্পতি স্মৃতি, কাত্যায়ন স্মৃতি, পরাশর স্মৃতি প্রভৃতি। পুরাণের সংখ্যা হল আঠারাে এবং তাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য হল বিষ্ণুপুরাণ। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে তথাকথিত হিন্দু ধর্মের যথেষ্ট মিল আছে। এ কারণে ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে হিন্দুধর্ম বলা হয়। অষ্টম শতকে আরবীয়রা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিভিন্ন শাখাগুলি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথম “হিন্দুধর্ম" কথাটি ব্যবহার করেন।

ঈশ্বরের নির্দেশে কোনও বিশেষ ব্যক্তি ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রচলন করেন নি। নানা বেদ বিরােধী ধর্মের ঘাত প্রতিঘাতে এই ধর্ম তার নিজস্ব রূপ পরিগ্রহ করে। বৈদিক ধর্ম, বিভিন্ন লৌকিক ধর্মবিশ্বাস, বৈদিক ও অবৈদিক, বৌদ্ধ ও জৈন, আর্য ও অনার্য নানা ধর্মমতের বিভিন্ন উপাদান, ধর্মাচার, পূজাপদ্ধতি প্রভৃতি নিয়ে গড়ে ও উঠেছে এই ধর্মমত। সমন্বয়ই হল এই ধর্মের মূলকথা। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার তাই হিন্দু ধর্মকে বিচিত্র বর্ণের মর্মর প্রস্তর ও কাচের টুকরাে দিয়ে তৈরি আস্তরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যে বৈদিক ধর্মের স্থলে পাঁচটি প্রধান ভক্তি ধারার উৎপত্তি হয়। এই ধারাগুলি হল — বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গাণপত্য। এই পাঁচটি সম্প্রদায়ের পাঁচজন দেবতা ছিল। তারা হল যথাক্রমে বিষ্ণু, শিব, শক্তি, সূর্য ও গণপতি বা গণেশ। গুপ্তযুগে এই সমস্ত সম্প্রদায়গুলি পরস্পরের কাছাকাছি আসে এবং তাদের একত্রে বলা হত পঞ্চোপাসনা। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব দেবতা থাকলেও অন্যের দেবতাকেও তারা নিজেদের ধর্মে স্থান দিয়েছিল। এর ফলে একটি সমন্বষী মনােভাব গড়ে ওঠে। একেশ্বরবাদী এই ধর্মগুলিকে একত্রে ভগবত ধর্ম বলা হত।

এই যুগে ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, সােম প্রভৃতি দেবতাদের গুরুত্ব কমে যায়। তাদের স্থান দখল করেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম অনুসারে ব্রহ্মা ছিলেন জগতের সৃষ্টিকর্তা। বিষ্ণু জগতের ধারক ও পালক। প্রাকৃতিক নিয়মেই জগৎ সংসার মাঝে মধ্য বিপদের সম্মুখীন হয়। তখন বিষ্ণু অবতার রূপে আবির্ভাব হয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করে। এইভাবে তিনি ১২ বার দ্বাদশ অবতার রূপে আবির্ভূত হয়ে জগৎকে রক্ষা করেছেন। মহেশ্বর হল শিবের নতুন নাম। তিনি প্রলয়ের দেবতা। তিনি প্রলয়ের মাধ্যমে পাপক্রিষ্ট জগৎকে ধ্বংস করেন। বৈদিক দেবতা রুদ্র থেকে মহেশ্বর বা শিবের উৎপত্তি হলেও দুই দেবতার মধ্যে পার্থক্য অনেক।

দেবতাদের পাশাপাশি দেবীরা পূজিতা হতে থাকে। এই যুগে মুনি ঋষি পূজাও শুরু হয়। সপ্তর্ষি নামে খ্যাত মারীচি, অত্রি, অঙ্গরস, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও বশিষ্ঠ এবং নারদ, কাশ্যপ, দক্ষ, বিশ্বমিত্র, বৃহস্পতি, অগস্ত্য প্রমুখ ঋষিগণ উল্লেখযােগ্য। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে অনেক অবৈদিক লৌকিক ধর্মের সমন্বয় ঘটে। পশু-পক্ষী, বৃক্ষ, নদ-নদী , পাহাড়-পর্বত, গরু, সাপ, ভূত-প্রেত, পিশাচ প্রভৃতি দেবতা জ্ঞানে পূজিত হতে থাকে। অশ্বথ, বট ও তুলসি প্রভৃতি বৃক্ষের উপর পবিত্রতা আরােপিত হয়।
Advertisement