দক্ষিণ ভারতের বাহমনি সাম্রাজ্য

- September 13, 2019
মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালের শেষদিকে দক্ষিণ ভারতের সুলতানি শাসনাধীন অংশে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যার অন্যতম কারণ ছিল সাদাহ আমিরদের সমস্যা। যে সব আমিরদের উপর একশােটি গ্রামের শাসনভার অর্পিত ছিল তাদের সাদাহ আমির বলা হত। দাক্ষিণাত্যে দিল্লি সুলতানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় এই আমিরদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ও জনজীবনে এরা খুবই প্রতিপত্তিশালী ছিলেন। মহম্মদ বিন তুঘলক এঁদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে গেলে তারা বিদ্রোহ ঘােষণা করেন। বিদ্রোহী অভিজাতবর্গ দৌলতাবাদ দুর্গটি দখল করেন এবং ইসমাইল মুখ নামক জনৈক বৃদ্ধ আমিরকে স্বাধীন সুলতান বলে ঘােষণা করেন (১৩৪৬ খ্রিঃ)। বৃদ্ধ ইসমাইল মুখের পক্ষে নব প্রতিষ্ঠিত বাহমনি রাজ্যের গুরুভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তিনি স্বেচ্ছায় হাসান বা জাফর খা-র অনুকুলে সিংহাসন ত্যাগ করেন। জাফর খা আবুল মজফফর আলাউদ্দিন বাহমন শাহ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে বসেন ৩রা আগস্ট, ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের নাম বাহমনি বংশ এবং রাজ্যের নাম বাহমনি রাজ্য।

বাহমন শাহ (১৩৪৭-১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দ): বাহমনি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাহমন শাহ। দক্ষিণী ঐতিহাসিক ফেরিস্তার মতে, হাসান ছিলেন একজন আফগান। তিনি প্রথম জীবনে গাঙ্গু নামে জনৈক ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীর ভৃত্য ছিলেন। এই ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীর চেষ্টায় তিনি মহম্মদ বিন তুঘলকের অধীনে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত হন। এই ব্রাহ্মণ ভবিষ্যৎবাণী করেন যে হাসান একদিন রাজসিংহাসনে বসবেন। এই ভবিষ্যৎবাণী সফল হলে তিনি ব্রাহ্মণ জ্যোতিষীর প্রতি কৃতজ্ঞতাবশত নিজ প্রতিষ্ঠিত বংশের নামকরণ করেন বাহমান বংশ। পারসিক ভাষায় ব্রাহ্মণ-কে বাহমন বলা হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই কিংবদন্তি অগ্রাহ্য করেন। বুরহান-ই-মাসির এবং তবকাৎ-ই-আকবরী গ্রন্থে বলা হয়, তিনি পারস্যের বিখ্যাত নরপতি বাহমন-বিন-ইসফান্দারের বংশধর ছিলেন এবং এই কারণে তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ বাহমনি বংশ নামে পরিচিতি লাভ করে। হাসান নিজেও পারস্যের বিখ্যাত পৌরাণিক বীর বাহমন-এর বংশধর বলে নিজের পরিচয় দিতেন। বর্তমানে এই মতটিও ঐতিহাসিকরা বাতিল করেছেন। ডঃ কালিকারঞ্জন কানুনগোর মতে, তিনি ছিলেন একজন ধর্মান্তরিত হিন্দু বা ধর্মান্তরিত হিন্দুর বংশধর। রিজভি-র মতে তিনি ছিলেন সুলতান আলাউদ্দিন খলজির বিখ্যাত সেনাপতি জাফর খানের ভ্রাতুস্পুত্র।

বাহমন শাহ সুদক্ষ যােদ্ধা ছিলেন। তিনি গােয়া, বিদর, কোলাপুর, দাভােল ও তেলেঙ্গানা জয় করে উত্তরে পেনগঙ্গা থেকে দক্ষিণে কৃষ্ণানদী এবং পশ্চিমে দৌলতাবাদ থেকে পূর্বে ভােনগির পর্যন্ত বাহমনি রাজ্য বিস্তৃত করেন। তাঁর রাজধানী ছিল গুলবর্গা। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি তার রাজ্যকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করেন। সেগুলি হল গুলবর্গা, বেরার, বিদর ও দৌলতাবাদ। প্রত্যেক তরফ-এ একজন করে আমির বা শাসনকর্তা নিযুক্ত ছিলেন। সামরিক ও বেসামরিক শাসন পরিচালনায় তারা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভােগ করতেন। তিনি ১১ ফেব্রুয়ারি ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে মারা যান।

প্রথম মুহাম্মদ শাহ (১৩৫৮-১৩৭৭ খ্রিস্টাব্দ): আলাউদ্দিন বাহমন শাহের পুত্র মহম্মদ শাহ পিতার উত্তরাধিকারী হন। তিনি সুযােগ্য শাসক ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। বিভিন্ন সংস্কারের মাধ্যমে তিনি বাহমনি রাজ্যের প্রশাসনিক উন্নতিতে সচেষ্ট হন। তাকে তার রাজ্যের দক্ষিণ পূর্ব এবং দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত দুটি হিন্দুরাজ্য বরঙ্গল ও বিজয়নগরের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়। এই বিবাদের মূল কারণ হল কৃষ্ণা গােদাবরীর ব-দ্বীপ এলাকা, তুঙ্গভদ্রা দোয়াব এবং মারাঠা রাজ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। তিনি বরঙ্গল-রাজকে পরাজিত করে গােলকুণ্ডা দখল করেন এবং প্রচুর ক্ষতিপূণ আদায় কবেন। বিজয়নগর অধিপতি বুক্ক তার কাছে পরাজিত হন।

আলাউদ্দিন মুজাহিদ শাহ (১৩৭৭-১৩৭৮ খ্রিস্টাব্দ): আলাউদ্দিন মুজাহিদ শাহ ছিলেন ব্যর্থ শাসক। তিনি পর পর দুবার বিজয়নগরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজিত হন। তিনি বিদেশি তুর্কি ও পারসিক আনিরদের বেশি গুরুত্ব ও মর্যাদা দিলে দক্ষিণী আমির ওমরাহদের সঙ্গে তাদের বিরোধ বাধে, যার ফল রাষ্ট্রের পক্ষে ভালাে হয় নি। তার চাচা দাউদ কর্তৃক নিহত হন। ১৩৭৮ সালে ১৬ এপ্রিল দাউদ সিংহাসনে বসেন। তিনি জনৈক আততায়ীর হাতে ১৩৭৮ খ্রিস্টাব্দে ২২ মে নিহত হন।

দ্বিতীয় মহম্মদ শাহ (১৩৭৮-১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ): বাহমন শাহের চতুর্থ পুত্র দ্বিতীয় মহম্মদ শাহ সিংহাসনে বসেন। তিনি শান্তিপ্রিয় শাসক ছিলেন। তার আমলে কোনও যুদ্ধবিগ্রহ হয় নি। শিল্প সাহিত্যের প্রতি তার প্রবল অনুরাগ ছিল। তিনি নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরে বেশ কিছু মক্তব, মসজিদ ও খানকা বা ফকিরদের বাসস্থান নির্মাণ করেন। এশিয়া মহাদেশের নানা স্থান থেকে পণ্ডিতরা তার রাজসভায় সমবেত হতেন। প্রজাদের দুর্দশা লাঘবেও তার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। একবার দুর্ভিক্ষের সময় গুজরাট ও মালব থেকে খাদ্যশস্য আমদানির জন্য তিনি দশ হাজার গবাদি পশু ব্যবহার করেন। তার মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র গিয়াসউদ্দিন ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ ২০ এপ্রিল - ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ ১৪ জুন) ও সামউদ্দিন (১৪ জুন ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ-১৫ নভেম্বর ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ) কয়েক মাসের জন্য পরপর সিংহাসনে বসেন।

তাজউদ্দিন ফিরােজ শাহ (১৩৯৭-১৪২২ খ্রিস্টাব্দ): আলাউদ্দিন বাহমন শাহের জনৈক পুত্র তাজউদ্দিন ফিরােজ শাহ। তিনি ছিলেন বাহমনি রাজ্যের অষ্টম শাসক। বসেন। তাজউদ্দিন ফিরােজ শাহ ছিলেন একজন শক্তিশালী নরপতি এবং বাহননি রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান। তার রাজত্বকালে বিজয়নগরের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ১৩৯৮ সর খ্রিস্টাব্দে বিজয়নগর-রাজ দ্বিতীয় হরিহর এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রায়চুর দোয়াব আক্রমণ করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পশ্চাদপসরণে বাধ্য হন। ফিরােজ শাহের সঙ্গে খান্দেশ, গুজরাট ও মালবের মুসলিম শাসকদের সম্পর্ক ভালাে ছিল না। তারা সর্বদাই বিজয়নগর-রাজকে বাহমনি সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্ররােচনা দিতেন। ১৪০৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়। ফিরােজ শাহের বিজয়নগর শহর আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং তিনি পরাজিত হন। অবশ্য তার এক সেনাপতি তুঙ্গভদ্রা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল দখল করেন। বিজয়নগর রাজ প্রথম দেবরায় অপমানজনক শর্তে সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হন। তিনি তার কন্যার সঙ্গে ফিরোজ শাহের বিবাহ দেন, বাঁকাপুর ছেড়ে দেন। ১৪১৭ খ্রিস্টাব্দে তাজউদ্দিন ফিরােজ শাহ তেলেঙ্গানা জয় করেন। ১৪২০ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় দুই পক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়। বিজয়নগর বাহিনী বাহমনি রাজ্যের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল দখল করে। ফিরােজ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করেন। রায়চুর দোয়াব আবার বিজয়নগরের অধিকারে আসে। এই পরাজয়ের ফলে ফিরােজ শাহের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খর্ব হয়। রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তিনি তার ভ্রাতা আহম্মদ শাহ-র অনুকূলে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য হন। ১৪২২ খ্রিস্টাব্দে তার মৃত্যু হয়।

To be continue........