আরবদের সিন্ধু অভিযানের কারণ ও ফলাফল

- September 16, 2019
আরবের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অতি প্রাচীন। আরবে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হওয়ার বহু পূর্ব থেকেই আরবের বণিকরা ভারতের পশ্চিম উপকুল ও দাক্ষিণাত্যে বাণিজ্য করতে আসত। আরবে ইসলাম ধর্ম প্রসারিত হওয়ার পরেও যােগাযােগ অব্যাহত ছিল এবং এ সময় থেকেই আরবরা ভারতে রাজ্যবিস্তারে আগ্রহী হয়। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে খলিফা ওমর-এর শাসনকালে আরবরা ভারতের পশ্চিম উপকূলে বােম্বাইয়ের থানা, ভারুচ এবং সিন্ধুর দেবল বন্দর আক্রমণ করে। এইসব আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। এরপর তারা স্থলপথে উত্তর-পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে কাবুলের পথে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করে। সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। এরপর তারা মাকরান বা বেলুচিস্তানের পথে ভারতের দিকে অগ্রসর হয়। ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে আরব সেনাপতি আবদুল্লাহ মাকরান দখল করেন। ৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় বােলান গিরিপথ দিয়ে তারা ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করে, কিন্তু এই প্রয়াসও ব্যর্থ হয়। এরপর ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে আরবরা ভারতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সিন্ধুদেশ জয় করে। সিন্ধুর রাজা চাচ-এর নামাঙ্কিত আরবি চাচনামা, মির মহম্মদ মাসুদ রচিত তারিখ-ই-সিন্ধ গ্রন্থ, আলিশের কানি রচিত তফাতুল-কিরান এবং অল-তারি, খুলাসত-উৎ-আকবর ও অল বিলাদুরি নামক গ্রন্থ থেকে সিন্ধুদেশে আরব আক্রমণ ও আরব শাসনের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে প্রধান উপাদান হল অল বিলাদুরি। এই গ্রন্থে সন তারিখের বিভ্রান্তিগুলির সংশােধক হল উল্লিখিত অন্যান্য গ্রন্থগুলি।
Mohammad bin Qasim and King Dahir Sindy War

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের কারণ

আরবদের সিন্ধুদেশ আক্রমণের কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ। ডঃ এ. এল. শ্রীবাস্তব ও অন্যান্য অনেকে মনে করেন যে, ইসলাম ধর্মের বিস্তারের উদ্দেশ্যেই আরবরা সিন্ধুদেশ আক্রমণ করে। ডঃ শ্রীবাস্তব বলেন যে, আরবরা বিজিত অঞ্চলের মানুষদের উপর ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি কেবলমাত্র বলপূর্বক চাপিয়েই দেয় নি স্থানীয় ধর্মকেও তারা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করেছিল। বলা বাহুল্য, এই মত সর্বাংশে গ্রহণযােগ্য নয়, কারণ সিন্ধুদেশ জয়ের পর আরব সেনাপতি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ পুরােহিতদের নিজ নিজ অধিকার ভােগ করার অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন এবং এ সময় ধর্মান্তকরণের কোনও সংবাদ পাওয়া যায় নি।

অনেকের মতে আরবদের ভারত অভিযানের মূল কারণ ছিল ভারতীয় বাণিজ্যের উপর তাদের পূর্ণ আধিপত্য স্থাপন করা। ইউরােপের বাজারে ভারতীয় মশলা, রেশম ও অন্যান্য পণ্যাদি বিক্রি করে আরব বণিকরা প্রচুর মুনাফা লুঠত। ইতিমধ্যে আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলিতে আরব আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে সমগ্র ভূমধ্যসাগরের উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হয় এবং এর স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ভূমধ্যসাগরের দরজা ইউরােপীয় বণিকদের কাছে বন্ধ হয়ে যায়। ভারত তথা প্রাচ্যের সঙ্গে ইউরােপের বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে আরবদের হাতে চলে যায়। এরপর তারা ভারতের পশ্চিম উপকুল জয় করে ভারতীয় বহির্বাণিজ্যের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।

অনেকের মতে ভারতের ধনরত্ন লুণ্ঠন করাই ছিল আরবদের প্রধান লক্ষ্য। ঐতিহাসিক আরনল্ড বলেন যে, ধর্মবিস্তার অপেক্ষা প্রতিবেশীদের ধনরত্ব লণ্ঠন ও তাদের রাজ্যগ্রাস করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আরবদের যুদ্ধ আইন অনুসারে পরাজিত শক্রর সম্পদ লুঠ করা বৈধ ছিল। শরিয়ত-এ খাম নামে একপ্রকার করের উল্লেখ আছে। এই প্রথা অনুসারে যুদ্ধক্ষেত্রে লুষ্ঠিত সম্পদ সেনাদল ও সরকারের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হত। এই বক্তব্য সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে, কারণ ভারত থেকে ব্যাপক হারে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করার কথা সমকালীন গ্রন্থ চাচনামাতে উল্লেখ নেই। সুতরাং এইসব দিক থেকে মনে হয় যে, বাণিজ্য বিস্তাৱই ছিল আরবদের মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ডঃ আবদুল করিম এর মতে নবী হজরত মহম্মদের মৃত্যুর একশো বছরের মধ্যে আরবরা এশিয়া, ইউরােপ ও আফ্রিকা মহাদেশের এক বিস্তীর্ণ অংশে তাদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বিজয় অভিযান ওই বিস্তীর্ণ রাজ্য বিজয়ের অংশ বিশেষ। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে তারা ভারতে রাজ্যজয়ে উদ্যোগী হয়। খলিফার নিষেধাজ্ঞার ফলে কিছুকাল বন্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত খলিফাই আবার এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন। সুতরাং রাজ্যলিপ্সা, বাণিজ্য বিস্তার এবং এর সঙ্গে ধর্মীয় উদ্দীপনার সংযােগ আরবদের সিন্ধুজয়ে প্রণােদিত করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ শাহনাওয়াজ এর মতে ধর্মীয় কারণকে একেবারে উপেক্ষা করার উপায় নেই।

আরদের দ্বারা সিন্ধুদেশ আক্রমণের প্রত্যক্ষ কারণ হল সিন্ধুর দেবল বন্দরে জলদস্যুদের দ্বারা আরব জাহাজ লুণ্ঠন। সিংহলে বাণিজ্যরত কিছু আরব বণিকের মৃত্যু হলে সিংহল-রাজ এমন একটি জাহাজে করে তাদের পরিবারবর্গকে ইরাকের শাসনকর্তা হেজ্জাজের-এর কাছে পাঠান। জাহাজটি সিন্ধুর দেবল (করাচি) বন্দরের কাছে জলদস্যুদের দ্বারা লুষ্ঠিত হলে হেজ্জাজ সিন্ধুর অধিপতি দাহির-এর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। দাহির ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃত হলে তার বিরুদ্ধে অভিযান পাঠানাে হয়। অপরমত অনুযায়ী বলা হয় যে, সিংহল-রাজ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খলিফার উদ্দেশ্যে কিছু উপঢৌকনসহ আটটি জাহাজ পাঠান। এই জাহাজগুলি দেবল বন্দরে লুষ্ঠিত হয়। ডঃ ঈশ্বরী প্রসাদ এবং কেম্বুিজ ঐতিহাসিক স্যার উললি হেইগ সিংহল-রাজের ইসলাম ধর্মগ্রহণের কাহিনি মানতে রাজি নন, কারণ তাদের মতে সিংহল হল বৌদ্ধ রাজবংশ শাসিত একটি বৌদ্ধ রাজ্য। অন্যমত অনুযায়ী বিশেষ অনুগ্রহ লাভের আশায় সিংহল-রাজ ইরাকের শাসনকর্তা হেজ্জাজের কাছে কিছু উপটৌকন-সহ একটি জাহাজ পাঠান। জাহাজটি দেবল বন্দরে লুষ্ঠিত হয়। অপর মত অনুযায়ী কিছু ক্রীতদাসী ও দ্রব্যসামগ্রী ক্রয়ের উদ্দেশ্যে খলিফা তার কয়েকজন প্রতিনিধিকে ভারতে পাঠান। এই জাহাজটি সিন্ধুর দেবল বন্দরের কাছে লুণ্ঠিত হলে হেজ্জাজ ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। দাহির এই দাবি পূরণে অস্বীকৃত হলে হেজ্জাজ সিন্ধুদেশে অভিযান পাঠান।

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের বিবরণ

ওবেদুল্লা ও বুদাইল নামক দুজন সেনাপতির নেতৃত্বে পর পর দুটি অভিযানের ব্যর্থতার পর ৭১২ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ-বিন-কাশিমের নেতৃত্বে সিন্ধুর তৃতীয় অভিযান পাঠানাে হয়। মহম্মদ-বিন-কাশিম মাকরানে উপস্থিত হলে সেখানকার শাসক হারুন তার সঙ্গে যোগদেন। আবদুল আসাদ জাহানের নেতৃত্বে একটি আরবীয় বাহিনী যোগ দিলে প্রায় ২৫ হাজার সৈন্য নিয়ে মহম্মদ-বিন-কাশিম দেবল আক্রমণ করেন। ব্রাহ্মণ রাজা দাহিরের হাতে নির্যাতিত জাঠ, মেড় ও বৌদ্ধরা স্বদেশের কথা ভুলে গিয়ে মহম্মদ-বিন-কাশিমের সাহায্যে অবতীর্ণ হয়। অনেক সামন্তরাজা পুরস্কারের লােভে তার পক্ষে যােগদান করে। দেবল অধিকারের পর সেখানে ব্যাপক লুণ্ঠন, হত্যাকাণ্ড ও ধর্মান্তরকরণ চলে। সতেরাে বছরের ঊর্ধ্বে সকল পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় এবং নারী ও শিশুদের দাসে পরিণত করা হয়।

এরপর বিজয়ী সেনাদল দেবলের উত্তর পূর্বে নিরুন (বর্তমান পাকিস্থানের অন্তর্গত হায়দ্রাবাদের দক্ষিণে আধুনিক জরকের কাছে) অভিমুখে অগ্রসর হলে বৌদ্ধ অধিবাসীরা বিনাযুদ্ধে আরবদের বশ্যতা স্বীকার করে। এরপর মহম্মদ-বিন-কাশিম সিন্ধুনদ অতিক্রম করার চেষ্টা করলে রাওয়ার নামক স্থানে রাজা দাহির বাধা দেন।। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ১২ জুন দুপক্ষের তমুল যুদ্ধ হয়। রাজা দাহির এই যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। আরব বাহিনী রাওয়ার দুর্গ আক্রমণ করলে সদ্যবিধবা রাজমহিষী রানিবাঈ ও পুত্র জয়সিংহ প্রতিরোধ করতে থাকেন। দুর্গের পতন হলে রানিবাঈ ও অন্যান্য নারীরা সম্মানরক্ষার্থে অগ্নিকুণ্ডে প্রাণ দেন। রাজা দাহির পুত্র জয়সিংহ ব্রাহ্মণাবাদ ও রাজধানী আলাের শক্ত ঘাঁটি স্থাপন করেন। প্রায় ছয়মাস যুদ্ধ চলার পর জয়সিংহ চিতোর পালিয়ে যান। সিন্ধুদেশের রাজধানী আলোর জয় করেন। এরপর মুলতান জয় করে, এরপর একটি দল কনৌজ অভিমুখে যাত্রা করে। কাশ্মীর-রাজ ললিতাদিত্য এবং কনৌজ-অধিপতি যশােবর্মন তাদের প্রতিহত করে নিজ নিজ রাজ্যসীমা থেকে তাদের বিতাড়িত করেন। ইতিমধ্যে খলিফার নির্দেশে মুহম্মদ-বিন-কাশিম স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সেখানে খলিফা ওয়ালিদ তার প্রাণদণ্ড দেন।

মুহম্মদ-বিন-কাশিমের পর জুনায়েদ সিন্ধুর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। এ সময় সিন্ধুর হিন্দু রাজন্যবর্গের অনেকেই স্বীয় স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। জুনায়েদ তাদের পরাজিত করে সমগ্র সিন্ধুর উপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। ৭২৪ থেকে ৭৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজপুতানা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশের উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে তার এই উদ্যোগ সফল হয় নি। প্রতিহার-রাজ প্রথম নাগভট্ট, চালুক্য-রাজ পুলকেশী এবং কাশ্মীরের কর্কট-বংশীয় রাজন্যবর্গ বারংবার সিন্ধুদেশ আক্রমণ করে আরব শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এ সত্ত্বেও সিন্দুদেশে আরব শাসন প্রায় তিনশাে বছর স্থায়ী হয়। শেষ পর্যন্ত শিয়া-সুন্নি বিবাদ, আরবদেশে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং মহম্মদ ঘুরির আক্রমণে সিন্ধুদেশে আরব শাসনের অবসান ঘটে।

সিন্ধু বিজয়ে আরবদের সাফল্যের কারণ

সিন্ধুদেশে আরবদের সাফল্য এবং রাজা দাহিরের পতনের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল - (১) সিন্ধুদেশ জল ও স্থল দুদিক থেকেই উন্মুক্ত ছিল। রাজা দাহিরের কোনও নৌবল ছিল না। এর ফলে তিনি সিন্ধুর সমুদ্র উপকূল রক্ষায় ব্যর্থ হন। অপরদিকে সামুদ্রিক আধিপত্যের ফলে আরবদের পক্ষে সমুদ্রপথে সেনা ও রসদ আমদানি সহজ হয়। (২) সিন্ধু রাজ্যটি চারটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল এবং এর শাসনকর্তারা ছিলেন স্বাধীন ও অর্ধ স্বাধীন। তারা সম্মিলিতভাবে বিদেশি আক্রমণকারীদের মুখােমুখি হন নি। (৩)প্রজাবর্গ এবং সামন্তরাজাদের সঙ্গে দাহিরের সম্পর্ক ভালো ছিল না। ব্রাহ্মণ দাহিরের হাতে নির্যাতিত বৌদ্ধ ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আরবদের পক্ষে যােগদান করে। সামন্তরাজারাও দাহিরকে মানতে পারেন নি। তারা আরবদের সাহায্যে অবতীর্ণ হন। (৪) হিন্দু, বৌদ্ধ ও বিভিন্ন ধর্ম এবং জাঠ ও মেড় প্রতি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে গঠিত সিন্ধুবাসীর মধ্যে কোনও ঐক্য ছিল না। (৫) আরবদের সেনাবাহিনী, সৈন্যসংখ্যা, ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন অশ্বারােহী বাহিনী, যুদ্ধাস্ত্র, রণকৌশল ও সেনাপতি ছিল অনেক উন্নত। আরবদের গােলন্দাজ বাহিনী সম্পর্কে দাহিরের কোনও ধারণা ছিল না। (৬) নিজে উন্নত মানের যােদ্ধা হয়েও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে দাহিরের কোনও ধারণা ছিল না। সীমান্তের পরপারে আরব জাতির অভ্যুদয় সম্পর্কে তিনি অন্ধকারে ছিলেন। তিনি নৌবাহিনীর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন নি। তিনি প্রথমে আরবদের সম্মুখীন হন নি, তিনি মনে করেছিলেন যে তারা দেবল বন্দর নিয়েই খুশি থাকবে। (৭) অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল সিন্ধুর পক্ষে বড়াে সেনাদল গঠন করা সম্ভব ছিল না। (৮) সিন্ধুবাসীর মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব ছিল। রাজা দাহির সমগ্র দেশবাসীকে নিয়ে আরবদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরােধ গড়ে তুলতে পারেন নি।

সিন্ধুদেশে আরব শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি

(১) আরব শাসনাধীনে সিন্ধুদেশকে কয়েকটি ইক্তায় বিভক্ত করা হয়। প্রত্যেক জেলায় একজন করে ইজাদার বা আরব সামরিক শাসনকর্তা ছিলেন। নিজ নিজ এলাকায় তারা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন এবং খলিফার প্রয়ােজনে তাকে সামরিক সাহায্যদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। সরকারি কর্মচারী ও সামরিক কর্মচারীরা জায়গির ভােগ করতেন। মুসলিম সন্ত ও সাহিত্যসেবীরা বিনা খাজনায় জমি ভােগ করতেন। স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব দেশীয় জনসাধারণের উপর ন্যস্ত ছিল এবং হিন্দু আমলের বহু আইন কানুনই দেশে প্রচলিত ছিল। রাজধানী ও জেলা শহরগুলিতেই কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। (২) সরকারের আয়ের উৎস ছিল ভূমিরাজস্ব ও জিজিয়া। উৎপন্ন শস্যের দুই তৃতীয়াংশ থেকে এক চতুর্থাংশ ভূমিকর হিসেবে আদায় করা হত। এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলিম শাসকগণ কর্তৃক এই প্রথম ভারতীয়দের উপর জিজিয়া কর আরােপিত হয়। নিলামের মাধ্যমে সর্বোচ্চ অর্থ দিতে সম্মত ব্যক্তিকেই কর আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হত। (৩) এ সময় দেশে কোনও সুসংগঠিত বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি। জেলাশাসক ও সামন্তরাজন্যবর্গ নিজ নিজ এলাকার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। রাজধানী ও বড়াে বড়াে শহরে কাজিরা ইসলামি আইন অনুসারে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। হিন্দুদেরও এই আইন অনুসারে বিচার করা হত। অনেকক্ষেত্রে হিন্দুদের উপর কঠোর দণ্ডবিধি প্রয়ােগ করা হত। (৪) সিন্ধু জয়ের সূচনায় হিন্দুদের উপর কঠোর দমননীতি গ্রহণ করা হয়, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই আরব বিজেতারা উপলব্ধি করেন যে দমননীতির মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের উচ্ছেদসাধন সম্ভব নয়। তাই তারা হিন্দুদের সম্পর্কে কিছুটা উদারনীতি গ্রহণ করেন। জিজিয়া প্রদানের মাধ্যমে হিন্দুরা মন্দির নির্মাণ ও স্বাধীন ধর্মাচরণের অধিকার লাভ করে।

আরব শাসনের স্বল্প স্থায়িত্বের কারণ

(১) আরব সেনাপতি মহম্মদ-বিন-কাশিমের অকাল মৃত্যু সিন্ধুদেশে আরবদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। পরবর্তীকালে আর যে সব সেনাপতি আসেন তারা মহম্মদ-বিন-কাশিমের মতাে উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী ছিলেন না। (২) বাগদাদে রাজনৈতিক বিপ্লবের ফলে উম্মায়িদ-দের স্থলে আবাসীয়-বংশীয় খলিফাদের উত্থান সিন্ধুদেশে আরবদের ভাগ্য যথেষ্ট পরিমাণে নির্ধারণ করে। আব্বাসীয় খলিফাগণ সিন্ধুর পূর্ববর্তী আমলাদের অপসারিত করেন। এছাড়া আব্বাসীয়রা সিন্ধুদেশ সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন না। এজন্য তারা সেখানে যথেষ্ট পরিমাণে সেনা বা অর্থ পাঠান নি। (৩) বস্তুত সমগ্র সিন্ধুদেশে আরব আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি বিভিন্ন স্থানে বিদ্বেষভাবাপন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু রাজ্যের অস্তিত্ব নানাভাবে আরবদের অসুবিধার সৃষ্টি করত। আরব শাসনের অস্থায়িত্বের জন্য এইসব রাজ্যগুলির দায়িত্বও কম ছিল না। (৪) উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অংশে রাজপুত রাজ্যগুলির, বিশেষত গুর্জর-প্রতিহার বংশের অস্তিত্ব আরবদের ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। (৫) সিন্ধুদেশ একটি মরু অঞ্চল এবং এর কোনও দৃঢ় আর্থিক ভিত্তি ছিল না। সুতরাং আর্থিক দিক থেকে এটি ছিল একটি দুর্বল এলাকা।

আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল

সিন্ধুদেশে আরব অধিকার তিনশাে বছর স্থায়ী হলেও নৈতিক দিক থেকে এই ঘটনার কোনও ফলাফল ছিল না। ইংরেজ ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুল-এর মতে, আরবদের সিন্ধুজয় ভারত ও ইসলামের ইতিহাসে ফলাফলহীন একটি ঘটনা মাত্র। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক স্যার উলসলি হেইগ বলেন, সিন্ধুতে আরবদের অধিষ্ঠান ছিল একটি সামান্য উপাখ্যান, এবং একটি বিরাট দেশের অতি ক্ষুদ্রতম অংশে তাদের স্বল্পস্থায়ী কর্মকাণ্ড সীমিত ছিল। ডঃ শ্রীবাস্তব বলেন, রাজনৈতিক বিচারে ইসলাম ও ভারতের দিক থেকে আরবদের সিন্ধু জয় একটি গুরুত্বহীন ঘটনা (The Sultanate of Delhi, P.23)। অধ্যাপক হাবিবউল্লাহ-র মতে, ভারতে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আরবরা অগ্রসর হয় নি। বিশাল এই ভারতীয় মহাদেশের এক প্রান্তকে তাদের আক্রমণ নাড়া দিতে পেরেছিল মাত্র এবং তাও মিলিয়ে গিয়েছিল সল্পকালের মধ্যেই।

ভারতে মুসলিম আধিপত্য বিস্তারের ইতিহাসে সিন্ধুজয় প্রথম পদক্ষেপ হলেও রাজনৈতিক ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা কোনও স্থায়ী রেখাপাত করে নি। আরব আধিপত্য দীর্ঘস্থায়ী হয় নি এবং তা একমাত্র সিন্ধুতেই সীমাবদ্ধ ছিল—সিন্ধুদেশকে কেন্দ্র করে কখনােই ভারতের অন্তর্দেশে বিস্তৃত হতে পারে নি। সিন্ধুদেশে কিছু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, শাসনপদ্ধতি বা সামাজিক রীতিনীতির উপর আরব শাসনের কোন প্রভাব পড়ে নি।

সিন্ধু বিজয়ের বহু পূর্ব থেকেই আরবদের সঙ্গে ভারতের পশ্চিম উপকূলের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সিন্ধু বিজয়ের পর তা আরও ঘনিষ্ঠ ও সুদৃঢ় হয়। সিন্ধুদেশকে ভিত্তি করে সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরব বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে আর বাণিজ্যপােত গুলির যাতায়াত বৃদ্ধি পায়। সিন্ধুর প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্য উপকরণ ইউরােপের বিভিন্ন দেশে চালান করে আরব বণিকরা মুনাফা অর্জন করতে থাকে। সিন্ধুর বণিকরা আরব দেশের প্রায় প্রতিটি শহরে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে।

রাজনৈতিক দিক থেকে নিষ্ফলা হলেও আরব আক্রমণের পরােক্ষ ফল ছিল সুদূরপ্রসারী—বিশেষত সাংস্কৃতিক দিক থেকে ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। ডঃ শ্রীবাস্তব বলেন যে, আরবদের সিন্ধু জয়ের ফলে ভারতের মাটিতে ইসলামের ভিত রচিত হয় এবং এর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আক্রমণকারীরা ভারতে এই ধর্মমতের বিকাশ ঘটায়। আরবরা ভারতীয় সংস্কৃতি দ্বারা যথেষ্টভাবে প্রভাবিত হয়। সিন্ধু অঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলির মাধ্যমে আরবরা ভারতীয় দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, ভেষজ, রসায়ন, সঙ্গীত, চিত্রকলা প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করে। খলিফা মনসুর-এর আমলে ভারত থেকে বেশ কিছু হিন্দু পণ্ডিত, সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী ও রাজমিস্ত্রী আরবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। খলিফা মনসুরের পৃষ্ঠপােষকতায় ব্রহ্মগুপ্ত রচিত ব্রহ্মসিদ্ধান্ত ও খণ্ডখাদ্যক নামে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত দুটি সংস্কৃত গ্রন্থ আরবীয় ভাষায় অনুবাদ হয়। আমির খসরুর রচনা থেকে জানা যায় যে, আরব জ্যোতির্বিদ আবু মাশার বারাণসীতে দশ বছর ধরে জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়ন করেন। খলিফা হারুন-অল-রশিদ-এর আমলে (৭৮৬-৮০৮ খ্রিঃ) এই যােগাযােগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। আরবীয় পণ্ডিতদের রচনায় মনাকা, বিজয়কর, সিন্দবাদ প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিতের উল্লেখ আছে। বাগদাদের চিকিৎসালয় ও হাসপাতালে বহু ভারতীয় চিকিৎসক নিযুক্ত ছিলেন।

তথ্যসূত্র:
1. মধ্যকালীন ভারত - অধ্যাপক গোপালকৃষ্ণ পাহাড়ী
2. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস - ড: মুহাম্মদ ইনামুল হক
3. ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন - আব্দুল করিম, ঢাকা, ২০০১