আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

- September 30, 2019
আলাউদ্দিন খলজির অর্থনৈতিক সংস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ছিল বাজারদর নিয়ন্ত্রণ বা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। তিনি নিত্যপ্রয়ােজনীয় সব জিনিসপত্রের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট হন। ঐতিহাসিক হাবিব ও নিজামি এই ব্যবস্থাকে 'সুলতানি যুগের শ্রেষ্ঠ প্রশাসনিক অবদান' বলে অভিহিত করেছেন। সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনি রচিত দুটি গ্রন্থ - তারিখ-ই-ফিরােজশাহি ও ফতােয়া-ই-জাহান্দারিতে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তৃত জানা যায়। এছাড়া আমির খসরু রচিত খাজাইন-উল-ফুতুহা ' এবং সুফিসন্ত শেখ নাসিরউদ্দিন চিরাগ রচিত খয়ের-উল-মজলিস থেকে তথ্য পাওয়া যায়। তবে জিয়াউদ্দিন বরনির রচনাই সর্বাপেক্ষা নির্ভরযােগ্য উপাদান।
Market in Imphal

আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য

জিয়াউদ্দিন বরনির লেখা তারিখ-ই-ফিরােজশাহি গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আলাউদ্দিনের বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনা, রাজ্যজয়, মােঙ্গল আক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দুর্গ নির্মাণ, বিশাল সেনাবাহিনী গঠন, তাদের সাজ-সরঞ্জাম এবং বেতন দান প্রভৃতি কারণে রাষ্ট্রের ব্যয়ভার বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থায় আলাউদ্দিন খলজি সেনাদের বার্ষিক বেতন ২৩৪ তঙ্কা রেখে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন, যাতে সেনাবাহিনীর জীবনধারণের কোনও অসুবিধা না হয়। বরনির মতে, আলাউদ্দিনের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ছিল আসলে সামরিক ব্যবস্থার অঙ্গ। ডঃ কে. এস. লাল এবং ডঃ পরমেশ শরণ দুজনই জিয়াউদ্দিন বরনির মত সমর্থন করেন।

বরনির লেখা থেকে অনেকে মনে করেন যে হিন্দুদের জব্দ করার উদ্দেশ্য নিয়েই আলাউদ্দিন খলজি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, কারণ এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুদেরই প্রাধান্য ছিল। ডঃ সতীশ চন্দ্র ও অন্যান্য ঐতিহাসিকরা এ ব্যাপারে একমত নন। এ সময় মুলতানি ও খােরাসানি বণিকরাও ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল এবং তারা ছিল মুসলমান। সুতরাং বরনির বক্তব্য যুক্তিগ্রাহ্য নয়।

ডঃ কিশােরী শরণ লাল বলেন যে, আলাউদ্দিনের রাজত্বকাল ছিল যুদ্ধ বিগ্রহে পরিপূর্ণ। যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে পণ্য-চলাচলের সমস্যা হত এবং তার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ত। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল নেতা মালিক তাৰ্ঘি দিল্লি আক্রমণ করলে দিল্লিতে খাদ্য-সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শহরের বণিকরা তাদের গুদামজাত পণ্যাদি বেশি দামে বিক্রি করতে থাকে। আগামী দিনে যাতে এই ধরনের সমস্যা আর না হয় এবং স্বাভাবিক বাজারদর বজায় থাকে এই উদ্দেশ্যে আলাউদ্দিন বাজারদর বা মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

ডঃ ইউ. এন. দে বলেন যে, দিল্লি ছিল সুলতানী সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। সেখানে সর্বদাই একটি বিশাল সেনাবাহিনী উপস্থিত থাকত এবং নানা কারণে সেখানে বহু লােকজন আসত। এর ফলে সেখানে লােকসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। কেবলমাত্র এই নয় যে, আলাউদ্দিন খলজি দক্ষিণ ভারত, গুজরাট, রাজপুতানা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে প্রচুর ধনরত্ন এনে তার অনুচর ও জালালি অভিজাতদের মধ্যে বিতরণ করেন। এর ফলেও মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। তাই মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস এবং জনসাধারণের মধ্যে সস্তায় নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের জন্য আলাউদ্দিন খলজি মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন।

জিয়াউদ্দিন বরনির লিখিত ফতেয়া-ই-জাহান্দারিতে গ্রন্থে বলেন যে, জনগণের মঙ্গলের জন্য সব যুগেই রাজাদের বাজারদর নিয়ন্ত্ৰণ করা উচিত। নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদির মুল্য স্থিতিশীল না হলে সেনাবাহিনীতে যেমন শান্তি থাকে না, তেমনি জনগণ সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে পারে না। আমির খসরু তাঁর খাজাইন-উল-ফুতুহা গ্রন্থে এবং সুফি সন্ত শেখ নাসিরউদ্দিন চিরাগ তার খয়ের-উল-মজলিস গ্রন্থে জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে আলাউদ্দিন খলজির বাজারদর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। সুতরাং বলা যায় যে, সেনাবাহিনীর প্রয়ােজন এবং জনকল্যাণের তাগিদে মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য তিনি উৎপাদন মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মূল্য নিয়ন্ত্ৰণ করেন।

আলাউদ্দিন খলজির মূল্য নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনামা

খাদ্যদ্রব্য ও বস্ত্র থেকে শুরু করে গবাদি পশু, এমনকী দাস ক্রয়-বিক্রয়কে পর্যন্ত আলাউদ্দিন খলজি সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ভারতবর্ষে আলাউদ্দিন খলজি সর্বপ্রথম মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেন। সরকার ব্যতীত কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রয়ােজনের অতিরিক্ত ফসল মজুত করা নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে দুর্ভিক্ষ হলেও শস্যের দাম বৃদ্ধি পেত না এবং দুর্ভিক্ষের কালে দুটি ক্রীতদাস সহ প্রতি পরিবারকে আধ-মন করে খাদ্যশস্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে রেশনিং ব্যবস্থার প্রবর্তন আলাউদ্দিনের অভিনব কীর্তি। কোনও ব্যবসায়ী যাতে অধিক মূল্য নিতে না পারে তিনি তার ব্যবস্থা করেন এবং আইনভঙ্গ করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। কোনও ব্যবসায়ী ওজনে কম দিলে তার সমপরিমাণ মাংস সেই ব্যবসায়ীর দেহ থেকে কেটে নেওয়া হত।

নিয়ন্ত্রিত মূল্যে জিনিসপত্র বিক্রির জন্য আলাউদ্দিন খলজি দিল্লিতে চারটি বিশেষ বাজার প্রতিষ্টা করেন। (১) মাণ্ডি ছিল প্রধান শস্য বাজার। এখানে চাল, গম, ডাল, বার্লি প্রভৃতি সরকার নিয়ন্ত্রিত মুল্য পাওয়া যেত। খরা, অতিবর্ষণ প্রভৃতি কোনও অবস্থাতেই বাজারদরের পরিবর্তন হত না। বছরের পর বছর ধরে শস্যের একই দাম বজায় থাকত। শস্য বাজারের প্রধান নিয়ন্ত্রক বা শাহনা-ই-মাণ্ডি হিসেবে আলাউদ্দিনের দক্ষ কর্মচারী মালিক কাবুল-কে নিয়োগ করেন। আলাউদ্দিনের খলজি মাণ্ডির বাজারের উপর লক্ষ রাখার জন্য বারিদ বা গুপ্তচর নিয়োগ করেন। (২) সেরা-ই-আদল বা ন্যায় ভবন নামক বাজার থেকে বস্ত্র, চিনি, ফল, মাখন, জ্বালানি তেল, ওষুধপত্র প্রভৃতি বিক্রি হত। সুলতানের নির্দেশে বদাউন গেটের পাশে সবুজ প্রাসাদের সংলগ্ন মাঠে এই বাজার গড়ে তোলা হয়। বিভিন্ন বস্ত্র ও দ্রব্যাদির দামের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। এই বাজারের বিক্রেতাদের দেওয়ান-ই-রিয়াসৎ বা বাণিজ্য মন্ত্রকালয়ে নাম নথিভুক্ত করতে হত। (৩) ঘােড়া, গবাদি গুণ্ড এবং ক্রীতদাসদের বিক্রির জন্য একটি বাজার ছিল। গুণগত মান অনুসারে এখানে গণ্যের দাম স্থির হত। (৪) সমগ্ৰ দিল্লি শহর জুড়ে ছােটোখাটো নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্যের জন্য প্রচুর বাজার ছিল। এইসব বাজারে মাছ, মাংস, তরকারি, টুপি, চিরুনি, তৈজসপত্র প্রভৃতি বিক্রি হত।

আলাউদ্দিন খলজির দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ফলাফল

আলাউদ্দিন খলজি কর্তৃক মূল্য নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা একমত নন। সমকালীন ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বরনি এই ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন যে, শস্যের অপরিবর্তিত বাজার সেই যুগের এক বিস্ময় ছিল। সমকালীন ঐতিহাসিক ফেরিস্তার মতে, এই ব্যবস্থা ছিল অভূতপূর্ব। অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও আলাউদ্দিন খলজির রাজত্বকালের শেষদিকে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। আধুনিক ঐতিহাসিক লেনপুল এই ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেছেন, এর দ্বারা সাধারণ প্রজাবর্গ উপকৃত হয়। তিনি ধনীদের লুঠ করে দরিদ্রদের উপকার সাধন করেন। তিনি আলাউদ্দিনকে দুঃসাহসী রাজনৈতিক অর্থনীতিক বলে অভিহিত করেছেন। বলা বাহুল্য ডঃ লাল, ডঃ পি. শরণ প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই ব্যবস্থার ফলে সেনাবাহিনী ও দিল্লির অবস্থাপন্ন নাগরিকরা উপকৃত হলেও কারিগর, শিল্পী ও শিল্পদ্রব্যের উৎপাদকরা ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়ায়। কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ অনাবৃষ্টির ফলে উৎপাদন কম হলেও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করা যেত না। বণিকদের লভ্যাংশ হ্রাস পাওয়ায় তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, আলাউদ্দিন খলজির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা লােপ পায়।