PayPal

অর্থনৈতিক মহামন্দা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

author photo
- Tuesday, August 13, 2019

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা বা বিপর্যয়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে এক বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সােভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া প্রায় সকল দেশে দেখা দেয়। এই মন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন সর্বপ্রথম আমেরিকায় দেখা দেয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ২৪ অক্টোবর মার্কিন শেয়ার বাজারে অকস্মাৎ ধ্বস নামে এবং ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার মার্কেটে হাহাকার দেখা দেয়। মার্কিন ব্যাঙ্কগুলি শেয়ার বাজারে বহু টাকা লগ্নি করেছিল। ফলে ব্যাঙ্কগুলিও দরজা বন্ধ করে। দুমাসের মধ্যে মার্কিন বিনিয়ােগকারীরা ৪০, ০০০ মিলিয়ন ডলার হারায় এবং ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আমানতকারী জনগণ সর্বস্বান্ত হয়। Hobsbawm বলেন, The largest global earthquake ever to be measured on economic historians Richter Scale. এইরূপ অর্থনৈতিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং ইউরোপীয় ব্যবস্থার ভাঙনের জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল।
world economic crisis 1929
আমেরিকা থেকে এই মন্দা অথনৈতিক ভূমিকম্পের মত ইওরােপে ও এশিয়ায় ছড়ায়। ইওরােপের অধিকাংশ দেশের মুদ্রা ডলারের দামে বাধা ছিল এবং ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ আমেরিকাকে যুদ্ধকালীন ঋণ মেটাত। জার্মানী মার্কিন ঋণ গ্রহণ করে তার অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালাচ্ছিল। এই সকল দেশ মার্কিন অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কায় দারুণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কেবলমাত্র সােভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মার্কিন বা ইওরােপীয় দেশগুলির অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলে মন্দার ধাক্কা এখানে দেখা যায়নি। অনেকে বলেন যে, কমিউনিষ্ট অর্থনীতিতে সকল কিছুই পরিকল্পনা ও জনসাধারণের প্রয়ােজনের দিকে লক্ষ্য রেখে করা হত। উদ্বৃত্ত উৎপাদন এবং সেই মালের রপ্তানির সমস্যা সােভিয়েত ইউনিয়নের ছিল না বলে সােভিয়েত ইউনিয়ন বেঁচে যায়। মার্কিন ঋণ প্রদান বন্ধ হওয়ায় জার্মানীর অবস্থা সর্বাপেক্ষা শােচনীয় হয়।

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণ : গার্থন হার্ডির মতে, যুদ্ধের সময় মার্কিন দেশ প্রচুর যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে তা রপ্তানি করত। যুদ্ধ শেষে এই অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ হলে মার্কিন ভারী শিল্পে দারুণ আঘাত পড়ে। লােহা ও কয়লা শিল্পের ওপর তার প্রভাব পড়ে। এছাড়া যুদ্ধের সময় থেকে বিভিন্ন ভােগ্যপণ্য, খাদ্যশস্য এবং শিল্পদ্রব্য মার্কিন দেশ ইওরােপকে রপ্তানি করত। সেই চাহিদার ফলে মার্কিন শিল্পদ্রব্যের ও খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ান হয়েছিল। এখন যুদ্ধ শেষে ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ তাদের নিজ নিজ শিল্প ও খাদ্য উৎপাদনের ওপর জোর দিলে আমেরিকার রপ্তানি বাণিজ্যে ঘাটতি দেখা দেয়।

যুদ্ধ ঋণ পরিশােধ ও পণ্য ক্রয় বাবদ ইওরােপ থেকে প্রচুর সােনা মার্কিন দেশে পাঠাতে হয়। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সােনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভাণ্ডারে জমা হয়। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। যারা মার্কিন দেশের মাল কিনত অথবা যারা মার্কিন দেশকে ঋণ পরিশােধ করত তাদের স্বর্ণভাণ্ডার শূন্য হয়ে গেলে তারা আর মার্কিন মাল খরিদ অথবা মার্কিন দেশের প্রাপ্য ঋণের টাকা পরিশােধ করতে পারেনি। এজন্য মার্কিন উদ্বৃত্ত শিল্প ও খাদ্যদ্রব্য গুদামে পচতে থাকে। তার ক্রেতা ছিল না। অধিকন্তু মন্দা দেখা দিলে বিভিন্ন দেশ তাদের যতই সােনা বা মূল্যবান ধাতু ছিল তা বাচাবার জন্যে শুল্ক প্রাচীর তুলে মাল আমদানী বন্ধ করার চেষ্টা করায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভয়ানক মন্দা দেখা দেয়। এই সকল দেশ আমদানী বন্ধ করায় মন্দা চেপে বসে।

যুদ্ধের সময় আমেরিকা ও কানাডার গম ইওরােপের মিত্রশক্তি ব্যাপক আমদানী করত। এখন যুদ্ধের পর ইওরােপের কৃষিতে জোয়ার দেখা দিলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা প্রতি দেশের খাদ্যশস্য ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের রপ্তানি অকস্মাৎ হ্রাস পায়। মার্কিন কৃষক, কানাডার গম উৎপাদক, ব্রাজিলের কফি খামারের মালিক অকস্মাৎ দেখে যে, তাদের পণ্যের দাম পড়ে গেছে, চাহিদাও নেই। একে টাকার দাম পড়ে যায়, অপরদিকে লােকের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেলে কৃষিপণ্য ও শিল্পদ্রব্যের চাহিদা দারুণ ক্ষয় পায়। এতে কৃষিপণ্যের রপ্তানিকারক দেশগুলির অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। ক্রমে এই সঙ্কট এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিপণ্য, কাঁচা মালের উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে শিল্পদ্রব্যের বাজারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কৃষিপণ্যের বিপণনের সঙ্কট ও নিম্নমুখী দাম শিল্পদ্রব্যের উৎপাদনকেও ব্যাহত করে। চাহিদার অভাবে কল কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে যায়।

মার্কিন ডলার লগ্নির সঙ্গে জার্মান ক্ষতিপূরণ প্রদানের সমস্যা যুক্ত হয়ে আরও অবস্থা জটিল হয়। ডাওয়েজ ও ইয়ং পরিকল্পনা অনুসারে মার্কিন ঋণ জার্মানীকে দেওয়া হয়। জার্মানী এই ঋণের টাকা কিছু ক্ষতিপূরণ খাতে দেয়, বাকি টাকা উন্নয়ন খাতে খরচ করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভূতি এই ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়ে মার্কিন যুদ্ধ ঋণ শােধ করে। এখন জার্মানীকে মার্কিন ঋণ প্রদান মহামন্দার জন্য স্থগিত করা হলে, জার্মানরা ক্ষতিপূরণের অর্থপ্রদান রদ করে। হুভার মরেটোরিয়াম অনুযায়ী ২ বছরের জন্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং মার্কিন ঋণ শােধ রদ করা হয়। কিন্তু তাতে অবস্থায় বিশেষ উন্নতি হয়নি। কারণ জার্মান অর্থনীতি পুরাে মার্কিন ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কাজেই তা ধসে পড়ে। অপরদিকে, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় আগেই সেই বাবদে প্রদেয় টাকা খরচ করে ফেলে।

রূপার অতিরিক্ত আমদানী বৃদ্ধি মুদ্রামূল্য হ্রাসের প্রধান কারণ ছিল। এর ফলে যে সকল দেশে রৌপ্যমান প্রচলিত ছিল সেখানে রূপার অতিরিক্ত আমদানীর ফলে টাকার দাম পড়তে থাকে। লােকের ক্ষয়ক্ষমতা হ্রান্স পায়। টাকার দাম পড়ে গেলে লােকে কৃষি ও শিল্পজাত পণ্য ক্রয় করতে অক্ষম হয়। মালের চাহিদা দ্রুত ক্ষয় পেলে, কল কারখানা বন্ধ হয়, কৃষিতে উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রির অভাবে পচতে থাকে। সকল কিছু অচল হয়ে যায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর মহামন্দার প্রভাব : ১৯৩০-এর মহামন্দার প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ধনতন্ত্রী মুক্ত দুনিয়ার ওপর এত বড় আঘাত আর কখনও ঘটেনি। মহামন্দা ছিল যেন এক রক্তপাত হীন যুদ্ধ যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাট ধস দেখা দেয়। সােভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ধনতন্ত্রী বিশ্বের অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল না। এজন্য একমাত্র সােভিয়েত ইউনিয়নে এই মহামন্দার কবলে পড়ে নি। এর ফলে অনেক দেশে কমিউনিষ্ট রাশিয়ার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়। অনেকে বলতে থাকেন যে, ইওরােপে শিল্প বিপ্লবের ফলে যে ধনতন্ত্রী সমাজ গঠিত হয়েছে, যার মূলমন্ত্র হল অধিক উৎপাদন ও অধিক মুনাফা, এই মহামন্দা হল তারই কুফল, এজন্য বহু লােক ধনতন্ত্রী অর্থনীতি ও উদারতন্ত্রী, বুর্জোয়া শাসনবাবস্থার প্রতি আস্থা হারায়। উনারতন্ত্রী মূল্যবােধ, গণতান্ত্রিক আদর্শ বিপন্ন হয়।

গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে মহামন্দার সর্বনাশা প্রভাব বেশী তীব্র ছিল। এজন্য গণতান্ত্রিক ও উদারতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর লােকের আস্থা নষ্ট হয়। কারণ উদারতান্ত্রিক সরকারগুলি এই মহামন্দার ধাক্কা সামলাতে পারেনি। উদারপন্থার অঙ্গ অবাধ বাণিজ্য, মুক্ত অর্থনীতি, সীমাহীন উৎপাদন দ্বারা সীমাহীন সম্পদ অর্জন, শিল্প বাণিজ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ না করা প্রভৃতি ভাবধারা ধিকৃত হয়। উদারতন্ত্রী সরকারগুলিতে সর্বত্র ফাটল দেখা দেয়। ব্রিটিশ মুদ্রা স্টার্লিং এর অবনমন ঘটতে থাকে।

উদারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীনতা দেখা দিলে তার বিকল্প হিসেবে কোন কোন দেশ ফ্যাসীবাদ বা নাৎসীবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কোন কোন দেশ বলশেভিক সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকারের ব্যর্থতার ফলে কিছু লােক ভাবতে থাকে যে একদলীয়, একনায়কতন্ত্র শাসনের কেন্দ্রীয়তা থাকলে এরকম বিপর্যয় রােখা যেত। অনেকে অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, মুদ্রা মূল্য হ্রাসের ফলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশাগ্রস্থ হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণী যারা ছিল গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ তারাই জার্মানী প্রভৃতি দেশে আশাহত হয়। এজন্য ডিক্টেটরশিপ বা একনায়কতান্ত্রিক, একদলীয় শাসনের দিকে ঝোক বাড়ে। অপর দিকে, বহু মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক সাম্যবাদের মধ্যে মুক্তির পথ খোঁজে। মােট কথা, কিছুদিনের জন্যে মহামন্দার ফলে রাজনৈতিক মূল্যবােধের পরিবর্তন ঘটে।

জার্মানীর ক্ষেত্রে এই মহামন্দার ফল ছিল ভয়াবহ। একেই বিশ্বযুদ্ধে অর্থনৈতিক ধ্বস ও ক্ষতিপূরণের বোঝায় জার্মানী ছিল ডুবন্ত অবস্থায। ডাওয়েজ ও ইয়ং পরিকল্পনার দ্বারা জার্মানীতে মার্কিন ঋণের প্রবাহ বইলে জার্মানী তাতে কিছুটা স্বস্তি পায়। জার্মানীর নিজস্ব অর্থনীতি ছিল ভাঙাচোরা। তার মাঝে মহামন্দার ধাক্কায় জার্মানীর নাভিশ্বাস দেখা দেয়। মার্কিন ঋণের সমর্থন না থাকায়, জার্মানীর কাগজের মুদ্রা বা মার্কের দাম ভয়ানকভাবে কমতে থাকে। শেষ পর্যন্ত দোকানদারেরা এই মার্ক নিতে রাজী হয়নি। তারা ব্রিটিশ পাউন্ড বা মার্কিন ডলার দাবী করে। জার্মানীর রপ্তানি বাণিজ্য ১৯২৯ খ্রীঃ ৬৩০, ০০০, ০০০ পাউন্ড থেকে পরের বছর ২৮০, ০০০, ০০০ পাউন্ডে নেমে আসে। জার্মানীর আমদানী বাণিজ্য ৬৭০, ০০০, ০০০ পাউন্ড থেকে ২৩০, ০০, ০০০ পাউন্ডে নেমে যায়। জার্মান নথীভুক্ত বেকারের সংখ্যা ১৯২৯ খ্রীঃ ২, ০০০, ০০০ থেকে ১৯৩২ খ্রীঃ ৬, ০০০, ০০০ হয়। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, জার্মানির অর্থনৈতিক ধ্বস কত গভীর ছিল।

জার্মানীর ভাইমার প্রজাতন্ত্রের প্রতি জার্মান জনসাধারণের আস্থা বিনষ্ট হয়। জার্মানীর ১৯৩৩ খ্রীঃ সাধারণ নির্বাচনে পার্লামেন্টে নাৎসী সদস্যদের সংখ্যা ১ থেকে ১০৭-এ দাড়ায়। বলা বাহুল্য, নাৎসীরা ছিল একনায়কতন্ত্রবাদী, ভাইমার বিরােধী, ভার্সাই বিরােধী গােষ্ঠী। এই মন্দার ধাক্কা থেকে বাঁচতে জার্মানী ও অট্রিয়া উভয় দেশ শুল্ক জোট গঠন করে। কিন্তু ফ্রান্স তার নিরাপত্তার আশংকায় এই জোট গড়ার বিরােধিতা করে। ফ্রান্সের বক্তব্য ছিল যে, অর্থনৈতিক জোট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জোটে পরিণত হবে, যা ভার্সাই সন্ধি ও লীগের শর্ত বিরােধী। ব্রিটেন যদিও এই জোটের বিরােধী ছিল না, ফ্রান্সের চাপে ব্রিটেনকে লীগের সভায় বিষয়টিকে হেইগ আদালতের কাছে বিচার্য হিসেবে পাঠান হয়। হেইগ আদালত এই জোটকে অবৈধ ঘােষণা করে। ফরাসী, ব্রিটিশ, পােলিশ বিচারকরা এই রায় দিলে জার্মানী তা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে। অস্ট্রো জার্মান অর্থনৈতিক জোট ভেঙে গেলে জার্মানীর অর্থনৈতিক দুর্দশা, মুদ্রাস্ফীতি চরমে ওঠে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের পতনের শেষ ঘণ্টা বেজে যায়। নাৎসী নেতা হিটলার ১৯৩৩ খ্রীঃ ক্ষমতা দখল করেন।

বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দার ফলে ইওরােপে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়ে ওঠে। প্রতি রাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক প্রাচীর তুলে অন্যদেশ থেকে মাল আমদানী বন্ধ করতে অর্থনৈতিক চেষ্টা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড়রকমের ধাক্কা খায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও মনরাে নীতির দোহাই দিয়ে ইওরােপের অনৈতিক জটিলতা ও ইওরােপীয় মাল আমদানী থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চেষ্টা করে। ব্রিটেন স্বর্ণমান ত্যাগ করে রৌপ্যমান গ্রহণ করে। অটোয়া (Ottowa) চুক্তির দ্বারা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলিকে নিয়ে আলাদা নির্দিষ্ট পারস্পরিক শুল্ক হার স্থির করে। এইভাবে বিভিন্ন দেশ আঞ্চলিক অথনৈতিক শুল্ক গঠনের চেষ্টা করে। এই অর্থনৈতিক স্বতন্ত্র স্থাপনের চেষ্টা, ঐতিহাসিক ল্যাসােমের মতে, ইওরােপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিমণ্ডল রচনা করে। কোন কোন দেশ ভাবতে থাকে যে, এই আন্তর্জাতিক মহামন্দাকে কাটাতে হলে যুদ্ধই হল একমাত্র পথ।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলন : বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দার হাত থেকে বাঁচতে ১৯৩৩ খ্রীঃ মার্চ মাসে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলন আহুত হয়। প্রায় ৬৪টি দেশ এই সম্মেলনে যােগ দেয়। ফ্রান্স ও তার সহায়ক দেশগুলি জেদ ধরে যে মুদ্রা মুল্যের স্থিতি হলে তবেই শুল্ক প্রাচীর হ্রাস করা হবে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট অবশ্য ব্রিটেনের সঙ্গে একমত হন যে, শুল্ক হ্রাস সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। মুদ্রামূল্য স্থির করে পরে শুল্ক হ্রসের কথা ভাবা উচিত নয়। এই মতভেদের ফলে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ভেঙে যায়। E. H. Carr-এর মতে, বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল, সম্মেলনের সদস্যরা বিশ্ব অর্থসঙ্কটের সমাধানের আশু পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা না করে মহামন্দার পূর্ববর্তী যুগের মত মুদ্রামানের স্থিরত্ব এবং তার সঙ্গে শুল্ক হ্রাসের প্রশ্নকে জড়িত করেন। আসলে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত জাতীয় অর্থনীতি প্রাধান্য পাচ্ছিল। এভাবেই মহামন্দার পর বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামো নতুন করে গড়ে ওঠে।

তথ্যসূত্র :
1. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা।
2. গৌরীপদ ভট্টাচার্য - আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
3. অলক কুমার ঘোষ - আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বর্তমান বিশ্ব (১৮৭০-২০০৬)।
4. প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় - আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস।
5. E.H. Carr - International Relations Between the two world wars.
6. Hobsbawm - Age of Extremes.