মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ১৪ দফা নীতি

- August 06, 2019
১৯১৮ খ্রীঃ মিত্রশক্তি জার্মানীর পতন আসন্ন দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ৮ই জানুয়ারি, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন কংগ্রেসের নিকট তার শান্তি পরিকল্পনা ঘােষণা করেন। এর নাম ছিল চৌদ্দ দফা শর্ত (Fourteen Points)। এই ১৪ দফায় উইলসন উল্লেখ করেন, এই নীতির ওপর নির্ভর করে জার্মানী ও তার মিত্রদেশগুলির সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। উইলসন আগাগােড়া নিজেকে শান্তি স্থাপনের অগ্রনী দূত বলে মনে করতেন। তিনি চান যে, তার ঘােষিত শর্তগুলির ভিত্তিতে ইউরোপে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হল, ইওরােপে শান্তি স্থায়ী হবে। বিশেষভাবে উইলসন চান যে, জাতিসংঘ বা লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা করে তিনি আন্তর্জাতিক বিরােধের স্থায়ী মীমাংসার ব্যবাস্থা করবেন।
The Fourteen Points of Wilson
উইলসনের ১৪ দফা নীতির শর্ত : চতুর্দশ দফার ধারাগুলি হল -
১) গোপন কুটনীতির হলে খোলাখুলিভাবে শান্তি চুক্তির শর্ত আলােচনা করা হবে। কোন গোপন চুক্তিকে সন্ধির শর্ত হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।
২) মহাসমুদ্রে নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ চলাচলের অবাধ অধিকারকে স্বীকার করা হবে।
৩) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সকল দেশের অবাধ অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
৪) প্রতি দেশের অস্ত্র হ্রাস করে আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করতে হবে।
৫) উপনিবেশগুলির ওপর বিভিন্ন দেশের দাবী স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করা হবে।
৬)রাশিয়ার অধিকৃত স্থানগুলি রাশিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৭) বেলজিয়ামের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা পুনঃস্থাপন করা হবে
৮) ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের জন্যে ফ্রান্সকে আলসাস ও লােরেন ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
৯) ইতালীর জাতীয়তাবাদী আশা অনুযায়ী ইতালীর জাতীয় সীমান্ত নির্ধারণ করা হবে।
১০) অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের জনগণকে স্বায়ত্ব শাসনের সুযােগ দেওয়া হবে।
১১) বলকান রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দান করা হবে। সার্বিয়ার ভূখণ্ডকে সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
১২) তুরস্কের সুলতানের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জাতিগুলিকে স্বায়ত্ব শাসনের অধিকার দেওয়া হবে এবং দার্দানালিস প্রণালীকে আন্তর্জাতিক জলপথ বলে ঘােষণা করা হবে।
১৩) স্বাধীন ও সার্বভৌম পােল্যাণ্ড স্থাপন করা হবে এবং স্বাধীন পােল্যাণ্ডকে সমুদ্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
১৪) ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও ভৌমিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে এবং আন্তর্জাতিক বিরােধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্যে বিভিন্ন জাতিগুলির সমবায়ে একটি সংঘ স্থাপন করা হবে।

উইলসনের ১৪ দফা নীতির গুরত্ব: ১৪ দফায় ১ থেকে ৫ নং শর্তগুলি ছিল সাধারণ শর্ত এবং সকল দেশের প্রতি প্রযােজ্য। এই শর্তগুলির দ্বারা উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণগুলি যথা গােপন চুক্তি, ঔপনিবেশিক বিরােধ, বাণিজ্য শুল্ক এবং নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ চলাচলের অবাধ অধিকার নিয়ে অস্ত্র প্রতিযােগিতা প্রভৃতি দূর করার চেষ্টা করেন। ৬ থেকে ১৩ নং শর্তগুলির দ্বারা উইলসন বিশেষ বিশেষ দেশের অসন্তোষের কারণ দুর করার চেষ্টা করেন। ১৪ নং শর্ত দ্বারা জাতিসংঘ স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। উইলসন চতুর্দশ দফা ছাড়া আরও কয়েকটি ঘােষণায় বলেন যে, চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি রচনার সময় লক্ষ্য রাখাও হবে যেন - (১) প্রতি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ওপর নিরপেক্ষ বিচার করা হয় এবং (২) যেন ভবিষ্যতে কোন অশান্তির কারণ সৃষ্টি না হয়। উইলসন আশা প্রকাশ করেন যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হবে মানব জাতির শেষ যুদ্ধ। পৃথিবীতে আর এরূপ যুদ্ধ ঘটবে না।

উইলসনের ১৪ দফা নীতির বৈশিষ্ট্য : মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন-এর উল্লিখিত চতুর্দশ শর্তগুলির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ছিল -
১) চতুর্দশ দফায় পরাজিত জার্মানীর ওপর কোন শাস্তি বা প্রতিশােধ গ্রহণের কথা ছিল না। বরং এর সারমর্ম এই ছিল যে, শান্তিচুক্তি এমনভাবে রচনা করতে হবে যেন পরাজিত দেশগুলির মনে অসন্তোষ না জমা থাকে।
২) জার্মানীর কাছ থেকে বিজয়ী দেশগুলি ক্ষতিপূরণ নিবে এমন কথা এতে ছিল না।
৩) একমাত্র জার্মানীকেই নিরস্ত্রীকরণ করা হবে একথা চতুর্দশ দফায় বলা হয়নি। সকল শক্তির অস্ত্র হ্রাসের কথা এতে বলা হয়।
৪) ইওরােপের সকল জাতির স্বাধীনতা স্বীকার করে ইওরােপের পুনর্গঠনের কথা বলা হয়। এক জাতি ও এক রাষ্ট্র ছিল ১৪ দফার মূল সূত্র।
৫) বিজয়ী দেশগুলির একাধিপত্য স্থাপন করার কোন ইঙ্গিত এতে ছিল না। চৌদ্দ দফার পশ্চাতে মার্কিন স্বার্থরক্ষার নীতিও নিহিত ছিল। ইওরােপে শক্তিসাম্য স্থাপন করে মার্কিন দেশ তার নিরাপত্তাকে দৃঢ় করার চেষ্টা করে।
Advertisement