PayPal

ভিয়েনা সম্মেলন/ভিয়েনা কংগ্রেস ১৮১৫

author photo
- Monday, August 26, 2019
নেপোলিয়নের পতনের পর ইওরােপের পুনর্গঠনের জন্যে বিজয়ী মিত্রশক্তিবর্গ অস্টিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নগরীতে ১৮১৫ সালে ২০ নভেম্বরে ভিয়েনা সম্মেলন (Vienna Congress) আয়োজন করে। ইওরােপের সকল শক্তি (কেবলমাত্র পােপ ও তুরস্ক ব্যতীত) এই সম্মেলনে যােগ দেয়। বিভিন্ন দেশের রাজা, রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতির ফলে ভিয়েনা সম্মেলন এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের রূপ পায়। অষ্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রান্সিস ভিয়েনায় আগত রাজা ও কূটনীতিকদের আপ্যায়নের জন্য প্রত্যহ ১০ হাজার পাউন্ড মুদ্রা ব্যয় কতেন।
Vienna Congress in Austria
ইওরােপের পুনর্গঠনের যে ছক চার বিজয়ী শক্তি গােপনে স্থির করে, প্রকাশ্যে কংগ্রেসের মাধ্যমে তাকেই রূপায়িত করে। ফরাসী মন্ত্রী ট্যালিরান্ড এই চার বিজয়ী শক্তির একাধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন যে, প্যারিসের প্রথম সন্ধিতে উপরােক্ত চার বিজয় শক্তি ছাড়া ফ্রান্স, স্পেন, সুইডেন ও পর্তুগাল স্বাক্ষরকারী ছিল। সুতরাং চার বিজয়ী শক্তি ও এই চার শক্তি মােট আট শক্তির মধ্যে আলােচনার ভিত্তিতে সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত। ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যকরী বিজয়ী শক্তিজোট ইংল্যান্ড, অস্টিয়া, রাশিয়া ও প্রাশিয়া এদের একেত্রে বিগ ফোর বলা হয় এবং পরাজিত পঞ্চম সদস্য হিসেবে ফ্রান্স যােগ দেন।

ভিয়েনা সম্মেলনের সমস্যা : ভিয়েনা সম্মেলনে ইওরােপের সমাজ ব্যবস্থার পুনর্গঠন, ইওরােপের রাজনৈতিক জীবনের পুনরুজ্জীবন প্রভৃতি গালভরা বাক্য দ্বারা সম্মেলনের মহৎ উদ্দেশ্য ঘােষণা করেন। কিন্তু এই সােচ্চার ঘােষণার অন্তরালে বিজয়ী শক্তিগুলির মধ্যে রাজ্য ভাগের জন্যে গােপন রেষারেষি চলছিল। এজন্য প্রধান শক্তিগুলির মতভেদ গােড়া থেকে দেখা দেয়। এই সমস্যাগুলি হল - ফ্রান্সকে সীমানা দ্বারা আবদ্ধ করা যাতে ভবিষ্যতে ফ্রান্স ইওরোপের শান্তি পুনরায় ভাঙতে না পারে। জার্মানী, ইতালী, পােল্যান্ড প্রভৃতি দেশে নেপােলিয়ন যে সংগঠন করেন তাহা ভেঙে নতুনভাবে সংগঠন করা। নেপােলিয়ন কর্তৃক বিতাড়িত রাজবংশগুলি সম্পর্কে বাবস্থা গ্রহণ করা। ইওরােপে স্থিতাবস্থা, শক্তিসাম্য স্থাপন করে শান্তি বজায় রাখা। সর্বোপরি, বিজয়ী চতুঃশক্তি নিজেদের ক্ষতিপূরণের জন্যে রাজ্য ভাগ করে নিতে স্থির করে। কিন্তু এই রাজ্যভাগের ফলে কোন একটি শক্তি যাতে বেশী ক্ষমতাশালী না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়। এই লক্ষ্যগুলি নিয়ে সম্মেলনের কাজ পরিচালিত হয়।

ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবর্গ : ভিয়েনা সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন অষ্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিক। “মাছ যেমন ঘূর্ণি জলে অবাধে চলাফেরা করে, তিনি তেমনই ভিয়েনা সম্মেলনের স্বচ্ছ রাজনৈতিক ঘূর্ণি জলে মাছের ন্যায় অবলীলাক্রমে সঞ্চরণ করতেন"। মেটারনিক ছিলেন ভিয়েনা কংগ্রেসে রক্ষণশীলতার ধারক ও বাহক। মেটারনিকের বিপরীত মেরুতে ছিলেন রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজাণ্ডার। নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ জয়ের সাফল্যের জন্যে ইওরােপীয় জনসাধারণের নিকট তিনি “বিজেতার বিজেতা" রূপে পরিচিত হন। রাশিয়ার বিশাল সেনাদলের জন্যে তিনি ইওরােপের সর্বশক্তিমান নৃপতিদের মর্যাদা পান। জার উদারতান্ত্রিক মতামত প্রকাশ করে ভিয়েনা সম্মেলনে নিপীড়িত জাতিগুলির শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেন। ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্যোক্তা ছিলেন অষ্ট্রিয়ার সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস, শান্ত প্রকৃতির ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যাসলরি, পাকাল মাছের ন্যায় পিচ্ছিল ফরাসী মন্ত্রী ট্যালিরান্ড, প্রাশিয়ার মন্ত্রী হামবােল্ড প্রভৃতি।

ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য : ভিয়েনা বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলঃ (১) নেপােলিয়নের আগ্রাসনের ফলে ইউরােপের পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামাের পুনর্গঠন, (২) প্রাক-বিপ্লব যুগের রাজনৈতিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা, (৩) ইউরােপের শান্তি বজায় রাখা, (৪) নেপােলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, (৫) ফ্রান্সকে বেষ্টনী দ্বারা আবদ্ধ করে রাখা। (৬) ইউরোপে পুরাতন রাজবংশকে ফিরিয়ে আনা।

ভিয়েনা সম্মেলন/কংগ্রেসের নীতি

ভিয়েনা সম্মেলনের নেতৃবর্গ ইওরােপের পুনর্গঠনের জন্যে এবং ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ আক্রমণ হতে ইওরােপকে রক্ষার জন্যে ও ইওরােপের পুর্নগঠনের জন্যে তিনটি নীতি গ্রহণ করেন। ডেভিড টমসনের মতে, এই তিন নীতি প্রয়ােগের সময় বিজয়ী শক্তিগুলি আগে পরস্পরের স্বার্থরক্ষার পর নীতিগুলি প্রয়োগ করেন। এই নীতিগুলি ছিল (১)ন্যায্য অধিকার নীতি (Ligitimacy), (২) ক্ষতিপুরণ নীতি (Compensation) এবং শক্তিসাম্য নীতি (Balance of power)। এছাড়া ইওরােপে পুরাতনতন্ত্র ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্যে বিপ্লবের প্রতি ঘৃণা (hatred of Revolution) এবং আন্তর্জাতিক সহযােগিতা নীতিও গৃহীত হয়।

ন্যায্য অধিকার নীতি : ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে নেপােলিয়নের আগে ইওরােপের যে দেশগুলিতে যে সকল রাজবংশের শাসন ছিল তাহা পুনঃস্থাপন করা হয়। ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে ফ্রান্সের সঙ্গে প্যারিসের দ্বিতীয় সন্ধি (নভেম্বর, ১৮১৫ খ্রীঃ) (Second Treaty of Paris) স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধির দ্বারা বুরবো রাজবংশের অষ্টাদশ লুইকে ফ্রান্সের সিংহাসনে পুনঃস্থাপন করা হয়। ফ্রান্সকে ১৭৯০ খ্রীঃ অর্থাৎ বিপ্লব পূর্ববর্তী বৈধ সীমানায় ফিরিয়ে আনা হয়। ফরাসী মন্ত্রী ট্যালিরান্ড ছিলেন ন্যায্য অধিকার নীতির উদ্ধাবক। তিনি মেটারনিকের পুরাতনতন্ত্রকে সমর্থন করেন। উত্তর ইটালিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য স্থাপিত হয়। সিসিলি ন্যাপলসের সিংহাসন ফার্ডিনান্ডকে দেওয়া হয়। সার্ডিনিয়া-পিডমন্ট, স্যাভয় পরিবার স্থাপিত হয়। পােপ পুনরায় তার মধ্য ইটালির রাজ্য ফিরে পান। জার্মানির উপর অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য স্থাপিত হয়। স্পেনে বুরবো পরিবারকে সিংহাসন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হল্যান্ডের সিংহাসনে অরেঞ্জ পরিবার পুনরায় অধিষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের নেতারা ন্যায্য অধিকার নীতি সর্বত্র সমানভাবে প্রয়ােগ করেননি, কারণ তারা ক্ষতিপূরণের নীতিও প্রয়ােগ করেছিলেন, যার ফলে ন্যায্য অধিকার নীতি সর্বত্র প্রয়ােগ করার পথে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল।

ক্ষতিপূরণ নীতি : ফ্রান্স বিজয়ী মিত্রশক্তিকে যুদ্ধের দরুন ৭০ কোটি ফ্রা ক্ষতিপূরণ দেয়। নেপােলিয়ন যে সকল মূল্যবান সামগ্রী বিভিন্ন দেশ থেকে আনেন তাহা ফেরৎ দিতে হয়। ফ্রান্স যাতে পুনরায় গণ্ডগােল সৃষ্টি করতে না পারে এজন্য বিজয়ী মিত্রপক্ষের দখলকারী সেনাদল ৩ বছর ফরাসী ভূমি দখল করে থাকবে বলা হয়। প্যারিসের দ্বিতীয় সন্ধির দ্বারা ফ্রান্সের সীমানা নির্ধারণ এবং ফ্রান্সে বুরৰো রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পর, সন্ধি কর্তারা নিজেদের ভৌমিক ক্ষতিপূরণ লাভের ব্যাপারে মন দেন। এক্ষেত্রে রুশ জার প্রথম আলেকজাণ্ডার গােটা পােল্যাণ্ড দখলের জন্যে চাপ দিলে এবং প্রাশিয়া স্যাক্সনী রাজ্য গ্রাস করার জন্যে দাবী জানালে সমস্যা দেখা দেয়। ক্ষতিপূরণ নীতি অনুসারে রাশিয়া পায় গ্রাও ডাচি অব ওয়ার নামে পােল্যাণ্ডের প্রায় ৩/৪ অংশ নিয়ে নেপােলিয়নে যে অঞ্চল গড়েন, তার সবটা। রাশিয়া এছাড়া তুরস্কের কাছ থেকে বেসারাবিয়া এবং বাল্টিক অঞ্চলে ফিনল্যাণ্ড দেশটিও রাশিয়া পায়। এর ফলে পূর্ব ইওরােপে রাশিয়ার প্রভাব ভীষণ বাড়ে।

অস্টিয়া হল্যান্ডকে বেলজিয়াম রাজ্য ছেড়ে দেয়। এই ফ্লেমিশ দেশটি ছিল একেই অজার্মান, এছাড়া অষ্ট্রিয়ার সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন। এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে উত্তর ইতালীর লম্বাডি ও ভেনেসিয়া প্রদেশ অষ্ট্রিয়া পায়। তাছাড়া ব্যাভেরিয়া অষ্ট্রিয়ার যে অঞ্চল দখল করেছিল তা ফিরিয়ে দেয়। এছাড়া অস্ট্রিয়া টাইরল, সালজবার্গ ও ইল্লিরিয়া অঞ্চল পায়। ম্যারিয়টের মতে, অষ্ট্রিয়া ফ্লেমিশ অঞ্চল ত্যাগ করে ইতালীর বিরাট অঞ্চল পেয়ে লাভবান হয়।

প্রাশিয়া ক্ষতিপূরণ হিসেবে স্যাক্সনীর অর্ধেক (মতান্তরের ২/৫ অংশ) এবং সুইডেনের কাছ থেকে পােমিরানিয়া প্রদেশ পায়। জার্মানীর ওয়েষ্টফ্যালিয়া অঞ্চলের কিছু অংশ প্রাশিয়াকে দেওয়া হয়। প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হামবােল্ড এতে সন্তুষ্ট হন। এছাড়া ভবিষ্যতে ফ্রান্সকে জার্মানী আক্রমণে বাঁধা দেবার জন্য প্রাশিয়াকে রাইনল্যাণ্ডে আধিপত্য দেওয়া হয়।

ইংল্যান্ড ক্ষতিপূরণ হিসেবে তার সাম্রাজ্যের স্বার্থে ইওরােপের বাইরের স্থান নেয়। ইংল্যান্ড পায় সিংহল বা শ্রীলঙ্কা, কেপ কলােনি, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, মাল্টা ও আইওনীয় দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি। এর ফলে বিশ্বের নানাস্থানে ইংলণ্ডের উপনিবেশ ও নৌর্ঘাটি বিস্তৃত হয়। সুইডেন প্রাশিয়াকে পােমিরানিয়া ছেড়ে দেয়, এজন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে সুইডেনকে নরওয়ে দেশটি দেওয়া হয়।

শক্তিসাম্য নীতি : ফ্রান্স যাতে ভবিষ্যতে ইউরোপ আক্রমণ না করতে পারে এজন্য ফ্রান্সের প্রতিবেশী দেশগুলিকে শক্তিশালী করে শক্তিসাম্য শক্তি সাম্য স্থাপন করা হয়। ফ্রান্সে কিছুদিনের জন্যে বিজয়ী শক্তির সেনাদল স্থাপন করা হয়। ফ্রান্সের প্রতিবেশী দেশগুলিকে শক্তিশালী করে ফ্রান্সের চারদিকে বেষ্টনী প্রাচীর রচনা করা হয়। ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বে লাক্সেমবার্গ ও বেলজিয়ামকে হল্যাণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। ভবিষ্যতে ফ্রান্স বেলজিয়াম অধিকারের চেষ্টা করলে হল্যাণ্ডকে তা প্রতিরোধের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তে জার্মানীর রাইন প্রদেশগুলিকে প্রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে ফ্রান্সের পূর্ব সীমান্তকে চেপে রাখা হয়। জার্মানীর ৩৮ টি রাজ্যের সমবায়ে এক শিথিল রাষ্ট্রজোট বা বুণ্ড গঠন করে, ফ্রান্স জার্মানিতে ঢােকার চেষ্টা করলে যাতে বাধা পায় তার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে ফ্রান্সের পূর্ব সীমায় রক্ষা প্রাচীর তৈরি করা হয়। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বে সুইজারল্যাণ্ডকে ফ্রান্সের তিনটি ক্যান্টন বা জেলা দেওয়া হয়। সুইজারল্যাণ্ড মােট ২২টি ক্যান্টন সহ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দেশে পরিণত হয়। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব সীমায় সুইজারল্যাণ্ড এক রক্ষা প্রাচীরে পরিণত হয়। ফ্রান্সের দক্ষিণ সীমান্তে সার্ডিনিয়ার সঙ্গে জেনােয়াকে সংযুক্ত করা হয়। এভাবে শক্তিসাম্য নীতির প্রয়ােগ করে ফরাসী সীমান্তে বেষ্টনী প্রাচীর তৈরি করা হয়।

জার্মানী ও ইতালীর পুনর্গঠন : মেটারনিক জার্মানীতে ফরাসী বিপ্লবের পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষপাতী হলেও, জার প্রথম আলেকজাণ্ডার এর বিরােধিতা করেন। নেপােলিয়নের জার্মানী দখলের আগে জার্মানী ছিল ৩০০ রাজ্যের সমষ্টি। নেপােলিয়ন এই ৩০০টি রাজ্য ভেঙে ৩৯টি রাজ্য গঠন করেন। ভিয়েনা সম্মলনে জামানীকে ৩৮টি রাজ্যে বিভক্ত করে এর ওপর বুণ্ড বা একটি শিথিল যুক্তরাষ্ট্র স্থাপন করা হয়। অস্ট্রিয়াকে এই রাষ্ট্রমণ্ডলের সভাপতি করা হয়। ইতালীর ক্ষেত্রে নেপােলিয়নের অবলম্বিত ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করে ইতালীকে মােট ৫টি রাজনৈতিক ভাগে বিভক্ত করা হয়। পােপ, স্যাভয়, বুরবো প্রভৃতি রাজবংশের অধিকার ইতালীতে পুনঃস্থাপন করা হয়। এর ফলে ঐক্যবদ্ধ ইতালীর আদর্শ লুপ্ত হয়। মেটারনিক বলেন যে, "ইতালী হল একটি ভৌগােলিক সংজ্ঞা" মাত্র। ভিয়েনা চুক্তির দ্বারা ফরাসী বিপ্লবের ভাবধারা গণতন্ত্রবাদ, উদারতন্ত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদকে দমন করে ইওরােপে পুরাতনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবে ইওরােপের প্রগতিকে ভিয়েনা চুক্তির দ্বারা পিছিয়ে দেওয়া হয়।

ভিয়েনা কংগ্রেস/সম্মেলনের সমালোচনা : ভিয়েনা সন্ধি হল ইতিহাসের একটি বিতর্কিত সন্ধি। গ্রান্ট ও টেমপারলির মতে, ভিয়েনা সন্ধি প্রণেতাদের প্রতিক্রিয়াশীল ও উদারতন্ত্র বিরােধী বলা এখন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ভিয়েনা সম্মেলনের প্রাক্কালে মেটারনিক ইওরােপের সমাজ ব্যবস্থার পুনর্গঠন, ইউরোপের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ প্রভৃতি যে সকল গালভরা আদর্শ প্রচার করা হয়, বাস্তবে তাহা মােটেই পালন করা হয়নি। আসলে বিজয়ী শক্তিগুলির উদ্দেশ্য ছিল আদর্শের আড়ালে পরাজিত ফ্রান্সের রাজ্য গ্রাস করা মাত্র।

ভিয়েনা সন্ধি নির্মাতাদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব প্রমাণিত হয়। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই বিপ্লবের পর বেলজিয়াম হল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘােষণা করে। ভিয়েনা সন্ধির দ্বারা বিভক্ত ইতালী ১৮৬১-৬৬ খ্রীঃ ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই সন্ধির দ্বারা বিভক্ত জার্মানী ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যবদ্ধ হয়। সুতরাং ভিয়েনা সন্ধির ভিত্তি মজবুত ছিল না একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান দুর্বলতা ছিল পুরাতন রাজবংশগুলির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং ফরাসী বিপ্লবীজাত নতুন ভাবধারার প্রতি উগ্র বিরােধিতা। ন্যায্য অধিকার নীতি প্রয়োগ করে পুরাতন রাজবংশগুলিকে নিজ নিজ সিংহাসনে ফিরিয়ে আনা হয়। স্বৈর শাসন হতে মুক্তিকামী লােকেদের পুনরায় স্বৈর শাসনের অধীনে আনা হয়। জনসাধারণের স্বাধীনতার ইচ্ছার ফলে ফ্রান্সে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত বুরবো রাজবংশের পতন ঘটে। ফরাসী বিপ্লবের আদর্শগুলি যথা জাতীয়তাবাদ, উদারতন্ত্র এবং গণতন্ত্র ইওরােপকে এক পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। জুলাই বিপ্লব ও ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে ভিয়েনা চুক্তির কাঠামাে ভেঙে পড়ে।

জার্মান জাতীয়তাবাদের দাবী অগ্রাহ্য করে মেটারনিকের হস্তক্ষেপে জার্মানীকে ৩৮টি রাজ্যে বিভক্ত করা হয়। প্রাশিয়ার রাষ্ট্রনীতিবিদ হার্ডেনবার্গ জার্মানীতে একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি মেটারনিকের এই প্রস্তাবকে বুদ্ধিহীন বস্তু বলে আখ্যা দেন।মেটারনিকের প্রভাবে ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে জার্মানীতে অষ্টিয়ার কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপন করা হয়। জার্মানীকে ৩৮টি রাজ্য বিভক্ত করা হয়। এই কারণে জার্মান জাতীয়তাবাদীরা ভিয়েনা চুক্তিকে প্রকাণ্ড প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা (A great deception and a betrayal) বলে অভিহিত করে। ১৮৭০ খ্রীঃ জার্মানির ঐক্য স্থাপিত হলে জার্মানীতে ভিয়েনা চুক্তিকে বাতিল করা হয়।

বেলজিয়ামকে শক্তিসাম্যের খাতিরে হল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু কেল্টিক ও ক্যাথলিক বেলজিয়াম, ১৮৩০ খ্রীঃ টিউটন ও প্রটেস্ট্যান্ট হল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা ঘােষণা করে। পােল্যান্ডকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, নরওয়েকে সুইডেনের অধীনে রাখা হয়। ইতালীর জাতীয়তারবাদ দাবীকে অস্বীকার করে উত্তর ইতালীতে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে অষ্ট্রিয়ার আধিপত্য স্থাপন করা হয়। মধ্য ইতালীতে স্বৈরাচারী রাজাদের পুনঃস্থাপন করা হয়। মেটারনিক বলেন, এখন থেকে ইতালীর নাম শুধু ভূগােলের বইয়ে থাকবে। জাতীয়তাবাদকে উপেক্ষা করার ফলেই ভিয়েনা চুক্তি স্থায়ী হয়নি। ভিয়েনা চক্তির দ্বারা ইওরােপের যে রাজনৈতিক মানচিত্র রচিত হয় তা অল্পদিনের মধ্যেই ছেড়া কাগজে পরিণত হয়।

ভিয়েনা কংগ্রেস/সম্মেলনের গুরত্ব : তাদের কাজের ফলে অন্ততপক্ষে চল্লিশ বৎসর ইউরোপে মােটামুটিভাবে শান্তি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। নেপােলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থার বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যে সকল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলির শর্তাদিও ভিয়েনা সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিগণকে মেনে চলতে হয়েছিল। তাদের কাজের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। সর্বশেষে এরুপ বলা চলে যে, তারা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা মহাপুরুষ ছিলেন না। সদর ভবিষ্যতে কি ঘটিবে তা স্মরণ করে কার্য সম্পাদন তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই সম্মেলনে শক্তি সমবায় গঠন পরবর্তীকালে রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠার পথপ্রদর্শক ছিলেন। ফরাসী সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ইতালী ও জার্মানীর জাতীয়তাবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভিয়েনা চুক্তি ভেঙে ফেলেন।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. ডক্টর কিরণচন্দ্র চৌধুরী - ইউরোপ ও বিশ্ব ইতিহাস কথা
2. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
3. Grant and Temperly - Europe in the 19th and 20th centuries
4. Quoted by Lipson - Europe in the 19th and 20th Centuries
5. Kctelbey - History of Modern Times
6. A.J.P. Taylor - Struggle for Mastery of Europe
7. Devid Thomson - Europe Since Napoleon
8. Schevill - History of Europe
9. Gordon Craig - Europe Since 1815
10. Hearnshaw - The Era of Congress
11. Nicholson - The Congress of Vienna