ভার্সাই সন্ধির প্রেক্ষাপট, শর্তাবলী ও ফলাফল ১৯১৯

- August 07, 2019
১৯১৯ সালের ১২ই জানুয়ারি প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ভার্সাই চুক্তির খসড়া করা হয়। খসড়ার মূল নকশা তৈরি করেন চারজন নেতা যারা ইতিহাসে বিগ ফোর হিসেবে খ্যাত। এরা হলেন ব্রিটেনের ডেভিড লয়েড জর্জ, ফ্রান্সের জর্জেস ক্লিমেনশো (সভাপতি নির্বাচিত হন), যুক্তরাষ্ট্রের উড্রো উইলসন এবং ইতালির ভিটোরিও অরল্যান্ডো। মূলত প্রথম তিনজনই নকশা তৈরি করেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ২৮ জুন তারিখে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীর, ভার্সাই প্রাসাদের মিরর হল-এ ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সেই সন্ধি ভার্সাই সন্ধি নামে পরিচিত। বিজয়ী মিত্রশক্তির মতে, জার্মানী ছিল যুদ্ধ অপরাধী। সুতরাং সন্ধির শর্ত আলােচনার জনাে জার্মানীকে প্যারিসের শান্তি বৈঠকে কোন সুযােগ না দিয়ে একতরফাভাবে জার্মানীর ওপর ভার্সাই সন্ধির শর্তগুলি চাপান হয়। শান্তি সম্মেলনে জার্মান প্রতিনিধিদলকে প্রতীক যুদ্ধবন্দী হিসেবে গণ্য করা হয়। জার্মান প্রতিনিধিদলকে প্রহরীর দ্বারা বেষ্টন করে সন্ধি স্বাক্ষর করতে আনা হয় এবং সন্ধি-স্বাক্ষরের পর তাদের প্রহরীর অধীনে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
Versailles Treaty in France 1919
ঔপনিবেশিক শর্ত : ভার্সাই সন্ধির ঔপনিবেশিক শর্ত অনুসারে আফ্রিকা ও দূরপ্রাচ্যের উপনিবেশগুলির ওপর জমিনীর অধিকার লোপ করা হয়। জার্মানীর দূরপ্রাচ্যের উপনিবেশগুলি জাপানকে দেওয়া হয়। জার্মানীর অন্যান্য উপনিবেশগুলি জাতিপুঞ্জ অধিগ্রহণ করে ঔপনিবেশিক শর্তাবলী ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে ম্যান্ডেট হিসেবে শাসন করতে দেওয়া হয়। জার্মান নিউগিনি, নাউর এবং ইকোয়াটারের দক্ষিণাংশ দ্বীপপুঞ্জগুলি ব্রিটেনের ম্যান্ডেট হিসেবে পরিগণিত হয়। জার্মান স্যামােয়া নিউজিল্যান্ডকে লিগের ম্যান্ডেট হিসেবে প্রদান করা হয়। জার্মানির বাকি দ্বীপপুঞ্জগুলি অস্ট্রেলিয়াকে ম্যান্ডেট হিসেবে প্রদান করা হয়। চিন, শ্যাম, সাইবেরিয়া, মরক্কো, ইজিপ্ট প্রভৃতি অঞ্চলে জার্মানির বিশেষ অধিকার বর্জন করতে হয়। জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে সংযুক্তিকরণের বিষয়টি লিগ কাউন্সিলের অনুমােদন ছাড়াই বাতিল করা হয়।

অর্থনৈতিক শর্ত : ভাসাই সন্ধির অর্থনৈতিক শর্তগুলির দ্বারা জার্মানীকে যুদ্ধ অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। যুদ্ধের দরুন মিত্রশক্তির ক্ষতিপূরণের জন্যে জার্মানীর ওপর ক্ষতিপূরণ চাপান হয়। যুদ্ধে মিত্রশক্তির যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তার দরুন মিত্রশক্তির অর্থের দ্বারা ক্ষতিপূরণ দিতে জার্মানীকে বলা হয়। জার্মানীর প্রদেয় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ধার্যের জন্যে একটি ক্ষতিপূরণ কমিশন নিয়ােগ করা হয়। এই কমিশনকে তিন বছরের মধ্যে চূড়ান্ত রিপাের্ট দিতে বলা হয়। আপাততঃ জার্মানী কিছু পরিমাণ অর্থ মিত্রশক্তিকে দিতে বাধ্য থাকবে বলা হয়। রাইন নদীকে আন্তর্জাতিক জলপথ বলে ঘােষণা করা হয়। মিত্রশক্তিকে কয়লা, কাঠ ও অন্যান্য দ্রব্য সরবরাহ করতে জার্মানীকে বাধ্য করা হয়। ভার্সাই সন্ধির ২৩৪ ধারায় বলা হয় যে, মিত্রশক্তির দ্বারা উৎপন্ন শিল্পদ্রব্য বিক্রয়ের জন্যে জার্মানীর বাজারে মিত্রশক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ভৌগােলিক শর্ত : ভার্সাই সন্ধির ভৌগােলিক শর্তগুলি দ্বারা স্থির হয় যে জার্মানীর পশ্চিম সীমান্তে -
১) ঐতিহাসিক ন্যায় বিচার নীতি অনুসারে, জার্মানী ফ্রান্সকে আলসাস ও লোরেন প্রদেশ ফিরিয়ে দিবে।
২) বেলজিয়ামকে ইউপেন, মাসিনেট মালমেডি নামক জেলাগুলি জার্মানী ছেড়ে দিবে।
৩) জার্মানির উত্তর সীমান্তে ডেনমার্ককে স্নেজভিগ প্রদেশ জার্মানী ফিরিয়ে দিবে। গণভােটের দ্বারা স্লেজভিগ প্রদেশের জনমত যাচাই করা হলে দক্ষিণ স্নেজভিগ, জার্মানীর সঙ্গে যােগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
৪) জার্মানী মেমেল অঞ্চল লিথুয়ানিয়াকে হস্তান্তর করে।
৫) জার্মানীর পূর্ব সীমান্তে পােজেন ও পশ্চিম প্রাশিয়া অঞ্চল জার্মানী পােল্যাণ্ডকে ছেড়ে দেয়।
৬) ঐতিহাসিক ন্যায় বিচার অনুসারে স্বাধীন ও সার্বভৌম পােল্যাণ্ড রাষ্ট্র স্থাপিত হয়। দীর্ঘকাল পরে পােল্যাণ্ড তার স্বাধীনতা ফিরে পায়।
৭) স্বাধীন পােল্যাণ্ড যাতে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়, এজন্যে জার্মানীর মধ্য দিয়ে একটা যােগাযােগকারী রাস্তা (Corridor) পােল্যাণ্ডকে জার্মানী ছেড়ে দেয়।
৮) জার্মান বন্দর ডানজিগ জাতিসংঘ অধিগ্রহণ করে এবং উন্মুক্ত শহর বলে ঘোষণা করে। জাতিসংঘ এই বন্দর পােল্যাণ্ডকে ব্যবহার করতে দেয়।
৯) জার্মানীর পূর্ব সীমান্তে সাইলেশিয়া প্রদেশটিকে গণভােটের দ্বারা তিন ভাগ করা হয়। একাংশ জার্মানীর সঙ্গে যুক্ত থাকে, অপরাংশ চেকোশ্লোভাকিয়া এবং তৃতীয় অংশ পােল্যাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়।
১০) জার্মানীর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে যাতে ভবিষ্যতে জার্মানী ফ্রান্সকে আক্রমণ না করতে পারে এজন্য নিরাপত্তা বলয় রচনা করা হয়। ফ্রান্সের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে সন্ধিতে বলা হয় যে, (ক) রাইনল্যান্ডে আপাততঃ ১৫ বছরের জন্য মিত্রশক্তির দখলদার বাহিনীর অধীনে থাকবে। ফ্রান্সকে নিরাপত্তার ছত্র দিবে। (খ) রাইন নদীর পূর্বতীরে জার্মান সামরিক ঘটি রাখা যাবে না। (গ) যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের কয়লাখনিগুলি জার্মানী ধ্বংস করার জন্যে, ১৫ বছরের জন্য জার্মানির কয়লাখনি সমৃদ্ধ সার অঞ্চল ফ্রান্স দখল করবে। ১৫ বছর পরে গণভােট দ্বারা স্থির হবে এই জেলা কোন দেশ পাবে।

সামরিক শর্ত : ভার্সাই সন্ধির পঞ্চম অনুচ্ছেদে সামরিক শর্তগুলির উল্লেখ করা হয়। সামরিক শর্তগুলির উদ্দেশ্য ছিল জার্মানী যাতে ভবিষ্যতে আক্রমণাত্মক ক্ষমতা লাভ না করতে পারে তার ব্যবস্থা করা। জার্মানীকে নিরস্ত্রীকৃত করে ফ্রান্সের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। এজন্যে ভার্সাই সন্ধির ২৩১ ধারায় জার্মানীকে যুদ্ধ অপরাধী সাব্যস্ত করে জার্মানীর সামরিক শক্তি ধ্বংস করার ব্যবস্থা করা হয়। জার্মানীর স্থল, জল ও বিমান বাহিনীকে বিলুপ্ত করার ব্যবস্থা করা হয়। জার্মান সেনাপতিমণ্ডলীকে বরখাস্ত করা হয়। জার্মানীতে বাধ্যতামুলক সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে সেনাদলে যােগদান ব্যবস্থা লােপ করা হয়।

হেলিগােল্যিাণ্ডের নৌঘাটি বিলুপ্ত করা হয়। ভবিষ্যতে জার্মানীকে সমরাস্ত্র নির্মাণ করতে নিষেধ করা হয়। জার্মান যুদ্ধ জাহাজগুলিকে ইংলন্ডের হাতে তুলে দিতে বলা হয়। জার্মানী কেবলমাত্র ৬টি ছােট যুদ্ধ জাহাজ, ৩টি ছােট ক্রুজার, ৪টি ডেস্ট্রয়ার ও ১২টি সাবমেরিন রাখার অধিকার পায়। রাইন নদীর পশ্চিম তীরের ত্রিশ মাইলের মধ্যে সকল জার্মান দূর্গ ও সামরিক ঘাটি ভেঙে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়। এই সামরিক শর্তগুলি কার্যকরী করার জন্যে জার্মানীতে মিত্রপক্ষের সেনাদল মােতায়েন রাখা হয় এবং একটি কমিশন নিয়ােগ করা হয়।

আইনানুগ শর্ত : জার্মান সম্রাট কাইজার ও তার সেনাপতিদের যুদ্ধ অপরাধী সাব্যস্ত করে তাদের বিচার করার জন্যে আদেশ দেওয়া হয়। ভাসাই সন্ধির প্রথম পরিচ্ছেদে বলা হয় যে, শান্তিপূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক বিরােধ নিষ্পত্তি এবং বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্যে জাতিসংঘ স্থাপন করা হবে। এজন্যে একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করা হবে। এছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর কল্যাণের জন্যে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন স্থাপন করা হবে।

ভার্সাই চুক্তির প্রভাব ও ফলাফল : জার্মান জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা ভার্সাই সন্ধিকে একটি জবরদস্তি সন্ধি (Dictated Peace) বলে অভিহিত করেন। শান্তি সম্মেলনে যােগদানকারী জার্মান প্রতিনিধিদের সন্ধির শর্ত আলােচনার অধিকার না দিয়ে এবং সন্ধির শর্ত সম্পর্কে জার্মান প্রতিনিধিদলের প্রতিবাদকে অগ্রাহ্য করে এই সন্ধি জার্মানীর ওপর একতরফাভাবে চাপন হয়। পরাজিত শক্তির প্রতি ন্যায় ও সুবিচার প্রদর্শন করে তার কৃতজ্ঞতা অর্জনের জন্যে কোন চেষ্টা বিজেতারা ভার্সাই বৈঠকে করেনি।

ইংলন্ডের প্রধান মন্ত্রী লয়েড জর্জ জার্মানীকে শাসিয়ে বলেন যে, যদি জার্মানী ভার্সাই শহরে সন্ধি স্বাক্ষর করতে রাজী না হয় তবে তাকে বার্লিনে বসে এই সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হবে। এই কারণে জার্মানী জাতীয়তাবাদীরা ভার্সাই সন্ধিকে ঘৃণা করে। এই সন্ধিকে তারা একতরফা সন্ধি, ম্যাকিয়াভেলীয় সন্ধি বিশেষণে অভিহিত করে। পরবর্তীকালে জার্মানীর নাৎসীদল ভার্সাই সন্ধিকে একতরফা সন্ধি বলে এমন তুমুল সমালােচনা চালায় যে, জার্মান জনমত তাতে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। পরাজিত জার্মানীকে সন্ধি আলােচনার সুযােগ না দিয়ে একতরফাভাবে সন্ধি চাপানাের ফলে এই সন্ধির নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।

ইওরোপের ক্ষুদ্র, বৃহৎ সকল শক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় আত্বনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা হয়। এক জাতি, এক রাষ্ট্র নীতিই ছিল ভার্সাই শান্তি চুক্তির মূলসূত্র। কিন্তু জার্মানীকে এই জাতীয় আত্বনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে ভার্সাই সন্ধির দ্বারা বঞ্চিত করা হয়। সার অঞ্চলের প্রতি অবিচার জার্মান অধিবাসীদের ফ্রান্সের অধীনে রাখা হয়। স্লেজভিগের জার্মানরা ডেনমার্কের অধীনে চলে যায়। ইউপেন, ম্যালমেডি ও মরিসনেটের জার্মানির বেলজিয়ামের অধীনে যায়।

পশ্চিম প্রাশিয়ার জার্মান অধিবাসী ও ডানজিগের জার্মানদের পােল্যান্ডের অধীনে, এবং সুদেতেন জেলার জার্মানদের চেকোশ্লোভাকিয়ার অধীনে স্থাপন করা হয়। এভাবে বহু জার্মানকে পিতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য দেশে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়। সর্বোপরি, জার্মান ভাষাভাষী অষ্ট্রিয়াকে জার্মানী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। সেন্ট জার্মেইন সন্ধির ৮০নং ধারায় ও ভার্সাই সন্ধিতে অষ্ট্রিয়াকে জার্মানী থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। এজন্যে জার্মান লেখকদের মতে, ভার্সাই সন্ধি ছিল একটি পক্ষপাতদুষ্ট, একতরফা সন্ধি।

ভার্সাই সন্ধির পশ্চাতে মিত্রশক্তির উদ্দেশ্য ছিল জার্মানীকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে রাখা। জার্মানীর প্রতি ন্যায় বিচার করা অপেক্ষা জার্মানীকে দুর্বল করে রাখার লক্ষ্যটিই গ্রহণ করা হয়। এই কারণে জার্মানীর কয়লা, লােহা প্রভৃতি খনিজ সম্পদ অধিগ্রহণ করে জার্মানীকে ক্ষমতাহীন করা হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিধ্বস্ত জার্মান জাতি, ভার্সাই সন্ধিকে অন্যায় মনে করে, এজন্যে তারা শীঘ্রই এই সন্ধি ভেঙে ফেলে। রাইকার নামক ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, হংসীকে খাদ্য না দিয়ে তার নিকট স্বর্ণডিম্ব প্রত্যাশা করা যেমন অবাস্তব, জার্মানির কয়লা, লােহা প্রভৃতি সম্পদ অধিগ্রহণ করে জার্মানীকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য করা ছিল অবাস্তব।

জার্মানদের একাংশকে পিতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্যদেশে সংখ্যালঘুতে পরিণত করার ফলে শীঘ্রই আন্তর্জাতিক গােলমাল দেখা দেয়। জার্মানী তার নাগরিকদের প্রতিবেশী অজার্মান রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হয়ে থাকতে দিতে রাজী ছিল না। এজন্যে জার্মানী থেকে বিচ্ছিন্ন জার্মানদের জার্মান ভূমিতে ফিরিয়ে দিতে দাবী জানায়। জার্মান সংখ্যালঘুরা পিতৃভূমিতে ফিরে আসার জন্যে দারুণ গােলযােগ সৃষ্টি করে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ ভার্সাই সন্ধিতে অঙ্কুরিত হয়।

Advertisement
প্যারিসের শান্তি বৈঠকে জার্মানীকে শান্তি চুক্তি আলােচনার সুযােগ দিলে, পরবর্তী সময়ে এই সন্ধিকে জার্মানী একতরফা সন্ধি বলতে পারত না। প্যারিসের শান্তি বৈঠকে সােভিয়েত রাশিয়াকে আমন্ত্রণ না করা বড় ভুল হয়েছিল। সােভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে কোন আলোচনা না করে রুশ পােলিশ, রুশ চেক ও রুশ বাল্টিক সীমান্ত স্থির করায়, রাশিয়াও ভার্সাই চুক্তির বিরোধিতা করে। ১৯৩৯ খ্রীঃ রুশ জার্মান সহযােগিতায ভার্সাই চুক্তি ভেঙে ফেলা হয়। ভার্সাই সন্ধির ফলে ইওরােপে শক্তি শূন্যতা দেখা দেয়। একদিকে জার্মানীকে ছাটাই করে দুর্বল করে ফেলা হয়। অপর দিকে হ্যাপসবার্গ ও জারের সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলা হয়। এই রাজ্যগুলি ভেঙে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি গড়া হয়, সেগুলি আত্বরক্ষায় অক্ষম ছিল। পরে নাৎসী দলের নেতৃত্বে জার্মানী এই সকল রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন চালালে, শক্তিসাম্য না থাকায়, এই ক্ষুদ্র রাজ্যগুলিকে রক্ষা করা যায়নি।

প্যারিসের শান্তি বৈঠকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলিকে আহ্বান করা হয়নি। নিরপেক্ষ দেশগুলি যােগদান না করায় শান্তি চুক্তিগুলি পক্ষপাতহীন, ন্যায্য চরিত্র পায়নি। বিজয়ীরা তাদের পরিকল্পিত সন্ধি ইচ্ছামত বিজিতের উপর চাপাতে পারে। নিরপেক্ষ দেশ হাজির থাকলে তাদের চাপে বিজয়ী দেশগুলি নমনীয় শর্তে সন্ধি করতে বাধ্য হত। তাহলে সন্ধি বেশী স্থায়ী হত। ভার্সাই সন্ধির দ্বারা হওবােপে সংখ্যালঘু সমস্যা সৃষ্টি করা হয়। এক জাতি এক রাষ্ট্র নীতি নিয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির কথা ভেবেই তাদের স্বার্থে নতুন রাষ্ট্রগুলি গঠিত হয়। কিন্তু প্রতি নতুন দেশে অন্য জাতির বহু সংখ্যালঘু অধিবাসী থেকে যায়। তাদের কথা সন্ধিতে গণ্য করা হয়নি। এজন্য পরে সংখ্যালঘু সমস্যার চাপে সন্ধি ভেঙে পড়ে।

ভার্সাই সন্ধি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন মন্তব্য করেছেন যে, এই সন্ধিটি ছিল ভুল জায়গায় নিদারুণ কঠিন এবং ভুল স্থানে উদারপন্থী। সন্ধি রচনার সময় মিত্রশক্তি অহেতুক কঠোরতা দেখান এবং সন্ধি রক্ষার সময় অনাবশ্যক দুর্বলতা বা উদারতা দেখান। যদি জার্মানীর ওপর ন্যায্য আচরণ ও শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি স্থাপন করা হত তবে জার্মানী এই সন্ধি মানতে নৈতিক বাধ্যবাধকতা স্বীকার করত। এই সন্ধি ২০ বছরের মধ্যে এত সহজে ভেঙে পড়ত না।

ভার্সাই চুক্তির সপক্ষে যুক্তি : ভার্সাই সন্ধির সমর্থনে গ্যাথাের্ন হার্ডি (Short History of International Affairs) প্রভৃতি ঐতিহাসিকেরা কিছু কিছু যুক্তি দেখান। তারা বলেন যে, ইতিহাসে দেখা যায় প্রতি যুদ্ধের পর বিজয়ী শক্তি বিজিতের ওপর সন্ধি চাপিয়ে দেয়। সেই অর্থে প্রতি যুদ্ধের পর যে সকল সন্ধি রচিত হয় সেগুলি হল চাপিয়ে দেওয়া জবরদস্তি সন্ধি। ভার্সাই সন্ধিও একই নিয়মে রচিত হয়। সােভিয়েত রাশিয়ার ওপর জার্মানী নিজেই ১৯১৭ খ্রীঃ ব্রেস্টলিটভস্কের সন্ধি চাপিয়ে দেয়। সুতরাং ভার্সাই সন্ধি একতরফা সন্ধি হলে জার্মানীর আপত্তি করা অন্যায়।

চতুর্দশ দফায় ক্ষতিপূরণের উল্লেখ না থাকলেও, ল্যান্সিং নােট (Lanshing Note) দ্বারা (৮ই ডিসেম্বর, ১৯১৮ খ্রীঃ) মার্কিন বিদেশমন্ত্রী জার্মানীকে জানান যে, জার্মানীকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। জার্মানী যদি যুদ্ধে জয়লাভ করত তবে জার্মানী মিত্রশক্তির ওপর কম কঠোর সন্ধি স্থাপন করত না। ভার্সাই সন্ধির দ্বারা যদি জার্মানীর অস্ত্র নির্মাণ বন্ধ করা হয় তার কারণ ছিল যে জার্মানীর আগ্রাসনের ফলেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটছিল। ভার্সাই সন্ধির স্বপক্ষে বলা হয় যে, যেক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানীকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানীর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌমিক অখন্ডতা রক্ষা করা হয়।
Advertisement