PayPal

উনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার

author photo
- Sunday, August 04, 2019

উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলন

উনবিংশ শতকে ভারতীয় সমাজ ছিল জরাজীর্ণ ও কুসংস্কারে পূর্ণ। এই কুসংস্কারগুলিকে ধর্মীয় ও সামাজিক দুইভাগে ভাগ করা যায়। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে এদেশের যুবমানসে যুক্তিবাদী প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। এর ফলেই শুরু হয় সমাজ সংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলনের পুরােধা ছিলেন রাজা রামমােহন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডিরােজিও ও বিদ্যাসাগর প্রমুখ।
উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কার
উনবিংশ শতকে হিন্দুসমাজে প্রধান সমস্যা ছিল দুটি - (১) নারীজাতির দুর্দশা, এবং (২) নিম্নবর্ণের হিন্দুদের প্রতি নির্যাতনমূলক আচরণ বা জাতিভেদ প্রথা। শিক্ষার আলোক থেকে নারীর ছিলেন বঞ্চিত। জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

বিভিন্ন কুপ্রথায় জাতী ছিল জর্জরিত। যেমন সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিবাহ, কৌলীন্য প্রথা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, জাতিভেদ প্রথার কঠোর পুরােহিততন্ত্র ইত্যাদি। অস্পৃশ্যতা, বিভিন্ন ধর্মীয় কুসংস্কার যেমন — পশুবলি, আচারসর্বস্ব পূজাপার্বত্র পুরােহিততন্ত্র ইত্যাদি।

রামমােহনের ভূমিকা : ভারত পথিক রাজা রামমােহন ধর্মীয় সংস্কার প্রবর্তনের জন্য ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন আত্বীয় সভা ও ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজ, রামমােহনের ব্রাহ্মসমাজ ধর্মান্দোলনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করে। তিনি পৌত্তলিকতা, বহু ঈশ্বরবাদ, লােকাচারের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।

ধর্মীয় সংস্কার ছাড়াও তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিংক সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করেন। তার চেষ্টায় বেন্টিংক গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন ও শিশুকন্যা হত্যা নিষিদ্ধ করেন। তিনি বহুবিবাহ ও কৌলীন্য প্রথার নিন নিন্দা করেন ও বিধবা বিবাহ সমর্থন করেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা : দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববােধিনী সভা প্রতিষ্ঠা ও তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা প্রকাশ করে ব্রাহ্ম আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নারীশিক্ষার বিস্তার, বিধবা-বিবাহের পক্ষে ও বাল্যবিবাহের পক্ষে জোর প্রচারকার্য চালান।

ডিরােজিও ভূমিকা : নবজাগরণের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ডিরােজিও তাঁর ইয়ং বেঙ্গল গােষ্ঠীর সাহায্যে প্রচলিত রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কারের রুিদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু করেন। অ্যাকাডেমি অ্যাসােশিয়েসন প্রতিষ্ঠা ও পার্থেনন পত্রিকা প্রকাশ করে তার প্রখর যুক্তিবাদের আদর্শ প্রচার করেন। ইংরেজ বিরােধিতার প্রথম স্ফুরণ ইয়ং বেঙ্গল গােষ্ঠীর মধ্যে গড়ে ওঠে।

বিদ্যাসাগরের ভূমিকা : উনিশ শতকের এক শ্রেষ্ঠ মনীষী পুরুষসিংহ বিদ্যাসাগর তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় যাবতীয় সংস্কার থেকে ভারতীয় সমাজকে পরিত্রাণ করতে এগিয়ে আসেন। নারীমুক্তিই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য। স্ত্রী শিক্ষার বিস্তারের উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিদর্শক রুপে বাংলার জেলাগুলিতে ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তােলেন। বেথুন সাহেব তাঁকে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন। বিদ্যাসাগর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্রের সঙ্গে বিধবা ভবসুন্দরীর বিবাহ দেন। তাঁর চেষ্টাতেই ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসি বিধবা বিবাহ আইন পাশ করেন। তিনি বাল্যবিবাহের ঘাের নিন্দা করেন।

মূল্যায়ন : এইভাবে সমাজ সংস্কারকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার অচলায়তন ভেঙে যায়। দেশে যুক্তিবাদ, মানবতা, বাস্তবতাবাদের আদর্শে উন্নত ও আধুনিক সমাজ গড়ে ওঠে। পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণের উন্নত মানসিকতা গড়ে ওঠে।

No comments:

Post a Comment