নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ

- August 02, 2019
সুভাষচন্দ্র বসু কটকে জানকীনাথ বসুর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষা কটকে র্যাভেনশ কলিজিয়েট স্কুলে এবং পরে কলিকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে ও স্কটিশ চার্চ কলেজে হয়। তিনি দর্শন শাস্ত্রে বি. এ. অনার্স ডিগ্রী নিয়ে কেমব্রিজে পড়তে যান। তিনি আই. এস. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকুরীতে যােগদানের জন্যে মনােনীত হন। ভারতে আসার পর তিনি চাকুরী ত্যাগ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের শিষ্যত্ব নেন এবং ১৯২১ সালে গান্ধীজির অসহযােগ আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। অসহযােগ আন্দোলনের সময় তিনি কারারুদ্ধ হন। গান্ধীজি চৌরীচেরার ঘটনা উপলক্ষে অসহযােগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে তিনি গান্ধীজির সিদ্ধান্তকে "দুর্ভাগ্যজনক" বলে অভিহিত করেন।
Subhash Chandra Azad Hind Fauj
স্বরাজ্য দল ও কর্পোরশনের যোগদান : অসহযােগ আন্দোলনের পর চিত্তরঞ্জন ও মােতিলালের নেতৃত্বে স্বরাজ্য দল গঠিত হয়। সুভাষ চন্দ্র স্বরাজ্য দলে যােগ দেন। কলিকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে ও বাংলার আইনসভার নির্বাচনে স্বরাজ্য দল অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। বাংলার মুসলিম নেতাদের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন বেঙ্গল প্যাক্ট সম্পাদন করে তাদের সহায়তা পান। কলিকাতা কর্পোরেশনের প্রধান প্রশাসক বা Executive Officer রূপে সুভাষচন্দ্র মহানগরীর উন্নয়ন, আবর্জনা পরিষ্কার, জল সরবরাহ প্রভৃতি কাজে এত দক্ষতা দেখান যে, শীগ্রই উদ্যমী কর্মী হিসেবে তিনি নাম পেয়ে যান। ইতিমধ্যে ১৯২৫ খ্রীঃ চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু হয়। তার আগেই ১৯২৪ খ্রীঃ অক্টোবর মাসে ৮০ জন দেশকর্মী সহ সুভাষচন্দ্রকে সরকার সন্ত্রাসবাদীদের সহায়তার অভিযােগে বিনা বিচারে বন্দী করেন। কিন্তু তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যতীন্দ্রমোহনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিণত হয়।

যুব আন্দোলন ও সুভাষচন্দ্র : সুভাষচন্দ্র এই সময় ছাত্র ও যুব সংগঠন দ্বারা যুবশক্তিকে জাগিয়ে তােলেন। এই সময় তার প্রদত্ত বক্তৃতাগুলি ও তার মতবাদ “তরুণের স্বপ্ন" গ্রন্থে পাওয়া যায়। এছাড়া “ইণ্ডিয়ান স্ট্রাগল" (Indian Struggle) গ্রন্থেও গঠন ও তার রাজনৈতিক চিন্তাধারার ছাপ পাওয়া যায় । সুভাষচন্দ্র কলকাতা কংগ্রেসে ১৯২৮ সালে জওহরলাল নেহেরুর সহযোগিতায় কংগ্রেসে পূর্ণ স্বরাজের দাবী তােলেন এবং ইণ্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ গঠন করেন। অবশেষে ১৯২৯ খ্রীঃ লাহাের কংগ্রেসে পূর্ণ স্বৰাজ দাবী গৃহীত হয়। লাহাের কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করার জন্যে ও যুব গােষ্ঠীকে হাতে রাখার জন্যে গান্ধীজি জওহরলালকে সভাপতির পদে বরণ করেন। সুভাষচন্দ্র তার কাছে এই সময় স্বীকৃতি পাননি। আইন অমান্য আন্দোলনের সময় সুভাষচন্দ্র কারাবরণ করেন। স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারায় ও আদর্শে গভীর প্রভাবিত হন সুভাষচন্দ্র।

হরিপুরা ও ত্রিপুরা কংগ্রেস : লন্ডনের অধ্যাপক হ্যারল্ড ল্যাস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর তিনি বামপন্থী চিন্তাধারার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরি কংগ্রেসে তিনি পট্টভি সিতারামাইয়াকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বার সভাপতি পদে নির্বাচিত হলেও গান্ধিজির প্ররােচনায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে সুভাষকে চরম অসহযােগিতা করা হলে তিনি সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সুভাষ ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করে কংগ্রেসের পতাকার নীচে কাজ করতে চাইলে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির দক্ষিণ-পন্থী সদস্যরা তাকে দল গঠনের অভিযােগে বহিস্কার করে।

সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান : কংগ্রেস থেকে বহিস্কৃত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ফরওয়ার্ড ব্লক দল গঠন করেন। তিনি কলকাতায় যুবসমাজকে নিয়ে হল ওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন করেন। এর ফলে ১৯৪০ সালে ভারত রক্ষা আইনে সুভাষচন্দ্র বসুকে বন্দী করে। সুভাষ তার মুক্তির জন্য আমরণ অনশন শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত গভর্নর তাকে মুক্তি দিয়ে নিজগৃহে নজরবন্দি রাখেন। কিন্তু সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ খ্রীঃ ১৫ই জানুয়ারি ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে ভারত ত্যাগ করেন। এই ঘটনাকে শিশিরকুমার বসু মহানিষ্ক্রমণ বলেছেন। তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে কাবুলের পথে ভারত ছেড়ে যান। সুভাষচন্দ্র অরল্যান্ডো মাৎসােটা ছদ্মনামে কাবুল হয়ে মস্কো পৌছান এবং সেখান থেকে তিনি ১৯৪১ খ্রীঃ ১লা এপ্রিল বার্লিনে আসেন।

বার্লিনে সুভাষচন্দ্র বসু : বার্লিনে সুভাষচন্দ্র আফ্রিকার যুদ্ধে ভারতীয় বন্দী সেনাদের নিয়ে ইন্ডিয়ান লিজন (Indian Legion) গড়ে তোলেন। তিনি বার্লিনে ফ্রি ইণ্ডিয়া সেন্টার ও বেতার প্রচারকেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি ফ্রি ইণ্ডিয়া সেন্টার থেকে বেতার ভাষণে ভারতীয়দের ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে বলেন, “To arms, To arms, My Country men”। কিন্তু জার্মানীতে থাকার কিছুদিনের মধ্যে সুভাষ বুঝতে পারেন যে, জার্মানীর কাছ থেকে বিশেষ কিছু সাহায্য পাওয়ার আশা নেই। তাই তিনি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুরে চলে আসেন।

আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন : ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জাপানের অভাবনীয় সাফল্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের মনে বিপুল উৎসাহের সঞ্চার করে। দীর্ঘকাল জাপান প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু ও ক্যাপ্টেন মোহন সিং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের সংঘবদ্ধ করায় উদ্যোগী হন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুন ব্যাঙ্ককে প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে বিপ্লবী রাসবিহারী বসু ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪২ সালের মার্চে টোকিওতে এক সম্মেলনে ভারতের জন্য এক জাতীয় সৈন্যবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। জুন মাসে ব্যাঙ্ককে বাসবিহারী বসুর সভাপতিত্বে এক সমাবেশে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভারতীয় এবং যুদ্ধবন্দী ভাৱতীয় সৈন্যদের নিয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার উদ্দেশ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রাসবিহারী বসু ১৯৪২ সালে ১লা সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেন। নবগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন মােহন সিং। কিন্তু আজাদ হিন্দ বাহিনীর কার্যকলাপ আশানুরূপ হচ্ছিল না। জাপানী কর্তৃপক্ষ এই বাহিনীর অগসরে উৎসাহী ছিল। অন্যদিকে মােহন সিং-এর সঙ্গে জাপানী কর্তৃপক্ষ এবং বাসবিহারী বসুর মনােমালিন্য শুরু হয়। মােহন সিং পদচ্যুত হন।

ইতিমধ্যে ১৯৪২ সালের জুন মাসে ব্যাঙ্কক সম্মেলনেই সুভাষচন্দ্রকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আসার আমন্ত্রণ জানানাে হয় এবং সুভাষচন্দ্র তা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জার্মানী থেকে জাপানে উপস্থিত হওয়া প্রায় দূরূহ ছিল। কিন্তু সুভাষচন্দ্র ও কর্নেল হাবিবুর রহমান এক দুঃসাহসিক সাবমেরিন অভিযানে ১৯৪৩ সালে ১৬ই মে টোকিও আসেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো তাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ২রা জুলাই, ১৯৪৩ তিনি সিঙ্গাপুর পেীছান এবং রাসবিহারী বসু তার হাতে "ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ" ও "আজাদ হিন্দ বাহিনীর" দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং সুভাষচন্দ্র নেতাজী নামে অভিনন্দিত হন।

এরপর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২১শে অক্টোবর নেতাজী সিঙ্গাপুরে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার বা আজাদ হিন্দ সরকারের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বেতারে জাতির পিতার আশির্বাদ চান। তিনি তার বিখ্যাত "দিল্লী চলো" ধ্বনি উচ্চারণ করেন। ভারতীয়দের তিনি বলেন "আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো"। শীঘ্রই জাপান, জার্মানী, ইটালী, বার্মা, থাইল্যান্ড সহ ১৩টি দেশ আজাদ হিন্দ সরকারকে স্বীকৃতি জানায়। আজাদ হিন্দ সরকার ১৯৪৩ সালের ২৬ অক্টোবর ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। ১৯৪৩ সালে নভেম্বরে সুভাষচন্দ্র Greater East Asia Conference এ যােগদান করেন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তােজো ভারতের মুক্তিসংগ্রামে জাপানের সাহায্যদানের কথা ঘােষণা করেন এবং জাপানী সহযােগিতার নিদর্শন হিসাবে আন্দামান (শহিদ দ্বীপ) ও নিকোবর (স্বরাজ দ্বীপ) আজাদ হিন্দ সরকারের হাতে প্রত্যার্পণ করেন। আজাদ হিন্দ সরকার এভাবে প্রথম বিদেশী শাসনমুক্ত ভারতীয় অঞ্চল লাভ করে।

এরপর নেতাজী ভারতের মুক্তি সাধনে চুড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। ১৯৪৩ এর ২৫ শে আগষ্ট নেতাজী আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সৈন্যবাহিনীর উন্নতি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সচেষ্ট নেতাজীর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় শীঘ্রই সৈন্যসংখ্যা ১৩,০০০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে পঞ্চাশ হাজারে পেীছল - ২০,০০০ সৈন্য এবং ২৩,০০০ স্বেচ্ছাসেবক। নারী সৈনিকদের জন্য ঝাঁসির রাণী নামে একটি ব্রিগেড গঠিত হল। অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের আয়ের একটি অংশ অনুদান দিতে আহ্বান জানালেন।

১৯৪৪ এর জানুয়ারীতে আজাদ হিন্দ বাহিনীর প্রধান কেন্দ্র রেঙ্গুনে স্থানান্তরিত হয়। কারণ ব্রহ্মদেশকে ভিত্তি করেই ভারত অভিযান অধিকতর সফল হবার সম্ভাবনা ছিল। সুভাষচন্দ্র সম্মিলিত (জাপানী ও আজাদ হিন্দ বাহিনী) বাহিনীর চট্টগ্রাম আক্রমণের পক্ষপাতী হলেও জাপান সম্মিলিত মার্কিন ব্রিটিশ নৌ ও বিমান আক্রমণের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম আক্রমণের পক্ষপাতী ছিল না। সুভাষচন্দ্র জাপানী বাহিনীর সহায়ক হিসাবে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে ব্যবহারের ঘােরতর বিরোধী ছিলেন। এ বিষয়ে সুভাষ চন্দ্র ও জাপানী সেনাধ্যক্ষ কাওয়ারের মধ্যে আলােচনায় স্থির হয় যে - আজাদ হিন্দ বাহিনী জাপানী বাহিনীর সমমর্যাদা সম্পন্ন হবে। আজাদ হিন্দ বাহিনী তাদের নিজস্ব সামরিক আইন দ্বারা পরিচালিত হবে এবং ভারতের যে সব অঞ্চল মুক্ত হবে তার দায়িত্ব আজাদ হিন্দ ফৌজের হাতে ন্যস্ত থাকবে।

আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান : জাপানী সেনাপতি মুতাগুচি মণিপুর আক্রমণের উদ্যোগ নিলে আজাদ হিন্দ বাহিনী তার সঙ্গে যুক্ত হয়। শাহনওয়াজ খাঁ-এর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর একটি দল ভারতে ও অন্য দলটি আরাকান ও চীনা পাহাড়ের মধ্য দিয়ে ভারত অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। আজাদ হিন্দ সেনারা পলেতোয়া ও দলেথসা দখল করে নেন, যেখান থেকে ভারত সীমান্ত মাত্র ৪৮ কিমি। অতর্কিত আক্রমণে আজাদ হিন্দ সেনারা ভারত সীমান্তের ভিতরে ডিমাপুর দখল করে সেখানে ভারতীয় জাতীয় পতাকা তুলে ধরে। ১৯৪৪ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে ভারত অভিযান শুরু হল এবং মার্চের শেষে ইম্ফল অধিকৃত হল। এপ্রিলের ৮ তারিখে কোহিমা অবরুদ্ধ করে। ১৯৪৪ সালের মে মাস নাগাদ আজাদ হিন্দ বাহিনী যখন কোহিমায় উপস্থিত হয় তখন জাপানের সামরিক অবস্থা শােচনীয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন চাপ বাড়ায় জাপান ব্রহ্মা সীমান্ত থেকে বিমানবাহিনী সরিয়ে ফেলেছিল।

এই পরিস্থিতিতে ইম্ফল রণাঙ্গনে ব্রিটিশরা ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল। বর্ষা শুরু হওয়ায় খাদ্য ও রসদ সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এরকম প্রতিকুল পরিবেশেও আজাদ হিন্দ বাহিনী বীর বিক্রমে কোহিমা দখলে রাখতে প্রয়াসী হয়। শেষ পর্যন্ত জুন মাসে আজাদ হিন্দ বাহিনী রণাঙ্গন থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। ৫ই জুলাই ভারত অভিযানের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। ইক্ষল রণাঙ্গনে আজাদ হিন্দ ও জাপানী বাহিনীর ব্যর্থতার জন্য সামরিক সাহায্য ও রসদের অপ্রতুলতা, নিন্মমানের সামরিক কৌশল এবং সর্বোপরি যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিবর্তন যা ক্রমশ অক্ষবাহিনীর প্রতিকুল হয়ে পড়ছিল তা দায়ী ছিল। এই পরাজয় ও ব্যর্থতা নেতাজীকে নিরুৎসাহ করতে পারেনি। ১৯৪৪ সালের ১৪ই আগষ্ট একটি ঘােষণায় তিনি জানান যে ‘যুদ্ধ স্থগিত হয়েছে, উপযুক্ত সময়ে পুনরায় আক্রমণ শুরু হবে'। এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ জাপানের আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছিল। মে মাসে ব্রিটিশরা রেঙ্গুন পুনর্দখল করেছিল। বাধ্য হয়ে আজাদ হিন্দ সদর দফতর ব্যাঙ্ককে স্থানান্তরিত করা হয়।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মৃত্যু : ১৯৪৫ সালের ১০ই আগস্ট রাশিয়া জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। ১৯৪৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাপান আত্মসমর্পন করে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকা নিরাপদ হবে না মনে করে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু একটি জাপানী সামরিক বিমানে সায়গন থেকে টোকিও অভিমুখে যাত্রা করেন। ১৯৪৫ সালের ১৮ই আগস্ট তাইওয়ানের তাইহােকু বিমানবন্দরে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে এবং কথিত আছে যে এই দুর্ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে সুভাষচন্দ্র শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৫৫-৫৬ সালে গঠিত শাহনওয়াজ কমিটি পরে খােসলা কমিটি ও বর্তমানে মুখার্জি কমিশন নেতাজির মৃত্যুরহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। মুখার্জি কমিশন ফৈজাবাদে প্রাপ্ত গুমনামি বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও নেতাজির বংশধরদের রক্তের ডি. এন. এ পরীক্ষা করেছে। আশা করা যায় এই রহস্যের উদঘাটন হবে।

আজাদ হিন্দ বাহিনীর গুরুত্ব : (১) আজাদ হিন্দ বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম প্রমাণ করেছিল যে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধুমাত্র গান্ধিজি নির্দেশিত অহিংস আন্দোলনের পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, সশস্ত্র সংগ্রামের এক গৌরবােজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। বস্তুতপক্ষে নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনীর সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল জাতীয় বিপ্লববাদী ধারার সর্বোচ্চ পরিণতি।
(২) ব্রিটিশ সরকার বন্দি আজাদ হিন্দ সেনাদলের কয়েকজন সেনাপতির দিল্লির লালকেল্লায় বিচার করবার আয়ােজন করেন। কিন্তু এতে ভারতীয় জনমত অত্যন্ত বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। কংগ্রেস নেতাগণ অভিযুক্ত সেনাপতিগণের পক্ষ নেন। জনমতের চাপে ইংরেজ সরকার অভিযুক্ত সেনাপতিগণকে মুক্তি দেন। নেতাজির শৌর্য ও আত্মত্যাগ এবং আজাদ হিন্দ বাহিনীর আত্মােৎসর্গ ভারতবাসীর মনে নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করে। লালকেল্লায় বিচারের সময় যে গণজাগরণ হয় তাও ইংরেজ সরকারকে সন্ত্রস্ত করে। নেতাজির দিল্লি চলাে অভিযানে ইংরেজ রাজের মর্যাদা বিনষ্ট হয়। ভারতীয়গণ ইচ্ছা করলে ইংরেজের সমান হতে পারে এবং ইংরেজকে হারিয়ে দিতে পারে একথা স্পষ্ট হয়ে যায়।
(৩) আজাদ হিন্দ বাহিনীর অমর কীর্তিকথা ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বিরােধী মনােভাব গড়ে তুলেছিল। শীঘ্রই এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ভারতীয় নাবিকেরা ও বিমান সেনা বিদ্রোহের পথে ধাবিত হয়।
(৪) সেনাবাহিনীর আনুগত্যের উপর ব্রিটিশ শাসন একদিন নির্ভরশীল ছিল। সেই প্রধানতম ভিত্তি এখন নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
(৫) আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠন নেতাজির সাংগঠনিক প্রতিভা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের পরিচায়ক ছিল। জাতিধর্মনির্বিশেষে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী ভারতীয়গণ আজাদ হিন্দ ফৌজ ও সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়।
(৬) সাম্প্রদায়িকতার কলুষমুক্ত এই গৌরবময় প্রচেষ্টা অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তরূপে প্রতিভাত হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশ শাসনের অবসানকল্পে জাপান ও জার্মানির মতাে একনায়কতন্ত্রী সমরবাদ শক্তিগুলির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন বলে অনেকে বিরূপ সমালােচনা করেছেন। কিন্তু একথা আজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে সুভাষচন্দ্র ফ্যাসিবাদ আদর্শের সমর্থক ছিলেন না, এমনকি ফ্যাসিবাদের প্রতি তার গভীর ঘৃণার কথা তিনি গােপন রাখেননি। সুভাষচন্দ্রের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান ছিল ভারতের মুক্তি অর্জন।

আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্যর্থতা : আজাদ হিন্দ ফৌজের ব্যর্থতা সামরিক কারণে হয়েছিল ছিল। ১৯৪৪ সালে ব্ৰহ্মদেশ থেকে ভারত অভিযান সময়োপযােগী ছিল না। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রণাঙ্গনে ব্রিটিশ-মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাঘাত শুরু করেছিল। মিত্রশক্তির অপর্যাপ্ত সামরিক ও আর্থিক শক্তির তুলনায় ব্রহ্ম রণাঙ্গনে জাপানের শক্তি ও সামর্থ ছিল প্রয়ােজনের তুলনায় অপ্রতুল। আরও দু বছর আগে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ বাহিনী যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিপর্যস্ত, ভারতের অভ্যন্তরেও যখন ভারত ছাড় আন্দোলন চলছিল, সে সময় ভারত অভিযানের কর্মসূচী গৃহীত হলে ব্রিটিশদের পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রবল হত। আসলে নেতাজী ১৯৪৩ সালে যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পদার্পণ করলেন তখন থেকেই যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হতে শুরু হয়েছে। তাই ভারত অভিযানের ক্ষেত্রে নেতাজীর কর্মসূচী ও রণকৌশল ত্রুটিপূর্ণ ছিল।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ভারত ইতিহাস পরিক্রমা
2. শেখর বন্দোপাধ্যায় - পলাশী থেকে পার্টিশন
3. প্রণব চট্টোপাধ্যায় - Modern India
4. সুমিত সরকার - Modern India
5. তারাচাঁদ - History of the Freedom Movement in India - Vol-IV.