ইউরোপে পুঁজিবাদের প্রসার

- August 19, 2019
ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সূত্র ধরে ধনতন্ত্রের বা পুঁজিবাদের (ইংরেজি : Capitalism) উৎপত্তি ও প্রসার ঘটলেও তা পরবর্তীকালে ফ্রান্স, জার্মানী, রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। শিল্পায়ন শুধু ইউরােপেই নয়, অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল। উনিশ শতকের শেষ তিন দশকে পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রবাদ দ্রুত প্রসারলাভ করেছিল। এই সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়ায় জাপান, এমন কি চীন, গনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা মাধ্যমে শিল্পন্নয়নের পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল।
Capitalism of Europe
ইংল্যান্ড : ইংল্যান্ডে প্রথমে ধনতন্ত্রবাদের বিকাশের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। শিল্পায়নের বিকাশের সঙ্গে যে ধনতন্ত্রবাদের সম্পর্ক সেই শিল্পায়নের কিছু আবশ্যিক শর্তের উপস্থিতি ইংল্যাণ্ডে প্রথম দেখা দিয়েছিল, যা অন্যত্র দেখা যায়নি। অষ্টাদশ শতকের প্রথম থেকেই ইংল্যাণ্ড আর্থিক দিক দিয়ে স্বচ্ছল হতে শুরু করে। রপ্তানী, দাস ব্যবসা, ঔপনিবেশিক জমির আবাদ, ব্যক্তিগত পুঁজির পরিমাণ বৃদ্ধি, মালবহনের মাশুল প্রভৃতির ফলে ইংল্যান্ড অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আর্থিক দিক দিয়ে এক অভাবনীয় উন্নতি ঘটায়। ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে প্রচুর পরিমাণে বাণিজ্যিক পুঁজি সঞ্চয়ের সঙ্গে শিল্পবিপ্লব ও পুঁজিবাদের উদ্ভবের সম্পর্কটি ওতপ্রােতভাবে জড়িত ছিল। ইংল্যান্ডে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার প্রভূত উন্নতি, নতুন চালিকাশক্তির উৎসের আবিষ্কার ও ব্যবহার, বস্ত্রশিল্পের যান্ত্রিকীকরণ, লােহা ইস্পাতের বহুল ব্যবহার, কারখানাব্যবস্থা ও নতুন উৎপাদন পদ্ধতি, পরিবহন ও যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং আরও নানা ক্ষেত্রে শুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ফলে শিল্পায়ন অভাবনীয়ভাবে দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল।

ইংল্যান্ড উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার একচেটিয়া প্রাধান্য শিল্পের ক্ষেত্রে বজায় রেখেছিল এবং সমগ্র বিশ্বের কারখানায় পরিণত হয়েছিল। এ সময়ে ইংল্যান্ডে পুঁজিবাদের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। পুঁজিপতিশ্রেণী তাদের পুঁজি বিনিয়ােগ করেছিল কলকারখানা নির্মাণে এবং প্রয়ােজনীয় শিল্পদ্রব্যাদির উৎপাদনে। উদ্দেশ্য ছিল, অত্যধিক মুনাফা অর্জন। ইংল্যান্ডের পুঁজিপতিশ্রেণী যন্ত্রে উৎপাদিত উৎকৃষ্ট শিল্পদ্রব্যাদি সস্তা দামে বাজারে বিক্রী করে প্রচুর লাভ করত। কাচামালের অনায়াসলভ্যতা ইংল্যান্ডের শিল্পমালিকদের সুবিধা করে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে এই পুঁজিবাদের প্রসারে পুজিপতিশ্রেণী ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি পাচ্ছিল, কারণ শ্রমিকশ্রেণী পুজিপতিশ্রেণীর শােষণের নানাভাবে শিকার হয়েছিল, এর ফলে পুঁজিপতিশ্রেণী ও শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল এবং তা দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছিল।

জার্মানী : জার্মানীতে উনিশ শতকের শেষার্ধে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে। এর পশ্চাতে জার্মানীর রাজনৈতিক ঐক্য, ফ্রান্সের কাছ থেকে ফ্রান্স প্রাশীয় যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ বিরাট অঙ্কের অর্থ আদায় এবং আলসাস লোরেন ফ্রান্সের কাছ থেকে প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়গুলি বড় কারণ ছিল। আলসাস লোরেন লাভ করার ফলে জার্মানীর বস্ত্র শিল্পসহ অন্যান্য নানা শিল্পের উন্নতি ঘটে। লৌহ ও কয়লা শিল্প, রসায়ন ও বিদ্যুৎ শিল্পে জার্মানীতে অভাবনীয় উন্নতি ঘটে। বৈদেশিক বাণিজ্য দ্রুত প্রসারলাভ করে। শিয়ােন্নয়নের জন্য বিসমার্ক শিল্প সংরক্ষণ নীতি অবলম্বন করেন। জার্মানী একটি ধনতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয় এবং কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ম পুঁজিবাদের স্বার্থে সমুদ্রপারে উপনিবেশ বিস্তার এবং নৌবহর গড়ে তােলার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হন।

ফ্রান্স : উনিশ শতকের প্রথমার্ধে নানা কারণে ফ্রান্সের শিল্পায়ন অত্যন্ত মন্থর ছিল বলা চলে। বিপ্লবী ও নেপােলিয়নের সময়ে ক্রমাগত যুদ্ধ বিগ্রহ, কয়লার অভাব, কৃষির উপর অধিক নির্ভরশীলতা এর জন্য দায়ি ছিল। ফ্রান্সে উনিশ শতকের শেষ লগ্নে ধনতন্ত্রবাদ এবং পুঁজিপতিশ্রেণী বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। ফ্রান্স প্রাশীয় যুদ্ধে (১৮৭০-৭১) ফ্রান্সের পরাজয়ের ফলে তার অর্থনীতি সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একদিকে খনিজ সম্পদ ও শিল্পেসমৃদ্ধ আলসাস লােরেন জার্মানীর কাছে পরিত্যাগ এবং অন্যদিকে যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষতিপূরণ বাবদ বিরাট অঙ্কের অর্থ জার্মানীকে প্রদানের ফলে ফ্রান্সের অর্থনীতিতে সাময়িক মন্দা দেখা দেয়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদশকে এবং বিংশ শতকের সুচনায় বৃহৎ পুঁজিপতিদের আবির্ভাবে এবং আধুনিকতম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ফ্রান্স শিল্পের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি ঘটায়। বৃহদায়তন নতুন কলকারখানা ও শিল্প গড়ে উঠতে থাকে। বিশ শতকে ফ্রান্সে কয়লা ও লৌহ ইস্পাত শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, বস্ত্র শিল্প প্রসারলাভ করে। ফ্রান্সের শিল্পায়নের প্রধান ক্ষেত্র ছিল বস্ত্রশিল্প। এইভাবে ফ্রান্সে পুঁজিবাদের বিকাশলাভ করে।

রাশিয়া : ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ভূমিদাসদের মুক্তি থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত সময়কালকে সােভিয়েত ঐতিহাসিকেরা রুশ ইতিহাসের পুঁজিবাদী যুগ বলে অভিহিত করেছেন। এই পর্ববিভাগ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডাবের মহাসংস্কারসমূহকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট বিভাজনবে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। মহাসংস্কারের ফলে একদিকে যেমন ভূস্বামী শ্রেণীর ক্রমিক অবক্ষয় শুরু হয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে শিল্পপতি, বণিক, প্রযুক্তিবিদদের উত্থান ঘটেছিল। ১৮৯০ এর দশকে রুশ শিল্পের অস্বাভাবিক বিকাশ ঘটে। গেরসেনক্রনের হিসাব মতে বেড়ে যাওয়ার গড় ৮ শতাংশ।

রেলপথের দ্রুত সম্প্রসারণ, দেশী ও বিদেশী পুজির ব্যাপক হারে বিনিয়ােগ, বৃহদায়তন শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা ইত্যাদির ফলে শিল্পোন্নয়নের গতিবেগ তীব্র হয়ে উঠেছিল। লৌহ ও কয়লার উৎপাদন অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত রুশ শিল্পায়ন দ্রুতগতিতে অগ্রসর হতে থাকে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকদের মতে, রুশ সরকার তার শিল্পের প্রসারে বিদেশী পুঁজির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন এবং রাশিয়ার সমগ্র শিল্পের বিনিয়ােগের এক তৃতীয়াংশই ছিল বিদেশী পুঁজি। এর ফলে বিপ্লবপূর্ব রাশিয়া আধা ঔপনিবেশিক অবস্থায় পৌঁছেছিল বলে রুশ মার্কসবাদী ঐতিহাসিকগণ অভিমত প্রকাশ করেছেন। ধনতন্ত্রবাদ ও পুঁজিবাদের এই বিকাশের ফলে দুর্দশা নেমে এসেছিল সীমাহীন দারিদ্র্যে নিপীড়িত ও বিক্ষুব্ধ সর্বহারা শ্রমিক ও কৃষক সমাজের উপর।

গ্রন্থপঞ্জি :
1. রাষ্ট্র ও বিপ্লব - লেনিন
2. প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় - আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস
3. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
4. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী - ইউরোপের ইতিহাস
5. নিহারেন্দু বন্দোপাধ্যায় - আধুনিক ইউরোপের সমীক্ষা
Advertisement