PayPal

স্পেনের গৃহযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল

author photo
- Wednesday, August 14, 2019

স্পেনের গৃহযুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্পেনে দক্ষিণপন্থী রাজতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের বিরােধ দেখা দেয়। স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আলফানসাে, প্রিমাে ডি রিভেরা নামে এক মন্ত্রীর সাহায্যে দেশ শাসন করেন। প্রিমাে ডি রিভেরা ১৯২৩-১৯৩০ খ্রীঃ পর্যন্ত একনায়কের ন্যায় শাসনকার্য চালান। ১৯৩০ খ্রীঃ ব্যাপক গণ আন্দোলন ও সেনা বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়ে প্রিমাে ডি রিভেরা পদত্যাগ করেন। রাজা ত্রয়োদশ আলফানসাে জমিদার শ্রেণী ও সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৯৩১ খ্রীঃ প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীরা নির্বাচনে জয়লাভ করে রাজতন্ত্র ধ্বংস হােক এই দাবী জানালে আলফানসাে পদত্যাগ করেন। ১৯৩১ খ্রীঃ স্পেন একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। স্পেনের এই প্রজাতন্ত্র যে সংবিধান প্রবর্তন করে তাকে “সকল শ্রেণীর শ্রমিকের" প্রজাতন্ত্র নাম দেওয়া হয়। ২৩ বছর বয়স্ক সকল স্প্যানিশ নরনারী ভােটাধিকার পায়। ৪ বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন দ্বারা পার্লামেন্ট গঠনের বিধান দেওয়া হয়। প্রজাতন্ত্রের সভাপতি ৬ বছরের জন্যে নির্বাচিত হন।
1936 The Spanish Civil War begins
১৯৩১-১৯৩৬ খ্রীঃ পর্যন্ত এই নবজাত প্রজাতন্ত্র বহু বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়। দক্ষিণপন্থী রাজতন্ত্রীরা এবং বামপন্থী নৈরাজ্যবাদীরা এই প্রজাতন্ত্রকে ধবংস করবার চেষ্টা চালায়। এই প্রজাতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রপতি জামােরা ও প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল আজানার নেতৃত্বে নানাবিধ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রবর্তন করে। বৃহৎ জমিদারীগুলি বাজেয়াপ্ত করে, বৃহৎ শিল্পগুলিকে রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে শ্রমিক ও কৃষকদের রক্ষার জন্যে আশ্বাস দিয়ে প্রজাতন্ত্রী সরকার সমাজতান্ত্রিক আদর্শ অনুসরণ করে। স্পেনের অন্তর্গত ক্যাটালােনিয়া প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রশমনের জন্যে ক্যাটোলােনিয়াকে স্বায়ত্ব শাসনের অধিকার দান করা হয়। ১৯৩৫ খ্রীঃ সাধারণ নির্বাচনের ফলে পার্লামেন্টে বামপন্থী সমাজতন্ত্রীদের প্রাধান্য বাড়লে, প্রজাতন্ত্রী সরকার কৃষকদের জমির অধিকার দেয় এবং গীর্জা প্রভৃতির জাতীয়করণ করা হয়। স্পেন থেকে জেসুইট ও ফ্যাসিবাদীদের বহিষ্কার করা হয়। যে সকল সরকারি কর্মচারী ফ্যাসিবাদী মনােভাবের অনুরাগী ছিল তাদের নির্বাসিত করা হয়। জেনারেল ফ্রাঙ্কো ক্যানারি দ্বীপে নির্বাসিত হন।

প্রজাতন্ত্রী সরকারের সমাজবাদী নীতিতে অখুসী হয়ে দক্ষিণপন্থীরা এই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘােষণা করে। স্পেনের সামরিক বিভাগে বহু অফিসার ছিল রাজতন্ত্রী। তারা প্রজাতন্ত্রী সরকারের কাজে বিরক্ত হয়। স্পেনের শ্রমিক ও কৃষক যারা প্রজাতন্ত্রের প্রতিদ্বন্দী সরকার গঠন সমর্থনে ভােট দেয় তারাও প্রজাতন্ত্রী সরকারের ধীর গতি সংস্কারে বিরক্ত হয়। প্রজাতন্ত্রের এই জনপ্রিয়তার হ্রাসের সুযােগে এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। স্পেনের উপনিবেশ মরক্কোয় অবস্থিত স্পেনীয় সৈন্যদল পপুলার ফ্রন্ট বা প্রজাতন্ত্রী সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা করে। জেনারেল ফ্রাঙ্কো ক্যানারি দ্বীপ থেকে চলে আসেন এবং এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তিনিও একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার ঘােষণা করেন। ফ্রাঙ্কো সেনাদলসহ মরক্কো থেকে দক্ষিণ স্পেনে চলে আসেন। স্পেনের রাজতন্ত্রী, ফ্যাসিবাদী, অভিজাত প্রভৃতি সকল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ফ্রাঙ্কোর পক্ষ নেয়। ফ্রাঙ্কোর বাহিনীতে পেশাদার সেনা ছিল। তিনি রাজধানী মাদ্রিদের অভিমুখে সেনাদল পরিচালনা করেন। প্রজাতন্ত্রী সরকার অনুগত সেনাদল ও সমর্থক সহ ফ্রাঙ্কোকে বাধা দেয়। প্রজাতন্ত্রী সরকারের পক্ষে ছিল বামপন্থীরা, কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও শ্রমিক সেনা। ইতিমধ্যে জার্মানী ও ইতালী ফ্রাঙ্কো সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। এইভাবে ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ জুলাই স্পেনের গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই যুদ্ধ ৩ বছর স্থায়ী হয়েছিল।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ ক্রমে একটি ক্ষুদ্র বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়। এই গৃহযুদ্ধে বৈদেশিক শক্তিগুলিও জড়িয়ে পড়ে। স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সরকারে কমিউনিষ্টদের আধিপত্য থাকায়, পশ্চিমের বুর্জোয়া দেশগুলি মনে করে যে, স্পেনে কমিউনিষ্ট বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। বিশেষতঃ জার্মানী ও ইতালীর এই ধারণা বদ্ধমূল হয়। স্পেনে সাম্যবাদী বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নির্মূল করার জন্যে ফ্যাসিষ্ট ইতালীতে তৎপরতা দেখা দেয়। ফ্যাসিষ্ট নেতা মুসােলিনীর উদ্দেশ্য ছিল স্পেনে ফ্রাঙ্কোর একনায়কতন্ত্র স্থাপন করে, ইতালীর শত্রু ফ্রান্সকে বেষ্টন করা। তিনি স্প্যানিশ মরক্কোর মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকায় ফরাসী উপনিবেশে অনুপ্রবেশ করার লক্ষ্য নেন। স্পেনের সাহায্যে জিব্রাল্টার অধিকার করে ভূমধ্যসাগরে ইতালীয় আধিপত্য স্থাপন করাও ছিল মুসােলিনীর অন্যতম লক্ষ্য। এই কারণে, ফ্যাসিষ্ট ইতালী ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে স্পেনে সেনাদল ও সমরাস্ত্র পাঠায়।

নাৎসী জার্মানীও ফ্রাঙ্কোর পক্ষ নিয়ে স্পেনে বায়ুসেনা পাঠায়। পর্তুগালও ফ্রাঙ্কোর পক্ষ সমর্থন করে। অপরদিকে সােভিয়েত ইউনিয়ন পপুলার ফ্রন্ট বা বৈধ প্রজাতন্ত্রী সরকারকে সমর্থন জানায়। অনেকের মতে, হিটলার তার নবগঠিত বিমান বহর বা লুফৎভাফের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে চান এবং স্পেনের খনিজ সম্পদ হস্তগত করা। তাছাড়া স্পেনে ডিক্টেটর হিসেবে ফ্রাঙ্কোর জয় হলে ইওরােপে তৃতীয় ডিক্টেটরী শাসন দেখা দিত। এর ফলে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের গণতন্ত্র বেষ্টিত হত। সােভিয়েত সরকার ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে প্রজাতন্ত্রী সরকারকে সাহায্য বিভিন্ন কারণে করেন। কমিউনিষ্ট ঘেঁষা প্রজাতন্ত্র স্পেনে স্থাপিত হলে পশ্চিম ইওরােপে সােভিয়েত প্রভাব বাড়ত। এর ফলে পশ্চিমী গণতন্ত্রের সঙ্গে ফ্যাসিষ্টবাদী সরকারগুলির বিচ্ছেদ দেখা দিত।

এমতাবস্থায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স সকল দেশকে স্পেনের গৃহযুদ্ধে নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্যে অনুরােধ জানায় এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি দ্বারা স্পেনে বৈদেশিক শক্তির হস্তক্ষেপ বিরোধী আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষতা সমিতি গঠন করে এবং ১৯৩৬ এর ৯ সেপ্টেম্বর কমিটির প্রথম অধিবেশন বসে। স্পেনের বিবাদী দুই পক্ষকে কোন বৈদেশিক শক্তির পক্ষ থেকে যুদ্ধের উপকরণ না পাঠাবার প্রস্তাব নেওয়া হয়। কিন্তু ইতালী, জার্মানী ও পর্তুগাল এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য পাঠাতে থাকে। এর ফলে সােভিয়েত সরকারও প্রজাতন্ত্রী সরকারকে সাহায্য পাঠায়। ফ্রাঙ্কোর বাহিনী মাদ্রিদের নিকটবর্তী হলে অক্ষশক্তি ফ্রাঙ্কোর সরকারকে স্বীকৃতি জানায়। এর পর বহু ইতালীয় ও জার্মান সেনা ফ্রাঙ্কোর পক্ষে যুদ্ধ করার জন্যে স্পেনে ঢুকে পড়ে। এদিকে কমিউনিষ্ট ও ফ্যাসিবিরােধী স্বেচ্ছাসেবকেরা স্পেনের প্রজাতন্ত্রী সরকারের সমর্থনে যুদ্ধ করে। বিখ্যাত মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এই যুদ্ধে প্রজাতন্ত্রী সরকারের স্বপক্ষে যুদ্ধ করেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় তার উপন্যাস ফর হম দি বেল টোলস (For whom the Bell Tolls) একটি দ্রপদী সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃত হয়।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ এই প্রকারে একটি ক্ষুদ্র বিশ্বযুদ্ধের আকৃতি নেয়। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে এই যুদ্ধে বহু রাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের বিস্তৃতির ফলে লীগ অব নেশনসের আদর্শ অকার্যকরী প্রতিপন্ন হয়। অক্ষশক্তি আন্তর্জাতিক আইন এবং লীগের আদর্শ অগ্রাহ্য করে স্পেনের গৃহযুদ্ধে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করে। স্পেনে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিষ্ট সরকার জয়লাভ (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ১ লা এপ্রিল) করায় পশ্চিম ইওরােপে ফ্যাসিবাদী প্রভাব বাড়ে। বলা হয় যে, স্পেনের গৃহযুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া।

তথ্যসূত্র :
1. Langsham - World Since 1919.
2. E.H.Carr - International Relations Between Two World War.
3. Robert Boyce - The Origins of World War Two.
4. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা।