দ্বিতীয় ফরাসি প্রজাতন্ত্রের উথান ও পতন

- August 20, 2019
১৮৪৮ খ্রীঃ ফেব্রয়ারি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে অর্লিয়েন্স রাজতন্ত্রের পতন এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। লুই ফিলিপের পতনের পর ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রজাতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দলের যৌথ সহযােগিতায় ফ্রান্সে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ছিল প্রধানতঃ প্যারিসের নাগরিক বিপ্লব। প্যারিসের নাগরিকরাই ছিল এই প্রজাতন্ত্রের সমর্থক। ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের বিশেষ কোন প্রভাব ছিল না। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে প্যারিসের প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হলে এই প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের কোন আত্মিক যােগ ছিল না। এই কারণে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুসারে ফ্রান্সে সর্বসাধারণের ভােটাধিকার স্থাপিত হয়। এই সংবিধান চালু হলে ভােটাধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষকদের হাতে চলে যায়। প্যারিসের অধিবাসীদের ভােট ছিল মােট ভােটদাতাদের ভগ্নাংশ মাত্র। কৃষকদের সমর্থন ছাড়া এই প্রজাতম্বের স্থায়িত্ব রক্ষা করা কষ্টকর ছিল। প্রজাতন্ত্রী দল কৃষকদের সমর্থন লাভের জন্যে গ্রামে প্রচার করেনি। ফরাসী কৃষক সমাজের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হওয়ায় এই প্রজাতন্ত্র স্থায়িত্ব হারায়।
Second French Republic in 1848
প্রজাতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দলের বিরোধ : দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপনের পর প্রজাতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দলের মধ্যে বিরােধ দেখা দেয়। প্রজাতান্ত্রিক দল ছিল নিম্ন বুর্জোয়াদের দ্বারা সমর্থিত। এই দলের নেতা লা-মাটিন সর্বসাধারণের ভােট দ্বারা প্রজাতন্ত্র স্থাপনকেই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য বলে ঘােষণা করেন। "আমি প্রজাতন্ত্রকেই একমাত্র বিপ্লবের লক্ষ্য বলে মনে করি এর বেশী কিছু নয়"। অপর দিকে সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা লুই ব্ল্যঙ্ক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকেই বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে নেন। কর্মহীনের কর্মসংস্থান, জীবিকার অধিকার, শিল্পে মালিক ও শ্রমিকের মিলিত সমবায় স্থাপন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি প্রভৃতি দাবী সমাজতান্ত্রিক দল দাবী করে। বুদ্ধিজীবি ও নিম্ন বুর্জোয়া সমর্থিত প্রজাতান্ত্রিক দল এই দাবীগুলিকে সমর্থন করত না। এই দুই দলে পরস্পর বিরােধী দৃষ্টিভঙ্গীর ফলে জন্মলগ্ন থেকে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র এক সঙ্কটে পড়ে।

প্রজাতন্ত্রের শ্রমিক বিরোধী নীতি : দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হওয়ার পর লুই ব্লঙ্ক ও আলবেয়ার নামে দুই সমাজতান্ত্রিক মন্ত্রী দাবী করেন যে, শ্রম সংস্থানের জন্যে সরকারের একটি স্বতন্ত্র শ্রম দপ্তর গঠন করতে হবে। কিন্তু প্রজাতন্ত্রীরা এই দাবী অগ্রাহ্য করে। সমাজতন্ত্রী দল রক্তবর্ণ পতাকাকে জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণের দাবী জানালে তাও প্রত্যাখ্যাত হয়। এদিকে বেকার শ্রমিকদের আপাততঃ কাজ না দিলে সমাজতন্ত্রীরা গন্ডগোল সৃষ্টি করতে পারে। যাতে শ্রমিক অসন্তোষ আপাততঃ চাপা থাকে এজন্য প্রজাতন্ত্রীরা জাতীয় শ্রম শিবির স্থাপন করে। এই শিবিরে যে সকল শ্রমিক নাম লেখায় তাদের প্রত্যহ ২ ফ্রা হারে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সমাজতন্ত্রীরা আপত্তি জানায় যে, শ্রমিকদের জীবিকার অধিকার দানের পরিবর্তে কর্মসংস্থান শিবিরে মাত্র ২ ফ্রা ভাতা দেওয়ার ফলে এই শিবিরকে ত্রাণ কেন্দ্রে পরিণত কথা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে কর্মহীন শ্রমিকরা বেকার ভাতা ভােগ করে বৃত্তিভােগী ভিক্ষুকে পরিণত হবে। কিন্তু প্রজাতন্ত্রীরা এই প্রতিবাদে কান দেয়নি।

জুন মাসের গৃহযুদ্ধ : ইতিমধ্যে জাতীয় সভা বা ফরাসী পার্লামেন্টের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সমাজতান্ত্রিক দল পরাজিত হয়। ভােটে জয়লাভের পর সংখ্যাগুরু প্রজাতান্ত্রিক দল শ্রমিক কল্যাণমূলক পরিকল্পনাগুলি বন্ধ করে। সমাজতন্ত্রীদের মন্ত্রীসভা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে উৎখাত করা হয়। বেকার শ্রমিকদের জন্যে যে জাতীয় কর্মসংস্থান শিবির খােলা হয় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই শিবিরগুলি বন্ধ হলে বহু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রীদের এই নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিক বিদ্রোহ ঘােষণা করে। বেকার শ্রমিকেরা সমাজতন্ত্রীদের নেতৃত্বে প্যারিসের রাস্তা অবরােধ করে। তারা সরকারি সেনাদের সঙ্গে রক্তাক্ত সংগ্রাম চালায়। প্রজাতন্ত্রের সেনাপতি ক্যাভিগন্যাকের সেনাদল প্রায় ১০ হাজার শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করে এবং ৪ হাজার শ্রমিককে আলজেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠায়। শেষ পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রী জয়লাভ করে। এই গৃহযুদ্ধের নাম ছিল জুন মাসের গৃহযুদ্ধ।

ডেভিড টমসনের মতে, জুনের গৃহযুদ্ধের ফল ছিল শােচনীয় ও সুদূরপ্রসারী। (১) এর ফলে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র সাকুলেং ও দরিদ্র শ্রেণীর সমর্থন হারায়। (২) দরিদ্র জনগণের নিষ্ঠুর রক্তপাত সাধারণ নাগরিকদের মনে প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে ঘৃণা সঞ্চার করে। ভিক্টর হিউগাে মন্তব্য করেন যে, “জুনের রক্তঝরা দিনে বর্বরতার দ্বারা সভ্যতাকে রক্ষা করা হয়, এটা ছিল পরিতাপের বিষয়।” (৩) গৃহযুদ্ধের ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বুর্জোয়া শ্রেণী হতাশ হয়ে পড়ে। তারা প্রজাতন্ত্রের স্থলে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা কামনা করে। (৪) গ্রামীণ কৃষকশ্রেণী এই ধারণা নেয় যে, প্রজাতান্ত্রিক সরকার দেশে শান্তি শৃঙ্খলা স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রজাতন্ত্রী সরকার হয়ত তাদের জমির অধিকার রক্ষা করতে পারবে না। সমাজতন্ত্রীদের চাপে হয়ত শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেবে। এই আকাঙ্ক্ষা কৃষকদের প্রজাতন্ত্রে আস্থাহীন করে। লুই নেপােলিয়নের স্বৈর শাসনের দিকে তারা তাকাতে থাকে।

কর বৃদ্ধি ও ভ্রান্ত সংবিধান : ইতিমধ্যে প্রজাতন্ত্রী দলের দুটি ভ্রান্ত নীতি এই প্রজাতন্ত্রের পতন অনিবার্য করে। গৃহযুদ্ধের ফলে প্রজাতন্ত্রী সরকারের অর্থসঙ্কট দেখা দেয়। এই অর্থসঙ্কট মােচনের জন্যে সরকার কৃষকদের প্রদেয় করের ওপর প্রতি ফ্রা পিছু ৪৫ সেন্টিম পরিমাণ কর বৃদ্ধি করে। এই কর বৃদ্ধির জন্যে কৃষক সমাজ অসন্তুষ্ট হয়। প্রজাতন্ত্রের নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে শাসন বিভাগের সর্বময় ক্ষমতার অধীশ্বর করা হয়।। রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতার ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়নি। মার্কিন দেশের ন্যায় তাকে সরাসরি গণভােটে ৪ বছরের জন্যে নির্বাচনের নিয়ম করা হয়। সংবিধানে তার ওপর আইনসভার নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়নি। রাষ্ট্রপতিকে এরূপ নিরঙ্কুশ, নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতাবানের কুফল অচিরেই ফলে।

লুই নেপোলিয়ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : রাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বােনাপার্ট দলের প্রার্থী লুই নেপােলিয়ন, প্রজাতান্ত্রিক দলের প্রার্থী ক্যাভিগন্যাককে ভােট পরাস্ত করে রাষ্ট্রপতির পদ অধিকার করেন। বােনাপার্টবাদী নেতা লুই নেপােলিয়ন রাষ্ট্রপতি পদে বসলে প্রজাতন্ত্রের পতন আসন্ন হয়। কারণ লুই নেপােলিয়ন প্রজাতন্ত্রের আদর্শের অনুরাগী ছিলেন না। নতুন সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতির যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ছিল, লুই নেপােলিয়ন তার সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তিনি ১৮৫১ খ্রীঃ ২রা ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতা বলে আইনসভা ভেঙে দেন। আইন সভা ভাঙার পর তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন প্রার্থনা করেন। জনপ্রিয়তার সুযােগে তিনি দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। লােকে প্রজাতন্ত্র অপেক্ষা নেপােলিয়নের অধীনে স্থিতিশীল সরকার কাম্য বলে মনে করে।

কৃষকরা আশা করে যে, লুই নেপােলিয়ন তাদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করবেন। এজন্য তাকেই ভােট দেয়। নেপােলিয়ন বংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তার মহিমাও জাতিকে আচ্ছন্ন করে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনঃনির্বাচনের পর লুই নেপােলিয়ন ২রা ডিসেম্বর, ১৮৫২ খ্রীঃ দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘােষণা করেন। তিনি নিজেকে ফ্রান্সের দ্বিতীয় সম্রাট হিসেবে ঘােষণা করেন। এভাবে তিনি একনায়কতন্ত্র স্থাপন করেন। গৌরব লিপ্সু ফরাসী জনসাধারণ মনে করে যে, লুই নেপােলিয়নই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ইওরােপে ফ্রান্সের হৃতমর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। কৃষকেরা মনে করে যে, লুই নেপােলিয়ন ফ্রান্সে আইন শৃঙ্খলা স্থাপন করতে পারবেন। তার একনায়কতন্ত্রকে তারা গণভােটের দ্বারা স্বীকৃতি দেয়। এভাবে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটে।

পাঠ্যসূচী :
1. Cobban - History of France
2. Hazen - Europe Since Napoleon
3. G. A. S. Grenville - Europe Reshaped
4. Gordon Craig - Europe Since 1815
5. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
Advertisement