PayPal

স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান নীতি

author photo
- Friday, August 02, 2019

স্বাধীনতা লাভের পর জওহরলাল নেহেরুর বিজ্ঞান নীতি

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের বিজ্ঞান নীতি প্রধানত জওহরলাল নেহেরু পরিকল্পনা মত হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান তৈরী করে তিনি ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটিয়েছিলেন। নেহেরু এই বিজ্ঞান নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বিজ্ঞান চর্চার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান সচেতন গড়ে তোলা। স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষানীতি অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি হিসাবে ভারতীয়দের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হল যে পশ্চিমী সভ্যতার ফসল ব্রিটিশদের শিক্ষানীতির দুটি উল্লেখযােগ্য দিক ছিল শিক্ষার মাধ্যমে ব্রিটিশরা তাদের শাসন পরিচালনার সুবিধার জন্য কিছু কেরানী তৈরী করতে চেয়েছিল। ছাত্রদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে কোন শিক্ষা দেওয়া হত না।
স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান নীতি
ইংরাজী ভাষা ও সাহিত্যের উপর অত্যধিক জোর দেবার ফলে ছাত্রদের মনে ভারতের পুরাতন ও প্রচলিত বিজ্ঞান চর্চা ও বিজ্ঞান চেতনা সম্পর্কে কোন ধারণা গড়ে উঠেনি। প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ঐতিহ্য সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল। তাছাড়া ব্রিটিশ শিক্ষানীতির মাধ্যমে এই ধারণা ছাত্রদের মধ্যে তৈরী করা হয় যে, ভারতীয় সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ঠ্য হল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক। কিন্তু ভারতের ব্রিটিশ বিরােধী জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলি সরকারের এই নীতি পরিবর্তন করার জন্য প্রচন্ড আন্দোলন করতে থাকে। এর ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকার তাদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাঙালি প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির চাপে ব্রিটিশ সরকার তাদের বিজ্ঞাননীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে রিপাের্ট গুলি প্রকাশিত হয়েছিল তা প্রধানত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিজ্ঞান নীতি সম্পর্কে পরিস্কার সিদ্ধান্ত নিলেও ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখায়নি। জাতীয় কংগ্রেসের বেশীর ভাগ নেতাই কেবলমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন তাই নয়, বিজ্ঞানের প্রসারকে তারা বাধা দেবার চেষ্টাও করেছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত চরিত্রের মানুষও ছিলেন। তিনি হলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি নতুন ভারতের নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ভারতের যে কয়েক জন রাজনৈতিক নেতা ভারতের নতুন জাতীয় জাগরনের স্রোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছিলেন তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন অন্যতম। তিনি এমন কথাও বলেছিলেন যে ভবিষ্যৎ ভারতের উন্নতি নির্ভর করবে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে।

জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস National Planning Committee গঠন করেন। এই কমিটি স্বাধীনতার পর ভারতের উন্নতির জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার খসড়া প্রস্তুত করেন। নেহেরু ভারতের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের এই কমিটিতে যােগ দেবার জন্য আহবান জানান। এইসব বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন কমিটির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে তিনি ভবিষ্যত ভারতের রূপরেখা তৈরী করার কাজে আত্মনিয়ােগ করেন।

নেহেরু যখন স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তখন তিনি যে বিখ্যাত বিজ্ঞান দপ্তরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি হল Department of Scientific and Natural Resources . এই দপ্তরটির গুরুত্ব অনুধাবন করে এর দায়িত্বভার তিনি নিজেই গ্রহণ করেছিলেন। এই দপ্তরটির প্রথম ১০ বছর কাজ করার পর তিনি এর কার্যাবলী সমীক্ষা করেন এবং বােঝার চেষ্টা করেন যে এই দপ্তরটি দেশের উন্নতির জন্য কতখানি কার্যকর হয়েছে। এই সমীক্ষা করার সময় তিনি এই দপ্তরটির কর্মসূচী রুপায়নের ক্ষেত্রে কতকগুলি ত্রুটি খুঁজে বের করেন।

ত্রুটি সংশােধনের জন্য জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৮ সালে পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব অনুমােদন করান। এই প্রস্তাবটির নাম ছিল 'Science Policy Resolution'। প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য ছিল জাতির উন্নতির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানীদের কর্মচেষ্টাকে প্রবাহিত করা। প্রস্তাবটির বিশেষত্ব হল এই যে, পার্লামেন্টে পূর্বে সাধারণত এই ধরনের কোন প্রস্তাব অনুমােদিত হয়নি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ক্ষেত্রে জওহরলাল নেহেরুর অবদান উল্লেখযােগ্য। নেহেরু ভারতীয় বিজ্ঞানীদের সামাজিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিজ্ঞানীদের সামনে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা উপস্থাপিত করে। সেগুলির সমাধান তাদের কাছ থেকেই চেয়েছিলেন। তার এই চিন্তাধারা তিনি বিভিন্ন মিটিং এবং ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেষণগুলিতে নিয়মিতভাবে উল্লেখ করতেন।

নেহেরু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ও বিজ্ঞানকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি গুলিতে তিনি এই প্রশাসনিক অফিসারদের যুক্ত করেছিলেন। বিজ্ঞান নীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি এইসব প্রশাসনিক অফিসারদের মতামত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতেন।

জওহরলাল নেহেরু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির জন্যে সবরকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শিল্পপতি, প্রশাসনিক অফিসার এবং কংগ্রেস দলের কিছু সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও নেহেরু বিজ্ঞান এবং কারিগরি গবেষণার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন। নেহেরুর এই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতি হিসাবে কতগুলি রিসার্চ ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া অটোমিক এনার্জি এজেন্সি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিভাগ গুলিকে আরাে প্রসারিত করা হয়। Technological Institute গঠন করা হয়। এই প্রতিষ্ঠান গুলিকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়ােজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়। নেহেরু এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ‘Temples of Learning' বলা হয়।

নেহেরুর বিজ্ঞাননীতির আরাে একটি উল্লেখযােগ্য অবদান হল দেশের মানুষদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চেতনা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত করা। নেহেরু ভালভাবেই জানতেন যে কতগুলি বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তৈরী করলেই ভারতের জনগণের মন থেকে কুসংস্কার দূর করা যাবে না। এই জন্য তিনি বিজ্ঞানীদের কাছে বারংবার আবেদন করেন যে তারা যেন জনগণের মধ্যে বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ঘটানা অর্থাৎ তিনি চেয়েছিলেন, “Popularisation of scientific outlook among the people"। শুধু তাই নয় নেহেরু চেয়েছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অঙ্গ হিসাবে পরিনত করতে। এইভাবে নেহেরুর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে ভারতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানিকরূপ বিকশিত হয়ে ওঠে।

নেহেরুর বিজ্ঞান নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিজ্ঞানী ও সমাজের মধ্যে আন্তরিক সংযােগ স্থাপন। নেহেরু চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা যেন সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে বিজ্ঞানকে প্রয়োগ করে অর্থাৎ বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে গবেষণাগারে আবদ্ধ না রেখে সমাজ ও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। অর্থাৎ নেহেরুর এই নীতিকে বলা যেতে পারে "Principle of science for the people"। সাধারণভাবে দেখা যায় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মানুষের কোন যােগাযােগ থাকে না। কিন্তু নেহেরুর চিন্তাধারা ছিল অন্য। তিনি চেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা যেন মানুষের প্রতিনিয়ত সমস্যাগুলির সুষ্ঠু সমাধানের জন্য সচেষ্ট হন। এইভাবে নেহেরু বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে সমাজভিত্তিক করতে চেয়েছিলেন। বস্তুত পক্ষে সমাজের সঙ্গে বা মানুষের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকলে জনগণের মনে বিজ্ঞান চেতনার অনুপ্রবেশ ঘটানাে সম্ভব নয়।

স্বাধীনতার পরবর্তীকালে বিজ্ঞান নীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্বনির্ভরতা অর্জন করা। ১৯৬২ সালে এবং ১৯৬৫ সালে যথাক্রমে চীন ও পাকিস্থানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বৈদেশিক সাহায্যের ব্যাপারে ভারত যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল সেদিকে লক্ষ্য রেখে ভারত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন করার জন্য প্রয়াসী হয়। ভারত উপলব্ধি করে যে এ ব্যাপারে ইউরোপীয় দেশগুলির উপর সবসময় নির্ভর করা যাবে না। সেইজন্য ভারতীয় বিজ্ঞানীরা যুদ্ধাস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরীর কাজে মন দেয়। যেহেতু ভাৱত জোট নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করেছিল সেইজন্য সমস্ত দেশের কাছ থেকে যুদ্ধের সময় সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। এইসব দিকে লক্ষ্য রেখে ভারতের “National Committee of Science and Technology" পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সময়ে একটি নীতি গ্রহণ করে। এর নাম দেওয়া হয় Approach to Science and Technology plan. এই পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে Science for the people নীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়। The Indian Institute of Science গ্রামীণ এলাকায় বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি প্রয়ােগ করার ক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। গ্রামীণ প্রযুক্তি সম্পর্কেও তারা সচেতন ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে ১৯৭৬ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস ওয়ালটেয়ার অধিবেশনে গ্রামীন প্রযুক্তির সমস্যাগুলির সম্পর্কে আলােচনা করেন।

স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের বিজ্ঞান নীতি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে ক্রমশ একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়। সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে মানুষ ও সমাজকে যুক্ত করা। বস্তুত পক্ষে সরকার চেয়েছিলেন বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির গবেষণাকে সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে প্রকাশ করতে চেয়েছিল।

গ্রন্থপঞ্জী:
1. Bipan Chandra - India After Independence.
2. Harish Kapur - India's Foreign Policy.
3. Surjit Man Singh - India's Search for Power.
4. Ranabir Samaddar (ed) - Space, Territory and the State.
5. A. Vaidyanathan - The Indian Economy since Independence (1947-70).
6. Dharma Kumar (ed) - The Cambridge Economic History of India.
7. S. Gopal - Jawaharlal Nehru: A Biography.