PayPal

বিশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব ও বিশ্বায়ন

author photo
- Monday, August 19, 2019
বিজ্ঞানের গবেষণা দ্রুত বেড়েছে হয় যুদ্ধের সময়ে, নয়তাে সেই সময়ে যখন শিল্পোদ্যোগীরা পুঁজিসৃষ্টির সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে। যুদ্ধের সময়ে সামরিক বিজ্ঞানচর্চার ভেতর দিয়ে এমন সব তত্ত্ব ও তথ্য দ্রুত বেরিয়ে আসে, যেসৰ তত্ত্ব ও তথ্য হয়তাে শান্তির সময়ে পাওয়া যেত অনেক ধীরে ধীরে। ১৯২৯ সালে আলেকস্যানডার ফ্লেমিং পেনিসিলিনের গুণ আবিষ্কার করেছিলেন, কিন্তু তখন এটা নিয়ে তেমন সাড়া পাওয়া যায় নি। অথচ যুদ্ধের সময়ে সেনাদের চিকিৎসার ব্যাপারটি জরুরি হয়ে পড়েছিল, সেই সময়ে গুরুত্ব পেয়েছিল পেনিসিলিন।
Twenty century technology revolution
অন্যদিকে বিজ্ঞানের ব্যবসায়িক প্রেরণার লক্ষণীয় উদাহরণ টেলিভিশন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই পাওয়া গিয়েছিল এর আভাস। তখন কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন বােঝা গেল যে, উনিশ শতকীয় উৎপাদন প্রযুক্তি আর কুড়ি শতকীয় শক্তি প্রযুক্তির মিশ্রণে গণব্যবহার্য পণ্যউৎপাদনের (Mass Production) বাজার সম্ভাবনা (Market Potential) অসীম এবং তার জন্য চাই গণমাধ্যমের উন্নতি, কেননা গণমাধ্যমই ভােগ্যপণ্যবাদের (Consumerism) প্রচার করে বাজার সৃষ্টি করবে আর পুঁজির সম্ভাবনা বাড়াবে, তখন আর টেলিভিশনের ব্যাপারে কেউ পিছিয়ে রইল না, তার থেকেই এল তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব আর ভােগ্যপণ্যের বিশ্বায়ন।

তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব ও বিশ্বায়ন

বিশ্বায়ন ভোগ্যপণ্য সংস্কৃতি এবং কেন্দ্রীয় উৎপাদন ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত তথ্যপ্রযুক্তি। বিশ্বায়ন গতি পেয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে নতুন আন্তর্জাতিক তথ্য আদেশ-এর প্রতিশ্রুতি দিয়ে। তথ্যপ্রযুক্তির নতুন অবয়বকে এভার্ট রজার্স পুরনো কাঠামাের ওপর নতুন ব্যবস্থার প্রসারিত প্রভাব হিসেবে দেখতে চান, আর মার্শাল ম্যাকলুহান একে বলেছেন নাটক বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই তথ্যপ্রযুক্তি মূল্যায়ন তিনদিক থেকে করা যেতে পারে। (১) তথ্যসঞ্চয়ন, তথ্যসঞ্চালন ও তথ্যবাজারের সংরক্ষণ ও প্রসারণ, (২) তথ্যমাধ্যমিক পণ্যয়ান এবং (৩) উদ্বৃত্ত মূল্যজনক প্রযুক্তি।

প্রথম দিকটির ভিত্তি হল সাংখ্য বৈদ্যুতিন (digital) পদ্ধতির প্রয়োগ। ১৯৮০ দশক থেকে উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক এজেন্টগুলাে স্যাটেলাইট কম্পিউটারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করে। তার ফলে সমস্ত বিশ্বের সম্পদ, চাহিদা, জনসংখ্যা, সাচ্ছল্য বা দারিদ্র্য, সমাজের ক্রয়ক্ষমতা, আঞ্চলিক সৃজনশীলতা, এই সব তথ্যই বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যায়। প্রয়ােজনমতাে পুঁজির বিশ্বায়নে বা একরূপীকরণে ব্যস্ত ইন্ডাস্ট্রিয়াল মানেজমেন্ট এর বা টেকনােক্রাটদের কাজে লেগে যায়। ডিজিটাল আর্কাইভ ব্যবস্থায় দরকারি তথ্য জমিয়ে রাখা যায়, পরে কাজে লাগবে বলে বা সেই তথ্য বিক্রি করা যাবে বলে। এইভাবে তথ্য নিজেই পণ্যয়িত হয়ে যায়, প্রসারিত হয় তথ্যবাজার। সাধারণ অবস্থায় এই তথ্যবাজারের সবচাইতে দরকারি যােগাযােগ প্রযুক্তি হল ইন্টারনেট। এদের দৌলতেই পৃথিবীর ভোক্তারা আজ আর কোনাে বিশেষ রাষ্ট্রের সিটিজেন বা নাগরিক নন, তাহা সকলেই হয়ে পড়েন নেটিজেন।

এই তথ্যপ্রযুক্তিই এখন গোটা পৃথিবীর পণ্য বাণিজ্যর সবচাইতে বড় হাতিয়ার। এর মাধ্যমেই তৈরি হয় ক্রেতা, গড়ে ওঠে তার চাহিদা আর তার যোগাযােগ হয় বিক্রেতা বা উৎপাদকের সঙ্গে। ১৯৯০ এর দশকে স্যাটেলাইট সম্প্রচারে ছাড়পত্র দিয়ে ভারতে এই ব্যবস্থার সূচনা করেছিল অর্থমন্ত্রী ডক্টর মনমােহন সিং, যে মনমােহন সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মানুষের খাওয়া বা শরীরচর্চা সবই ঠিক করে দেয় এই স্যাটেলাইট পণ্যায়ন। রুপার্ট মার্ডক নিউজ কর্পোরশনের কর্ণধার রুপার্ট মার্ডককে বলা হয় আকাশের আলেকজান্ডার। তার একমাত্র কাজ হল সংবাদ, খেলাধুলা, বিনােদন এবং মানুষের শৈশবকেও স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা। এই দিয়েই যেন তিনি পৃথিবীকে পণ্যসংস্কৃতিতে ছেয়ে দেবেন, জয় করে নেবেন গােটা বিশ্বকে।

তথ্য সংগ্রহ আর তার উৎপাদনমুখী ব্যবহারের নানা কৌশল উদ্ভাবন করে উদ্বৃত্ত মুল্যও সৃষ্টি করতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি। বিভিন্ন রকমের সফটওয়্যারই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সারা বিশ্বে যে নেটভিত্তিক বাণিজ্য চলে ই-কমার্স, ই-ব্যাংকিং বা ই-শপিং এর হাত ধরে তার মূলে এই সফটওয়্যার।

উনিশ শতকে রিকার্ডো Theory of Comparative Advantage শীর্ষক একটি আলােচনা করেছিলেন। তিনি এমন একটি বাণিজ্য ব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন, যেখানে নিচু হারে থাকা মজুরির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শ্ৰম-নিবিড় দেশগুলােকে উৎপাদনের ব্যাপারে তুলনামূলক সুবিধা দেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে এসব দেশে পণ্যের মূল্যমান কম থাকবে এবং মুক্ত বাণিজ্যের আবহাওয়ায় উচু হারে বাধা মজুরির যন্ত্র-নিবিড় উৎপাদনের বিদেশী পণ্য ঐ দেশগুলাের বাজার দখল করতে পারবে না। এইভাবে অনুন্নত দেশ মুক্ত বাণিজ্যের দুনিয়ায় আপেক্ষিক সুবিধা ভােগ করতে পারবে।

বিশ্বায়নের অর্থনীতি, প্রযুক্তির হাতবদল এবং তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার রিকার্ডোর এই ভাবনাটাকে অচল করে ভারতের মতাে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলােকে মুশকিলে ফেলে দিয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও পুঁজির দ্রুত চলাচল নিচু মজুরির দেশের শ্রমকে উন্নত অর্থনীতির দেশে আমদানির সুযােগ করে নিয়েছে। ফলে উন্নত দেশেই নিচু মজুরির সমান্তরাল উৎপাদন কাঠামাে তৈরি হয়ে গেছে। মুক্ত বাণিজ্যের আপেক্ষিক সুবিধার তত্ত্ব এইভাবেই উন্নত দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। অবশেষে ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব রিকার্ডোর তত্ত্বকেই বিপরীত মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আউটসাের্সিং এর কায়দায় এখন শ্রম-প্রতুল দেশে বসেই যােগাযােগ-বিপ্লবের সুযােগে উন্নত দেশের উৎপাদনের কাজ সেরে ফেলা যায়। এ এক নতুন ধরনের পুঁজির উপনিবেশায়ন।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. McGeorge Bundy - Danger and Survival
2. Rinita Mazumder - A Short Introduction to Feminist Theory
3. C.F.J. Muller (ed.) - Five Hundred Years: A History of South Africa.