১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল

- August 06, 2019
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা যে কোন যুদ্ধকে ছাড়িয়ে যায়। প্রায় ২৬ লক্ষ সেনা এই যুদ্ধে মারা পড়ে এবং ৭০ লক্ষ লােক আহত হয়। প্রচুর ধনসম্পত্তি বিনষ্ট হয়। বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানী এই যুদ্ধে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধজনিত মহামারী, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতির দরুন বহু প্রাণহানি হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দীর্ঘকাল পরেও ইওরােপের জীবন স্বাভাবিক হয়নি। এই যুদ্ধে জার্মানী এমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, জার্মানীতে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। যুদ্ধ ফেরৎ জার্মান সেনাদল বেকার হয়ে পড়ে। কল-কারখানাগুলি মন্দার দরুন বন্ধ হয়ে যায়। মুদ্রাস্ফীতির দরুন জিনিসপত্রের দাম ভয়ানক বৃদ্ধি পায়। জার্মান মুদ্রা মার্কের দাম ভয়ানক হ্রাস পেলে জার্মানীর অথনৈতিক জীবন পঙ্গু হয়ে যায়।
Results of the World War I
বৈষয়িক ক্ষতি ও জীবনহানি ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দারুন নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন রাষ্ট্র শত্রুর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালায়। তারা শত্রুর ক্ষয়ক্ষতিকে বড় করে দেখায় এবং নিজেদের ক্ষতিকে কমিয়ে বলে। এই যুদ্ধের জন্যে শত্রুপক্ষই একমাত্র দায়ী এরূপ মিথ্যা ধারণা সৃষ্টি করা হয়। সরকারি স্তরে মিথ্যা প্রচার জনজীবনের নীতিবােধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও জনসাধারণ আমরা ও তাহারা (We and They), মিত্রশক্তি ও শক্রশক্তি এই মনােভাব বেশ কিছুদিন ছাড়তে পারে নি। সংবাদপত্রগুলিও এই মিথ্যা প্রচারের শিকার হয়। মানবতাবােধ, সহিষ্ণুতা এবং শান্তিবাদ ফিরে আসতে যথেষ্ট সময় লাগে।

রাজনৈতিক দিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সূচনা করে। ইংলন্ড ও ফ্রান্স এই যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তারা প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার হয়। এজন্য মিত্রশক্তি তাদের পূর্ব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একদা ইঙ্গ-ফরাসী দেশ দুটি বিশ্বের প্রধান শক্তি ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির দরুন তারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়। এদের স্থলে মার্কিন দেশ ও বলশেভিক রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাধান্য বিস্তার করে। ইঙ্গ-ফরাসী শক্তির হাত থেকে বিশ্ব রাজনীতির প্রাধান্য হাতছাড়া হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে জার্মানীতে দারুণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই যুদ্ধের পর জার্মানীর নব প্রতিষ্ঠিত প্রজাতন্ত্রী সরকার জার্মানীতে মজবুত শাসন স্থাপনে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত এডলফ প্রথম হিটলার নামে এক ব্যক্তি জার্মান প্রজাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে জার্মানীর ওপর নাৎসি একনায়কতন্ত্র স্থাপন করেন। হিটলার ভার্সাই সন্ধিকে নস্যাৎ করে পুনরায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে পৃথিবীকে এগিয়ে দেন।

রাশিয়ার জার সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়ে ভুল করেন। তার স্বৈরাচারী শাসনের জন্য রুশ জনসাধারণের ঘৃণার পাত্র ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার সেনাদলের পরাজয় ঘটলে, জারের বিরুদ্ধে রাশিয়ায় দারুণ বিক্ষোভ দেখা দেয়। জার বাধ্য হয়ে চতুর্থ ডুমার অধিবেশন ডাকেন। ডুমার অধিবেশন ডাকার অর্থই ছিল জারের স্বৈরতন্ত্রে বিফলতা স্বীকার করা। ডুমার নির্দেশে জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন। রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসান হয়। জারতন্ত্রের পতনের ফলে রাশিয়ায় একটি বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র কিছুদিনের জন্যে স্থাপিত হয়। কিন্তু এর পশ্চাতে শ্রমিক, কৃষকদের সমর্থন না থাকায় এই প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে রাশিয়ার বলশেভিক দল সমাজতন্ত্র স্থাপন করে। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠনের সুযােগ সৃষ্টি করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ শক্তি জার্মানীর আক্রমণ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দেশে উপনিবেশগুলিতে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার হয়। ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ১৯২০ খ্রীঃ অহিংস অসহযােগ আন্দোলন আরম্ভ হয়। ভারতের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক দেশগুলির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়।

সামাজিক দিক থেকে দেখা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সাধারণভাবে নারী শ্রেণীর মুক্তি ঘটে। যুদ্ধের সময় পুরুষেরা যুদ্ধে যােগ দিলে গৃহবধুরা গৃহকোণ ছেড়ে অফিসে, বিদ্যালয়ে, ক্ষেতে, খামারে, কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ শেষ হলে আর নারীরা গৃহের বদ্ধ জীবনে ফিরে যায়নি। ইওরােপে তারা পুরুষের পাশাপাশি মাথা উচু রেখে চলতে আরম্ভ করে।

ইওরােপের শ্রমিকশ্রেণী যুদ্ধের সময় তাদের শক্তির কথা বুঝতে পারে। তারা বুঝতে পারে যে, শ্রমিক কলে, কারখানায় কাজ করলে তবেই যুদ্ধের মারণাস্ত্র নির্মিত হয়, সাধারণ লােকের নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য উৎপন্ন হয়। শ্রমিকের শ্রমের দ্বারাই রাষ্ট্রের সম্পদ উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনগুলি শ্রমিকের দাবী দাওয়া সম্পর্কে তাদের সচেতন করে। রুশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্ৰেণী লাভবান হলে, অন্যান্য দেশেও শ্রমিকের মঙ্গলের জন্যে রাষ্ট্রকে আইন রচনা করতে হয়। শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা বাড়ে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে প্রতি রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে জনমতের প্রভাব বিশেষভাবে পড়ে। অতীতে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সাধারণ লােকের আগ্রহ কম ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর লােকে বৈদেশিক নীতির গুরুত্ব বুঝতে পারে। সংবাদপত্রের প্রসারের ফলে লােকে বৈদেশিক ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়। এজন্য গােপন কুটনীতির স্থলে খােলা কুটনাতি চালু হয়। বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি বিদ্যার ক্ষেত্রে বিশ্বযুদ্ধের চাপে বিশেষ অগ্রগতি ঘটে। যুদ্ধের প্রয়ােজনে এই আবিষ্কারগুলো ত্বরান্বিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আকাশ পথে পরিবহণ ও যুদ্ধের সূচনা হয়। বিমান নির্মাণের ক্ষেত্রে বিরাট বিপ্লব ঘটে।

পাঠ্যসূচী :
১. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
2. Gooch - Before the war.
৩. Cruttwell - History of the Great War.
৪. Fay - Origins of the World War.