PayPal

ধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়ের অবদান

author photo
- Monday, August 05, 2019

রাজা রামমোহন রায়ের ধর্ম সংস্কার

অষ্টাদশ শতকে বাঙালী হিন্দু সমাজে কুসংস্কার ও সঙ্কীর্ণতা দেখা দেয়। লােকে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের মূল নীতিগুলি হতে দূরে সরে যায়। কতকগুলি আচার-অনুষ্ঠান ধর্মের নামে চলতে থাকে। পৌত্তলিকতা, বহু দেব-দেবীর পূজো, তন্ত্র মন্ত্র, প্রভূতি কুসংস্কার জনসাধারণের মধ্যে ধর্মের নামে প্রভাব বিস্তার করে। এই সঙ্গে জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, সতীদাহ, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন, ঘাটহত্যা প্রভূতি ভয়াবহ ক্ষতিকারক কুপ্রথা ধর্মের নামে সমাজে চলতে থাকে। চিন্তার জগতে স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদের অভাব সমাজের অগ্রগতিকে বিনষ্ট করে। জ্ঞানের গতি হয় অবরুদ্ধ। যুক্তিহীন অনুষ্ঠান ও আচার-সর্বস্বতা মানুষের প্রকৃত আধ্যাত্ম চেতনাকে ব্যাহত করে। পরাধীন ভারত শুধুমাত্র রাজনৈতিক দিক থেকে পরাধীন ছিল না, তার সৃজনী শক্তি, বুদ্ধি বিভাসার উন্মেষ স্তব্ধ হয়ে যায়। ধর্মের নামে কুসংস্কাৱেৰ তলানি তার বুদ্ধি শক্তিকে আচ্ছন্ন করে।
ধর্ম সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়
রাজা রামমােহন সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেন যে, জাতির মধ্যে কুসংস্কারগুলিকে দূর করে প্রকৃত আধ্যায় চেতনার জাগরণ না ঘটালে জাতির অগ্রগতি হবে না। রাজা রামমােহন ছিলেন ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত। ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্র, সুফী ধর্মমত সম্পর্কে তিনি মূল ধর্মগ্রন্থগুলি পাঠ করেন। তিনি হিব্রু ও গ্রীক ভাষা শিক্ষা করে মূল বাইবেলও পাঠ করেন। বারানসীতে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার পর তিনি বেদ, উপনিষদ, বেদান্ত ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মশাস্ত্রগুলি যত্ন সহকারে পাঠ করেন। বিভিন্ন ধর্মমতের সঙ্গে পরিচিতির পর রাজা রামমোেহনের মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। এই একেশ্বরবাদ রামমােহনের ধর্মচিন্তার প্রধান দিক ছিল। অনেকের মতে, রামমােহন ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্রের প্রভাবে একেশ্বরবাদী মত গ্রহণ করেন (British Paramountcy and Indian Ranaissance, P.97.)। আসলে বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র গভীরভাবে পাঠ এবং বিশ্লেষণের ফলে রামমােহনের মনে একেশ্বরবাদের তত্ত্ব জেগে ওঠে।

হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতা এবং বহু দেবতার পূজো ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে তার মনে প্রশ্ন দেখা দেয়। ১৮০৩ খ্রীঃ তিনি ফার্সী ভাষায় তুহফৎ উল মুয়াহিদিন নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার প্রভৃতির তীব্র সমালােচনা করেন এবং সকল ধর্মমতেই একেশ্বরবাদের কথা আছে এই মত প্রচার করেন। তিনি সকল প্রকার আচার ও কুসংস্কারকে বর্জন করে এক সময় ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা বলেন। রামমােহন বহু শাস্ত্র ও বহু ভাষায় সাহিত্য পাঠ করে প্রখর যুক্তিবাদী দৃষ্টি লাভ করেন। তিনি দৈবশক্তি, অলৌকিকত্ব ও অতি প্রাকৃত বস্তুর অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। রামমােহনের মতে প্রকৃত ঈশ্বর বিশ্বাসের সঙ্গে অলৌকিকত্ব বা অতি প্রাকৃতের কোন যােগ ছিল না। লােকে কুসংস্কারবশতঃ অলৌকিক তত্ত্বে বিশ্বাস করে। অবতার তত্ত্বকেও তিনি অস্বীকার করেন।

রামমােহন হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতা, বহু দেবতার পুজো ও অন্যান্য কুসংস্কারকে যেমন নিন্দা কৱেন, সেরূপ খ্রীষ্টধর্মের গোড়ামি এবং যীশুর অবতার তত্ত্ব ও অলৌকিক ক্ষমতার সমালােচনা করেন। তিনি ১৮২০ খ্রীঃ The Precepts of Jesus, the Guide to Peace and Happiness নামে একটি পুস্তিকায় খ্রীষ্টধর্ম সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশ করেন। এর ফলে শ্রীরামপুরের খ্রীষ্টান মিশনারীদের সঙ্গে রামমােহনের বিতর্ক হয়। ফ্রেইন্ড অব ইণ্ডিয়া পত্রিকায় তাঁর মতামতের সমালােচনা করা হলেও রাজা রামমােহন তার যুক্তিতে অটল থাকেন। তিনি খ্রীষ্টের নৈতিক বাণী ও নির্দেশগুলিকে মূল্যবান মনে করলেও খ্রীষ্টের ঐশ্বরিকতা এবং অবতারত্ব অলৌকিক ক্ষমতাতে তার আস্থাহীনতা প্রকাশ করেন। পৌত্তলিকতা বিষয়ে রামমােহনের সঙ্গে বিতর্কে গোড়া হিন্দু পণ্ডিত সুব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রী রামমােহনের শাস্ত্রজ্ঞানের কাছে পরাজিত হন।

রামমােহন তার একেশ্বর মতবাদ হিন্দুশাস্ত্রের সাহায্যে প্রচারের জন্যে ১৮১৫ খ্রীঃ আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮২৫ খ্রীঃ বেদান্তবাদ শিক্ষাদানের জন্যে তিনি বেদান্ত কলেজ স্থাপন। উগ্র খ্রীষ্টয় মিশনারীরা হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করে কুৎসা রচনা করায় তিনি ব্রাহ্মণিক্যাল ম্যাগাজিন (Brahmanical Magazine) নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি বহু প্রকাশ্য সভায় খ্রষ্টীয় পাদ্রীদের সঙ্গে বিতর্ক করেন। রামমােহন যেকোন গোড়ামির বিরুদ্ধে তার বক্তব্য রাখেন। গোড়া হিন্দুদের তিনি যেমন সমালােচনা করেন, গোড়া খ্রীষ্টানদেরও তিনি সমালােচনা করতে ছাড়ে নি। হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতার স্বপক্ষে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ও উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশ তার সঙ্গে বিতর্কে পরাস্ত হন।

রামমােহনের ধারণা জন্মায় যে, কেবলমাত্র একেশ্বরবাদ ও পৌত্তলিকতা বিরােধী বক্তব্য প্রচার করে কোন লাভ হবে না। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রগুলির যে সকল গ্রন্থে একেশ্বরবাদ তত্ত্ব আছে তা একেশ্বরবাদের সমর্থনে মাতৃভাষায় জনসাধারণের কাছে পৌছে দিতে হবে। এজন্য তিনি উপনিষদ ও বেদান্তের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। তিনি ১৮২১ খ্রীঃ কলকাতা ইউনিটেরিয়ান কমিটি গঠন করে একেশ্বরবাদ প্রচার আরম্ভ করেন। পাদ্রী এড্যামস, দ্বারকানাথ ঠাকুরও রামমােহনের সহযােগী ছিলেন। ইউনিটেরিয়ান সমিতি তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি।

একেশ্বরবাদের প্রচারের জন্যে রামমােহন ১৮২৮ খ্রীঃ, ২০শে আগষ্ট (ভারতীয় সন ১৭৫০ শকাব্দ, ৬ই ভাদ্র) ব্রাহ্ম সভার প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ, তারাচাদ চক্রবর্তী প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ব্রাহ্ম সভায় যােগ দেন। প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্ম সভায় প্রার্থনা অনুষ্ঠান হত। পাশের ঘরে দুজন দক্ষিণী তেলেগু ব্রাহ্মণ বেদ পাঠ করনে। এছাড়া ব্রাহ্ম সভার সদস্যরা উপনিষদও পাঠ করতেন। ব্রাহ্ম সভার জনপ্রিয়তার ফলে রক্ষণশীল হিন্দুরা কৃপিত হয়ে, রক্ষণশীলদের নেতা রাজা রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে ধর্মসভা স্থাপন করেন। তারা সমাচার চন্দ্রিকা পত্রিকায় ব্রাহ্ম সভার তীব্র সমালােচনা করেন। এই সমালােচনার জবাব রামমােহন সংবাদ কৌমুদি পত্রিকা প্রকাশ করে দিতে থাকেন। এই বাদানুবাদ ও বিতর্কে কলিকাতার উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণী আলােড়িত হন।

রামমােহন ১৮৩৮ খ্রীঃ, ২৩শে জানুয়ারি ব্রাহ্ম সমাজ গৃহের দ্বার উদঘাটন করেন। এই গৃহের দলিলে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের গৃহ, অক্ষয়, অব্যক্ত পরম ব্রহ্মবাদীদের ব্রাহ্ম সমাজের স্থাপনা জন্যে উৎসর্গ করেন। সভা গৃহে পৌত্তলিক উপাসনা নিষিদ্ধ করা হয়। এই সভাগৃহের দরজা সকল ধর্মের একেশ্বরবাদীদের জন্যে উন্মুক্ত করা আন্দোলনে হয় (An Advanced History of India. P. 877)। এরপর রামমােহন বিলাত যাত্রা করলে তার প্রবর্তিত ব্রাহ্ম সভা আন্দোলনে স্থিমিত হয়ে পড়ে।

পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী রাজা রামমােহনের ধর্ম আন্দোলনের প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, “রাজা রামমােহনের ধর্মীয় আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল তার দেশবাসীকে পৌত্তলিকতা ত্যাগ করে এক ও অব্যয় পরম ব্রহ্মের উপাসনায় উদ্বুদ্ধ করা । তার কর্মধারা ছিল নেতিবাচক এবং সংস্কারমূলক, নতুন মতের প্রবর্তন, ইতিবাচক ও নতুন ধর্মমত প্রবর্তন হয় (Shivnath Sastri-History of Brahmo Samaj, P. 72.)। রাজা হিন্দুধর্মকে ত্যাগ করে নতুন ধর্মমত কখনও প্রচারের কথা ভাবেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুধর্মকে পৌত্তলিকতা এবং কুসংস্কার মুক্ত করে পবিত্র ঔপনিষদীয় ও বৈদিক ধর্মের পথে, একেশ্বরবাদের পথে ফিরিয়ে আনা। তিনি মৌলিক হিন্দুধর্মের মতবাদকে কোন দিন ত্যাগ করেন নি। তিনি নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেন এমন কোন দাবী করতেন না। কেশবচন্দ্র সেনের মতে, রামমােহনের উদ্দেশ্য ছিল সকল ধর্মমতের মধ্য থেকে একেশ্বরবাদের আদর্শকে উর্ধ্বে তুলে ধরা। রামমােহন আসলে সেই সার্বজনীন ঈশ্বরের আদর্শে বিশ্বাস করতেন যিনি সকল মানবের ঈশ্বর ছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এক বিশ্বজনীন ধর্মমতের প্রতিষ্ঠা। এই ধর্মর্মিত বিভিন্ন ধর্মীয় গােষ্ঠী, আচার ও পার্থক্যের বিভেদ অতিক্রম করে মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটাবে ।

যাই হােক রামমােহন তার ধর্মীয় মত প্রচারে বিশেষ সফল হয়নি একথা সত্য। তার যুক্তিবাদ ও নিরাসক্ত আবেগহীন মতামত সাধারণ লােকের মনে আলােড়ন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। ধর্মপ্রচারকরা যেরূপ উত্তাপ, আবেগ ও উগ্রতা সহ তাদের মত প্রচার করেন, যুক্তিবাদী রামমােহন তার থেকে শত হস্ত দূরে ছিলেন। এজন্য সাধারণ লােকের কাছে তার মতামত ছিল অস্পষ্ট। তিনি ছিলেন প্রধানতঃ দার্শনিক ও তত্ত্ববাণী। প্রচারের তেজ ও অফুরন্ত উদ্যম তার রামমােহনের ধর্মসংস্কার মধ্যে ছিল না। দ্বিতীয়তঃ, রক্ষণশীলদের অন্ধ বিরােধিতা তাকে আহত করেছিল। আলােকের পাখী রক্ষণশীলদের শরাঘাতে বিদীর্ণ বক্ষ ও শক্তি হারিয়েছিলেন। কয়েকজন শিক্ষিত ব্যক্তি তাকে বুঝলেও বেশীর ভাগ বাঙালী নেতারা তার বিরােধিতা করে তার বক্তব্যকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। গোড়ামির সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তি সাময়িকভাবে পরাস্ত হয়। তৃতীয়তঃ, রামমােহন শিক্ষাবিস্তার, সমাজ সংস্কার, ধর্মসংস্কার প্রভৃতি বিবিধ কাজে এতই উদ্যমকে ছড়িয়ে দেন যে, শুধুমাত্র একেশ্বরবাদ প্রচারের কাজে তার সমগ্র উদ্যমকে নিয়ােজিত করার সময় পাননি। চতুর্থতঃ, তার নিজস্ব চরিত্রে ও আচরণে কিছু স্ববিরােধিতা, সামঞ্জস্য ও ভারসাম্যের অভাব তার ভাবমূর্তিকে কিছুটা ম্লান করে। তথাপি রামমােহনই ছিলেন নতুন যুগের পথিকৃৎ। তিনিই সর্বপ্রথম হিন্দুধর্মকে কুসংস্কার এবং কদাচার মুক্ত করে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী ধর্মে পরিণত করার চেষ্টা করেন। সর্ব ধর্ম সমন্বয় ও একেশ্বরবাদের যে বীজ তিনি বপন করেন উত্তরকালে তা বলবতী হয়ে নবজাগরণ সৃষ্টি করে। তিনি ছিলেন যথার্থই ভারতপথিক।