ধর্ম সংস্কারক ও সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহন রায়

- August 04, 2019
উনিশ শতকে বাংলা তথা ভারতের নবজাগরণের পুরােধা ছিলেন রাজা রামমােহন রায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এজন্য তাকে ভারত পথিক নামে অভিহিত করেছেন। রামমােহনের আন্তরিত প্রচেষ্টায় সমাজ ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। হুগলি জেলার আরামবাগ মহকুমার রাধানগর গ্রামে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে, ২২শে মে (মতান্তরে ১৭৭৪) রামমােহনের জন্ম হয়। তার পিতা ছিলেন রামকান্ত রায় ও মাতা তারিণী দেবী বা ফুলঠাকুরণী। তার পিতা ছিলেন জমিদার। মােগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাকে আধুনিক ভারতের জনক বা ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ বলা হয়।
Social and Religious Reformer Rammohan Roy
রাজা রামমোহন রায়ের ধর্ম সংস্কার : তিনি ছিলেন বিস্ময় প্রতিভার অধিকারী। তিনি বাল্যকালে আরবি ও ফরাসি এবং কাশীতে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য ও পাশ্চাত্য দর্শন অধ্যায়ন করেন। তার মনে বিশ্বাস জন্মায় ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়া। একেশ্বরবাদের সত্য তিনি সারা জীবন আকড়ে ধরে থাকেন। ১৮০৩ খ্রীঃ তিনি তুহফৎ উল মুয়াহিদিন নামে ফার্সী ভাষায় একেশ্বরবাদের আদর্শ প্রকাশ করেন। একই সময়ে তিনি মনাজারারাট-উল-আাদিয়ান নামে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপর একটি ফার্সী গ্রন্থ রচনা করেন। এই দুই গ্রন্থে রামমােহন ধর্মীয় কুসংস্কার, বহু দেবতার পুজো ও পৌত্তলিকতার সমালােচনা করেন। তিনি অবতার তত্ত্বকে অস্বীকার করেন।

তিনি ১৮০৫ খ্রীঃ থেকে জন ডিগবীর দেওয়ান হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এই চাকুরী করার সময় তিনি তার প্রিয় বিষয় তুলনামূলক ধর্মশাস্ত্রের ওপর গভীরভাবে পড়াশােনা করেন। তিনি হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর সহায়তায় তন্ত্রধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। জৈন কল্পসূত্র ও অন্যান্য জৈন গ্রন্থ তিনি পড়েন। এই সময় তিনি ইংরাজী সাহিত্য, পাশ্চাত্য দর্শনেও ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। রামমােহনের ইংরাজী ভাষার জ্ঞান সম্পর্কে তার একটি গ্রন্থ পাঠ করে জেরেমি বেন্থাম উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। ১৮১৫ খ্রীঃ রামমােহন কলিকাতায় বসবাস করতে আসেন।

হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারগুলির বিরুদ্ধে তার যুক্তিবাদী সমালােচনার জন্যে তিনি কলিকাতায় শীঘ্রই খ্যাতিলাভ করেন। হিন্দু ধর্ম ও সমাজের সংস্কারপন্থী ব্যক্তিদের একত্রিত করে আলােচনা চালাবার জন্যে তিনি ১৮১৫ খ্রীঃ আত্মীয় সভা স্থাপন করেন। কলিকাতার উদারপন্থী, শিক্ষিত অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী শীঘ্রই রামমােহনের ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হন এবং আত্মীয় সভায় যােগ দেন। দ্বারকনাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায়, বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি এদের মধ্যে ছিলেন। প্রতি সপ্তাহে শনিবার আত্মীয় সভার অধিবেশন বসত। পৌত্তলিকতার সমালােচনা, জাতিভেদ প্রথার ত্রুটি, সতীদাহ ও বহু বিবাহ প্রভৃতি সামাজিক কুপ্রথার সমালােচনা এই সভায় হত। ১৮১৯ খ্রীঃ রামমােহন পৌত্তলিকতা সম্পর্কে বিতর্কে জয়লাভ করেন। তিনি মৃত্যুঞ্জয় ১৮১৫ খ্রীঃ রামমােহনের বিদ্যালঙ্কার, উৎসবানন্দ বিদ্যাবাগীশ প্রভৃতির সঙ্গেও বিতর্ক করেন। তার মতের সমর্থনে তিনি ১৮১৫ খ্রীঃ থেকে বেদান্তের ও উপনিষদের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেন।

১৮১৫ খ্রীঃ বেদান্ত সূত্র প্রকাশ করেন। ইংরাজী ভাষায় বেদান্তসারের অনুবাদ তিনি প্রকাশ করেন। ১৮২৫ খ্রীঃ তিনি বেদান্ত কলেজ স্থাপন করেন। পাশ্চাত্য দর্শন, বিজ্ঞানের সঙ্গে এই কলেজে বেদান্ত পড়ান হত। রামমােহন দৃঢ়ভাবে প্রচার করেন যে, পৌরাণিক ধর্মে পৌত্তলিকতা ও বহু দেবতার পুজোর বিধি থাকলেও বৈদিক হিন্দুধর্ম একেশ্বরবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিরাকার পরম ব্রহ্মই একমাত্র সত্য। তিনি গোড়ামি ও কুসংস্কার বর্জন করে প্রকৃত ধর্মকে অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি পুরােহিত তন্ত্রকেও আক্রমণ করেন। তিনি বলেন যে, পৌত্তলিকতা ও পুরােহিত তন্ত্র জনসাধারণের স্বাধীন চিন্তাকে আচ্ছন্ন করেছে ও চিরাচরিত কুসংস্কারের দাস হয়ে পড়েছে।

তিনি ১৮২০ খ্রীঃ প্রিসপ্টস অব জিসাস (Precepts of Jesus) নামে এক ধর্মগ্রন্থ রচনা করে খ্রীষ্টধর্মের নৈতিক অনুশাসনগুলিকে খ্রীষ্টীয় অলৌকিকবাদ ও যীশুখ্রীষ্টের অবতারত্ব থেকে পৃথকভাবে বিচার করেন। তিনি বলেন যে, খ্রীষ্টধর্মের নৈতিক অনুশাসনগুলি সমাজের পক্ষে মুল্যবান। কিন্তু অবতববাদ বা খ্রষ্টধর্মের গোড়া অনুশাসন ও আচারকে তিনি সমালােচনা করেন। ১৮২০ খ্রীঃ ও ১৮৭৩ খ্রীঃ তিনি এ্যাপীলস টু দি ক্রিশ্চিয়ান পাবলিক (Appeals to the Christian Public) পুস্তিকায় খ্রীষ্টধর্মের অলৌকিক মতবাদ ট্রিনিটি বা ত্রিত্ববাদ প্রভৃতিকে সমালােচনা করেন। এর ফলে শ্রীরামপুরের মিশনারী স্কিমিডট ও ইংরাজ প্রচারক টাহটলারের সঙ্গে তার বিতর্ক হয়। রামমােহন বলেন যে, যীশুখ্রীষ্ট আসলে মানব সন্তান। তিনি এক মহামানব। তার ঐশ্বরিকতায় ও অলৌকিক ক্ষমতায় তিনি বিশ্বাস করেন না। ১৮২১-২৩ খ্রীঃ তিনি ব্রহ্মণিক্যাল ম্যাগাজিন (Brahmanical Magazine) প্রকাশ করে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের দারিদ্র্যের সুযােগ নিয়ে তাদের খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত করার নিন্দা করেন। তিনি ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দিকগুলির উপর এই পত্রিকায় আলােকপাত করেন। রামমােহন প্রকৃতপক্ষে খ্রীষ্টধর্মের বিরােধী ছিলেন না। খ্রীষ্টীয় মিশনারীদের গোড়ামির তিনি প্রতিবাদ করেন। তিনি ১৮২১ খ্রীঃ ইউনিটেরিয়ান সম্প্রদায়ের পৌরহিত্য লাভে সহায়তা করেন।

তিনি সকল ধর্মের মূলে একই সত্য বিদ্যমান এই মতের ভিত্তিতে বিশ্বজনীন ধর্মের কথা বলেন। ১৮২৮ খ্রীঃ, ২০শে আগষ্ট তিনি ব্রাহ্মসভা স্থাপন করেন। ১৮৩০ খ্রীঃ ব্রাহ্মসমাজ ভবন স্থাপিত হয়। ব্রাহ্ম সমাজের দ্বাৱ সকল ধর্মের একেশ্বরবাদীদের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। সমাজে কোন পৌত্তলিক উপাসনা নিষিদ্ধ হয়। রামমােহনের পরে ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন তীব্রতর হয়।

রাজা রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কার : ধর্ম সংস্কার ছাড়া রামমােহন সমাজ সংস্কারের কাজেও ব্রতী হন। সামাজিক কুসংস্কার, কুপ্রথার অত্যাচারে যারা জর্জরিত ছিলেন বিশেষতঃ ভারতের নারী সমাজ তাদের মুক্তির জন্যে রাজা রামমােহন তার সর্বশক্তি নিয়ােগ করেন। হিন্দু সমাজে সতীদাহ নামে অমানুষিক বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। সদ্যমৃত স্বামীর চিতায় হিন্দু বিধবাকে দাহ করার অমানুষিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তিনি শুধু মানবিক আবেদন না করে শাস্ত্র বাক্যের সাহায্যে সতীদাহের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদকে জোরালাে করেন।

রামমােহন বুঝেছিলেন যে, শাস্ত্রবাক্য দ্বারা সতীদাহের প্রতিবাদ না করলে লােকে তা গ্রাহ্য করবে না। তিনি এজন্য কয়েকটি পুস্তিকা ১৮১৯ খ্রীঃ রচনা করেন। তিনি ৩০০ ব্যক্তির স্বাক্ষর সম্বলিত এক আবেদন দ্বারা সরকারকে সতীদাহ নিষিদ্ধ করার জন্যে অনুরােধ জানান। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে ১৭ নম্বর রেগুলেশন দ্বারা সতীদাহ নিষিদ্ধ করলে, এই আদেশের বিরুদ্ধে রক্ষণশীল প্রিভি কাউন্সিলে আপীল করায় রামমােহন পার্লামেন্টের কাছে পণ্টা আবেদন দ্বারা সতীদাহ নিরোদ আইনকে সমর্থন করেন।

রাজা রামমােহন শিক্ষা বিস্তার, বহু বিবাহ ও জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তিনি বিধবাদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার দান সমর্থন করে পুস্তিকা রচনা করেন এবং এ সম্পর্কে হিন্দু শাস্ত্র থেকে ব্যাখ্যা দেন। পুরুষের বহু বিবাহের বিরুদ্ধে তিনি লেখনী ধরেন। জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তিনি ব্রজসূচী গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। সমাজ সংস্কার সম্পর্কে তার মতামত প্রকাশের জন্যে তিনি সংবাদ কৌমুদী পত্রিকা প্রকাশ করেন।

পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের জন্যে রাজা রামমােহনকে পথিকৃৎ বলা চলে। রাজা উপলব্ধি করেন যে, পাশ্চাত্যের জ্ঞান বিজ্ঞানের শিক্ষা না করলে ভারতবাসীর মধ্যে যুক্তিবাদের জাগরণ ঘটবে না। তারা পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চর্চা না করলে তাদের উন্নতিবিধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সমাজের অবসাদ ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে তাকে প্রাণশক্তি দান করার জন্যে পাশ্চাত্যে শিক্ষার একান্ত প্রয়ােজন। এজন্য তিনি লর্ড আমহার্স্টকে এক পত্র দ্বারা শিক্ষাখাতে বরাদ্দ সরকারি ১ লক্ষ টাকা পাশ্চাত্য শিক্ষার জন্যে (১৮২৩ খ্রীঃ) ব্যয় করার অনুরােধ করেন। হিন্দু কলেজ স্থাপনের জন্যে তিনি ডেভিড হেয়ারের সঙ্গে প্রাথমিক উদ্যোগ নেন। পরে রক্ষণশীলদের প্রতিবাদে রামমােহন কলেজের পরিচালনা সমিতি থেকে সরে যান। অধুনা ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছেন যে, হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় রামমােহনের কোন অবদান ছিল না।

রাজা রামমােহন ১৮১৬ খ্রীঃ শুড়িপাড়ায় এক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৮২২ খ্রীঃ এই বিদ্যালয়ের নাম হয় এ্যাংলাে হিন্দু স্কুল। পরে এই বিদ্যালয়ের নাম হয় ইণ্ডিয়ান একাডেমি। রামমােহন পাদ্রী আলেকজাণ্ডার ডাফকে তার জেনারেল এ্যাসেম্বলীজ ইনষ্টিটিউশন স্থাপনে সহায়তা করেন। তিনি বেদান্ত কলেজ স্থাপন করেন। নারীদের শিক্ষালাভের প্রয়ােজনীয়তা তিনি স্বীকার করেন এবং সংবাদ কৌমুদী পত্রিকায় এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখেন। সরকারের শিক্ষানীতি বিষয়ে এ্যাংলিশিষ্ট ও ওরিয়েন্টালিষ্টদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিলে তিনি এ্যাংলিশিষ্টদের প্রতি সমর্থন জানান। রামমােহন এভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের পথ রচনা করেন।

রাজা রামমোহন রায়ের সাহিত্য : বাংলা সাহিত্য বিশেষতঃ বাংলা গদ্য রচনায় রামমােহনের অবদান লক্ষ্য করা যায়। যদিও তিনি প্রকৃত অর্থে কোন সাহিত্য গ্রন্থ রচনা করেননি, তথাপি তিনি সমাজ সংস্কার সম্পর্কে বিভিন্ন পুস্তিকা রচনা ও সংবাদ কৌমুদী পত্রিকার সম্পাদনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের একটি রূপ দান করেন। হিন্দু বেদান্ত ও উপনিষদের বাংলা অনুবাদ দ্বারা তিনি গদ্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। কঠিন বিষয়বস্তুর ভাব প্রকাশের বাহন হিসেবে তিনি বাংলা গদ্য রচনার নতুন পথ দেখান। ১৮২৬ খ্রীঃ তিনি একটি বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনা করেন। বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার পথও তিনি সংবাদ কৌমুদী পত্রিকার মাধ্যমে রচনা করেন। তিনি মিরাত-উল-আখবর নামে একটি ফার্সী পত্রিকাও প্রকাশ করেন।

রামমোহনের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাধারা : রামমােহন উপলব্ধি করেন যে, ধর্মীয় গােড়ামি ও জাতিভেদে জর্জরিত থাকলে জাতি কখনও বলশালী হয়ে আপন অধিকার অর্জন করতে পারবে না। এজন্য তিনি বেদান্ত মত প্রচার করে সাম্প্রদায়িকতার গহ্বর থেকে জাতিকে মুক্ত করার কথা ভাবেন।মানবতাবাদ ও বিশ্বজনীন ধর্মবােধের ভিত্তিতে তিনি ভারতবাসীর ঐকোর চিন্তা করেন। রামমােহনের বিরুদ্ধে অভিযােগ করা হয় যে, তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরােধী ছিলেন না। ব্রিটিশ শাসন নীতি ভারতবাসীর উপকার করবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। এমনকি তিনি ভারতে কিছু সংখ্যক ইংরাজের স্থায়ীভাবে বাস করা উচিত বলে অভিমত দেন। কারণ ইংরাজ ভারতে থাকলে তার কাছ থেকে ভারতবাসী তার শৃঙ্খলা ও কর্মপরায়ণতা প্রতি শিখতে পারবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

রামমােহনের ব্রিটিশ জাতির নানা গুণ এবং ইংরাজী সভ্যতার প্রতি আস্থা ছিল এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভারতবর্ষ চিরকাল ইংরাজের পদানত থাকবে বলে তিনি মনে করতেন। ইংরাজের যা ভাল গুণ তিনি তার প্রশংসা করেন এবং ইংরাজের কাছ থেকে ভারতবাসী যাতে সেই গুণগুলি আয়ত্ত করে সেজন্য তিনি কিছু সংখ্যক ইংরাজের ভারতে বসবাসের প্রস্তাব দেন। ফরাসী পর্যটক জেকুমোকে ১৮২৮ খ্রীঃ এক পত্রে তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার মতামত দেন। তিনি বলেন যে, ভারতের উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণী ভারতের মুক্তি আনতে সক্ষম হবে। ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাধ্যমে ভারতে একদিন সাংবিধানিক গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

Advertisement
রামমোহনের আন্তর্জাতিকতা : তিনি ফরাসী বিপ্লবের আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধ ও আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ভলতেয়ার, গিবন, হিউম প্রভৃতি দার্শনিকের রচনা তিনি পড়েন। জেরেমি বেন্থামের হিতবাদী দর্শনের সঙ্গে তার চিন্তার যােগ ছিল। তবে তিনি ছিলেন বেন্থাম অপেক্ষাও গভীর মানবতাবাদী। বিশ্বের সকল স্থানের সকল জাতির মানুষের মুক্তি তিনি কামনা করতেন। ১৮৩০ খ্রীঃ জুলাই বিপ্লবকে তিনি স্বাগত জানান। তিনি ফরাসী বিপ্লবের ত্রিবর্ণ পতাকাকে ও তার আদশকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। নেপলসের বিপ্লব (১৮২২ খ্রীঃ) ব্যর্থ হলে তিনি দুঃখিত হন। দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন ধ্বংস হলে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। ১৮৩২ খ্রীঃ রিফর্ম বিল দ্বারা ব্রিটিশ জনসাধারণ ভােটাধিকার পেলে তিনি ম্যাঞ্চেষ্টারের শ্রমিক সমাজকে অভিনন্দন জানান।

রামমোহনের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও সংস্কারের দাবী : তিনি প্রশাসনিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবী জানান। এজন্য তিনি ক্ষমতা বিভাজন নীতি প্রয়ােগ করে ভারতীয় শাসনব্যবস্থাকে সংগঠিত করার কথা বলেন। শাসনব্যবস্থায় ভারতবাসীর মতামত গ্রহণের দাবী ও জুরি আইনের দ্বারা ভারতবাসীর প্রতি বৈষম্যের তিনি প্রতিবাদ জানান। তিনি ১৮৩৩ খ্রীঃ চার্টার আইন রচনার প্রাক্কালে কোম্পানীর একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার, কোম্পানীর শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন ক্রটি লোপ করার দাবী জানান।

পার্লামেন্টের সমক্ষে রামমোহন বক্তব্য রাখার জন্যে তিনি ইংলন্ড যাত্রা করেন। ১৮২৩ খ্রীঃ এক আইন দ্বারা সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলে রামমােহন সুপ্রীম কোর্ট ও ইংলন্ডের মন্ত্রীসভার কাছে এক যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদ পত্র পাঠান। তিনি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোন দেশে বিপ্লব সৃষ্টির করণ হয় না। তার মৃত্যুর পর ১৮৩৩ খ্রীঃ প্রেস আইন লোপ করা হয়। বাক-স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে রামমােহনের এই প্রচেষ্টার জন্য বিপিনচন্দ্র পাল রামমােহনকে ভারতের রাজনৈতিক চেতনার স্রষ্টা বলেছেন।

রামমোহনের অর্থনৈতিক সংস্কারের চিন্তাধারা : তিনি ভারতে কোম্পানীর একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকারের প্রতিবাদ জানান। ১৮৩৩ খ্রীঃ কোম্পানীর সনদের নবীকরণের সময় তিনি পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির কাছে তার অভিমত জানান। লবণের বাণিজ্যে কোম্পানীর একচেটিয়া অধিকারের বিরুদ্ধে তিনি সিলেক্ট কমিটির সামনে তার বক্তব্য রাখেন। কোম্পানীর শাসনের ফলে ভারত থেকে সম্পদের নিষ্ক্রমণ বা অপহার হওয়ার কথা তিনি বলেন। Drain বা সম্পদের নিষ্ক্রমণ রদ করার জন্যে তিনি প্রস্তাব দেন যে, ভারতে কিছু সংখ্যক সৎ ও উদ্যমী ইংরাজ বসবাস করে কৃষি ও শিল্পে মূলধন লগ্নী করলে এই অপহার বন্ধ হতে পারে। আধুনিক দৃষ্টিতে Drain বা সম্পদের নিষ্ক্রমণ বন্ধ করার জন্যে রামমােহনের প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত মনে নাও হতে পারে। কিন্তু রামমােহনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদের নিষ্ক্রমণ বন্ধ করা, ভারতে ইংরাজের বসবাসকে তিনি অন্য কোন কারণে সমর্থন করেন একথা বলা যায় না।

রামমােহন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফল সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। নিজে জমিদার বংশের সন্তান হলেও চিরস্থায়ী ও রায়তওয়ারী ব্যবস্থায় কৃষকদের কিরূপ দূৱবস্থা হয়েছিল তা তিনি সিলেক্ট কমিটির সমক্ষে তুলে ধরেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে, রায়তের ওপর যাতে খাজনা বৃদ্ধি না হয় তার ব্যবস্থা সরকারের করা উচিত। এর ফলে যদি সরকারের রাজস্বের ক্ষতি হয় তবে বিলাসদ্রব্যর ওপর কর চাপিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করার তিনি সুপারিশ করেন। ভারতীয় কর্মচারী নিয়ােগ দ্বারা সরকারের ব্যয় কমানাের পরামর্শও তিনি দেন। এভাবে রাজা রামমােহন বিবিধমুখী চিন্তাধারা ও কর্মকৃতির দ্বারা ভারতের নবজাগরণের সূচনা করেন।
Advertisement