PayPal

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কারণ

author photo
- Tuesday, August 06, 2019
১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনরো নীতি (Monroe Doctrine) অনুসরণ করে ইউরোপের রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। ১৯১৪ খ্রীঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে মার্কিন দেশ ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত এই যুদ্ধের আবর্ত থেকে দূরে থেকে নিরপেক্ষতা রেখে চলে। কিন্তু ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে, ৬ই এপ্রিল মার্কিন দেশ নিরপেক্ষতা ত্যাগ করে ইঙ্গ-ফরাসী মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে নামে।
U.S.A. Joined the World War I
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন দেশের যােগ দেওয়ার প্রত্যক্ষ কারণ ছিল, আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে, নিরপেক্ষ দেশ মার্কিন জাহাজের ওপর মহাসমুদ্রে জার্মান সাবমেরিনের আক্রমণ। মার্কিন দেশ দাবী করত যে, নিরপেক্ষ মার্কিন দেশ, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, তার বাণিজ্য জাহাজ যুদ্ধমান যে কোন দেশে পাঠাতে পারে। মার্কিন খাদ্য ও অস্ত্র বােঝাই জাহাজগুলি যাতে ব্রিটেনে না যেতে পারে, এজন্য জার্মানী মাঝসমুদ্রে তার জাহাজগুলিকে ডুবাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যাত্রীবাহী বিলাস তরণী সিটানিয়াকে জার্মান সাবমেরিন আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবিয়ে দিলে, মার্কিন দেশের ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। এ বিষয়ে মার্কিন প্রতিবাদপত্র জার্মানী অগ্রাহ্য করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা হবে।

মহাসমুদ্রে নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে মার্কিন বাণিজ্য জাহাজ চলাচলের দাবীর পশ্চাতে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ স্বার্থ ছিল। মার্কিন শিল্পপতিরা চায় যে, নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে আমেরিকা জার্মানী, ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অস্ত্র ও রসদ বিক্রি করে ফুলে ফেপে উঠবে। এই অস্ত্র ও রসদের বড় ক্রেতা ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্স। জার্মানী তার শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যে মার্কিন সমরসম্পদবাহী জাহাজে আঘাত করে। এতে মার্কিন উচ্চ মহল ও বণিক গােষ্ঠী ক্রুদ্ধ হয়।

জার্মানী যদি সাবমেরিন আক্রমণ দ্বারা আন্তর্জাতিক আইন ভাঙ্গে, তবে ব্রিটেন জার্মানীর উপকূল অবরােধ দ্বারা আইন ভেঙেছিল। এক্ষেত্রে আমেরিকা কুটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়ে নিশ্চেষ্ট থাকে। কিন্তু জার্মানীর ক্ষেত্রে আমেরিকা ক্ষেপে যায়। বােষ্টনের একটি সংবাদপত্রে আমেরিকার মনােভাব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্রিটেনের নৌ-অবরােধের ফলে আমরিকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছিল। জার্মানীর সাবমেরিন আক্রমণের ফলে আমেরিকানদের জীবন হানি ঘটেছিল, যা সহনীয় ছিল না। আমেরিকার মতে যাত্রীবাহী জাহাজকে আক্রমণ করার আগে সতর্ক না করে আক্রমণ ছিল অসহনীয় অপরাধ।

ব্রিটেন জার্মান উপকূল অবােধ করায়, মার্কিন নিরপেক্ষ বাণিজ্যে বাধা পড়লে, আমেরিকা ব্রিটেনের কাছে যে সকল প্রতিবাদ পত্র পাঠায়, ব্রিটেন তার উত্তরগুলি বিলম্বিত করে, যাতে আমেরিকার মাথা ঠাণ্ডা হতে সময় পায়। জার্মানীর কাছে আমেরিকা সাবমেরিন আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে, জার্মানী চটজলদি, দাম্ভিক অজ্ঞতাপূর্ণ উত্তর পাঠায়। জার্মানী অপমানজনক পরামর্শ দেয় যে, মার্কিনদের উচিত এসময় ঘরে বসে থাকা, ইউরোপে যাতায়াত হ্রাস করা। নরওয়ে, সুইডেন প্রভৃতি দেশ সাবমেরিন আক্রমণের ভয়ে তাই করছে। আমেরিকানদের এটাই কাজ করা উচিত। এই ধরনের জার্মান উত্তর, আমেরিকার জাতীয় সম্মান ও গর্বে আঘাত করে।

লুসিটানিয়া ঘটনার পর, আমেরিকা লন্ডন ঘােষণা অনুযায়ী জার্মানীকে সাবমেরিন আক্রমণ বন্ধ রাখার জন্যে শাসানী দিলে, জার্মানী কিছুকাল সাবমেরিন আক্রমণ হ্রাস করে। কিন্তু ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে জার্মানী পুনরায় ব্যাপক সাবমেরিন আক্রমণ শুরু করে। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চতুর্দিকে জার্মানী সাবমেরিন আক্রমণের বলয় তৈরি করে এবং মার্কিন সরকারকে জানিয়ে দেয় যে, এই বলয় ভেদ করে মার্কিন মালবাহী বা যাত্রীবাহী জাহাজ ঢুকানাে মার্কিন নাগরিকের জীবনহানির জন্যে জার্মানী দায়ী হবে না এবং মার্কিন মালবাহী জাহাজ ঢুকলে জার্মানীর কোন দায় থাকবে না। জার্মানীর এই একতরফা ঘােষণা মার্কিন শাসক মহলে তীব্র বিরক্তি সৃষ্টি করে। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত মার্কিন রাষ্ট্রপতি যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি স্থাপনের যে প্রয়াস শুরু করেন তাতে ছেদ পড়ে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি উইলসনকে সিদ্ধান্ত বদলে জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার কথা ভাবতে হয়।

মার্কিন নৌ-চলাচলের ওপর জার্মান সাবমেরিন আক্রমণের একটি অর্থনৈতিক দিক ছিল। মার্কিন ঐতিহাসিক টমাস বেইলীর মতে, ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানীর ব্যাপক সাবমেরিন আক্রমণের ফলে মার্কিন মালবাহী জাহাজগুলি বিনষ্ট হতে থাকে। মার্কিন বন্দরগুলিতে লক্ষ লক্ষ টন রপ্তানি যােগ্য গম ও শিল্পদ্রব্য পচতে থাকে। কারণ জার্মান সাবমেরিন থাকার ফলে এই মাল মিত্র শক্তির বন্দরে পৌঁছানাে যায়নি। মার্কিন অর্থনৈতিক ধ্বসের সম্ভাবনা দেখা দিলে মার্কিন কংগ্রেস ও সেনেটের সদস্যরা চঞ্চল হয়। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি উইলসন যুদ্ধ ঘােষণার কথা ভাবতে বাধ্য হন। উইলসন চিন্তা করে দেখেন যে, আমেরিকার সামনে তিনটি পথ খােলা ছিল, যথা -১) মার্কিন মাল ও যাত্রীবাহী জাহাজগুলিকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চারদিকে জার্মানী সাবমেরিন আক্রমণের যে গণ্ডী রচনা করে, তার বাইরে রাখা। কিন্তু ধনাঢ্য ও শক্তিশালী মার্কিন দেশের কাছে জার্মানীর এই হুমকীর কাছে মাথা নত করা ছিল অসম্মানজনক। (২) মার্কিন অহমিকা ও জাতীয় সম্মানের বড়াই না করে নরওয়ে, সুইডেনের মত যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ থাকা। মার্কিন অধিবাসীর জীবনহানি ঘটলে বা মার্কিন জাহাজ বিনষ্ট হলে, তা নীরবে সহ্য করা। আমেরিকার মত দেশের পক্ষে এই নিষ্ক্রিয়তা গ্রহণ সম্ভব ছিল না। (৩) তৃতীয় পথ ছিল যুদ্ধ ঘােষণা।

মার্কিন দেশ মনে করত যে, ইওরােপে জার্মানীর ন্যায় একটি সামরিক শক্তির একক প্রাধান্য স্থাপিত হলে শক্তিসাম্য বিপন্ন হবে। ফ্রান্সের স্থলশক্তি ও ব্রিটেনের নৌশক্তি জার্মানীর হাতে ধ্বংস হলে, অতঃপর জার্মানী মার্কিন শক্তির মুখােমুখি হবে। সুতরাং ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে সাহায্য দিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে শক্তিসাম্য রক্ষার জন্যে মার্কিন দেশ যুদ্ধে নামে। ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড গ্রে মার্কিন দেশকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমেরিকার মনে রাখা উচিত যে, আমরা আমাদের এবং আমেরিকার স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করছি। মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন মন্তব্য করেন যে, গ্রে ঠিক কথা বলেছেন। রাশিয়া ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে যুদ্ধ ত্যাগ করলে, জার্মান সেনাদল পূর্ব রণাঙ্গন হতে পশ্চিমে এসে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে শক্তিসাম্য রক্ষার জন্য মার্কিন দেশ যুদ্ধে যােগ দেয়।

মার্কিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইংরেজি ভাষাভাষী এ্যাংলাে-স্যাক্সন গােষ্ঠীর লােক ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের পূর্বপুরুষদের মাতৃভূমি ইংলন্ডের বিপদে সাহায্যদানের জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তারা চাপ দেয় স্বয়ং রাষ্ট্রপতি উইলসনের মিত্রশক্তির প্রতি সহানুভূতি ছিল। উইলসনের ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী পরামর্শদাতারাও তাকে ইংলন্ডের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ফরাসী সাহায্যের কথা আমেরিকাবাসী ভােলেনি। ফ্রান্স আক্রান্ত হলে ফ্রান্সের প্রতি মার্কিন জাতির গভীর সহানুভূতি দেখা দেয়। মার্কিন কবি রবার্ট আন্ডারউড জনসন তার একটি কবিতায় আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ফরাসী সেনাপতি লাফায়েতের বীরত্বের কথা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্বরণ করেন। বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা অগ্রাহ্য করে জার্মানীর বেলজিয়াম আক্রমণ ও বেলজিয়ামে জার্মানসেনার নিষ্ঠুরতা ও বর্বর অত্যাচার মার্কিন জনমতকে জার্মানীর বিরুদ্ধে আলােড়িত করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যােগদানের পশ্চাতে মার্কিন দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ বিশেষভাবে ছিল। জার্মানীর বিরুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসী শক্তি সমরসম্ভার ও খাদ্য বিক্রয় করে মার্কিন দেশ ফুলে ফেপে উঠে। ইঙ্গ ফরাসী শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্যাঙ্কগুলি থেকে যুদ্ধের খরচ চালাইবার জন্য বিরাট পরিমাণ অর্থ ঋণ নেয়। ১৯১৬ খ্রীঃ যুদ্ধের গতি মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে গেলে মার্কিন শিল্পপতি এবং ব্যাঙ্ক মালিক শ্রেণী ইংলন্ড ও ফ্রান্স পরিদর্শনে আসে। ডেভিসন এবং মর্গান প্রভৃতি বৃহৎ কোম্পানীর মালিকরা আশঙ্কা করে যে, মিত্রশক্তি পরাস্ত হলে তাদের সঙ্গে বাণিজ্য নষ্ট হবে। যে বিরাট ঋণ মিত্রশক্তি মার্কিন দেশের কাছে নিয়েছে তা পরিশােধ হবে না। এজন্যে মার্কিন ধনকুবেররা মার্কিন সরকারকে মিত্রশক্তির পক্ষে যােগদানের জন্যে পরামর্শ দেয়।

পাঠ্যসূচী :
১. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
2. Gooch - Before the war.
৩. Cruttwell - History of the Great War.