PayPal

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের কারণ

author photo
- Tuesday, August 06, 2019

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকে রণপরিকল্পনা, অস্ত্রশস্ত্র, সম্পদ ও লােকবল সকল দিক থেকে জার্মানী মিত্রশক্তি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিল। জার্মানীর কোলন নগরের পুল দিয়ে প্রতি ১০ মিনিটে একটি করে সামরিক ট্রেন চলত। জার্মানীর কামান ও ডুবােজাহাজের ক্ষমতা ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তা সত্ত্বেও জার্মানী শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে পরাস্ত হয় তার ব্যাখ্যা জার্মান সামরিক ইতিহাসকাররা দিয়েছেন।
Germany in World War I defeat
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জার্মানির অক্ষমতা : জার্মানীর যে লােক ও অস্ত্রবল ছিল তার দ্বারা স্বল্পকালের যুদ্ধে জার্মানীর জয় ছিল সুনিশ্চিত। কিন্তু জার্মানীর পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। অপর দিকে ত্রিশক্তি আঁতাতের সম্পদ ও শক্তি এমন ছিল যে, তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ভার বহন করতে পারত। ব্রিটেন ও ফ্রান্স তাদের উপনিবেশগুলি থেকে লােকবল ও অর্থ যোগাড় করে। কিন্তু জার্মানীর পক্ষে এভাবে শক্তি বৃদ্ধির কোন সুবিধা ছিল না। মিত্রপক্ষ এই কারণে যুদ্ধটিকে দীর্ঘায়িত করে। এই দীর্ঘ জার্মানীর দম ফুরিয়ে যায়।

জার্মানির নৌশক্তির অভাব : ইঙ্গ-ফরাসী নৌবহর সমুদ্রপথে জার্মানীকে অবরােধ করায়, বিদেশ থেকে জার্মানীর পক্ষে অভাব সামরিক দ্রব্য ও খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ভূমধ্যসাগরে ফরাসী নৌবহর এবং উত্তর সমুদ্রে ব্রিটিশ নৌবহর জার্মান উপকুলকে ঘিরে ফেলে। জার্মান ডুবােজাহাজ বা সাবমেরিন দ্বারা ইংলন্ডের জাহাজ ডুবিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা হলেও তাতে আশানুরূপ কাজ হয়নি। তাছাড়া ব্রিটেন সাবমেরিন বিরােধী অস্ত্র আবিষ্কার করলে জার্মান সাবমেরিনের আক্রমণ ভোতা হয়ে যায়। হেলিগােল্যাণ্ডের নৌ-যুদ্ধে জার্মান নৌবহরের এমন ক্ষয়-ক্ষতি হয় যে, তারপর জার্মান নৌবহর ব্রিটিশ নৌ-বহরকে আক্রমণ করতে সাহস করেনি। জলপথে ইঙ্গ-ফরাসী শক্তির অপ্রতিহত ক্ষমতা তাদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রাখে। অপরদিকে এই বিষয়ে জার্মানীর দুর্বলতা তাকে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।

দুই রণাঙ্গনে যুদ্ধ : জার্মানীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ এই ছিল যে, ১৯১৭ খ্রীঃ পর্যন্ত জার্মানীকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই রণাঙ্গনে সৈন্য সন্নিবেশ করে দুটি সীমান্তে যুদ্ধ করতে হয়। এর ফলে কোন একটি সীমান্তে জার্মানী পুরাে সেনা সন্নিবেশ করতে পারেনি। যদি জার্মানী কূটনীতির দ্বারা রাশিয়াকে ইঙ্গ-ফরাসী শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারত, তবে হয়ত গােড়ার দিকে জার্মানীর জয়লাভ সম্ভব হত। কিন্তু কাইজার ত্রিশক্তি আঁতাতে ভাঙন ধরাতে পারেন নি। ১৯১৭ খ্রীঃ রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করলে সেই শূন্যস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পূরণ করে। মোট কথা, মিত্রশক্তির সম্মিলিত শক্তি জার্মানী অপেক্ষা বেশী ছিল।

জার্মানির আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের দুর্বলতা : জার্মানী আক্রমণাত্বক যুদ্ধে পটু ছিল। আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে জার্মানীর জয়লাভ ছিল দুস্কর। আক্রমণের সামনে পিছু হটে দাঁড়ানোর জায়গা জার্মানীর ছিল না। সেক্ষেত্রে রাশিয়া তার বিরাট এলাকা থাকার ফলে পিছু হঠে শক্রকে যুদ্ধের পর যুদ্ধ দিতে পারত, জার্মানী আক্রান্ত হলে তার এমন বিস্তৃত স্থান ছিল না যে রাশিয়ার মত পিছু হঠে যুদ্ধ দিতে পারে।

ফরাসীদের জনযুদ্ধ : পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মানীর বিষয়ে ফ্রান্স জনযুদ্ধ আরম্ভ করে। ফরাসী গণতন্ত্র জার্মানীর নিকট ১৮৭০ খ্রীঃ পরাজয়ের প্রতিশােধ নিতে বদ্ধপরিকর ছিল। যুদ্ধের গােড়ার দিকে জার্মানী ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দিকে এগােলে, ফরাসী জনসাধারণ প্রবল বিক্রমে জার্মান বাহিনীকে হঠিয়ে দেয়। ১৯১৭ খ্রীঃ জার্মানী পুনরায় ফ্রান্স আক্রমণের চেষ্টা করলে ফরাসী জনসাধারণ স্বতঃফুর্তভাবে বাধাদানে এগিয়ে আসে। সর্বশেষ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যােগদানের ফলে জার্মানীর পরাজয় নিশ্চিত হয়। মার্কিন দেশ তার বিপুর সমর সম্ভার, জনবলসহ মিত্রশক্তির পক্ষে যােগ দিলে, দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত জার্মানীর পক্ষে যুদ্ধ জয়ের সকল আশা দূর হয়।

তথ্যসূত্র :
১. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
2. Gooch - Before the war.
৩. Cruttwell - History of the Great War.

No comments:

Post a Comment