PayPal

প্যারিস শান্তি চুক্তি ১৯১৯

author photo
- Tuesday, August 06, 2019

প্যারিসের শান্তি সম্মেলন ১৯১৯

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি পরাজিত জার্মানী ও তার মিত্রদেশগুলির গৃহীত নীতিগুলি সঙ্গে শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ১২ জানুয়ারি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আহ্বান করে। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে পৃথিবীর মােট ২৭টি দেশের প্রতিনিধি যােগ দেয় (Thomas Bailay - Diplomatic History)। প্রতিনিধিদের দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়, যথা মিত্র দেশ (The Allies) এবং সহকারী দেশ (Associated Powers)। মিত্রদেশগুলির মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালী ও জাপান ছিল প্রধান। এরাই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী। যা হােক, প্যারিসের শান্তি বৈঠকে প্রধান সিদ্ধান্তগুলি শেষ পর্যন্ত তিন প্রধানের ওপর বর্তায়। এই তিন প্রধান ছিলেন ফরাসী মন্ত্রী ক্লেমাসু, ব্রিটেনের মন্ত্রী লয়েড জর্জ এবং মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন। প্যারিসের শান্তি চুক্তিতে উপস্থিত কূটনৈতিক প্রতিনিধিবর্গের মূলত দুটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল। প্রথমত, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত পুনবিন্যাস করা। দ্বিতীয়ত, এই মহাসমরের ন্যায় সংগঠিত হিংসাত্মক যুদ্ধের সম্ভাবনা অপসারিত করা।
Paris Peace Conference 1919
প্যারিসের শান্তি সম্মেলনের নীতি : ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিম্নে উল্লেখিত নীতিগুলির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সন্ধি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। (১) জার্মানীকে সন্ধির দ্বারা এমন ভাবে দুর্বল করে রাখা হবে যার ফলে ভবিষ্যতে জার্মানী ইওরােপে সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ না করতে পারে। (২) জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতি অনুসারে মধ্য ও পূর্ব ইওরােপের পুনর্গঠন করা হবে। (৩) এজন্য তুর্কী, রুশ ও হ্যাপসবার্গ সাম্রাজ্যকে ভেঙে ফেলা হবে। (৪) ফ্রান্সের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (৫) ইওরােপে যাতে কোন শক্তি একক প্রাধান্য না পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে।

১৯১৯-এর প্যারিসে স্বাক্ষরিত সন্ধি : ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ জুন জার্মানীর সহিত ভার্সাইয়ের সন্ধি, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ১০ সেপ্টেম্বর অষ্ট্রিয়ার সহিত সেন্ট জার্মেইনের সন্ধি, ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ৪ জুন হাঙ্গেরীর সহিত ট্রিয়াননের সন্ধি, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে ২৭ নভেম্বর বুলগেরিয়ার সহিত নিউলির সন্ধি এবং ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে ১০ সেপ্টেম্বর তুরস্কের সহিত সেভরের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়, তবে কিছুদিনের মধ্য সেভারেরে সন্ধি বাতিল করে ল্যাসেনের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।।

বিশ্ব নেতৃবৃন্দের মনোভাব : মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন ব্যক্তিগতভাবে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অন্যানা কুটনিতিবিদদের মধ্যে যথেষ্ট অনুপ্রেরণার সঞ্চার ঘটেছিল। পদে থাকাকালীন এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিদেশি রাষ্ট্র সফরে গমন করেন। দেশে সমালােচনা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ব্যক্তিগতভাবে ছয় মাস ইউরোপে উপস্থিত থাকার সিদ্ধান্ত করেন এবং তার অধস্তনদের স্বদেশে প্রেরণ করেন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমস্যা দেখাশোনা করার জন্য। ১৯১৮-র ডিসেম্বরে উইলসন ইউরোপে উপস্থিত হন অন্যান্য যে কোন নেতার তুলনায় অনেক বেশি নৈতিক কর্তৃত্ব ও মর্যাদা সহকারে। যুদ্ধকে পুরােপুরি বর্জন করে নতুন আন্তজাতিক ব্যবস্থার যে রুপরেখা তিনি প্রদান করেন তার অভিনবত্ব যুদ্ধবিগত অসংখ্য জনগােষ্ঠীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।

সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে উইলসন কার্যত একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিগণিত হন। উইলসনের মতে সাধারণভাবে যুদ্ধ এবং নির্দিষ্টভাবে এই মহাসমরের পেছনে তিনটি মুখ্য কারণ ছিল। প্রথমত, গােপন কুটনীতি যার মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্র সামরিক ও কূটনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করত। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী জনগোষ্ঠী কর্তৃক জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন। তৃতীয়ত, স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার দরুন মুষ্টিমেয় কিছু এলিট ব্যক্তিবর্গের পক্ষে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পরিচালনা করা সম্ভবপর হত। উইলসনের মতে এই তিনটি প্রতিবন্ধকতাকে অপসারিত করে স্বাধীনভাবে জনমত প্রকাশের সুযােগ প্রদান করা হলে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে চিরতরে দূর করা সম্ভবপর হবে। উইলসনের এই আদর্শবাদ যথেষ্ট আশার সঞ্চার করলেও বাস্তব রাজনীতির দরুন কুটনীতিবিদদের অনেক ক্ষেত্রেই এই আদর্শবাদ থেকে বিচ্যুত হতে হয়েছিল।

উইলসনের আদর্শবাদের বিপরীতে ফ্রান্সের ক্লেমেনশকে উপস্থাপিত করা যেতে পারে। ক্লেমেনশ ঘনিষ্ঠমহলে Tiger নামেও অভিহিত ছিলেন। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে তিনি একজন আশাহত ব্যক্তি হিসেবেই উপস্থিত হন। বাস্তব জীবনের কঠোর ও নিষ্ঠুর দিকগুলিকে তিনি অত্যন্ত বেশি মাত্রায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার আগে পর্যন্ত তিনি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরােধী ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন যুদ্ধ দপ্তরের মন্ত্রীত্ব লাভ করেন তখন তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সঙ্কোচনের জন্য নিজস্ব একটি পন্থা উদ্ভাবন করেন। তবে বাস্তববোধের নিদর্শন হিসেবে বলা যেতে পারে তিনি উইলসনের আদর্শবাদের প্রতি তার আপাত আনুগত্য ও নিষ্ঠা প্রকাশ করলেও একই সঙ্গে ফরাসি স্বার্থ রক্ষা করার জন্য জার্মানিকে দুর্বল করে রাখার নীতি অনুসরণ করেন।

ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ডেভিড লয়েড জর্জ। ওয়েলশ অঞ্চলের একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ অ্যাটনি হিসেবে পেশাগত দিক দিয়ে তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন। প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব বুঝে সেই অনুযায়ী বক্তব্য রাখার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। ব্রিটেনের লিবারাল দলের প্রধান হিসেবে তিনি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে ব্যাপকভাবে জয়লাভ করেন। সেই সময় তার নির্বাচনী শ্লোগান ছিল জার্মানি প্রদান করুন এবং কাইজারকে ঝুলিয়ে দিন। লন্ডনের Daily Mail পত্রিকায় লয়ের্ড জর্জের জার্মান বিরােধী মানসিকতার সমর্থন করে বক্তব্য রাখা হয়েছিল। কাজেই শান্তি সম্মেলনের প্রতি তার মনােভাব নির্বাচন কালে প্রদত্ত তার প্রতিশ্রুতি দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল।

ইটালির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন অরল্যান্ডাে। তিনি অত্যন্ত পণ্ডিত এবং বিচক্ষণ কুটনীতিবিদ ছিলেন। সিসিলির ভূতপুর্ব আইনের অধ্যাপকের অবশ্য একটি ব্যাপারে ঘাটতি ছিল। তা হল ইংরেজি ভাষায় কোনরকম দখল তার ছিল না। ফলে সম্মেলনের আলাপ আলােচনার ওপর প্রত্যক্ষ কোনরকম প্রভাব ফেলা তার পক্ষে সম্ভবপর হয়নি। তাছাড়া তিনি ইটালি কর্তৃক স্বাক্ষরিত গােপন চুক্তিগুলিকে কার্যকরী করার জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনকে ক্রমাগত উত্যক্ত করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের উল্লেখযােগ্য ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতেই শান্তি সম্মেলনের স্থান হিসেবে প্যারিসকে নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু জে. এম. কেইনস এবং আরও অনেকে মনে করেন যে শান্তি সম্মেলনের মূল কেন্দ্র হিসেবে প্যারির নির্বাচন দুর্ভাগ্যজনক ছিল। কেননা প্যারির জনগােষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছিল। অসন্তোষ, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতা অত্যন্ত জটিল একটি পরিমণ্ডলের সৃষ্টি করেছিল।

শান্তি সম্মেলনের নেতৃবৃন্দের সামনে অত্যন্ত জটিল কতগুলি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তাছাড়া ল্যাঙস্যামের মতে শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলির প্রতিনিধিদের সন্তুষ্টিবিধান করার প্রয়ােজনীয়তাও ছিল। মধ্য ও পূর্ব ইওরােপের লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়ােজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করার ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হয়েছিল। এছাড়া লিগের চুক্তিপত্রের একটি খসড়া প্রস্তুত করা প্রয়ােজনীয় ছিল। এই সমস্ত কিছুই যুদ্ধোত্তর পর্যায়ের এমন একটি পরিবেশের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়েছিল যেখানে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতপূর্ণ মানসিকতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ কখনও গড়ে উঠতে দেয়নি। বেশ কিছু দেশ তখনও দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে মতাদর্শজনিত পার্থক্যও সমস্যার একটি কারণ হয়ে উঠেছিল।

রুথ হিং তার Versailles and After নামক গ্রন্থে শান্তি সম্মেলনের প্রতিনিধিবর্গের সামনে কতগুলি সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ব্রিটেন, ইটালি এবং বিশেষ করে যে সব দেশ জার্মানি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল সেই সব দেশের জনমত তীব্রভাবে জার্মান বিরোধী হয়ে উঠেছিল। এর কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পূর্বেকার অন্যান্য যুদ্ধগুলি থেকে স্বতন্ত্র ধরনের ছিল এবং এই যুদ্ধের দরুন কক্ষতির পরিমাণও ব্যাপক ছিল।

প্যারিসের শান্তিচুক্তির সাংগঠনিক দিক :সুপ্রিম ওয়ার কাউন্সিল স্থির করে যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইটালি এবং আমেরিকা আলােচনার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করবে। এছাড়া জাপানকেও একটি বৃহৎ শক্তির মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু যে বিষয়টির সমাধান করা হয়নি তা হল এই পাঁচটি প্রধান শক্তির সঙ্গে বাকি সাতাশটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র শক্তির মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তি কী হবে (Ruth Henig - Varsailles and after, P.13.)। ফরাসী সরকার চেয়েছিল যে মূল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির নির্ধারণ পাঁচটি প্রধান শক্তি সুপ্রিম ওয়্যার কাউন্সিলের আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে। তাদের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত ওইসব অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির অনুমােদনের জন্য উপস্থাপিত করা হবে। তবে উইলসন চেয়েছিলেন যে প্লেনারি সেশন গুলিতে সমস্ত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাই আলােচনায় অংশগ্রহণ করবেন এবং সেই আলােচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। আসলে তিনি আশা করেছিলেন মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিনিধি রুদ্ধ দ্বার কক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তা কার্যত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেকার গােপন কূটনীতির ন্যায়ই বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। ওই জাতীয় গােপন কুটনীতির তীব্র বিরােধী ছিলেন উইলসন।

শান্তি সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে কার্যকরী করার জন্য অন্তত পঞ্চাশটি বিভিন্ন ধরনের কমিশন গড়ে তােলা হয়েছিল। কমিশনগুলির মধ্যে পারস্পরিক যােগসূত্র রক্ষা করার জন্য সুপ্রিম কাউন্সিল বা কাউন্সিল অব টেন-কে কাজে লাগানাে হয়েছিল। কাউন্সিল অব টেন আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইটালি ও জাপানের দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গড়ে উঠেছিল। কিছুকাল পরে এটি কাউন্সিল অব ফোর এসে দাঁড়ায়। ব্রিটেন, আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইটালির একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে এই কাউন্সিল গঠিত হয়। ইটালির প্রধানমন্ত্রী অরল্যান্ডাে, যুদ্ধ সময়ে ইটালি কর্তৃক স্বাক্ষরিত গােপন চুক্তিগুলিকে স্বীকৃতি দিতে রাজি না হওয়ার প্রতিবাদে প্যারিস ত্যাগ করেন। ফলস্বরূপ কাউন্সিল অব ফোর কার্যত কাউন্সিল অব থ্রি-তে পরিণত হয়। এইভাবে শান্তিচুক্তির প্রকৃত রূপকার হয়ে ওঠেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ এবং ফ্রান্সের পররাষ্ট্র সচিব ক্লেমেনশ। শান্তি সম্মেলনের কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি গড়ে তােলা হয়েছিল।

লিগ অব নেশনস সংক্রান্ত কার্যকলাপ পরিচালিত করার জন্য জেনারেল কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। লিগ অব নেশনস-এর যুদ্ধপরবর্তী ক্ষতিপূরণ, বন্দর, বিমান পরিষেবা, আর্থিক বিষয় এবং চুক্তির খসড়া ইত্যাদির বিষয়ে জেনারেল কমিশন ভারপ্রাপ্ত ছিল। আঞ্চলিক সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে টেরিটোরিয়াল কমিটি বা আঞ্চলিক কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির ওপর পােল্যান্ড, গ্রিস, আলবেনিয়া, চেক, বেলজিয়াম ও ডেনমার্কের সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও অ্যাডহক কমিটি গঠিত হয়েছিল বাল্টিক অঞ্চল, আলসাস লােরেন, কিয়েলকানাল, লুক্সেমবুর্গ সার, রাইনল্যান্ড এই সমস্ত অঞ্চলের ক্ষতিপূরণ, যুদ্ধবন্দি এবং ইউক্রেন, মরক্কো এবং বিজিত পক্ষের অঞ্চলগুলির সমস্যা সমাধানের জন্য। তবে কাউন্সিল অব ফোর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এই কমিটি সেন্ট্রাল ড্রাফটিং কমিটির কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

প্যারিস শান্তিচুক্তির সমস্যা : শান্তি সম্মেলনের নেতৃবৃন্দের সামনে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল। প্রথমত, উইলসনের আদর্শবাদের সঙ্গে লয়েড জর্জের ও ক্লেমেনশর বাস্তববাদের সমন্বয়সাধনের প্রশ্নটি জড়িত ছিল। যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল কিন্তু কীভাবে শান্তি ও স্থিতিস্থাপকতা ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন কার্যকরী ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যাবে সেই বিষয়টি শান্তি সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।

দ্বিতীয়ত, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি প্রয়ােগ করার ফলে জাতীয় সংখ্যালঘু সমস্যাটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে শান্তি সম্মেলনের নেতৃবৃন্দ পােল্যান্ড, যুগােশ্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া ইত্যাদি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে এবং অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রদান করে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে ঐতিহাসিক দাবি-দাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় বিষয়টি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে।

তথ্যসূত্র :
1. William R. Keylor - The Twenteeth Century world-An International History.
2. E.J. Hobsbawm - The Age of Extremes.
3. Ruth Henig - Versailles and after.
4. Thomas Bailay - Diplomatic History.
5. Thomson David - Europe Since Napoleon.
6. Seaman L.C.B. - From Vienna to Versailles.
7. Roberts J.M. - Europe 1870-1945
8. Lipson - Europe in the 19th and 20th Centuries.

No comments:

Post a Comment