PayPal

বাংলার নীল বিদ্রোহের ইতিহাস

author photo
- Sunday, August 04, 2019

নীল বিদ্রোহের কারণ ও গুরত্ব

উনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নীলচাষিদের উপর নীলকর সাহেবদের অমানুষিক অত্যাচার ও শােষণের বিরুদ্ধে নীলচাষিদের সংঘবদ্ধ আন্দোলনকে নীলবিদ্রোহ বলা হয়। ঐতিহাসিতে বিপান চন্দ্রের মতে নীল বিদ্রোহ ছিল, বর্তমান যুগের বড়ো বিক্ষোভ, যা বাংলাদেশকে ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সম্পূর্ণরুপে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আবার ড. চিত্তব্রত পালিত নীল বিদ্রোহকে বাঙালি জমিদারদের সঙ্গে নীলকর সাহেবদের সংঘাত বলে অভিহিত করেছেন।
বাংলার নীল বিদ্রোহ
নীল চাষের সূচনা : লুই বােনাে নামে জনৈক ফরাসি ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে চন্দননগরের কাছে গোঁদলপাড়ায় আধুনিক পদ্ধতিতে প্রথম নীল চাষের সূচনা করেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে সনদ আইনে কােম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার লুপ্ত হলে বহু বেসরকারি ইংরেজ নীল চাষে ও নীল ব্যবসায়ে প্রচুর বিনিয়ােগ শুরু করেন ইংল্যান্ডে বস্ত্রশিল্পের জন্য প্রচুর নীলের প্রয়ােজন থাকায় নীলকর সাহেবরা আগামী দাদন দিয়ে চাষিদের ধানের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করত এবং প্রচুর মুনাফা লুটত।

নীল বিদ্রোহের কারণ : ১) নীলকররা জমিদারদের মােটা টাকা নিয়ে দীর্ঘদিনের জন্য জমি ভাড়া নিয়ে ভাড়াটিয়া শ্রমিকদের দিয়ে যে নীল চাষ করত তাকে বলা হত এলাকা চাষ। এই চাষে কোন সমস্যা ছিল না। নীলকররা গরিব নিরক্ষর চাষিদের কম টাকা দাদন দিয়ে বেশি টাকার চুক্তিপত্র দেখিয়ে চাষিদের নিজেদের জমিতে যে চাষ করতে বাধ্য করত তাকে বলা হত রায়তি, দাদনি বা বে-এলাকা চাষ। এই চাষে চাষীরা সর্বস্বান্ত হত। চাষের সমস্ত নীল বিক্রি করেও তাদের দাদন পরিশােধ হত না। তারা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ত।
২) নীল আদায়ের জন্য নীলকুঠির সাহেবরা নিরীহ চাষীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালাত। তাদের ধন সম্পদ লুট করত, এমনকি স্ত্রী-কন্যাকে অপহরণ করে অপমান করত।
৩) ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে ষষ্ঠ আইনে, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম ও সপ্তম আইনে দাদনি প্রথাকে সরকার সমর্থন জানায়, ফলে জনরােষ তীব্র হয়। একাদশ আইনে দাদন গ্রহণকারী কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করা হয়।
৪) নীলের দাম দেওয়ার সময় দাদনের কিস্তি ও সুদের টাকা নীলকররা কেটে রাখত। চাষিদের কাছ থেকে এইভাবে আদায় করা হত দস্তুরি।
৫) নীলকরদের বিরুদ্ধে সরকারি আদালতে নালিশ করার উপায় ছিল না। নীলকর সাহেবদের অনেকই ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হতেন। মফস্বলে ভারতীয় বিচারকরা শেতাঙ্গণ নীলকরদের বিচার করতে পারত না।
৬) নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের স্বরুপ সমকালীন পত্রপত্রিকা সমাচার দর্পণ, সমাচার চন্দ্রিকা, অক্ষয়কুমার দত্তে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, হরিশচন্দ্র মুখার্জির হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

নীল বিদ্রোহের সূত্রপাত : নীলকরদের অত্যাচারে বিরুদ্ধে কৃষককুল সংঘবদ্ধ হয়ে ১৮৫৯-৬০ খ্রিষ্টাব্দে যশোর প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয়। পরে দ্রুত বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে অবিভক্ত বাংলার নদিয়া, চব্বিশ পরগনা, দিনাজপুর, মালদা, বর্ধমান, মেদিনীপুর, হাওড়া প্রভূতি জেলায়। নীল বিদ্রোহে নেতা ছিলেন যশোর জেলার চৌগাছা গ্রামের দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস। বিশ্বাস ভ্রাতাদ্বয়কে বাংলাদেশের ওয়াট-টাইলর বলা হয়। যদিও বিশ্বাস ভ্রাতারা ছিলেন নীলকুঠীর প্রাক্তন কর্মচারী। এছাড়া যশােহরের রামরতন রায়, রাণাঘাটের পালচৌধুরী, শিবনিবাসের বৃন্দাবন সরকার ও বাঁশবেড়িতে বৈদ্যনাথ সর্দার ও বিশ্বনাথ সর্দার নীল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। প্রায় ৫০,০০,০০০ করেন কৃষক নীল বিদ্রোহে যোগ দেন।

নীল বিদ্রোহে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা : বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একাংশ নীল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এদের মধ্যে শিশির কুমার ঘােষ ও হরিশচন্দ্র মুখার্জির নাম সর্বাগ্রে উল্লেখ্য। শিশির কুমার ঘোষ গ্রামে গ্রামে ঘুরে নীলকরদের অত্যাচার সম্পর্কে রিপাের্ট পাঠাতেন এবং হরিশ্চন্দ্র তার হিন্দু পেট্রয়ট পত্রিকায় সেগুলি ছাপতেন। হরিশ্চন্দ্রের আর্থিক অবস্থা ভাল না হলেও তার ভবানীপুরের বাড়ির দরজা মফঃস্বল থেকে আগত উৎপীড়িত নীলচাষীদের জন্যে খােলা ছিল। তিনি তাদের মামলা চালাবার জন্যে উকিল-মােক্তারের খরচা যথাসাধ্য বহন করতেন। হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে তিনি নীল চাষীদের স্বপক্ষে বলিষ্ঠ সম্পাদকীয় লিখে সরকারের ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিবেক জাগাবার চেষ্টা করেন। দীনবন্ধু মিত্র নীল দর্পণ নাটকে নীলকরদের অত্যাচারে একটি কৃষক পরিবারের ধ্বংস হওয়ার অশ্রুসজল কাহিনী বর্ণনা করেন। নীল দর্পণ নাটক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিবেক জাগিয়ে তােলে এবং নীলচাষীদের স্বপক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। ইংলন্ডে নীলকরদের অত্যাচার সম্পর্কে প্রচারের জন্যে নীল দর্পণ নাটকের ইংরাজী অনুবাদ মানবদরদী পাদ্রী লং সাহেবের নামে প্রচারিত হয়। সম্ভবতঃ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই ইংরাজী অনুবাদ করেন। নীলকররা লং সাহেবের নামে মামলা করায় তার এক হাজার টাকা জরিমানা আদালত ধার্য করেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ এই জরিমানার টাকা জমা দেন। লং সাহেব মুক্ত হন। এছাড়া অক্ষয়কুমার দত্তের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

নীল বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য : (১) নীল বিদ্রোহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকোষ্ঠ উদাহরণ।
(২) হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষ নীল বিদ্রোহে গ্রামবাংলার শোষিত মানুষ যোগদান করেছিল।
(৩) নীল বিদ্রোহে কয়েকজন জমিদার, তালুকদার ও পত্তনি দার সক্রিয় ভাবে যোগদান করেন।
(৪) নীল বিদ্রোহ ছিল মূলত কৃষক বিদ্রোহ।
(৫) নীল বিদ্রোহ কেবলমাত্র অবিভক্ত বাংলাকে কেন্দ্রকরে সংগঠিত হয়।
(৬) শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বাংলার কৃষক ও শিক্ষিত বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ হতে সাহায্য করে।
(৭) নীল বিদ্রোহ নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়।

নীল বিদ্রোহের ফলাফল : ১৮৬০ খ্রীঃ ৩০ মার্চ মাসে ইনডিগাে কমিশন নিয়ােগ করে নীলচাষীদের অভিযোেগ সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করেন। নীল কমিশন রিপাের্ট দেয় যে- (১) নীলকরদের বিরুদ্ধে অভিযােগগুলি সত্য। (২) নীলকরদের ব্যবসায়ের পদ্ধতি তাত্ত্বিকভাবে দুর্নীতিপূর্ণ, বাস্তবভাবে ক্ষতিকারক এবং মূলতঃ ভ্রমসঙ্কুল। নীলচাষীরা নীলকরদের জমিদারীর খাজনা প্রদান বয়কট করে। ১৮৫৯ খ্রীঃ প্রজাস্বত্ব আইনের সুযােগে নীলকর জমির খাজনা বৃদ্ধির দ্বারা নীলচাষীদের দমনের চেষ্টা করায় খাজনা বয়কট করা হয়। ব্লেয়ার ক্লিং এর মতে, নীলকর জমিদাররা, দেশীয় জমিদাররা যাতে নীলচাষীদের সমর্থন না করে এজন্য প্রচার চালায় যে, খাজনা বন্ধ আন্দোলন দেশীয় জমিদারদের বিরুদ্ধেও চলবে। ব্লেয়ার ক্লিং এর মতে, কোন কোন দেশীয় জমিদার এতে ভীত হয়ে নীল চাষীদের পক্ষ ত্যাগ করে। ডঃ সুনীল সেনের মতে, দেশীয় জমিদাররা নীলকরদের সঙ্গে চাষীদের আপােষের ব্যবস্থা করে। আসলে নীল আন্দোলন দ্বারা দেশীয় জমিদারদের জমিতে নীলকরদের হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়ার ফলে জমিদারদের নীল চাষীদের খাজনা বন্ধ আন্দোলনে সমর্থনের জন্যে উৎসাহ ছিল না। ইতিমধ্য ছোটলাট গ্রান্ট ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে যশােহর ও নদিয়া পরিদর্শন করে নীলচাষীদের অভিযোগের সত্যতা পরীক্ষা করে। ফলে ১৮৬৮ সালে সরকার অষ্টম আইন দ্বারা নীল চুক্তি আইন রদ করে নীলচাষ-কে চাষিদের ইচ্ছাধীন করা হয়, এ বিষয়ে কোনরূপ জোরজবরদস্তি করা যাবে না। এর পরিণতিতে নীল বিদ্রোহের অবসান হয়। নীল বিদ্রোহ পরােক্ষভাবে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায়।

নীল বিদ্রোহের গুরত্ব : নীল বিদ্রোহের মাধ্যমে বাংলার কৃষক, জমিদার ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশিরকুমার ঘােষ তার অমৃতবাজার পত্রিকায় ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ মে তারিখে লেখেন যে, 'নীল বিদ্রোহই সর্বপ্রথম ভারতবাসীকে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রয়োজনিয়তা শেখায়'। সামন্ত প্রথা ও উপনিবেশবাদী শােষণের বিরুদ্ধে নীল বিদ্রোহ ছিল প্রথম সচেতন, সঙ্ঘবদ্ধ গণ আন্দোলন। এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং অশিক্ষিত কৃষকরাও যে সংঘবদ্ধ হতে পারে এই বিদ্রোহ তা প্রমাণ করে। এই বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নেতৃত্ব না দিলেও আংশিক সমর্থন দ্বারা সরকারকে ভীত সন্ত্রস্ত করতে সক্ষম হয়। হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদকের ভাষায়, 'এই বিদ্রোহে রায়তরা অসীম কষ্ট সহ্য করিয়াছে। কিন্তু প্রজারা ইহাতেও দমে নাই — যে স্বাধীনতার তাহাদের ধর্মত, আইনত ও জন্মগত অধিকার আছে, তাহা লাভের জন্য আন্দোলন হতে তারা বিরত হয় নাই'। নীলচাষ বন্ধ হওয়া ছিল এর আপাত পরিণাম। কিন্তু এর আসল গুরুত্ব হল জাতীয় আন্দোলনের পথে প্রথম পদক্ষেপ।

নীল বিদ্রোহের প্রকৃতি : নীল বিদ্রোহ নদিয়া, যশাের, দিনাজপুর, মালদা, বর্ধমান ও হাওড়ায় গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ড. চিত্তব্রত পালিত নীলবিদ্রোহকে বাঙালি জমিদারদের সঙ্গে নীলকরদের সংঘাত বলে বর্ণনা করেছেন। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের মতে “এ বিদ্রোহ স্থানিক বা সাময়িক নহে, উহার নিমিত্ত কত গ্রাম্য বীর ও নেতাদের উদয় হইয়াছিল ইতিহাসের পাতায় তাহাদের নাম নাই'।

মন্তব্য : নীল বিদ্রোহের সাফল্যে বাংলার কৃষককুল অসাধারণ নৈতিক শক্তি লাভ করে। ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসানের পর নীল বিদ্রোহ ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে প্রথম সংঘবদ্ধ গণআন্দোলন।