Advertise

জাতীয়তাবাদ কি এবং জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও উপাদান

জাতীয়তাবাদের (ইংরেজি: Nationalism) সংজ্ঞা নির্ধারণের পূর্বে জাতি (Nation) কথাটির সঙ্গে পরিচিতি প্রয়ােজন। কারণ জাতি, জাতীয়তাবাদ এবং জাতিরাষ্ট্র এই সব শব্দগুলি একে অপরের সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত। সারা বিশে রাজনৈতিক সচেতনার যুগে জাতি শব্দের গুরুত্ব বৃদ্ধি লাভ করেছে। সাধারণভাবে জাতি বলতে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারী ঐক্যবদ্ধ জনগােষ্ঠীকে বােঝায়। তবে জাতি শব্দটি এই অর্থে শুধুমাত্র ব্যবহার করলে জাতিত্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা অস্পষ্ট থেকে যাবে। জাতি গঠনে বেশ কিছু উপাদান থাকে যা জাতিত্বের শর্তের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিবেচ্য। ধর্ম, ভাষা, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রভৃতি বহু উপাদানই জাতি গঠনে সহায়তা করে।
জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও উপাদান
বাংলায় বহু অর্থে জাতি কথাটি ব্যবহৃত হলেও জাতি শব্দটিই ‘Nation' এর পারিভাষিক অর্থরূপে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। যেমন — জাতিসংঘ, ভারতীয় জাতি, জার্মান জাতি ইত্যাদি। রেনানের মতে, জাতি হল এক আত্মিক ও সাংস্কৃতিক সূত্রে আবদ্ধ জনসম্প্রদায়। রেনান জাতিত্বের দুটি শর্ত আলােপ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় জনগােষ্ঠীর সনাতন ঐতিহ্য ও তার পরম্পরা এবং প্রতিবেশী জনগােষ্ঠীর তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে টিকে থাকবার জন্য ঐক্যের অদম্য ইচ্ছার উপর গুরুত্ব আরােপ করেছেন। কতকগুলি মানসিক গুণ একটি জনগােষ্ঠীকে একক জাতিকাপে ঐক্যবদ্ধ থাকতে সক্ষম করে। এইসব গুণগুলি হল সমমানসিকতা, সহমর্মিতা এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন।

রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃত একটি জাতি হল জাতীয়তাবাদের ধারক। নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাসকারী কোন জনসমষ্টি যদি তাদের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হয় এবং ভাষা, ধর্মের দিক থেকে অভিন্ন থাকে এবং নানা বৈচিত্রের মধ্যেও মূলগত ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে তবেই তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনার সঞ্চার হয়। উক্ত জনসমষ্টির মনে যে জাতিগত চেতনা বর্তমান থাকে তার থেকেই জন্ম নেয় জাতীয়তাবাদ। তবে সর্বক্ষেত্রে পূর্বোক্ত সমস্ত শর্ত নাও থাকতে পারে। তবে কিছু কিছু বিষয়ে ঐক্যবােধ থাকা একান্ত আবশ্যক, তা না হলে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠতে পারে না। আধুনিক বিশ্বে জাতিত্বের নিরিখেই রাষ্ট্রের বৈধতা, শক্তি ঠিক করা হয়ে থাকে।

জাতীয়তাবাদের উপাদান ও বৈশিষ্ট্য : এই জাতিত্বের কয়েকটি প্রয়ােজনীয় বৈশিষ্ট্য আছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলঃ অখন্ড ভূখন্ড, ভাষাগত ঐক্য, সাহিত্যগত, প্রথাগত বৈশিষ্টা, সাধারণ সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের সার্বভৌমিকতা, প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি আস্থা, একই রাষ্ট্রের প্রতি জনসাধারণের আনুগত্য, সাধারণ মূল্যবােধ, জাতীয় স্বার্থের স্বপক্ষে কাজ, জাতীয় নীতির সাফল্য কামনা, বিদেশি শক্রর প্রতি বৈরী মনােভাব ইত্যাদি।

এই উপাদানগুলির সবকটিরই যে থাকার প্রয়ােজন আছে তা নয়। আংশিকভাবে থাকলেই জাতিত্বের শর্তগুলি পূরণ করা সম্ভব। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ভাষা, ধর্মের ও রাজ্যসীমানার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশের জনগণের মধ্যেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় জাতীয় চেতনা বা জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটেছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্রিটিশ শাসনাধীন পরাধীন ভারতের কথা তুলে ধরা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনকালে ধর্মীয়, ভাষাগত বৈচিত্র্যের মধ্যে থেকেও ভারতের জনগণের মনে অখন্ড ভারত চেতনা বা জাতীয়তাবােধ গড়ে উঠে। ভাষাগত, ধর্মগত, কৃষ্টিগত, প্রথাগত বিভিন্নতা ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারেনি। ইউরােপেও বিভিন্ন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছিল।

জাতীয়তাবাদের উদ্ভব : জাতীয়তাবাদের প্রথম উন্মেষ ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। তার পূর্বে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় জাতি শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় না। মধ্যযুগের জাতীয়তাবাদ ছিল সর্বজনীন। ঐতিহ্যবাদী যেমন অ্যান্থনি স্মিথ এবং গটফ্রিড হারডার প্রমুখের জাতিত্বকে আবহকালীন ও সার্বজনীন বলে মনে করেন। কিন্তু এই ধারণা অনেকের কাছেই গ্রহণযােগ্য বিবেচিত হয়নি। প্রকৃত রাজনৈতিক গুরুত্বসহ জাতীয়তাবাদী ধারার উদ্ভব ফরাসী বিপ্লবের সময় থেকে ধরা যেতে পারে। রেনেসাঁসের পর জাতীয়তাবাদের কিছুটা আভাস পাওয়া গেলেও নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের ধারণা এই জাতীয়তাবােধকে খর্ব করতে থাকে। ধর্মসংস্কার আন্দোলন এর মুক্ত জাতীয়তাবাদী ধারণাগুলি Counter Reformation এর সামাজিক দ্বন্দ্বের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।

আধুনিকতাবাদীরা যেমন এন্টনি গিডেন্স, এরিক হবসবম, বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন অ্যাজারসন প্রমুখরা সকলেই সহমত পােষণ করেন যে, পাশ্চাত্যের ধনতন্ত্রবাদ, অষ্টাদশ শতকের শেষার্থে ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব এবং ফরাসী বিপ্লব ইত্যাদি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলী জাতীয় চেতনার উন্মেষে ও জাতিরাষ্টের গঠনে বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছিল। কোথাও ধর্ম, কোথাও ভাষা, আবার কোথাও এক অখন্ড ভূখন্ডের অধিকার থেকে ঐক্যবােধ সাহিত্যগত, সংস্কৃতিগত ও ঐতিহাসিক স্মৃতির ঐতিহ্য এই জাতিরাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ধর্মসংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে জ্ঞানদীপ্তির যুগ পর্যন্ত, অর্থাৎ ফরাসী বিপ্লবের পূর্ববর্তী ইউরােপে রাষ্ট্রীয় চেতনা ও জাতীয়তাবােধ সঞ্চারে ধর্মের ভূমিকাই প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছিল। ঐ সময়কার বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলনগুলি এ ক্ষেত্রে উল্লেখের দাবী রাখে। এগুলি হল বােহেমিয়ার হাসীয় (Hussite) আন্দোলন, জার্মানীর লুথারীয় সংস্কার আন্দোলন, ইংল্যান্ডের হেনরীয় ধর্মসংস্কার আন্দোলন এবং ফ্রান্সের ক্যালভিনবাদের ধর্মীয় আন্দোলন। এইসব ধর্মীয় আন্দোলন আঠারাে উনিশ শতকের জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামাের ভিত্তি প্রস্তুত করতে সাহায্য করেছিল।

আবার অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে জাতীয় চেতনার ক্ষেত্রে ইউরােপীয় দেশগুলিতে ভাষা বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। সতেরাে শতকের পূর্বেই ফরাসী রাজা চতুর্থ হেনরি লিয়-র তার অভিজাতদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা ফরাসী বলেন, সুতরাং আপনারা আমার সঙ্গে থাকবেন। স্প্যানিশ ভাষার স্পেনে থাকবে, জার্মানরা জার্মানিতে। অষ্টাদশ শতকে ফরাসী বিপ্লবের সময় প্যারিসের স্বীকৃত সাহিত্য ভাষাকে রাষ্ট্রিয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, ফ্রান্সের বিভিন্ম উপভাষা তাদের কাছে সামন্ত সমাজের উচ্ছিষ্ট বলে বর্জিত হয়েছিল।

জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে মার্কসীয় মতবাদ : কার্ল মার্কস এবং এঙ্গেলস প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ অর্থে জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা শ্রেণীসংগ্রামের উপরই জোর দিয়েছিলেন। জাতিত্ব ৰা জাতিতত্ত্ব তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। তবে একথাও সত্যি যে, তারা এটা অবশ্যই উপলব্ধি করেছিলেন যে জাতীয় পরিবেশ ও ঐতিহ্য শ্রেণী হিসেবে গড়ে উঠবার এবং শ্রেণী সংঘর্ষের এক অনস্বীকার্য অঙ্গ। মার্কস এবং এঙ্গেলস অনেক সময় জাতি ও সমাজ এই শব্দদুটি সিভিল সােসাইটি (Civil Society) অর্থে ব্যবহার করেছেন। মার্কসের মতে, ধনতন্ত্রবাদের স্বার্থসাধন নিয়ে শ্রেণীসংঘর্ষের সূচনা হয় সিভিল সােসাইটিতে। রাষ্ট্র সে ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শ্রেণীটিরই রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে কাজ করে থাকে এবং তার পররাষ্ট্রনীতি ওই প্রভাবশালী শ্রেণীর স্বার্থের অনুকুলে পরিচালিত হয়। জাতীয় চরিত্র প্রসঙ্গ মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনায় অনেক সময়েই এসে গেলেও তারা জাতীয়তাবাদ অপেক্ষা সামাজিক শ্রেণীসম্পর্ক বিষয়েই অধিক আগ্রহী ছিলেন। তাদের মতে, অনেক জাতিই ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যায়। দ্রুত শিল্পায়নের পরিণতি হিসেবেই তা ঘটে থাকে। কিন্তু সব সভ্য দেশগুলিকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ঐক্যবদ্ধ ও একীভূত করা হল মার্কসীয় সর্বহারা আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।

তারা উভয়েই একথাও মনে করতেন যে, বুর্জোয়াদের বিচ্ছিন্ন স্বার্থ থাকতে পারে, কিন্তু শ্রমজীবী শ্রেণীর সম্পূর্ণভাবে জাতীয়তাবােধ পরিহার করে চলা কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে The Coinimunist Manifesto এর বিখ্যাত উক্তিটি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। শ্রমজীবী মানুষের কোন দেশ নেই, শ্রমজীবী মানুষের কোন জাতি নেই, তারা সমগ্ন শ্রমজীবী শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত-এই তাদের মূল পরিচয়। Workers of the world unite এই ছিল তাদের স্লোগান। গােড়ার দিকের মার্কসীয় চিন্তাবিদরা জাতীয়তাবাদের ধারণার বিবােধী ছিলেন। তারা সর্বহারা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু মার্কসীয় চিন্তাবিদদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণার পরিবর্তন ঘটান। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের অধিকাংশ অষ্টো মার্কসীয় চিন্তাবিদগণ ও লেখকগণ মনে করতেন যে সর্বহারাশ্রেণীর বিকাশের স্বার্থেই জাতি, জাতিত্বের ও জাতীয়তাবাদের একটা প্রয়ােজনীয়তা রয়েছে। লেনিন সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী হলেও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি তার সহানুভূতিশীল মনােভাব বজায় ছিল। তিনি রাশিয়ার জাতীয় সমস্যা এবং অক্টোবর বিপ্লবের মধ্যে এক দৃঢ় সংযােগ স্থাপনের ব্যাপারে বিশেষ পক্ষপাতী ছিলেন। পোল্যান্ডের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে লেনিনের অভিমত ছিল যে পােল্যান্ডের স্বাধীনতার অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে না নেওয়া হলে সমস্যার সমাধান হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। লেনিনের মতে, সমাজতন্ত্রের লক্ষণ হল সব জাতি ও ব্যক্তিকে একই পরিবারের ঐক্যে আবদ্ধ করা। কিন্তু এটি বাস্থবায়িত করতে হলে প্রত্যেককে তার নিজস্ব মত ও পথ অনুযায়ী চলতে দিতে হবে। তাই লেনিন এশিয়ার মুক্তিকামী আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।