PayPal

উদারনীতিবাদের উদ্ধব, বৈশিষ্ট্য ও প্রসার

author photo
- Sunday, August 18, 2019
ফরাসী বিপ্লব ফ্রান্স তথা বিশ্বের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বিপ্লব নতুন ভাবধারার উন্মেষ ঘটিয়েছিল সমগ্র ইউরােপে। উনবিংশ শতকে দুটি পরস্পরবিরােধী প্রবণতার মধ্যে সংঘাত দেখা দিয়েছিল। এই প্রবণতা দুটি হল- (১) পরিবর্তনমুখী প্রবণতা এবং (২) পরিবর্তন-বিরােধী প্রবণতা। পরিবর্তনমুখী প্রবণতার জন্ম দিয়েছিল ফরাসী বিপ্লবের মুক্ত পন্থার আদর্শ এবং পরিবর্তন বিরােধী প্রবণতা এই আদর্শের বিরুদ্ধতা করে চলেছিল। এই পরিবর্তনমুখী প্রবণতা ইউরােপে তিনটি ভাবধারার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এগুলি মধ্য একটি হল উদারতন্ত্রবাদ বা উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ (ইংরেজি: Liberalism)।
Liberalism Origin
উদারনীতিবাদ সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মােটামুটিভাবে উদারনীতিবাদ বা উদারতাবাদ বলতে বােঝায় যে, সকল প্রকার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের অবসান এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তি জীবনের সার্বিক বিকাশকে সুনিশ্চিত করা এবং বৃহত্তম সংখ্যার সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন করাই উদারনীতিবাদের মূল কথা। সঠিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এবং নিরীক্ষিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন করাই উদারনীতিবাদের চরম লক্ষ্য। অর্থাৎ এর মূল কথা হল ব্যক্তির স্বশাসন। প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকা নির্বাচনের, চিন্তা ও মত প্রকাশের, দলবদ্ধ হওয়ার এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে।

উদারতবাদ বা উদারনীতিবাদ উদ্ধব ও প্রসার : ১৮১৫ থেকে ১৮৪৯ খ্রীষ্টাব্দের অন্তর্বর্তী সময়কে David Thomson তাঁর Europe since Napoleon গ্রন্থে আঞ্চলিক অন্তবিপ্লবের যুগ বলে অভিহিত করেছেন। (The generation between 1815 and 1849....was a time of endemic civil war) ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রক্ষণশীল পুরােনাে ব্যবস্থা ইউরােপে পুনরায় ফিরে এলে ফরাসী বিপ্লব প্রসূত নতুন ভাবধারার সঙ্গে এর সংঘাত দেখা দেয়। ইউরোপের দুই পরস্পর বিৰােধী শক্তির সংঘাত ইউরােপের ইতিহাসকে নতুন দিকে মােড় দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে রক্ষণশীলবাদী শক্তিগুলি প্রচণ্ড আঘাতের সম্মুখীন হয়েছে, এবং ইউরােপের প্রায় সর্বত্র নুতন সমাজের প্রয়ােজন অনুসারে নুতন ধরনের সরকার গড়ে উঠতে চলেছে।

১৮১৫ থেকে ১৮৫০ খ্রীষ্টাব্দের ইউরােপের ইতিহাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রগতিপন্থী ও প্রগতি বিরােধী শক্তির মধ্যে লড়াই। ফরাসী বিপ্লব উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচার করে ইউরােপের দেশগুলির জনগণের মনে আশা আকাঙ্খার সৃষ্টি করেছিল স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্রগুলিতে গণতন্ত্রের জন্য জোরালাে দাবী উঠেছিল। আবার জার্মানী, ইতালির ন্যায় দেশে রাষ্ট্রীয় ঐক্য আন্দোলন প্রসার লাভ করেছিল। আবার বেলজিয়াম, গ্রীস, নরওয়ে, পােল্যান্ড, আয়ারল্যান্ডে জাতীয় ঐক্য ও স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। গ্রীস ও বেলজিয়ামে উদারনীতিবাদ ও জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হয়েছিল। এই উভয় দেশ গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিল।

উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদের বৈশিষ্ট্য : লিবারেলিজম বা উদারতাবাদের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য হল। প্রথমতঃ উদারনীতি শাসক শ্রেণীর স্বৈরাচারী নিরঙ্কুশ ও অবাধ ক্ষমতার ঘােরতর বিরােধী ছিল। সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শাসকের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল উদারনীতিবাদের লক্ষ্য। দ্বিতীয়তঃ উদারতন্ত্রবাদ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জনগণের বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল। তৃতীয়তঃ উদারনীতি আইনের চোখে সকল মানুষই সমান এই আদর্শের প্রতি আস্থাশীল ছিল। চতুর্থতঃ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণমুক্ত গণ উদ্যোগ হল উদারনীতি মতবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি মানুষের যেমন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে তেমনি তাদের যে কোন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও কোনরকম রাষ্ট্রীয় বাধা থাকবে না। ষষ্ঠতঃ উদারতাবাদ আইনসভার সার্বভৌম ক্ষমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এই আইনসভা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে চূড়ান্ত ক্ষমতার অবকারী হবে। উদারতন্ত্রবাদ নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিল। কারণ এই ধরনের সরকার বা শাসনব্যবস্থা আইনসভার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে স্বৈরাচারী বা সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না।

কিন্তু উদারতন্ত্রবাদের উগ্র রূপটি প্রকাশ লাভ করেছিল গণতন্ত্রবাদের মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্রবাদীরা গণ সার্বভৌমত্বের তত্ত্বে আস্থাশীল ছিল। এই তত্ত্বের প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়েছিল রুশোর General will বা জনসাধারণের ইচ্ছা তত্ত্বের মধ্যে। উদারতন্ত্রবাদীরা কিন্তু এই তত্ত্ব প্রচার করেনি। উদারতন্ত্রবাদীরা গণতন্ত্রবাদের সার্বজনীন ভোটাধিকার নীতি প্রয়ােগও মেনে নিতে পারেনি। আইনসভার নির্বাচনে সমস্ত জনগণই ভােটে অংশগ্রহণ করবে তা উদারনীতিবাদের সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। তাই ফ্রান্সে ১৭৯১ খ্রীষ্টাব্দের উদারনৈতিক সংবিধানে সম্পত্তিশালী ব্যক্তিদের মধ্যেই ভােটাধিকার সীমাবদ্ধ থাকবে তা মেনে নেওয়া হয়েছিল।

উদারনীতিবাদের সাফল্য ও ব্যর্থতা : ইউরােপে ১৮১৫ থেকে ১৮৫০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে লিবারেলিজম বা উদারতাবাদের সাফল্য ছিল সীমিত। একমাত্র গ্রিস ও বেলজিয়ামে স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া অন্যান্য স্থানে উদারতাবাদ পরাক্রমশালী রাজতান্ত্রিক শক্তি ও তার সেনাবাহিনীর কাছে পরাস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, উদারনীতিবাদের সমর্থকগণ কোন বাস্তব আদর্শবাদ জনগণের কাছে স্থাপন করতে পারেনি। রাষ্ট্রের গঠন সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল এবং জনসাধারণের কাছে তারা কোনরকম কার্যকরী পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য উপস্থাপিত করতে পারেনি। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় জার্মানি ও ইটালীর উদারনৈতিক আন্দোলনে। ইটালীর ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্র গঠন সম্পর্কে ম্যাসিনি ও তার সমর্থকগণ বাস্তবতা বর্জিত রাজনীতিজ্ঞানের পরিচয় রেখেছিল। জার্মান উদারনীতিবিদরা ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টে কোন কার্যকরী গঠনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

পাঠ্যসূচী :
1. নীহারেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় - আধুনিক ইউরােপ সমীক্ষা
2. প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় – আন্তর্জাতিক সম্পর্ক্সে ইতিহাস
3. অলক কুমার ঘােষ – আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বর্তমান বিশ্ব (১৮৭০-২০০৪)।
4. David Thomson - Europe Since Napolean (বঙ্গানুবাদ-দীপক মুখােপাধ্যায়)