উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধ ১৯৫০

- August 22, 2019
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর প্রথম বড় যুদ্ধ হল কোরিয়ার যুদ্ধ (২৫ জুন ১৯৫০–২৭ জুলাই ১৯৫৩)। ঠাণ্ডা লড়াইকে কেন্দ্র করে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধেই সর্বপ্রথম সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সৈন্যবাহিনী আক্রমণকারী দেশের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মহাযুদ্ধের পর অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে রাশিয়া উত্তর কোরিয়া দখল করে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন সৈন্যবাহিনীর অধীনে আসে। কিন্তু কিছুদিন পর সিংগম্যান রী (Syngman Rhee) এর নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়াকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ এ পরিণত করে আমেরিকানরা দক্ষিণ কোরিয়া ত্যাগ করে। অন্যদিকে রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার পিপলস ডেমােক্র্যাটিক রিপাবলিক গঠন করে। এই সরকারের নেতৃত্ব দেন কিম ইল সুঙ্গ (Kim IL Sung)। ৩৮ ডিগ্ৰী সমান্তরাল রেখাকে দুই কোরিয়ার মধ্যে বিভাজন রেখা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
korean war 1950
১৯৫০ সাল পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এই বছরে দুই কোরিয়ার মধ্যে হঠাৎই সংঘর্ষ শুরু হয়। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কি ছিল তা খুঁজে বের করা খুবই কঠিন। কোন দেশ প্রকৃত আক্রমণকারি তাও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। যাই হােক শেষপর্যন্ত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সাম্যবাদী উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী হিসাবে সার্বস্ত করে। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া দাবী করে যে দক্ষিন কোরিয়ার সৈন্যবাহিনী প্রথম ৩৮ ডিগ্রি সমান্তরাল রেখা লঙঘন করে। সােভিয়েত বিদেশমন্ত্রী বলেন যে, এই ঘটনা হল জনগণতান্ত্রিক কোরিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে দক্ষিণ কোরিয়ার সৈন্যবাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ।

১৯৫০ সালে ২৫ জুন উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করে। সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জাতিপুঞ্জের সেক্রেটারি জেনারেল এর কাছে ঘটনাটি জানায়। আমেরিকা অভিযোগ করে যে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করেছে এবং শান্তি ভঙ্গ করা হয়েছে। সেই দিনই নিরাপত্তা পরিষদ আলােচনায় বসে। প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় যে, অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধ করতে হবে এবং উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীকে পশ্চাৎপদ অপসারণ করে ৩৮ ডিগ্রি সমান্তরাল রেখায় ফিরে আসতে হবে। পরের দিন কোরিয়া সংক্রান্ত জাতিপুঞ্জ কমিশন জানায় যে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীর অগ্রগমন এক বিপজ্জনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। ২৭শে জুন নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক জাতিপুঞ্জের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং উত্তর কোরিয়ার আক্রমণকে বাধা দেওয়ার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে আহ্বান জানায়।

বস্তুত পক্ষে আমেরিকা দূর প্রাচ্যে কমিউনিস্ট প্রগতি রােধ করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার সিংগম্যান রী সরকারকে সাহায্য করার জন্য আমেরিকা বিমান ও নৌবাহিনী পাঠায়। ফরমােজাকে রক্ষা করার জন্য আমেরিকা তার সপ্তম নৌবহরকে পাঠানাের নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে ৭ই জুলাই নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বাহিনী পাঠানাের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ খ্যাত মার্কিন সেনাপতি ডগলাস ম্যাক আর্থারকে এই বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমেরিকা ছাড়া আরও পনেরটি রাষ্ট্র জাতিপুঞ্জের বাহিনীতে যােগ দেয়।

চীন তৎক্ষণাৎ তার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী উত্তর কোরিয়ায় পাঠায়। এদের সংখ্যা ছিল প্রায় সাত লক্ষ। এরা উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করে। এই চীনাবাহিনী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল যার অধিকাংশই রাশিয়া কর্তৃক পাঠানাে হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়াকে ধ্বংস করার জন্য রাশিয়ার বিমান পাঠানাে হয়। সুতরাং দুপক্ষই যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল। দুবছর ধরে যুদ্ধ চলার পরও কিন্তু যুদ্ধের কোন নিষ্পত্তি হয়নি। উভয়েই একে অপরের এলাকায় বারবার প্রবেশ করতে থাকে। চীনাবাহিনী রাষ্ট্রসংঘের বাহিনীকে পর্যদস্ত করে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওল অধিকার করে। জাতিপুঞ্জ বাহিনী আবার তা পুনরুদ্ধার করে। জেনারেল ম্যাক আর্থার চীনের বিরুদ্ধে প্রতিশােধ নেবার হুমকি দেন। আমেরিকা তাকে সরিয়ে নেন। যাই হােক ১৯৫১ সালের ১১ই জানুয়ারী সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ যুদ্ধ বিরতি ঘােষণার প্রস্তাব করে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সমগ্ন কোরিয়ার ঐক্য ও কমিউনিস্ট বিরােধী সরকার গঠন সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত আমেরিকা কমিউনিস্ট আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব নিলে তিনি যুদ্ধ বিরতিতে সম্মতি দেন।

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর পানমুনজন নামক স্থানে ১৯৫৩ সালের ২৭শে জুলাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩৮ ডিগ্রী দ্রাঘিমা রেখা বরাবর উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া বিভক্ত হয়। উভয় পক্ষই যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে নিতে রাজী হন এবং তা ৬০ দিনের মধ্যে কার্যকারী হবে বলে স্থির হয়। ভারতের সভাপতিত্বে একটি নিরপেক্ষ কমিশনের উপর বন্দী বিনিময়ের ভার দেওয়া হয়। এই কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা ছিল পােল্যান্ড, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া। তবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক বিবাদে কমিশনের কাজে ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। কিন্তু ভারত ও অন্যান্য সদস্যদের ধৈর্য ও উদারতার ফলে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বিনিময়ের কঠিন কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছিল। যুদ্ধ বিরতি চুক্তি অনুযায়ী উভয়পক্ষের প্রতিনিধিরা বিদেশী সৈন্য অপসারণ ও কোরীয় সমস্যার সমাধানের জন্য একটি অধিবেশনে বসবে। এই অধিবেশন ১৯৫৪ সালে জেনেভা শহরে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এতে কোরিয়ার ঐক্যের প্রশ্নের কোন মীমাংসা করা হয়নি।

কোরিয়া যুদ্ধের ফলাফল : কোরিয়ার যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চিন একটি বৃহৎ শক্তির মর্যাদা লাভ করে। এই যুদ্ধে চিনের ভূমিকার মধ্য দিয়ে চিনের সামরিক শক্তি ও দক্ষতার বিষয়টি সম্পর্কে দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। সমগ্র এশিয়া ও তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলির সামনে চিনের ভাবমূর্তি যথেষ্ট উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কোরিয়ার যুদ্ধের সময় জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে ভারতবর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে চিনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। যুদ্ধবন্দি হস্তান্তর সংক্রান্ত যে কমিটি গঠিত হয় ভারতবর্ষ তার চেয়ারম্যান হিসেবে মনােনীত হয়। কাজেই ১৯৫০ এর দশক ভারত ও চিন, এশিয়া ও আফ্রিকার মুক্তিকামী দেশগুলির নিকট আদর্শস্থানীয় হয়ে ওঠে।

Advertisement
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মর্গেন থাউ Politics among Nations গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে কোরিয়ার যুদ্ধের দরুন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গুরুত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি পায়। কোরিয়ার যুদ্ধ সংক্রান্ত বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদ বা General Assembly-তে গৃহীত হয়।

কোরিয়ার যুদ্ধের দরুন আমেরিকার সঙ্গে দূর প্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের সূচনা হয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যেতে পারে যে ১৯৫১ সালে আমেরিকা জাপানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করে জাপানের ওপর মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটায়। জাপানের নতুন সরকার আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক স্তরে নিরাপত্তামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী স্থির হয় যে আমেরিকার সেনাবাহিনী জাপানের সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়কাল পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবে। কোরিয়ার যুদ্ধের আগে জর্জ কেনান জাপান থেকে আমেরিকান বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন কিন্তু পরে তিনি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন এই যুক্তিতে যে জাপানে আমেরিকার বাহিনীর উপস্থিতি ও অঞ্চলের সামরিক সুরক্ষার দিক থেকে বিশেষ প্রয়ােজনীয় ছিল। প্রায় অর্ধশতক আমেরিকা জাপানের সাম্রাজ্যবাদের প্রসার রােধের জন্য চিনকে গড়ে তােলার চেষ্টা করে। কিন্তু ১৯৫০-এর পর আমেরিকা জাপানের সঙ্গে যৌথভাবে চিনের কমিউনিজমের প্রসার রােধে সক্রিয় হয়।

ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী কমিউনিস্ট বিরােধী জোট গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড ও ফিলিপাইন-এর সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এই কাঠামােকে একটি আরও সম্প্রসারিত করার জন্য Manila pact বা South East Asia Treaty Organisation (SEATO) গড়ে তােলেন। এই চুক্তি NATO-র অনুরূপ দূরপ্রাচ্যের একটি চুক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শান্তি ও সংহতি বিপন্ন হলে SEATO-র সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রগুলি পারস্পরিক আলােচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান কল্পে মধ্যে সচেষ্ট হবেন বলে স্থির হয়।

কোরিয়ার যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমেরিকা ভিয়েতনামে অনুপ্রবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইওরােপেও আমেরিকা সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে এবং পশ্চিম জার্মানির শক্তি বৃদ্ধি করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কাজেই কোরিয়ার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাম্যবাদের বিরােধিতার ক্ষেত্র অনেক বেশি সম্প্রসারিত হয়। কোরিয়ার যুদ্ধ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ নীতির ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে টুম্যানের কমিউনিজমকে প্রতিরােধ করার নীতির ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের সময় কোরিয়ার যুদ্ধের প্রশ্নটিকে রিপাবলিকান দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচার হিসেবে কাজে লাগান বিরােধীপক্ষ।
Advertisement