PayPal

সাম্রাজ্যবাদ কি এবং নয়া সাম্রাজ্যবাদের উদ্ধব ও তত্ত্ব

author photo
- Friday, August 16, 2019
সাম্রাজ্যবাদ : সাম্রাজ্যবাদ বা Imperialism রাজনীতির পরিভাষায় একটি নেতিবাচক ও নিন্দাসূচক শব্দ। শব্দটির সাধারণ অর্থ হল, এক রাষ্ট কর্তৃক অন্য এক অপেক্ষাকৃত অনুন্নত, দুর্বল রাজ্য গ্রাস করার চেষ্টা। উদ্দেশ্য ছিল, নিজ রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি করা এবং পর রাজ্যের অধিবাসীদের উপর সর্ব দিক দিয়ে আধিপত্য স্থাপন এবং শাসনের নামে শােষণ করা। সাম্রাজ্যবাদ হল একটি রাজনৈতিক ধারণা ও নীতি যা সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপকে সদাসর্বদা উৎসাহ প্রদান করে। সাম্রাজ্যবিস্তার, নতুন নতুন স্থান দখলের নীতি, নিজ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক সীমানা বৃদ্ধি করা এবং অন্য রাজ্য বা জাতির উপর শাসন কায়েম করার লক্ষ্য থেকেই সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদের ভয়াবহ পরিণতি হল সাম্রাজ্যবাদ। ১৮৩০-১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে জুলাই রাজতন্ত্রের সময় ফরাসী শব্দ অ্যাপিরিয়ালিজম সাম্রাজ্যবাদের সমার্থক শব্দ হিসেবে প্রথম ব্যবহৃত হয়। এই শব্দটি 'Bonapartism' এর প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের সংস্করণের অভিধানে একটি নতুন শব্দ Anti Imperialism এর আলোকেও Imperialism শব্দটির পরিবর্তনের কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
Origin imperialism
নয়া সাম্রাজ্যবাদ : প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের সাম্রাজ্যবাদ মূলত ভৌমিক অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ইউরােপীয় দেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী স্পৃহার লক্ষ্য শুধু ভূমি দখল নয়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে সেই অঞ্চলের অর্থনীতি, প্রজাশক্তি ইত্যাদি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা। সাম্রাজ্যবাদী শােষণের এই আধুনিক সাম্রাজ্যবাদকে নব সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে ইউরােপীয় দেশগুলি নানা আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে নতুন করে সাম্রাজ্য বিস্তার অথবা ঐসব অঞ্চলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব স্থাপনের প্রতিযােগিতায় নেমে পড়ে। একে ঐতিহাসিকরা নব সাম্রাজ্যবাদ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ একে নব উপনিবেশবাদ (Neo-Colonialism) বলেছেন।

নয়া সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভবের কারণ ও ফলাফল

১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দের পরবর্তীকালে ইউরােপের দেশগুলির মধ্যে সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দিয়েছিল। ১৮৭০ থেকে ১৯১৪ এই সময়কালে এক নয়া সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ইউরােপে দেখা যায়। ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলি আফ্রিকা ও এশিয়ায় উপনিবেশ বিস্তারের খেলায় মেতে উঠে। এই নয়া সাম্রাজ্যবাদের পেছনে এই কারণগুলি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে সাম্রাজ্যবাদের যুগ হিসাবে অভিহিত করা হয়।

অর্থনৈতিক কারণ : ১৯০২ খ্রীঃ দক্ষিণ আফ্রিকায় বুয়াের যুদ্ধের বিরােধিতা করে ব্রিটিশ উদারনৈতিক অর্থনীতিবিদ জে. এ. হবসন তার সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism - A study) গ্রন্থটি সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন যে, সাম্রাজ্যবাদ হল একটি সচেতন রাষ্ট্রনীতি ও একচেটিয়া ধনতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মূলধনী শ্রেণী শ্রমিকদের ঠকিয়ে অত্যধিক মুনাফা অর্জন করে। তাদের হাতে মাত্রাতিরিক্ত সঞ্চয়ের ফলে প্রভূত পরিমাণে মূলধন স্তূপকৃত হয়। সুতরাং এই মাত্রাতিরিক্ত মূলধনের লগ্নির ক্ষেত্র অনুসন্ধানের জন্য সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে। উপনিবেশ বিস্তার করে সেখানে মুলধন বিনিয়ােগ করে আরও মুনাফা বৃদ্ধির চেষ্টা করে। এজন্য তারা নিজ নিজ দেশের সরকারকে উপনিবেশ দখলের জন্য চাপ দিতে থাকে। উপনিবেশের কাচামাল ও বাজারকে একচেটিয়া দখল করে তারা অধিকতর বিত্তশালী হয়ে গেছে। সুতরাং নব সাম্রাজ্যবাদের মূল অর্থনৈতিক শিকড় ছিল উপনিবেশে লগ্নির জন্য অতিরিক্ত মুলধনের চাপ।

এর প্রতিকারের উপায় হিসেবে হবসন বলেন যে, অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংস্কার ও ধনের সুষম বণ্টন প্রবর্তন কর প্রয়ােজন। ধনবন্টনের বৈষম্য দূর করতে পারলে দরিদ্র জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা উদ্বৃত্ত ভোগ্যপণ্য ক্রয় করতে পারবে। সেক্ষেত্রে উন্নত ভোগপণ্য বা মুলধন পাহাড় সমান হবে না। তখন নতুন নতুন বাজারের অনুসন্ধানের প্রয়ােজনীয়তা কমে যাবে ফলে সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতাও কমে যাবে।

সাম্রাজ্যবাদ উদ্ধবের জন্য হবসন যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে সমালােচনাও হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের পর শিল্প মালিকদের মুলধন বেড়ে যাবার ফলেই সাম্রাজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে বলে হবসন অভিমত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পূর্বেও তাে সাম্রাজ্যবাদ ছিল। এর পেছনে কি কারণ তার ব্যাখ্যা কিন্তু হবসন দেন নি। তার মতবাদের এই ক্রটি থাকা সত্ত্বেও একথা অনস্বীকার্য যে, স্তুপীকৃত মূলধন এবং কাঁচামাল ও বাজার দখলের অভিপ্রায়ই নয়া সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিশালী করেছিল। শিল্পবিপ্লব এবং পুঁজিবাদের বিকাশ সাম্রাজ্যবাদের অগ্রগতির সহায়ক হয়েছিল।

বিখ্যাত রুশ কমউনিস্ট নেতা ভি. আই. লেনিন রচিত 'Imperialism : the Highest Stage of Capitalism' (১৯১৬) নামক গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাকে আরও বিশদভাবে তুলে ধরেন। লেনিনের মতে, ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদের ভিতরেই সাম্রাজ্যবাদের বীজ নিহিত আছে। পুঁজিবাদী দেশগুলির বৈদেশিক নীতি পুঁজিবাদীশক্তির অঙ্গুলি হেলনেই পরিচালিত হত। অধিক মুনাফার আশায় শিল্প মালিকরা দেশের প্রয়ােজনের মাত্রাতিরিক্ত শিল্পপণ্য উৎপাদন করত। এই উদ্বৃত্ত পণ্য বিক্রয় এবং বাজার দখলের জন্য পুঁজিবাদী উপনিবেশ দখল করত। যেহেতু বিশ্বে উপনিবেশের সংখ্যা সীমিত, সেহেতু প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশ উপনিবেশ দখল করার চেষ্টায় মত্ত হওয়ায় তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশেষে যুদ্ধের আকার নিয়েছিল। এ ব্যাপারে লেনিনের অভিমত হল, সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের অন্তিমপর্ব এবং সমাজতন্ত্রের আগমনের পূর্ববর্তী পর্ব। বৈবিভাবাপন্ন পুঁজিবাদ দেশগুলাের সংঘাত বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনবে।

লেনিনের মতে, বিত্তশালী বুর্জোয়া শ্রেণীরা উপনিবেশ দখলের পর সেই অনগ্রসর, দরিদ্র দেশের শ্রমিকদের শােষণ করে, উৎপাদনের পরিমাণ অত্যধিক বাড়িয়ে তােলার চেষ্টা করে। উপনিবেশের শ্রমিকশ্রেণী বেশি আয়ের আশায় এই শােষণের সামিল হয়। বিত্তশালী বুর্জোয়া শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীর একটি মুখ্য অংশকে উপনিবেশ থেকে মুনাফার কিছু অংশ উপটৌকন দেয়। এ ফলে সেই শ্রমিকরা তাদের বৈপ্লবিক প্রবণতাকে বিসর্জন দিয়ে ধনী বুর্জোয়াদের সহযােগী হয়। কিন্তু শ্রমিক ভুলে যায় যে তাদের এই সুবিধা হল নিতান্তই সাময়িক। একটা সময়ে এর অবসান ঘটবে। সীমিত উপনিবেশের দখলের প্রতিদ্ধন্ধিতার অনিবার্য পরিণতি হবে যুদ্ধ। আর তখন শ্রমিকদের দুর্দশার অন্ত থাকবে না। রোজা লুক্সেমবার্গ তার Accumulation of Capital গ্রন্থে (১৯১৩) লেনিনের মতই একই অভিমত ব্যক্ত করেন।

কোনাে কোনাে ঐতিহাসিক যেমন, ডেভিড টমসনের মতে, লেনিনের এই যুক্তি কয়েকটি অসুবিধাজনক সত্যকে উপেক্ষা করেছে। লেনিনের তত্ত্বের বিরুদ্ধে বলা যায় যে ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলির বিদেশে মূলধন বিনিয়ােগের অধিকাংশ ঔপনিবেশিক রাজ্যে হয়নি, মূলতঃ হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা ও রাশিয়ায়। সুতরাং উদ্বৃত্ত মূলধনের বিনিয়ােগের জন্যই উপনিবেশ গড়ে ওঠে, এই যুক্তি সবসময় গ্রাহ্য নয়। তাছাড়া এ প্রসঙ্গে উল্লেখযােগ্য, ডেনমার্ক ও সুইডেনের মত জীবনযাত্রায় মান্ননত দুটি দেশের কোন উপনিবেশ ছিল না। আবার ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের বিস্কৃত ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ছিল। কিন্তু এই দুই দেশের শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান অনুন্নত ছিল। তথাপি লেনিনের মতবাদের খুটিনাটি ত্রুটি বিচ্যুতি বাদ দিলে একথা স্বীকার্য যে, সাম্রাজ্যবাদ বিস্ফোরণের পেছনে শিল্পবিপ্লব, মূলধনী শ্রেণীর মূলধন বিনিয়ােগ ও বাজার দখলের আগ্রহই বিশেষভাবে কাজ করেছিল।

রাজনৈতিক কারণ : ডেভিড টমসন মনে করেন যে, সামগ্রিক বা মৌলিক কোনাে অর্থেই সাম্রাজ্যবাদের শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা করা চলে না। অর্থনৈতিক শক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ কথা স্বীকার্য যে, উপনিবেশ বিস্তারের জন্য অর্থনীতি ছাড়াও অন্য আরাে কারণও থাকতে পারে। ঐতিহাসিক গর্ডন এ. ক্রেগ অথনৈতিক উপাদানের চেয়ে রাজনৈতিক উপাদানের গুরুত্ব বেশি বলে মনে করেন। তিনি বলেছেন যে, ইউরােপীয় রাষ্ট্র উপনিবেশগুলিতে প্রকৃত রাজনৈতিক ও সামরিক সুযোেগ সুবিধার কথা। জনগণের মধ্যে প্রচার না করে সেখানকার অর্থনৈতিক সুযােগ সুবিধার কথা প্রচার করত নিজেদের কাজের সমর্থনে। কেননা এতে জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া সহজ ছিল। তিনি আরও বলেন, বৃহৎ রাষ্টগুলির কর্ণধার সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণে অর্থনীতির প্রয়ােজনের চেয়ে রাজনীতির প্রয়ােজনকেই প্রধান বলে বিবেচিত করতেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে ফ্রান্স প্রাশীয় যুদ্ধের (১৮৭০-৭১) পরের রাজনৈতিক পরিচিতি বিচার করা যেতে পাবে। এই যুদ্ধের পর ইউরােপীয় জাতিগুলির মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের একটি মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠে এবং তা হল-বৃহৎ রাষ্ট্রগুলি শুধুমাত্র নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে পারলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি তাদের ভয় করে চলবে এবং শক্তির মর্যাদা দেবে। অতএব এক্ষেত্রে উপনিবেশ বিস্তার হল বিজিত রাষ্ট্রের সমীহ আদায় করা এবং নিজ রাষ্ট্রের মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধি।

গর্ডন ক্রেগের মতানুসারে সাধারণভাবে এ কথা বলা যায় যে, অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থের সহাবস্থান দেশকে সাম্রাজ্যবাদী করে তােলে, কোনাে কোনাে দেশ, যেমন ইটালী ও রাশিয়াতে অর্থনৈতিক উপাদানের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রভাব বেশি ছিল। তবে এ সাধারণীকরণ সর্বক্ষেত্রে প্রযােজ্য নয়।

মিশনারীদের ধর্মপ্রচারের আগ্রহ : ঔপনিবেশিক বিস্তারে খ্রীষ্টান মিশনারীদেরও বিশেষ ভূমিকা আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ব্রিটিশ ধর্মপ্রচারক ডেভিড লিভিংষ্টোন, স্ট্যানলি ও স্কট, ফরাসী ধর্ম প্রচারক ল্যাভেজেরিক প্রমুখ আফ্রিকা যান। মিশনারীরা অনগ্রসর সব দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তারা সাম্রাজ্যবাদের পথ অনেক প্রশস্ত করে দিয়েছিল। এই মিশনারীদের অনুসরণ করেছিল বিভিন্ন দেশের বণিকের দল।

অভিযান স্পৃহা : সাম্রাজ্যবাদের বিকাশে আরো একটি উপাদান হল প্রশাসক ও সৈনিক। জটপাকানাে প্রশাসনিক অবস্থা থেকে শৃঙ্খলা ও দক্ষ প্রশাসন ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক প্রশাসকগােষ্ঠী তৎপর ছিল। এদের মধ্যে মিশরের লর্ড ক্রেমার উত্তমাশা অন্তরীপে লর্ড মিলনারের এবং জার্মান পূর্ব আফ্রিকায় কার্ল পিটার্সের নাম উল্লেখযােগ্য। এরা নিজ উদ্যোগে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য উপনিবেশ স্থাপনের আগ্রহ দেখা দেয়। সাম্রাজ্য স্থাপন বড় বড় শক্তিগুলির কাছে শক্তি জাহির করার ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যই এই সাম্রাজ্যবিস্তার একান্ত প্রয়ােজন ছিল।

সাম্রাজ্যবাদের ফলাফল : সাম্রাজ্যবাদের ফলাফল ছিল - ১)সাম্রাজ্যবাদীরা যে অর্থনৈতিক শােষন শুরু করেছিল তাতে উপনিবেশিক দেশগুলির অর্থনৈতিক কাঠামাে একেবারেই ভেঙে পড়ে। ২) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির মধ্যে উপনিবেশ স্থাপনে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দিতা বিশ্ব রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তোলে, যার ফলশ্রতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ৩) সাম্রাজ্যবাদের ফলে রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয়তাবােধের স্ফুরণ ঘটলে উপনিবেশিক দেশগুলিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

মন্তব্য : ডেভিড টমসনের মতে কােনাে দেশ সাম্রাজ্যবাদী হবে কিনা তা নির্ভর করে বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, দেশপ্রেমিক, সাংবাদিক বা রাজনীতিবিদদের ছােট ছােট গােষ্ঠীর সক্রিতার উপর। তারা হয়তাে জাতীয় নিরাপত্তা চায়, স্বয়ম্ভরতা চায়, অথবা অর্থনীতির উন্নতি চায়। তাছাড়া ঔপনিবেশিকতার ঐতিহ্য আছে এমন দেশই সাধারণতঃ তাড়াতাড়ি উপনিবেশের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। এর দৃষ্টান্ত ব্রিটিশ, পর্তুগীজ, ফরাসী, ওলন্দাজ প্রভৃতি জাতিসমুহ। জার্মানী ও ইটালীর ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য ছিল না। তাই ঔপনিবেশিক রঙ্গমঞ্চে তাদের আবির্ভাব দেরিতে হয়েছিল।

সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়াও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য উপনিবেশের বন্দর ও সামরিক ঘাঁটি অধিকার করার বাসনাও দেখা যায়। অতিরিক্ত মনুষ্যশক্তি সংগ্রহের কামনাও ছিল। ফরাসীরা আফ্রিকায় এই মনুষ্যশক্তিই চেয়েছিল, জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধির কামনা যা ইটালীয়রা লিবিয়ায় চেয়েছিল এবং এইসব ছাড়াও অনেক মিশ্রিত কামনা ঔপনিবেশিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশেছিল।

সাম্রাজ্যবাদের প্রেরণার উৎস ও প্রকৃতি এক নয়, একাধিক। বিভিন্ন দেশে উৎস ও প্রকৃতির বিভিন্নতা আছে। সুতরাং পতাকাকে বাণিজ্য অনুসরণ করেনি, বাণিজ্য পতাকাকে অনুসরণ করেছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও জলদস্যু, বাইবেল ও আমলা, ব্যাংকমালিক ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে পতাকা গেছে। পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত ও অশােষিত অংশ নানা সুযােগ সুবিধা এনে দিত যা উনিশ শতকের অন্তিমপর্বের প্রতিযােগিতার জগতে সবই দুহাত বাড়িয়ে নিয়েছিল।

তথ্যসূত্র :
1. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী - ইওরোপের ইতিহাস।
2. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা।
3. David Thomson - Europe Since Nepoleon.
4. Hobson - Imperialism: A Study.
5. V.I. Lenin - Imperialism: the Highest Stage of Capitalism.
6. Hobsbawm - Industry and Empire.
7. Hobsbawm - The Age of Empire.
8. P.T. Moon - Imperialism and World Politics.
9. W.L. Langer - The Diplomatic of Imperialism.
10. E. M. Winslow - The Pattern of Imperialism.