জ্ঞানদীপ্তির উদ্ধব ও বিকাশ

- August 12, 2019
অষ্টাদশ শতকে রেনেসাঁসজাত যুক্তিবাদ ইওরােপের চিন্তাধারাকে পুরােপুরি অধিকার করে নেয়। অষ্টাদশ যুগে প্রকৃতি বিজ্ঞান, সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা সকল ক্ষেত্রেই মানুষ যুক্তিবাদ প্রয়ােগ দ্বারা প্রচলিত ব্যবস্থার সত্য যাচাই করে। এজন্য অষ্টাদশ শতককে জ্ঞানদীপ্তির যুগ (ইংরেজি : Age of Enlightenment) বলা হয়। জনৈক ফরাসী দার্শনিকের মতে, অষ্টাদশ শতক ছিল সিয়্যাকল দ্য লা লুমিয়্যার অর্থাৎ আলােকিত শতাব্দী। অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষের নিকট যুক্তি এবং বুদ্ধি ছিল শ্রেষ্ঠ। অষ্টাদশ শতকের বুদ্ধি বা যুক্তিবাদ জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিকশিত হয়।
Age of Enlightenment
জ্ঞানদীপ্তির বৈশিষ্ট্য : জ্ঞানদীপ্তির চারটি বৈশিষ্ট্য ছিল (১) প্রকৃতিবাদ - মানসিক উৎকর্ষ বলতে প্রথমেই প্রাকৃত বা প্রকৃতিবাদের উপর নিভরশীলতা বোঝায়। জ্ঞানদীপ্তির পূর্বে মন্ত্রতন্ত্র, ভােজবাজি, ধর্ম প্রভৃতিতে মানুষের অগাধ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু সেই সকল ধারণার স্থলে প্রকৃতি প্রাকৃতিক শক্তিকে জানার, ধর্মের স্থলে বিজ্ঞানের প্রাধান্য দান করা, প্রকৃতির মনােবত্তি দেখা দেয়। (২) যুক্তিবাদ - ইহা ভিন্ন, যুক্তিবাদের সাহায্যে প্রাকৃতিক বিধির অনুসন্ধান এবং জীবনযাত্রা ও জীবনাদর্শকে যুক্তিবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করা - ইহাও জ্ঞানদীন্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। (৩) আশাবাদ - আশাবাদ ছিল জ্ঞানদীপ্তির অপর একটি বৈশিষ্ট্য। তখন এই বিশ্বাসই জন্মেছিল যে, উন্নত জীবন যাপন করে মানুষের ক্রমােন্নতি সাধন সম্ভব এবং ক্রমে মানুষ শ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত হইতে পারবে। (৪) মানবহিতৈষণা - জ্ঞানদীপ্তির সঙ্গে অপর যে বৈশিষ্ট্য জড়িত ছিল সেটা হল বাক্তির ন্যায্যত প্রাপ্য। যাবতীয় অধিকার ও সুযােগ সুবিধা ভােগের জন্মগত অধিকারে বিশ্বাস। সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্বভাবতই এই ধারণার ফলেই শুরু হয়েছিল।

দার্শনিক সমাজ চেতনা : ঐতিহাসিক ফিশারের মতে, “অষ্টাদশ শতকের চিন্তাবিদদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে সমাজের উন্নতি সাধনের জন্যে তাদের মতবাদকে তারা কাজে লাগান" (A leading feature of the movement of thought was it's active concern for the regeneration of the Society)। দার্শনিকেরা ধর্ম, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, রাজার অধিকার, অভিজাতদের বিশেষ অধিকার, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বিশ্লেষণ ও যুক্তিগুলি প্রয়ােগ করেন। এর ফলে অষ্টাদশ শতকের প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। দার্শনিকদের মতবাদে প্রভাবিত হয়ে জনগণ পুরাতন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারায়। এইভাবে দার্শনিকেরা ফরাসী বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেন। বিপ্লব ছিল আলােকের পুত্র (Revolution is the daughter of Enlightenment)।

বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রভাব : অষ্টাদশ শতকের জ্ঞানদীপ্তির প্রভাব প্রধানতঃ নগরবাসী বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে বেশি দেখা দেয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর নতুনকে গ্রহণ করার ক্ষমতা দার্শনিক মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। বুর্জোয়া শ্রেণী বুঝতে পারেন যে, এই যুক্তিবাদ বা বুদ্ধি বিভাসিত দর্শনের সাহায্যে তারা সমাজের পুরাতন ব্যবস্থাকে লোপ করতে পারবে। আইনজীবি, শিক্ষক, চাকুরিয়া, বণিক, আমলা প্রভূতি ছিল নব দর্শনের অনুরাগী। কোন কোন রাজা নব দর্শনের প্রতি অনুরক্ত হয়ে জ্ঞানদীপ্তি চর্চা করেন। প্রাশিয়ার সম্রাট ফ্রেডারিক দি গ্রেট, অষ্ট্রিয়ার দ্বিতীয় যােসেফ, রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথারিন ছিলেন আলােকিত রাজা বা Enlightened monarch।

প্রথম পর্ব (১৭১৫-১৭৫০ খ্রীঃ) : এই পর্বে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রবার্ট বয়েলের মানবদেহের রক্ত সঞ্চালন তত্ত্ব, স্যার আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। এছাড়া ফেনেলন, হেলভিসিটিয়াস প্রভৃতি দার্শনিকেরা তাদের মতবাদের জন্যে বিখ্যাত হন। ইংলন্ডের দার্শনিক জন লক তার সামাজিক চুক্তি তত্ব (Social Contract Theory) প্রচার করেন। লকের বক্তব্য ছিল যে, মানুষ যখন প্রাক রাষ্ট্রীয় সমাজে বাস করত সেই সময় তাদের কতকগুলি বিশেষ অধিকার রক্ষার জন্যে এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্যে তারা রাষ্ট্র শাসনের অধিকার শাসক বা রাজাকে দান করত। লক এই মতকে প্রতিপন্ন করেন যে, রাজা ঈশ্বরের আদেশের বলে রাজত্ব করেন না। তিনি সামাজিক চুক্তির দ্বারা যে অধিকার পান তার বলেই তিনি রাজত্ব করেন। লকের এই মতবাদ ফ্রান্সের চিন্তাবিদদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রথম পর্বের দার্শনিকদের মধ্যে সর্বপ্রধান উল্লেখ্য ছিলেন মন্তেস্কু। আইনের মর্ম (Spirit of laws) গ্রন্থে মন্তেস্কু যে রাষ্ট্রতন্ত্রের ব্যাখ্যা করে বিশেষ খ্যাতি পান। অষ্টাদশ শতকের দার্শনিকরা ক্যাথলিক ধর্মের অলৌকিক তত্ত্ব ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে সমালােচনা করেন। অষ্টাদশ শতকের সমাজের অগ্রগতি ধর্মের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হত। রক্ষণশীল লােকেরা ধর্মের অজুহাতে প্রগতিকে বাধা দিত। দার্শনিকেরা ক্যাথলিক ধর্মের গোড়ামি ও অন্ধবিশ্বাসকে সমালােচনা করায় ক্যাথলিক গীর্জার প্ৰভাব কমতে থাকে। সমাজে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটতে থাকে।

দ্বিতীয় পর্ব (১৭৫০-১৭৭৪ খ্রীঃ) : এই পর্বে জ্ঞানদীপ্তির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে। ফরাসী দার্শনিকরাই ছিলেন জ্ঞানদীপ্তির দ্বিতীয় পর্বের প্রধান পুরােহিত। দ্বিতীয় পর্বে দার্শনিকেরা রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির বিশ্লেষণে তাদের যুক্তিজাল প্রয়ােগ করেন। জ্ঞানদীপ্তি দার্শনিকদের মধ্যে প্রখ্যাত ছিলেন ভলতেয়ার (১৬৯৪–১৭৭৮ খ্রীঃ)। তার বিখ্যাত রচনাগুলির মধ্য কাদিদ (Candide) ও দার্শনিক অভিধান (Dictionary of Philosophy) অন্যতম। ভলতেয়ার সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মসহিষ্ণুতা, স্বাধীন চিন্তার পক্ষে যুক্তির বিস্তার করেন। এছাড়া রুশো তার সামাজিক চুক্তি মতবাদ দ্বারা রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বৈপ্লবিক তত্ত্ব প্রচার করেন। রুশাে ছিলেন দার্শনিকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা মৌলিক এবং অগ্রগামী। এছাড়া দেনিস দিদেরো(১৭৬৫ খ্রীঃ) বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়া (Encyclopaedia) রচনা করেন। বিশ্বকোষ গ্রন্থে দার্শনিকদের মৌলিক চিন্তাগুলি সঙ্কলিত হয়। এই গ্রন্থের মুখবন্ধ লেখেন দার্শনিক দালেমবেয়ার। দিদেরাে ও এলেমবার্ট অভিজাত শ্রেণীর বিশেষ অধিকারকে এই গ্রন্থে তীব্র আক্রমণ করেন। ফিজিওক্র্যাট নামক অর্থনৈতিক চিন্তাবিদরা কোয়েসনের নেতৃত্বে মার্কন্টাইলবাদ ও সংরক্ষণবাদের তীব্র সমালােচনা করেন। জ্ঞানদীপ্তির প্রথম পর্বে মানবতাবাদের বা হিউম্যানিজমেরও প্রসার ঘটে। বেকারিয়া নামে জনৈক ইতালীবাসী অধ্যাপক, দণ্ডিত অপরাধীদের প্রতি মানবতাময় আচরণের পক্ষে যুক্তি দেখান। অষ্টাদশ শতকে ইংলণ্ডে কোয়েকার সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। কোয়েকাররা নিপীড়ন ও নির্যাতনমুলক প্রথাগুলির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন। দাসপ্রথা ও দাস ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে কোয়েকাররা জনমত গঠন করেন।

তৃতীয় পর্ব (১৭৭৪-১৭৮৯ খ্রীঃ) : এই পর্বে দার্শনিক বা ফিলোজফদের চিন্তার বাস্তব প্রয়ােগের চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। ফ্রান্সে টুর্গ, নেকার প্রভৃতি মন্ত্রীরা দার্শনিকদের আলােকিত মতবাদে প্রভাবিত হয়ে মৌলিক সংস্কার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। দার্শনিকদের মতবাদগুলি জনসাধারণের নিকট পত্র পত্রিকা ও কফিখানার আলােচনার মাধ্যমে জনসমাজে ছড়িয়ে পড়ে। কন্ডরসেট, রেনাল প্রভৃতি ঐতিহাসিক লেখকেরা দার্শনিকদের মতবাদকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করে জনসমাজে প্রচার করেন।

জ্ঞানদীপ্তির ফলাফল : অষ্টাদশ শতকের জ্ঞানদীপ্তি বা আলােকিত দর্শনের প্রভাবে জনসাধারণের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। ক্যাথলিক গীর্জার সর্বর্ত্বক প্রভাবের বিরুদ্ধে দার্শনিকদের সমালােচনার ফলে ক্যাথলিকতন্ত্র মর্যাদা হারায়। খ্রীষ্টীয় গীর্জা মানুষকে শিক্ষা দিত যে, ইহজীবন হল পাপ। মানুষ ইহজীবনে কৃচ্ছসাধন করলে পরজন্মে ঈশ্বরের করুণা পাবে। কিন্তু দার্শনিকরা আত্বনীপিড়ন ও পাপবােধ হতে মুক্ত হয়ে ঐহিক জীবনকে সুন্দর ও এই জীবনকে ভালবাসার কথা বলেন। দার্শনিকদের এই ব্যাখ্যার ফলে পাপ ও ঈশ্বর সম্পর্কে লােকের ধারণা পরিবর্তিত হয়। বুর্জোয়া শ্রেণী খ্রীষ্টীয় পাপবােধ ও বৈরাগ্য হতে মুক্ত হয়ে ভােগবাদী জীবনের আদর্শ গ্রহণ করে। বুর্জোয়া শ্রেণী ছিল আলােকিত দর্শনের দ্বারা সর্বাপেক্ষা প্রভাবিত। তারা কৃষি অর্থনীতিকে ত্যাগ করে শিল্প বাণিজ্যের মাধ্যমে সমাজে সম্পদ সৃষ্টি করে।

দার্শনিকদের যুক্তিবাদের প্রচারের ফলে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। লােকে বুঝতে পারে যে, প্রতি ব্যক্তির স্বাধীনতা ভােগ করার মৌলিক অধিকার আছে। প্রতি ব্যক্তির নিজ মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচার অধিকার আছে। দিদেরো বলেন, “আমাদের শতাব্দীর প্রধান লক্ষণ হল স্বাধীনতা"। জ্ঞানদীপ্তির ফলে ইওরােপীয় সমাজের পুরাতন সংগঠন ভেঙে পড়ে। ট্র্যাডিশন বা পুরাতন প্রথার বিরুদ্ধে দার্শনিকরা যে সমালােচনা করেন তার ফলে স্বৈরতন্ত্র, অভিজাতদের বিশেষ অধিকার, খ্রীষ্টীয় গীর্জার আচার প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে লােকের আস্থা নষ্ট হয়। এর ফলে বিপ্লবী মানসিকতার সৃষ্টি হয়। মাদেলার মতে, “পুরাতনতন্ত্রর ভিত্তি ও প্রাণ ছিল পুরাতন প্রথার প্রতি বিশ্বাস। নিরন্তর সমালােচনার দ্বারা দার্শনিকেরা এতে ফাটল সৃষ্টি করেন।” বিপ্লব ছিল আলোকের সন্তান।

পাঠ্যসূচী :
1. Fisher - History of Europe
2. Quoted form P.K. Chakraborty
3. Madelin - France Revolution
4. Pierre Manent - An Intellectual History of Liberalism
5. Roche Daniel - France in the Enlightenment
6. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা