অ্যাডলফ হিটলারের বৈদেশিক/পররাষ্ট্র নীতি

- August 18, 2019
বৈদেশিক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে হিটলার ছিলেন সংশােধনবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী। অ্যালান বুলকের মতে, হিটলার জার্মানিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত করার জন্য বিশ্ব জয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তার পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যই ছিল জার্মানীকে ইউরোপ তথা বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত করা। অবশ্য এ. জে. পি. টেলর তার "The Origins of the Second World War" গ্রন্থে হিটলারের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনার কথা যে সব ঐতিহাসিক বলেছেন তাদের মতামত যুক্তিপূর্ণ ও প্রামাণ্য মনে করেন না। তার মতে, তা হলে হিটলার নৌবাহিনীর উপর গুরুত্ব দিতেন। টেলরের মতে, পূর্ব ইউরােপে জার্মান সাম্রাজ্যর প্রসার দ্বারা লেবেনসরাউম (Lebensraum) বা জার্মানদের বাসস্থান বিস্তৃত করা ছিল তার আসল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য হিটলার ভার্সাই সন্ধির শর্ত গুলি ভেঙ্গে ফেলেন।
Adlof Hitler
নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন বর্জন : ১৯৩৩ সালে ক্ষমতা লাভের পরেই হিটলার বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন থেকে জার্মান প্রতিনিধিকে প্রত্যাহার করেন। হিটলার দাবী করেন যে, হয় জার্মানীকে অস্ত্র বাড়াবার অনুমতি দেওয়া হােক, নতুবা ফ্রান্সের অস্ত্র কমিয়ে জার্মানীর সমতুল্য করা হােক। ফ্রান্স, জার্মানীর প্রস্তাবের বিরােধিতা করলে, নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে জার্মানীর প্রতি বৈষম্যের অজুহাতে জার্মান প্রতিনিধি বের হয়ে যান। এই সঙ্গে জার্মানী জাতিসংঘের সদস্য পদ ত্যাগ করে। হিটলারের উদ্দেশ্য ছিল নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন বর্জন করে জার্মানীর অস্ত্রসজ্জার নীতিকে পূর্ণতা দেওয়া। এই সম্মেলনে জার্মানী যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করত, তবে তার অস্ত্রসজ্জাতে বাধা পড়ত।

পোল্যান্ড জার্মান চুক্তি : ১৯৩৪ খ্রীঃ হিটলার পােল্যান্ডের সঙ্গে পােল-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি সম্পাদন করেন। এই চুক্তির দ্বারা ১০ বছরের জন্যে জার্মানী ও পােল্যান্ড পরস্পরকে আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরস্পরের বিরােধ শান্তিপূর্ণ উপায়ে মিটিয়ে নেওয়ার কথা এই চুক্তিতে বলা হয়। পােল-জার্মান চুক্তি ছিল হিটলারের পাশবিক কুটনীতির (Brutal diplomacy) একটি দুষ্টান্ত। জার্মানীর বিরুদ্ধে ফ্রান্স ও পােল্যান্ড যে পারস্পরিক রক্ষা জোট গঠন করেছিল তা হিটলার এই চুক্তির দ্বারা ভেঙে ফেলেন। জার্মানীর কাছ থেকে অনাক্রমণের প্রতিশ্রুতি পেয়ে পােল্যান্ড ফ্রান্সের ওপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে। এই চুক্তির দ্বারা লােকার্ণো সন্ধির (১৯২৫ খ্রীঃ) ফ্রাঙ্কো-পােলিশ পারস্পরিক আত্মরক্ষা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে ফ্রান্সের ক্ষমতা কমে যায় এবং জার্মানীকে বেষ্টন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পােল-জার্মান চুক্তির অন্য একটি তাৎপর্য ছিল, জার্মানীর কাছ থেকে অনাক্রমণের নিশ্চয়তা পেয়ে পােল্যান্ড রুশ সীমান্তে রাশিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার বাঙ্কার তৈরি করে।

অস্টিয়া নীতি : সেন্ট জার্মেইন সন্ধির ৮০নং ধারায় এবং ভার্সাই সন্ধির দ্বারা জার্মানী এবং অষ্ট্রিয়াকে পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু হিটলার জার্মান জাতির ঐক্য স্থাপনের জন্যে জার্মানীর সঙ্গে অষ্ট্রিয়াকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেন। হিটলারের জন্ম হয় অষ্ট্রিয়ায়। তিনি ছাত্র জীবন থেকে ছিলেন প্যান জার্মানবাদী (Pan Germanist) বা জার্মান জাতির ঐক্যে বিশ্বাসী। তিনি বলেন যে, প্রাশিয় মন্ত্রী বিসমার্ক জার্মানী থেকে অস্ট্রিয়াকে বহিষ্কার করলেও, অষ্ট্রিয় মন্ত্রী হিটলার অষ্টিয়াকে জার্মানীর সঙ্গে সংযুক্ত করবেন। তিনি এই নীতির নাম দেন আনস্লুস (Anschluss)।

আনস্লুস নীতিকে সফল করার জন্যে হিটলার, অষ্ট্রিয়ায় নাৎসী দলের শাখা স্থাপন করেন। এদের গােপনে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। ১৯৩৪ খ্রীঃ অষ্ট্রিয় নাৎসীরা অকস্মাৎ একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। অষ্টিয়া প্রধানমন্ত্রী ডলফাস নিহত হন। নাৎসী বিদ্রোহীরা সরকারি অফিস ও বেতারকেন্দ্র অধিকার করে। কিন্তু অষ্ট্রিয়ার রাষ্ট্রপতি অনুগত সেনাদল দ্বারা এই বিদ্রোহ দমন করেন। ইতালীর ফ্যাসিষ্ট নেতা মুসােলিনীর নির্দেশে ইতালীয় বাহিনী অষ্ট্রিয়ার সমর্থনে এগিয়ে আসে। ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দের নাৎসি সামরিক অভ্যুত্থান অস্ট্রিয়ায় ব্যর্থ হয়। এর পর প্রায় ২ বছর হিটলার অস্ট্রিয়ায় হতক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে জাতিসংঘের নির্দেশে এক গণভােটের মাধ্যমে সার উপত্যকা জার্মানীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। শতকরা ৯০ জন জার্মানীর সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে ভােট দেয়।

জার্মানির অস্ত্রসজ্জা : ১৯৩৫ খ্রীঃ ব্রিটেন ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তি সম্পাদন করে। এই চুক্তির দ্বারা ইংলন্ডের নৌ-বহরের শক্তির শতকরা ৩৫ % হারে জার্মানীকে জাহাজ নির্মাণ করতে বলা হয়। ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তি ছিল হিটলারের কূটনীতির একটি বিরাট সফলতা। প্রথমতঃ, এই চুক্তির দ্বারা জার্মানী ইংলন্ডের সহানুভূতি পায়। ফলে জার্মানীর স্থল ও বায়ু সেনা বৃদ্ধিতে ইংলন্ড আপত্তি না জানিয়ে নীরব থাকে। ফ্রান্স এককভাবে জার্মান অস্ত্রসজ্জার বিরুদ্ধে আপত্তি জানালে তা নিস্ফল হয়। স্ট্রেসা ফ্রন্ট ভেঙে যায়। এইভাবে হিটলার ভার্সাই সন্ধির পঞ্চম অনুচ্ছেদ ভেঙে জার্মানীকে ইওরােপের শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তিতে পরিণত করেন। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জার্মান বিরােধী জোট গঠনে ব্যর্থ হয়ে ফ্রান্স নিরুপায় হয়ে পড়ে। পােল-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির দ্বারা হিটলার জার্মানীর বিরুদ্ধে পােল-ফরাসী জোট ভেঙে ফেলেন। এখন ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তির দ্বারা তিনি ব্রিটেনকে জার্মানীর পক্ষে আনায়, ফ্রান্স মিত্রহীন, জোটহীন হয়ে নিরুপায় হয়। কারণ ব্রিটেন নীতিগতভাবে মেনে নেয় যে, জার্মানীর অস্ত্রসজ্জার অধিকার ছিল। ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত তার আত্মারক্ষার জন্যে ফ্রাঙ্কো-সােভিয়েত পারস্পরিক আত্মরক্ষা চুক্তি (১৯৩৫ খ্রীঃ) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্ত ছিল চেকোস্লাভাকিয়াকে জার্মান আক্রমণ থেকে উভয় শক্তি রক্ষা করবে।

রাইনল্যান্ড অধিকার : হিটলার ১৯৩৬ খ্রীঃ জার্মানীর রাইনল্যান্ড অধিকার করেন। ভার্সাই ও লোকার্ণ সন্ধির দ্বারা জার্মানী যে রাইন অঞ্চলকে অসামরিক এলাকা হিসেবে গণ্য করতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, হিটলার তা ভঙ্গ করেন।

রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি : আবিসিনীয় যুদ্ধে জার্মানী লীগের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে ইতালীকে সমর্থন জানায়। অতঃপর ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধে জার্মান বায়ু সেনাদল, স্পেনের সেনাপতি জেনারেল ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে যুদ্ধ করে। স্পেনের গৃহযুদ্ধে হিটলার জার্মান বায়ুসেনার শক্তি ভালভাবে পরীক্ষা করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে রোম-বার্লিন অক্ষশক্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর কিছুদিন পরে জাপানের সঙ্গে নাৎসী জার্মানী কমিউনিষ্ট বিরােধী চুক্তি(Anti Commintern Pact) সম্পাদন করে। ক্রমে এই চুক্তি ১৯৩৭ সালে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি চুক্তিতে (Axis Powers) পরিণত হয়। রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তির গুরুত্ব এই ছিল, এই চুক্তির দ্বারা জার্মান-ইতালী জোট ফ্রান্সকে বেষ্টন করে ফেলে। ইওরােপে নতুন শক্তি সাম্য গড়ে ওঠে।

আনস্লুস নীতি : ১৯৩৭ খ্রীঃ হিটলার আনস্লুস পরিকল্পনাকে রূপদানের কাজে হাত দেন। তিনি জার্মান পার্লামেন্ট বা রাইখষ্ট্যাগে একটি ঐতিহাসিক বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি রুশী কমিউনিজমের বিরুদ্ধে বিষােদগার করেন এবং পশ্চিমী গণতন্ত্র বিশেষতঃ ব্রিটেনের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানান। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন এর ফলে জার্মান তােষণ নীতি গ্রহণ করেন। হিটলার অষ্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী সুশনিগের নিকট দাবী জানান যে, অষ্ট্রিয়ার নাৎসী নেতা সিয়েস ইনকার্ট-কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নিয়ােগ করতে হবে। সুশনিগ হিটলারের চাপের নিকট নতি স্বীকার করেন। তিনি হিটলারের দাবী সম্বলিত দলিলে স্বাক্ষর দেন। অষ্ট্রিয়ার নাৎসী নেতা সিয়েস অস্টিয়ার সরকার গঠন করেন। এর কিছুকাল পরে সিয়েস ইনকার্টের আহ্বানে জার্মান সেনা অষ্ট্রিয়ায় প্রবেশ করে, কৃত্রিম ভোট দ্বারা অস্টিয়া দখল করে নেন।

সুদেতেন সমস্যা : অস্টিয়া অধিকারের পর হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে নজর দেন। চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতেন অঞ্চল ছিল জার্মানীর সীমান্ত সংলগ্ন। হিটলারের নির্দেশে সুদেতেন জেলায় নাৎসী তৎপরতা বাড়ে। হেনলিয়েন নামে এক নাৎসী নেতা দাবী করেন যে, সুদেতেন অঞ্চলকে জার্মান পিতৃভূমিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। হিটলার জার্মান জাতীয়তাবাদের অজুহাতে সুদেতেন জার্মানদের দাবীর প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন জানান। এমন কি তিনি জার্মান রাইখের স্বার্থে বলপ্রয়ােগে সুদেতেন জেলা অধিকারের হুমকি দেন। এদিকে ফ্রাঙ্কো-রুশ আত্মরক্ষা চুক্তি অনুসারে ফ্রান্স ও রাশিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়াকে জার্মান আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন জার্মান তােষণ নীতি অনুযায়ী জার্মানীকে বিনা বাধায় সুদেতেন জেলা ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ তিনি মনে করতেন যে, এই স্থান ছিল জার্মানীর প্রাপ্য।

মিউনিখ চুক্তি : ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তােষণ নীতির ফলস্বরূপ ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির সঙ্গে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর। চেম্বারলেইন, হিটলারের সঙ্গে বার্থটেসগাডেনে এবং গডেসবার্গে দুবার সাক্ষাৎ করেন। তিনি চেক সরকারকে সুদেতেন জেলা জার্মানীকে ছেড়ে দিতে রাজী করান। মিউনিখ বৈঠকে মুসােলিনী, ফরাসী মন্ত্রী দালাদিয়ের এবং হিটলারের সঙ্গে চেম্বারলেইন মিলিত হন। মিউনিখ চুক্তি দ্বারা সুদেতেন জেলা জার্মানীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। হিটলার প্রতিশ্রুতি দেন যে, "সুদেতেন জেলাই হল ইওরােপের নিকট তার শেষ দাবী।” সুদেতেন জেলা ছাড়া অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা তিনি স্বীকার করেন। মিউনিখ চুক্তির দ্বারা হিটলার বিনাযুদ্ধে চেকোশ্লোভাকিয়ার ১/২ অংশ দখল করেন। সােভিয়েত রাশিয়াকে এই বৈঠকে আহ্বান না করায় সােভিয়েত সরকারের সঙ্গে পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলির বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়। জার্মানীর বিরুদ্ধে পশ্চিমী ও সোভিয়েত জোট গঠনের সম্ভাবনা দূর হয়। হিটলারের কুটনীতি জয়যুক্ত হয়। তিনি বিনা যুদ্ধে শুধু মৌখিক হুমকির দ্বারা ভার্সাই সন্ধিকে অগ্রাহ্য করে, সুদেতেন জেলা জার্মানীর অন্তর্ভুক্ত করেন। মিউনিখ চুক্তি ছিল ব্রিটেনের জার্মান তােষণ নীতির পরাকাষ্ঠা এবং হিটলারের নিকট ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ শক্তির আত্মসমর্পণ।

চেকোশ্লোভাকিয়া অধিকার : মিউনিখ চুক্তির মাত্র ৭ মাস পরেই চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন। চেকোশ্লোভাকিয়ার ভেতর তিনি দারুণ অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করেন। হিটলারের প্ররােচনায় শ্লোভাক জাতি চেকদের শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্যে মহা গণ্ডগােল সৃষ্টি করে। জার্মান সীমান্তে গণ্ডগােল সৃষ্টির অজুহাতে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়াকে জার্মানীর অন্তর্ভুক্ত করেন।

পোল্যান্ড নীতি : হিটলার মিউনিখ চুক্তি ভেঙে অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়া গ্রাস করলে চেম্বারলেইন তার তােষণ নীতির বিফলতা বুঝতে পারেন। শেষ পর্যন্ত ইংলন্ড ও ফ্রান্স যুগ্মভাবে জার্মানীর আগ্রাসন রােধ করতে কৃতসঙ্কল্প হয়। চেকোশ্লোভাকিয়া অধিকারের পর হিটলার পােল্যান্ডের দিকে দৃষ্টি দেন। তিনি ডানজিগ বন্দর দাবী করেন এবং মেমেল দখল করেন। এর ফলে বােঝা যায় যে, পােল্যান্ডে তার আগ্রাসন আসন্ন । এমতাবস্থায় ইঙ্গ-ফরাসী শক্তি পােল্যান্ডের স্বাধীনতা রক্ষার গ্যারান্টি দেয়। পােল্যান্ড আক্রমণের বিরুদ্ধে হিটলারকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। কিন্তু জার্মানী পােল্যান্ড আক্রমণের জন্যে কৃতসংকল্প হলে বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন হয়ে পড়ে।

রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি : হিটলারের নির্দেশে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রী রিবেনট্রপ একটি মৈত্রীমিশন সহ মস্কোতে উপস্থিত হন। রুশ নেতা ষ্ট্যালিন ও রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী মলােটোভ মিউনিখ চুক্তির জন্যে ব্রিটেনের বিশ্বস্ততায় সন্দিহান ছিলেন। মস্কোতে প্রেরিত ব্রিটিশ মৈত্রীমিশন রুশ নেতাদের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে তারা এই মিশন বাতিল করে দেন। রুশ সরকার জার্মানি মিশনের সঙ্গে রুশ-অনাক্রমণ চুক্তি (১৯৩৯ খ্রীঃ) স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির দ্বারা দুটি দেশ ১০ বছরের জন্য পরস্পরকে আক্রমণ না করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। পরস্পর বিরােধের বিষয়গুলি শান্তিপূর্ণ উপায়ে মিটিয়ে নিতে রাজী হয়। এই সন্ধির গােপন শর্ত দ্বারা দুই স্বাক্ষরকারী দেশ পরস্পরের মধ্যে পােল্যান্ডকে ভাগ করতে রাজী হয়। দুই স্বাক্ষরকারী পূর্ব ইওরােপে নিজ নিজ প্রভাবযুক্ত এলাকা স্থির করে। জার্মানী তৃতীয় কোন শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হলে, রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি ছিল হিটলারের কূটনৈতিক দক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন। এর দ্বারা হিটলার জার্মান-বিরােধী জোট গঠনের সম্ভাবনা দূর করেন। তিনি আপাততঃ রাশিয়াকে নিরপেক্ষ রেখে ভবিষ্যতে রাশিয়া আক্রমণের ব্যবস্থা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা : জার্মান সেনা ১৯৩৯ খ্রীঃ ১লা সেপ্টেম্বর পােল্যান্ড আক্রমণ করলে, ইঙ্গ-ফরাসী শক্তি জার্মানীর বিরুদ্ধে ১৯৩৯ খ্রীঃ ৩রা সেপ্টেম্বর যুদ্ধ ঘােষণা করে। এইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই যুদ্ধে ফ্রান্স ও ইংলন্ডের প্রাথমিক পরাজয়ের পর, হিটলার ১৯৪১ খ্রীঃ রাশিয়াকে আক্রমণ করেন।

গ্রন্থপঞ্জি :
1. Alan Bullock - Hitler - A Study in Tyranny
2. A.J.P. Taylor - Origin of the Second World War
3. Robert Boyce - The Origins of World War Two
4. প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় - আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস
5. আলোক কুমার ঘোষ - আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বর্তমান বিশ্ব (১৮৭০-২০০৪)
6. শ্রী প্ৰভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
Advertisement