PayPal

কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের নব পররাষ্ট্র নীতি

author photo
- Friday, August 09, 2019
১৮৯০ খ্রীঃ জার্মান সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম প্রধানমন্ত্রী বিসমার্ককে পদচ্যুত করে, সকল ক্ষমতা নিজ হাতে নেন। ১৮৯০ খ্রীঃ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ ১৯১৮ খ্রীঃ পর্যন্ত জার্মানীর কর্ণধার ছিলেন কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম। তিনি ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে নব নীতি গ্রহণ করেন, এবং বিসমার্কের পররাষ্ট্র নীতিগুলো ত্যাগ করেন। আধুনিক গবেষক ইম্যানুয়েল জাইস এই প্রচলিত ধারণাকে ভিত্তিহীন মনে করেন। তার মতে, ১৮৯০-১৯৯৫ খ্রীঃ পর্যন্ত কাইজার আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে নবনীতি অনুসরণ করলেও, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বিসমার্কীয় নীতি থেকে পুরাপুরি বিচ্যুত হননি। তার মতে, ১৮৯০-১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দেকে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে সঙ্কল্পহীনতার যুগ বলা যেতে পারে। ১৮৯৬ খ্রীঃ-কেই কাইজারের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যুগ সন্ধিক্ষণ বলা চলে। কারণ তখন থেকে কাইজার Welt Politik বা বিশ্ব রাজনীতিতে জার্মানীর প্রাধান্য স্থাপনের লক্ষ্য নেন এবং বিসমার্কীয় পররাষ্ট্র নীতির মূল সূত্রগুলি ছিন্ন করেন।
Germany Emperor Kaiser William II
আঁতাত ঐতিহাসিকরা কাইজারের বিসমার্ক নীতি থেকে বিচ্যুতি ও Welt Politik বা বিশ্ব রাজনীতি অনুসরণের জন্যে কেবলমাত্র কাইজারের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দায়ী করেন। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ শক্তির ঘাত প্রতিঘাতের ফলে কাইজার নবনীতি নেন। প্রথমতঃ, বিসমার্কের পতনের পর জার্মান রাজনীতিতে বিভিন্ন প্রভাবশালী চাপ সৃষ্টিকারী গােষ্ঠীর উদ্ভব হয়। এই গােষ্ঠীগুলি আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিকে প্রভাবিত করে। বিসমার্ক তার ব্যক্তিত্বের জোরে এই চাপ সৃষ্টিকারী গােষ্ঠী গুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। তার অবর্তমানে তা করা যায়নি। এগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য ছিল -

১) কৃষিলবী গােষ্ঠীতে ছিল রক্ষণশীল, যুদ্ধবাজ জাঙ্কার ও পূর্ব জার্মণীর ভূস্বামীরা। এরা জার্মানীতে আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্থিতাবস্থা চাইতেন এবং শিল্পায়নের বিরােধী ছিলেন। বিদেশ থেকে সস্তা দরে খাদ্যশস্য রপ্তানির এরা বিরােধী ছিলেন, এজন্য যে তাদের জমিদারীর উদ্বৃত্ত শস্য তারা দেশে চড়া দরে বিক্রির সুযােগ ভােগ করতে চান।

২) প্যান জার্মান লবী ছিল ভয়ানক প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী গােষ্ঠী। এরা চাইত যে, জার্মানী ইওরােপে ও উপনিবেশে প্রাধান্য স্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন। বিসমার্কের শক্তিসাম্য নীতি এরা ভাঙতে চান।

৩) শিল্প লবী ছিল ভয়ানক শক্তিশালী। জার্মানীর বুর্জোয়া, ধনী শিল্পপতিরা ছিল এই গােষ্ঠীৰ নেতা। বিসমার্কের আমলে জার্মানীর শিল্পায়নের বিকাশ ঘটে। এজন্য এই মূলধন ও শিল্পপতিশ্রেণী জার্মান অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেন। তাদের দাবী ছিল যে, জার্মানীর আমদানি রপ্তানি নীতির এবং উপনিবেশ নীতির পরিবর্তন দরকার। জামানীর উদ্বৃত্ত মাল একচেটিয়া বিক্রির জন্য উপনিবেশ দখলের প্রয়ােজন। হান্স ডেলব্রুক, জন সিকুয়েল প্রভৃতি বুদ্ধিজীবী ছিলেন এই গােষ্ঠীর মুখপাত্র।

৪) সামরিক লবী জার্মানীর পররাষ্ট্র নীতিতে সেনাপতিমণ্ডলীর প্রভাব গোড়া থেকেই ছিল। কাইজারের আমলে এই প্রভাব অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সেনাপতি স্লিফেন, নৌ-সেনাপতি তিরপিৎস প্রত্যক্ষভাবে কাইজারকে স্থল ও নৌ-বাহিনীর নব নির্মাণের জন্যে চাপ দেন। স্লিফেন আগ বাড়িয়ে ভবিষ্যতে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ হলে বেলজিয়ামের পথে আক্রমণের এক আগাম পরিকল্পনা ছক করে ফেলেন। তিরপিৎস কাইজারকে নৌ-নির্মাণে এমনভাবে প্রভাবিত করেন যে, এজন্য জার্মানীর সঙ্গে ব্রিটেনের তীব্র বিরােধ দেখা দেয়। সেনাপতিরা এক বিস্তারশীল জার্মানীর কথাই ভাবেন।

৫) বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক যারা জার্মান জাতীয়তাবাদের পূর্ণতা লাভের জন্য এক বিশ্বব্যাপী জার্মান প্রাধান্য লাভের কথা বলেন। কাইজার যদি ১৮৯৬ খ্রঃ থেকে wel Politik বা বিশ্বরাজনীতিতে বিশেষত্তঃ উপনিবেশ দখল ও নৌ-নির্মাণ নীতিতে ঝুঁকে পড়েন, তার পশ্চাতে এই সকল চাপ সৃষ্টিকারী গােষ্ঠীর প্রভাব কম ছিল না।

কাইজারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে ক্যাপ্রিভি, হােহেন লাে, ফুন বুলাে এবং বেথম্যান হলােওয়গা। এরা কেহই বিসমার্কের মত ব্যক্তিত্বশালী এবং প্রতিভাবান ছিলেন না। এরা অনেকেই বিভিন্ন প্রভাবশালী লবীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কাইজার নিজে স্বৈরশাসক হলেও বুঝতেন কম। তিনি ছিলেন ভয়ানক তােষামােদপ্রিয় এবং বাক্যবাগীশ লােক। জন্মকাল থেকে তার শারীরিক পঙ্গুতার জন্যে তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন। বড় বড় কথা বলে তিনি তার এই হীনমন্যতা চাপা দিতেন। কূটনৈতিক সংযম ও বাকসংযম তার ছিল না। ইম্যানুয়েল জাইসের মতে “জার্মান অভিজাত বুর্জোয়া শাসকশ্রেণীর প্রভাব তিনি নিজ বাক্য ও আচরণে প্রকাশ করতেন।"

কাইজারের আমলে পররাষ্ট্র নীতির গঠনে উপরােক্ত বিভিন্ন প্রভাবগুলি বিশেষ সক্রিয় ছিল। তাই দেখা যায় যে, বিসমার্কের যুগের পর রাষ্ট্রনীতির সূত্রগুলিকে তিনি ছিড়ে ফেলেন এবং নবনীতি গ্রহণ করেন। বিসমার্কীয় পররাষ্ট্র নীতির গােড়ার কথা ছিল। (ক) জার্মানী আত্মতৃপ্ত দেশ তার আর বিস্তারের দরকার নেই। (খ) জার্মানীর নৌ বহরের দরকার নেই। (গ) জার্মানীর উপনিবেশের দরকার নেই। বিসমার্ক বলেন, “আমি উপনিবেশবাদী নই" (I am no colony man)। (ঘ) ফ্রান্সকে মিত্রহীন রেখে জার্মানীর নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। এজন্য তিনি তিন সম্রাটের চুক্তি ও ত্রিশক্তি জোট গঠন করেন। রাশিয়ার সঙ্গে রি-ইনস্যুরেন্স চুক্তির দ্বারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অনাক্রমণ নীতি নেন।

কাইজার বিসমার্কীয় নীতির এই ভিত্তিগুলি নস্যাৎ করেন, তার বিশ্বস্ত সচিব ফ্রেডারিখ হলষ্টিনের পরামর্শক্রমে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে রি-ইনস্যুরেন্স চুক্তি একতরমভাবে নাকচ করেন। ফ্রডারিখ হলষ্টিন কাইজারকে বোঝান যে, অট্রিয়ার সঙ্গে দ্বিশক্তি চুক্তি ও রাশিয়ার সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি পরস্পর বিরোধী ও জটিল। প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্রিভি এই সচিবকে সামলাতে চেষ্টা করেননি। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি খারিজের ফলে জার বিরক্ত হন এবং ক্রমে ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে ফান্সের মিত্রহীনতা দূর হয়। বিসমার্কীয় নীতির দুটি প্রধান সূত্রকে কাইজার নষ্ট করে জার্মানীকে বিপদে ফেলেন।

জার্মানীর অভূতপূর্ব শিল্প বিস্তারের ফলে জার্মানীর আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়ে। কাইজার নিজেকে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে ভাবতে থাকেন। জার্মানীর কিছু শিল্পপতি ও বুদ্ধিজীবী দাবী জানান যে, উদ্বৃত্ত মাল বিক্রির জন্যে জার্মানীর উপনিবেশ দরকার। হ্যানস ডেলব্রুক উপনিবেশ গঠনের জন্যে আন্দোলন গঠন করে চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন ইংলন্ড যদি উপনিবেশ স্থাপন করে, তবে জার্মানীরও তা করা দরকার। কাইজার বুঝেন যে, জার্মানীতে শিল্প বিস্তারের ফলে যেভাবে নগরবাসী মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু শিল্পের স্বার্থে তার বিস্তার নীতি গ্রহণ দরকার। জার্মানীর সমাজতন্ত্রী দল যেভাবে কাইজার সরকারের বিরােধিতা করছিল, সেদিক থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে কাইজার ওয়েল্ট পলিটিক বা ঔপনিবেশিক নীতি নেন। কাইজার এই সময় থেকে বিসমার্কের জার্মানী একটি পরিতৃপ্ত দেশ এই নীতিকে নাকচ করে। বলতে থাকেন, জার্মানী আদপেই পরিতৃপ্ত দেশ নয়। জার্মানী অসীম বিস্তারে সক্ষম। কাইজার আরও বলেন যে, বিশ্বের যেদিকে তাকাই, তা ব্রিটিশ নতুবা ফরাসী উপনিবেশ। জার্মানীও সূর্যের নীচে বাস করে।

ইতিমধ্যে কাইজার বিভিন্ন গােষ্ঠীর চাপে নৌ নির্মাণ নীতি গ্রহণ করেন। ক্যাপ্রিভির পতনের পর বৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রী হােহেনলাের আমলে জার্মান নৌ-নির্মাণ নীতি গৃহীত হলে বিসমার্কের বিদেশ নীতির অপর একটি সূত্রকে কাইজার ছিড়ে ফেলেন। Welt politik কাইজারকে নৌ-নির্মাণ নীতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে অথবা নৌ-নির্মাণ নীতি তাকে Welt politik এর পথে ঠেলে দেয় তা বলা কঠিন। শিল্প প্রসার, নৌ নির্মাণ ও উপনিবেশবাদ বা Welt politik ছিল পরস্পরের সঙ্গে জৈব সংযােগযুক্ত। ইম্যানুয়েল জাইসের মতে, কেবলমাত্র সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের জন্যে কাইজার নৌ নির্মাণ নীতি নেননি। লৌহ ও ইস্পাতশিল্পের মালিকরা চান যে, কাইজার তার নৌ নির্মাণ নীতি নিলে জার্মানীর লৌহ ইস্পাত শিল্পের দারুণ উন্নতি হবে। ক্রাপ কোম্পানি নৌ অস্ত্র নির্মাণের জন্যে উদগ্রীব হয়েছিল। জার্মানীর অধ্যাপকরা ছিলেন কট্রর জাতীয়তাবাদী ও প্যান জার্মান। তারা নৌ নির্মাণ নীতিকে জার্মানীর বিশ্বশক্তি হিসেবে বিকাশের ধাপ বলে মনে করতেন। জার্মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আত্মশ্লাঘাকে পূরণের জন্যে নৌনির্মাণের দরকার হয়।

রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে জার্মানীর নৌ নির্মাণের দাবী নৌ সেনাপতি তিরপিৎস তুলে ধরেন। তিরপিৎস বলেন যে, শিল্পদ্রব্য রপ্তানির বাজার ও উপনিবেশের ক্ষেত্রে ব্রিটেনই হল জার্মানীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্রিটেনের বিরুদ্ধে দাড়াবার জন্যে জার্মানীর চাই শক্তিশালী নৌবহর। প্যান জার্মানবাদীরা নৌবহরের জন্যে জেগে ওঠে। তারা এমন ভাব দেখায় যেন নৌবহর গঠিত হলেই জার্মানীর সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তিরপিৎস বােঝান যে, জার্মানী প্রথম থেকেই সর্বাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ গড়তে পারবে। ব্রিটেনকে তার পুরাতন জাহাজ ভেঙে বাড়তি খরচা করে আধুনিক জাহাজ তৈরি করতে হবে। তিরপিৎস বলেন তার নৌ নির্মাণ নীতি হবে দ্বিমুখী। একদিকে যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ দ্বারা ব্রিটেনের সমান হওয়ার চেষ্টা। অপর দিকে ডুবাে জাহাজ তৈরি করে যুদ্ধের সময় ব্রিটেনের জাহাজ ডুবিয়ে ব্রিটেনের শক্তি নামিয়ে আনা। ১৮৯৬ খ্রীঃ থেকে কাইজার বলে থাকেন, "জার্মানীর ভবিষ্যৎ সমুদ্রের আধিপত্য লাভের ওপরেই নির্ভর করছে"।

ওয়েল্ট পলিটিক বলতে জার্মানী সঠিক কি চায় তা জার্মান নেতা কখনও নির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি। সাধারণভাবে বলা যায় যে, ওয়েল্ট পলিটিক বলতে ইওরােপ মহাদেশের ক্ষেত্রে জার্মানীকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা দান, বলকানে অর্থনৈতিক ও ঔপনিবেশিক আধিপত্য স্থাপন, নৌবহরের সম্প্রসারণ ও সামদ্রিক প্রাধান্য লাভ, আফ্রিকায় সাম্রাজ্য বিস্তার, নিকট প্রাচ্যে বাণিজ্যিক আধিপত্য স্থাপন এবং দুরপ্রাচ্য উপনিবেশ স্থাপন বুঝায়। ওয়েল্ট পলিটিকের অন্যতম প্রচারক ছিলেন হাইনবিখ-ট্রাইটসকি ও ম্যাক্সওয়েবার। এঁরা বলেন যে, জার্মানরা লােকসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প বিস্তার প্রভৃতি ওয়েল্ট পলিটিক নীতিকে বাধ্যতামূলক করে। প্যান জার্মানবাদী ম্যাক্স ওয়েবার বলেন যে, জার্মান ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতিই হল জার্মানীর বিশ্ব আধিপত্য। কূট রিজলার ওয়েল্ট পলিটিকের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা দেন যে, প্রতিবছর জার্মানীর লােকসংখ্যা ৮-৯ লক্ষ বাড়ছে। জার্মানীর Lebe usra um বা living space বা বাসস্থান চাই। জার্মানীর উদ্বৃত্ত শিল্পের বাজার চাই। সুতরাং উপনিবেশ দখল প্রয়ােজন। নৌ-সেনাপতি ফন মূলার বলেন, “হয় জার্মানীর সামগ্রিক আধিপত্য চাই, নতুবা কিছুই চাই না"।

জার্মানী রি-ইনস্যুরেন্স চুক্তি রাশিয়ার সঙ্গে নাকচ করার পর রাশিয়ায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে মন্ত্রী হােহেনলাে জারকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। তাতে কোন কাজ হয়নি। ১৮৯৩ খ্রীঃ ফ্রাঙ্কো-রুশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে অনেক দেরীতে কাইজার বোঝেন যে, তার ভুল হয়ে গেছে। ১৯০৪ খ্রীঃ ইঙ্গ-ফরাসী চুক্তির পর কাইজার ভয় পান। তিনি রাশিয়াকে ফরাসী মিত্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে রুশ-জার্মান সন্ধির প্রস্তাব দেন (Immanuel Zeiss)। তিনি ১৯০৫ খ্রীঃ Bjorke বা বোজোর্কে সন্ধি প্রস্তাব দিলে জার তা নাকচ করেন।

ব্রিটেন কাইজারের ওয়েন্ট পলিটিক ও নী-নির্মাণ নীতির তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্রিটেনের কোন কোন রাজনীতিক মনে করতেন যে, জার্মানীর নৌ-নির্মাণ নীতি ব্রিটেনের পক্ষে সত্যিই বিপজ্জনক। জার্মানীর ঔপনিবেশিক নীতি অনেক কম বিপজ্জনক। যদি জার্মানী তার নৌ-নির্মাণ নীতিকে ব্রিটেনের প্রস্তাব মত সীমাবদ্ধ করে তবে ইঙ্গ-জার্মান মৈত্রী গঠন করা সম্ভব। কারণ এই সময় ফ্রান্স ও রাশিয়ার সঙ্গে উপনিবেশ নিয়ে ব্রিটেনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। রাশিয়ার সঙ্গে বিরােধের জন্যেই ব্রিটেন ১৯০২ খ্রীঃ রাশিয়ার শত্রু জাপানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিল।

জার্মানীর কাছে মিত্রতার প্রস্তাব নিয়ে চেম্বারলেইন ও হ্যাল্ডেন দুবার কাইজারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ব্রিটিশ নৌ-মন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল আবেদন করেন যে, “ইংলন্ডের পক্ষে নৌবহর হল তার বাঁচা-মরার প্রশ্ন এবং জার্মানীর ক্ষেত্রে নৌবহর হল বিলাসিতা মাত্র"। কাজেই কাইজার যেন নৌ-নির্মাণ নীতি সংযত করেন। কাইজার ও তার প্রধানমন্ত্রী ফন বুলো ব্রিটেনের আবেদনে সাড়া দেননি। ফন বুলাে বলেন যে, “জার্মানী তার হাত খােলা রাখতে চায়।" এর ফলে ব্রিটেন ১৯০৫ খ্রীঃ ইঙ্গ-ফরাসী আঁতাত এবং ১৯০৭-এ ইঙ্গ-রুশ আঁতাত গঠন করলে ত্রিশক্তি আঁতাত গঠিত হয়।

ইঙ্গ-ফরাসী মিত্রতার দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্যে কাইজার ফরাসী উপনিবেশ মরক্কোর দিকে হাত বাড়ান। তিনি মরক্কোর সুলতানকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সাহায্য দানের কথা বলেন। আগাদির বন্দরে ১৯১১ খ্রীঃ অকস্মাৎ প্যান্থার নামে একটি জার্মান রণতরী হাজির হয়। কিন্তু ইঙ্গ-ফরাসী যৌথ নৌমহড়ার ফলে, কাইজার মরক্কো হতে হাত ওঠান। এভাবে ভুল নীতির দ্বারা কাইজার ফ্রান্স, ইংলন্ড ও রাশিয়াকে তার বিরুদ্ধে জোট গড়তে প্ররােচনা দেন। শেষ পর্যন্ত এই বিরােধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।

পাঠ্যসূচী :
1. Rene Carrie — Diplomatic History of Europe.
2. Fay - Origin of the World War.
3. Gooch - History of Modern Europe.
4. Oxford - Genesis of the War.
5. David Thompson - Europe since Napoleon.