Advertise

এশিয়া ও আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার, ১৮৭০-১৯১৪

১৮৭০ থেকে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার প্রধান তিনটি বলয় ছিল আফ্রিকা, নিকট প্রাচ্য ও সুদূর প্রাচ্য। আফ্রিকায় ব্রিটিশ, ফরাসী এবং জার্মানী ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্য বিস্তারকে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের দিক দিয়ে অত্যন্ত অপরিহার্য মনে করে। অধ্যাপক ফ্রিজ ফিশার (Fritz Fischer) প্রমুখ জার্মান সংশােধনবাদী ইতিহাসবিদগণ গবেষণার মাধ্যমে জার্মানীর বিশ্বজনীন বিস্তারনীতির কারণ ও উদ্দেশ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। এর পশ্চাতে জার্মানীর রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালী গােষ্ঠীগুলাের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এরা সকলে সুপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণশীল নীতি গ্রহণে রাষ্ট্রকে বাধ্য করে এবং ঔপনিবেশিক ও রাজনীতির স্বার্থে ইউরােপের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব-ইউরােপে ও ইউরােপের বাইরে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য আফ্রিকার এক ব্যাপক অঞ্চলে এক বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে দৃঢ়সংকল্প হয়।
আফ্রিকার ব্যবচ্ছেদ
আফ্রিকার ব্যবচ্ছেদ : ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলির সাম্রাজ্যবাদী লালসা এবং শক্তিবৃদ্ধির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল আফ্রিকা ব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। উনবিংশ শতকের শেষার্ধ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনার মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন হয়। ইউরােপীয় রাজনীতিতে ইতালী ও জার্মানীর দ্রুততর শক্তিবৃদ্ধির ফলে ইউকােপীয় দেশগুলি যথা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী প্রভৃতি আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবিস্তারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে আফ্রিকাকে নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়। ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যান্ড বুয়োর রাজ্যটি অধিকার করে নেয়। এরপর সাময়িকভাবে বুয়ােররা তাদের হৃত রাজ্যগুলি পুনরুদ্ধার করলেও ইংরেজ বুয়ােরদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ১৯০২ খ্রীঃ তা পুনরায় নিজেদের দখলে আনে। এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইংরেজ প্রাধান্য স্থাপিত হয়েছিল।

আফ্রিকার একটি বৃহৎ অংশের উপর ফরাসী আধিপত্য স্থাপিত হয়েছিল, আলজেরিয়া, টিউনিস, সমগ্র সাহারা অঞ্চল, সেনেগাল প্রভূতি এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফরাসীরা তাদের দখল বিস্তার করে। আফ্রিকার উত্তর উপকুল থেকে কঙ্গো পর্যন্ত বিস্তৃণ ভূভাগের উপর ফরাসী আধিপত্য বিস্তৃত হয়। ১৮৯০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে জার্মানী তােগােল্যান্ড, ক্যামেরুন ও আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে আধিপত্য স্থাপন করে। ইতালী ও পর্তুগালও আফ্রিকাতে তাদের উপনিবেশ গড়ে তােলে। এভাবে প্রায় সমগ্র আফ্রিকায় ইউরােপীয় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে।

এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের আক্রমণের একটি ক্ষেত্র ছিল। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তােলার জন্য ইঙ্গ-ফরাসীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়েছিল। ফরাসীদের প্রাধান্য খর্ব করে শেষ পর্যন্ত ইংরেজরা সারা ভারতবর্ষে তাদের উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল, পরবর্তীকালে ভারত সীমান্তে রুশ প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনাকেও ইংরেজরা প্রতিহত করেছিল। এ ছাড়া সিংহল, ব্রহ্মদেশ, মালয় প্রভৃতি স্থানেও ইংরেজ উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। ফরাসীরা ইন্দো চীনের এক বিস্তৃত অঞ্চলে অর্থাৎ কোচিন, কাম্বােডিয়া, আন্নাম, লাওস প্রভৃতির উপর ঔপনিবেশিক আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

মধ্য এশিয়ায় ইঙ্গ রুশ ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে উভয়ের সংকট অত্যন্ত তিক্ত হয়ে উঠেছিল। এই আফগান সমস্যাকে কেন্দ্র করে খাইবার গিরিপথ, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ইংরেজদের অধিকারে আসে। রাশিয়াও এই অঞ্চলে তার বিস্তারনীতি অব্যাহত রেখেছিল। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইঙ্গ-রুশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে উঠেছিল। উনবিংশ শতাব্দীতে পারস্য উভয়ের দ্বন্দ্বের ঝটিকাকেন্দ্রে পরিণত হয়। অবশেষে ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে ইঙ্গ-রুশ চুক্তির মাধ্যমে পারস্য দুটি প্রভাব বলয়ে বিভক্ত হয়। উত্তরাংশ রাশিয়া এবং দক্ষিণাংশ ইংল্যান্ডের প্রভাব বলয় হিসেবে স্থিরীকৃত হয়।

একইভাবে নিকট প্রাচ্য বা তুরস্ক ছিল ইউরােপীয় শক্তিবর্গের সাম্রাজ্য বিস্তার এবং সংঘর্ষের একটি উল্লেখযােগ্য কেন্দ্র, মৃতপ্রায় তুরস্ককে গ্রাস করাই ছিল ইউরােপীয় শক্তিগুলির উদ্দেশ্য। এই সংঘর্ষের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রাশিয়া, অস্ট্রিয়া এবং ইংল্যান্ড। তুরস্কের অখণ্ডতা বজায় রাখা ছিল ইংল্যান্ডের দীর্ঘ অনুসৃত নীতি। আর তুরস্ককে গ্রাস করা ছিল রাশিয়ার নীতি। ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দে ইঙ্গ রুশ কনভেনশন স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইংল্যান্ডকে তার দীর্ঘদিনের তুরস্ক নীতি পরিহার করে রাশিয়ার মতই তুরস্ককে গ্রাস করতে অগ্রসর হয়।

দূর প্রাচ্য চীন ছিল ইউরােপীয় শক্তিগুলির সাম্রাজ্য বিস্তাবের প্রধান লক্ষ্য। ইউরােপীয় রাষ্ট্রগুলি সেখানে অর্থনৈতিক শােষণ এবং রাজনৈতিক আধিপতা স্থাপনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথম চীন যুদ্ধ (১৮৩৯-৪২ খ্রী:) এবং দ্বিতীয় চীন যুদ্ধের (১৮৫৬-৬১ খ্রী:) সুযােগ নিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স বাণিজ্যিক অতিরাষ্ট্রিক সুযােগ সুবিধা অর্জন করে। চীনের দুর্বলতার সুযােগে জাপানও সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠে। কোরিয়ার উপর চীনের আধিপত্য চলে যাওয়ার পর সেখানে জাপান তার আধিপত্য বিস্তার করে। রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানী, ইংল্যান্ড, জাপান প্রভৃতি দেশ চীনে বিস্তার নীতি অনুসরণ করে চলে। জার্মানী সান্টুং অঞ্চলে, ইংল্যান্ড ইয়াং সিকিয়াং অঞ্চল, রাশিয়া মাঞ্চুরিয়া ও মঙ্গোলিয়ায়, ফ্রান্স কোয়াং চোয়াং, টনকিন ও ইউনান অঞ্চলে তাদের প্রাধান্য স্থাপন করেছিল। দূর প্রাচ্যে রাশিয়ার অগ্রগতিতে জাপান ও ইংল্যান্ড আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ১৯০৪ খ্রী: জাপান শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হয়। রুশ-জাপান যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত হয়ে মাঞ্চুরিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯১০ খ্রীষ্টাব্দে জাপান কোরিয়া দখল করে নেয়। সাম্রাজ্যবাদী জাপান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনের কাছে একুশ দফা দাবী পেশ করেছিল।

সাম্রাজ্যবাদের পরিণতি : ১৮৯৭-৯৮ খ্রীষ্টাব্দের পর ইউরােপীয় রাজনীতি বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে সমপক্ত হয়ে পড়েছিল। অধ্যাপক জি. বারাক্ল (G. Barraclough) মনে করেন ১৮৯৮ খ্রীঃ থেকে ইউরােপের দেশগুলি এবং জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশঃ বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করে। তাই একদিকে যেমন মহাদেশীয় রাজনীতিতে জার্মানীর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ছিল ইউরােপীয় রাজনীতি থেকে উদ্ভূত, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এই দুটি দেশের কাছে জার্মানীর প্রাধান্যের প্রশ্ন নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্রিটেনের সামুদ্রিক আধিপত্য ছিল প্রধান প্রতিবন্ধক, জাপানের কাছে এশিয়ার বিশেষত সুদূর প্রাচ্যে রাশিয়ার ক্রমিক বিস্তার নীতি অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে মহাদেশীয় রাজনীতির চিরায়ত ধারার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অভ্যুদয় ঘটেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরােপ ও ইউরােপ-বহির্ভূত দেশগুলাের যােগদানের ফলে একটি সার্বিক বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল।