Cuban Missile Crisis - কিউবা মিসাইল/ক্ষেপণাস্ত্র সংকট ১৯৬২

- August 22, 2019
কিউবা দ্বীপটি ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত। স্পেন যখন ল্যাটিন আমেরিকা থেকে তার উপনিবেশগুলি ত্যাগ করতে থাকে সেই সময় কিউবাও স্পেনের অধীনতা পাশ থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু কিউবা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হতে পারেনি। সেখানে স্পেনের পরিবর্তে আমেরিকার রাজনৈতিক প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৩ সালে প্লাট চুক্তি অনুসারে আমেরিকা কিউবার আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার লাভ করে। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কিউবাতে আমেরিকার প্রভাৰ বলবৎ ছিল। ১৯৫০ এর দশকে Cold War বা ঠাণ্ডা লড়াইয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্রশস্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি সংকটের সুত্রপাত করে যা কার্যত পৃথিবীকে পারমাণবিক একটি সংঘাতের প্রান্তে উপনীত করে। এই সংকট কিউবার মিসাইল সংকট (Cuban Missile Crisis) নামে পরিচিত।
Newspaper of Cuba missile crisis
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভন্টে ল্যাটিন আমেরিকার প্রতি Good Neighbour Policy অনুসরণ করার ফলে কিউবা ও আমেরিকার সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। কিউবায় মার্কিন প্রভাব হ্রাস পায়। ১৯৪৭ সালে আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে দুটি পারস্পরিক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিউবাও এতে স্বাক্ষর করেন। কিউবা ও আমেরিকা পরস্পর নিরাপত্তার ব্যাপারে সংযুক্ত হয়। ১৯৫২ সালে বাতিস্তা আমেরিকার সহায়তায় এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি কিউবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই অর্থনৈতিক অব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কিউবায় সাম্যবাদী প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় আভ্যন্তরীণ বিপ্লব ঘটে। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে বাতিস্তা পরিচালিত সরকারের পতন ঘটে। কাস্ত্রো কিউবার শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু নানা কারণে কাস্ত্রের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। কারণগুলি হল - (১) সােভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে কাস্ত্রোর মৈত্রী নীতি, (২) কিউবার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা, (৩) বৈদেশিক শিল্প ও বাণিজ্যের জাতীয়করণ, (৪) কিউবার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে মার্কিন নির্ভরতা কমানাে, (৫) সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন, (৬) রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক ও সামরিক নির্ভরতা স্থাপন ইত্যাদি। এইসব কারণে আমেরিকা কাস্ত্রোর উপর অসন্তুষ্ট হয়। আমেরিকা নানাভাবে কিউবার অর্থনীতি ধ্বংস করার চেষ্টা করে। কিন্তু কাস্ত্রো তা ব্যর্থ করে দেন। ১৯৬০ সাল থেকে আমেরিকা কিউবায় রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। ১৯৬১ সালে দেশত্যাগী কাস্ত্রে বিরােধীরা আমেরিকার সাহায্যে কিউবা আক্রমণ করে। কিন্তু কাস্ত্রো তা ব্যর্থ করে দেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে আমেরিকা কিউবাকে আগের দুটি চুক্তি এবং 0. A. S. (Organisation of American States) থেকে বহিষ্কার করে।

এইসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিউবা নিজের নিরাপত্তা ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়ে। কিউবা আত্মরক্ষার জনা রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। কিউবার ভয় ছিল Rio Pact এর অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকার সদস্যরা কিউবা আক্রমণ করতে পারে। সােভিয়েত প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ কিউবাকে অস্ত্র সাহায্য করেন। কিউবা রাশিয়ার সাহায্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ করে। জুলাই মাসে রাশিয়া Surface to air মিসাইল পাঠান। সেই সঙ্গে MiG-21 জঙ্গি বিমান, 11.28 Jet Nuclear Bomber এবং Ground to ground মিসাইল পাঠান। তবে কাস্ত্রো প্রচার করেছিলেন এটি একটি মৎস্য ধরার ঘাঁটি। আমেরিকার ভয় ছিল এই ঘাঁটি থেকে আমেরিকা ও সমগ্র পশ্চিম গােলার্ধের নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। কিউবা রাশিয়ার সাহায্যে তার বিমান বাহিনীকেও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। এবং ১৯৬২ সালে কিউবা মিসাইল সংকট সৃষ্টি হয়।

এইসব ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি ১৯৬২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর দেড় লক্ষ সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। কুশ্চেভ আমেরিকার নিন্দা করেন এবং সােভিয়েত বাহিনীও প্রস্তুত থাকবে বলে ঘােষণা করেন। কেনেড়ি ঘােষণা করেন যে কিউবা থেকে কোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে তার জন্য রাশিয়া দায়ী থাকবে। তাছাড়া তিনি ক্রুশ্চেভকে কিউবা থেকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্র অপসারণ করার জন্য অনুরােধ করেন। কেনেডি কিউবার চারদিকে নৌ অবরােধ সৃষ্টি করেন এবং ঘােষণা করেন যে কিউবা গামী সমস্ত জাহাজগুলিতে অনুসন্ধান করা হবে। ১৯৬২ সালের ২৪শে অক্টোবর কেনেডি মার্কিন বাহিনীকে নির্দেশ দেন যে রাশিয়া কর্তৃক কিউবায় প্রেরণ করা অস্ত্রশস্ত্র রাস্তায় আটক করা হবে। সােভিয়েত রাশিয়া এক পাল্টা ঘোষণায় জানায় যে কিউবাগামী কোন প্রাহাজ বাধাপ্রাপ্ত হলে গুলিবর্ষণ শুরু হবে। ২৫শে অক্টোবর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। আমেরিকা রাশিয়ার একটি তৈলবাহী জাহাজ ও লেবাননের একটি সামগ্রীবাহী জাহাজ তল্লাসী করে। কিন্তু কোনটিতেই আক্রমণাত্মক অস্ত্র ছিল না। জাহাজ দুটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতিতে কিউবা, রাশিয়া ও আমেরিকা তিন পক্ষই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে বিষয়টি উত্থাপন করেন। রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারী জেনারেল উ থান্ট ও জোট নিরপেক্ষ দেশগুলি শান্তিরক্ষার জন্য কেনেডি ও কুশ্চেভের কাছে আবেদন করেন। উ থান্ট দুপক্ষকে যুদ্ধরত কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরােধ করেন। উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য উ থান্ট আমেরিকা ও রাশিয়ার কাছে দুটি প্রস্তাব পাঠান। প্রথমতঃ উ থান্ট কুশ্চেভকে অনুরােধ করলেন যে সােভিয়েত জাহাজ যেন মার্কিন প্রহরারত জাহাজ থেকে দূরে থাকে। দ্বিতীয়তঃ উ থান্ট আমেরিকাকে জানান যে রাশিয়া কিউবা থেকে আক্রমণাত্মক সামরিক সাজ সরঞ্জাম সরিয়ে নেবে। তবে আমেরিকাকেও তুরস্ক থেকে অনুরূপ জিনিস সরাতে হবে। কেনেড়ি জানান যে আমেরিকা কিউবা থেকে নৌ অবরােধ তুলে নেবেন। কিন্তু একই সঙ্গে রাশিয়াকেও কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত ঘটিগুলিকে তুলে নিতে হবে। ১৯৬২ সালের ২৮শে অক্টোবর ক্রুশ্চেভ কিউবা থেকে সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি সরিয়ে নেবার আদেশ দেন এবং কেনেডিকে তা জানানাে হয়। রাশিয়া প্রকৃতই কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি গুলি তুলে নেয়। ১৯৬২ সালের ২০শে নভেম্বর আমেরিকা ও কিউবা থেকে নৌ অবরােধ তুলে নেয়। এইভাবে বিশ্বের দুই শক্তিশালী নেতা কেনেডি ও কুশ্চেভের মনে শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার ফলেই কিউবা সমস্যার আপাতত সমাধান হয় এবং ১৯৬২ সালে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা দূর হয়।

রাষ্ট্রসংঘ কেনেডি ও কুশ্চেভের দূরদর্শিতার প্রশংসা করে। পৃথিবী আসন্ন মানবিক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পায়। কুশ্চেভে যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতির পক্ষপাতী তা প্রমাণিত হয়। কেনেডি কুশ্চেভের এই দুরদর্শিতার প্রশংসা করেন। এরপর রুশ মার্কিন সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। ১৯৬৩ সালে মস্কোয় আনবিক বিশ্বেগণ নিষিদ্ধ করণের জন্য উভয়ের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু আলবানিয়া ও চীন ক্ষেপণাস্ত্র খাঁটি তুলে নেবার জন্য কুশ্চেভের নিন্দা করে। চীন আমেরিকাকে কাগজের বাঘ নামে অভিহিত করে। ক্রুশ্চেভ এর উত্তরে বলেন যে, এই বাঘের মানবিক দন্ত আছে। যা হােক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে আদর্শগত সংঘাত দেখা দেয় এবং উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। তবে কিউবা সংকটের সময়ে লাতিন আমেরিকার কিছু রাষ্ট্র মার্কিন নীতি সমর্থন করলেও অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি বাধ্য হয়েই আমেরিকাকে সমর্থন করতে সম্মত হয়। তারা তাদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার জন্য সচেষ্ট ছিল। তারা কিউবা অবরােধের প্রস্তাব অনিচ্ছা সত্বেও গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীকালে আমেরিকা লাতিন আমেরিকাকে সাম্যবাদী প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট হয়। তবে লাতিন আমেরিকায় কমিউনিষ্ট বিরােধিতাকে শক্তিশালী করতে গিয়ে আরও বেশী মাত্রায় মার্কিন বিরােধী হয়ে ওঠে। আমেরিকা যে সব প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক গােষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করেছিল, তার ফলে এই অঞ্চলের জনগণ আরও বেশি মার্কিন বিরোধী হয়ে ওঠে।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. প্রণব কুমার চট্টোপাধ্যায় - আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস
2. অসিত কুমার সেন - আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস
3. রাধারমন চক্রবর্তী ও সুকল্পা চক্রবর্তী - সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
4. Peter Calvocoressi - World Politics since 1945
Advertisement