PayPal

ফরাসী সংবিধান সভার কার্যাবলী, ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার

author photo
- Sunday, August 11, 2019

ফরাসী সংবিধান সভা

জাতীয় সভা (National Assembly) ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান রচনার কাজে ব্রতী হলে, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ২৭ জুন জাতীয় সভা সংবিধান সভায় (Constituent Assembly) রূপান্তরিত হয়। এই সভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা ছিল বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। শ্রমিক ও কৃষকশ্রেণীর প্রতিনিধি এই সভায় সংখ্যালঘু ছিল। কোব্বানের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় সভায় আইনজীবি সদস্যের সংখ্যা ছিল ২০ %, চাকুরীজীবি ৫ %, বণিক ও শিল্পপতি ছিল ১৩ % এবং কৃষকদের প্রতিনিধি ছিল ৯ %। কাজেই সংবিধান সভায় বুর্জোয়া সদস্যরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। এজন্য সংবিধান সভা প্রধানতঃ মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে সংবিধান রচনা করে। সংবিধান সভার দার্শনিকদের ভাবধারাগুলিকে সংবিধানের মাধ্যমে বাস্তব প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। সংবিধান সভা ফ্রান্সের পুরাতনতন্ত্রকে ধ্বংস করে ফ্রান্সে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রবর্তনের প্রচেষ্টা করে।
France Constituent 1791
৪ঠা আগষ্ট ঘোষণা : জাতীয় সভার আমলে ৪ঠা আগষ্ট, ১৭৮৯ খ্রীঃ অধিবেশনে ফ্রান্সে সামন্ততন্ত্র প্রথা লােপ করা। হয়েছিল। সংবিধান সভা এই সিদ্ধান্তকে আইনগত স্বীকৃতি দেয়। সামন্তপ্রথার লােপের ফলে ভূমিদাস প্রথা, বেগার বা কর্ভি প্রথা, সামন্ত কর, ম্যানর প্রথা, মেটায়ার বা বর্গা প্রথা, টাইদ বা ধর্ম কর, অভিজাতদের বিশেষ অধিকার যথা সরকারি চাকুরীর অগ্রাধিকার আইনের হাত থেকে অব্যাহতি, বৈষম্যমূলক কর প্রভৃতি লােপ পায়। অভিজাতদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির জন্যে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়। ৪ঠা আগষ্টের ঘােষণা কার্যতঃ ফ্রান্সে সামন্তপ্রথার মৃত্যুর ঘন্টা বাজায়। কারণ এই ঘােষণার ফলে জমিদারদের অধিকাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। গীর্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। এই জমি শেষ পর্যন্ত কৃষকদের হাতে পৌছে যায়।

৪ঠা আগষ্টের ঘোষণার ত্রুটি : ৪ঠা আগষ্ট ঘােষণার কিছু কিছু আইনগত ত্রুটি ছিল। হ্যাম্পাসন সােস্যাল হিষ্ট্রি অব দি ফ্রেঞ্চ রেভােলুশন গ্রন্থে বলেছেন যে, ৪ঠা আগষ্টের ঘােষণার দ্বারা তিনটি শ্রেণীকে বিলুপ্ত করে ফ্রান্সের সকল নাগরিকদের একটিমাত্র শ্রেণীতে পরিণত করা হয়নি। ফলে তখনও কাগজে কলমে তিনটি এষ্টেট বা শ্রেণী থেকে যায়। লেফেভারও এই কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন যে, ৪ঠা আগষ্টের ঘােষণার দ্বারা জেষ্ঠপুত্রের পিতার সম্পত্তিতে অধিকার অবলুপ্ত হয়নি।

আইনের সাম্য প্রতিষ্ঠা নভেম্বর ঘোষণা : ৪ঠা আগষ্টের ঘােষণায় আইনের কাছে সকলের সমান অধিকার আইনে সকল অপরাধীদের জন্যে সমান শাস্তি, ধর্মীয় স্বাধীনতা, যাজকদের একাধিক পদ অধিকারের নিষিদ্ধকরণ, পােপকে প্রদেয় বার্ষিক কর লােপ করা হয়। ওপরে ৪ঠা আগষ্টের ঘােষণার যে ত্রুটিগুলি উল্লেখ করা হল তার অনেকটা ৭ই নভেম্বর, ১৭৮৯ এর ঘােষণার দ্বারা সংবিধান সভা সংশোধন করে। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর ঘােষণার দ্বারা বলা হয় যে - ফ্রান্সে তিনটি এষ্টেট বা শ্ৰেণী লুপ্ত হল। ১৭৯০ খ্রীঃ ২৮শে ফেব্রুয়ারি ঘােষণায় বলা হয় যে, সেনাদলে কোন বিশেষ শ্রেণীর জনাে পদাধিকার থাকবে না। যে কোন সৈন্য যােগ্যতার পরিচয় দিলে উচ্চ পদে উন্নীত হবে। সেনাদলের ওপর অভিজাতদের আধিপত্য লােপ করা হয়। অন্যান্য সরকারি পদগুলিকেও যােগ্যতার ভিত্তিতে নিয়ােগের জন্যে খুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ সরকারি পদগুলির গণতন্ত্রীকরণ করা হয়। ১৭৯০ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারি ঘােষণার দ্বারা গ্রামগুলিতে অভিজাতদের ম্যানেরীয় অধিকার লােপ করা হয়। প্রতি কমিউনের শাসনের জন্যে নির্বাচিত পেীর পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা করা হয়। এইভাবে ১৭৮৯, ৪ঠা আগষ্ট থেকে ১৭৯০-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুরাতনতম্বের সকল শিকড়কে উপড়ে ফেলা হয়। ঐতিহাসিক রাইকার সংবিধান সভার এই কাজগুলিকে পুরাতনতম্বের কবর রচনা বলেছেন।

ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণা : সংবিধান সভা ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারগুলি ঘােষণা " (২৬শে আগষ্ট, ১৭৮৯ খ্রীঃ) করে।লেফেভারের মতে, “এই ঘােষণাপত্র ফরাসী বিপ্লবকে পৌরাণিক মর্যাদা দান করে।" আমেরিকার স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র এবং লক ও রুশাের দার্শনিক তত্বের ওপর নির্ভর করে এই ঘােষণাপত্র রচিত হয়। এছাড়া এই ঘােষণাপত্রে প্রাকৃতিক আইন বা Natural Law-র প্রভাবও দেখা যায়। ঐতিহাসিক জে. এফ. টেইলারের মতে পুরাতনতন্ত্রের আমলের স্বৈরশাসন এবং অভিজাতদের জাতকৌলিন্যকে এই ঘােষণাপত্র ইতিহাসের আবর্জনা কুণ্ডে ফেলে দেয়।

ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণাপত্রের বৈশিষ্ট্য : নাগরিক অধিকার ঘােষণাপত্রে বলা হয় যে - (১) মানুষ স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানুষ এই স্বাধীনতা ভােগ করার অধিকারী। (২) মানুষ জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রকৃতি দত্ত অধিকার লাভ করে। এই অধিকারগুলি হল স্বাধীনভাবে বাঁচার, সম্পত্তি অর্জন ও ভােগ করার, জীবনের নিরাপত্তা রক্ষা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরােধের অধিকার। এই অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়া যায় না, কারণ এগুলি প্রকৃতির দান। সুতরাং ইহা অপরিবর্তনীয়। (৩) আইনের উৎস হল জনমত। জনমতের বিরুদ্ধে আইন রচিত হতে পারে না। (৪) সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র জাতির মধ্যেই নিহিত আছে। রাজা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নন। (৫) আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। কেহ কোন বিশেষ মর্যাদা বা অধিকার পেতে পারে না। সকল নাগরিক সমান সুযােগ লাভ করার অধিকারী। (৬) সম্পত্তি ভােগের অধিকার হল একটি পবিত্র অধিকার। আইনের সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণ ছাড়া কারও সম্পত্তি হরণ করা যায় না। (৭) আইনের সাহায্য ছাড়া কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দেওয়া যাবে না। (৮) মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মাচরণের স্বাধীনতা হল একটি মৌলিক অধিকার। (৯) নাগরিক অধিকার ঘােষণাপত্রে সরকারি ক্ষমতার বিভাজন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে ঘােষণা করা হয়।

ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণার গুরত্ব : ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার সম্পর্কিত ঘােষণাপত্র ছিল নিঃসন্দেহে একটি উচ্চ আদর্শের পরিচয়। এই আদর্শগুলি কেবলমাত্র ফরাসী জাতিকে অনুপ্রাণিত করেনি। ইওরােপের নিপীড়িত জনসমষ্টি এই ঘােষণার মধ্যে মুক্তির অধিকার খুঁজে পায়। লেফেভারের মতে, “ইওবােপের সর্বত্র এই ঘােষণাপত্রের মর্ম এক নবযুগের সঙ্কেত সূচনা করে।" ঐতিহাসিক ওলারের মতে, “এই ঘােষণাপত্র ছিল পুরাতনতন্ত্রের মৃত্যুর পরওয়ানা।" এই ঘােষণার মধ্যে জনসাধারণ এক অসীম সম্ভাবনা ও প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত পায়। শত শত বছর ধরে ফরাসী জাতি যে সকল গণতান্ত্রিক, মৌলিক ও মানবিক অধিকারে বঞ্চিত ছিল, এই ঘােষণাপত্র তাদের সেই সকল অধিকার দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। ফরাসী বিপ্লবের আশাবাদ ও মুক্তির আশ্বাস এই ঘােষণাপত্রে উচ্চারিত হয়।

ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণার ত্রুটি : ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার ঘােষণাপত্রের বিশেষ কয়েকটি ক্রটিও ছিল। বুর্জোয়া শ্রেণী কেবলমাত্র নিজ সম্প্রদায়ের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এই ঘােষণাপত্র রচনা করে। যদিও ঘােষণাপত্রে বলা হয় যে, সকল মানুষ স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মায়, কিন্তু বুর্জোয়া নেতারা ভােটাধিকার আইন রচনার সময় সে কথা ভুলে যায়। তারা সর্বসাধারণের ভােটাধিকার নীতিকে অগ্রাহ্য করে। এই ঘােষণাপত্রেও সর্বসাধারণের ভােটাধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়নি। দ্বিতীয়তঃ, এই ঘােষণাপত্রে সম্পত্তির অধিকার পবিত্র বলা হয়। কিন্তু দরিদ্র জনসাধারণের জীবিকার অধিকার, কাজ পাওয়ার অধিকার স্বীকার করা হয়নি। ফলে সম্পত্তিভােগীদের অধিকার রক্ষিত হলেও সম্পত্তিহীনদের দাবী অনুক্ত থাকে। ব্যক্তির নাগরিকের অধিকার রাজনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলা হলেও তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলেননি। তৃতীয়তঃ, এই ঘােষণায় নাগরিকের অধিকারের কথা ঘােষিত হলেও, নাগরিকের কর্তব্যের কথা অনুক্ত থাকে। জর্জ রুডের মতে, "নাগরিকের অধিকার ঘােষণাপত্রের মহান ভাষা ও আদর্শগুলি স্বত্তেও এটি ছিল একটি বুর্জোয়া শ্রেণীর অধিকারের দলিল।" চতুর্থতঃ, লেফেভারের মতে, সম্পত্তির অধিকার এই ঘােষণাপত্রে পবিত্র বলা হয়। কিন্তু সম্পত্তির ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তথাপি এর দ্বারা পুরাতনতন্ত্রের মৃত্যুর ঘণ্টা বাজান হয়।

রাজার ক্ষমতা : সংবিধান সভা ফ্রান্সের জন্য ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সংবিধান রচনা করেন। এতে বলা হয় - বুরবো রাজবংশের স্বর্গীয় অধিকার নীতিকে নস্যাৎ করে রাজাকে সংবিধানের অধীন করা হয়। রাজার সর্বময় ক্ষমতা লােপ করে তাকে কেবলমাত্র কার্য রাজার নির্বাহক বিভাগ বা শাসন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফ্রান্সের রাজার উপাধি হয় ফরাসী জাতির রাজা। রাজার রাজকোষের অর্থ ব্যয় করার ক্ষমতা লােপ করা হয়। রাজার নিজস্ব ব্যয় নির্বাহের জনাে বার্ষিক ২৫,০০০,০০০ লিব্র মঞ্জুর করা হয়। রাজার ব্যক্তিগত জমি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কার্য নির্বাহক বা এক্সিকিউটিভ বিভাগের কর্তা হিসেবে রাজা, তার মন্ত্রী, সেনাপতি, রাজদূত নিয়ােগ করার অধিকার পান। কিন্তু সেনাদলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ লোপ করা হয়। ক্ষমতা বিভাজন নীতি অনুসারে তার আইন রচনা ও বিচার করার অধিকার লোপ করা হয়। সকল সরকারি কর্মচারীকে জাতির নামে শপথ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আইন সভার ক্ষমতা : সংবিধান সভা নতুন সংবিধানে আইনসভাকে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পণ করে। আইনসভাটিকে এক কক্ষ বিশিষ্ট করা হয়। আইনসভার সদস্য সংখ্যা ৭৪৫ করা হয়। আইনসভার সদস্যদের কার্যকালের মেয়াদ হয় ২ বছর। একবার কোন ব্যক্তি নির্বাচিত হলে তার পুনরায় প্রার্থী হওয়ার অধিকার লােপ করা হয়। ভােটাধিকার সম্পর্কে আইনে বলা হয় যে, যে সকল নাগরিক অন্ততঃ তিন দিনের নির্ধারিত মজুরী সরকারকে প্রত্যক্ষ কর হিসেবে দেয় একমাত্র তারাই ভােটাধিকার পাবে। এই মাপকাঠির ভিত্তিতে ফ্রান্সের নাগরিকদের সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় এই দুভাগে ভাগ করা হয়। যারা অন্ততঃপক্ষে তাদের তিন দিনের রােজগার সরকারকে কর হিসেবে দিত তাদের সক্রিয় নাগরিক হিসেবে ভােট দানের অধিকার দেওয়া হয়। বাকি লোকেদের ভোটাধিকার নাকচ করা হয়। এদের বলা হয় নিস্ক্রিয় নাগরিক। সক্রিয় নাগরিকদের ভােটে প্রাথমিক স্তরে নির্বাচন হলে ভােটে যারা নির্বাচিত হয় তাদের নিয়ে নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয়। এই নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। এই ৫০ হাজার নির্বাচকের ভােটে আইনসভার সদস্যরা চুড়ান্তভাবে নির্বাচিত হবে বলা হয়। এই নির্বাচকমণ্ডলীর তারাই সদস্য নির্বাচিত হতে পারত যারা ৫ দিনের নির্ধারিত মজুর বা সরকারকে কর দিত। নির্বাচন দুটি স্তরে হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। যারা ৫২ লিভ্র কর সরকারকে দিত এবং যাদের অন্ততঃ কিছু সম্পত্তি ছিল তারা আইনসভার প্রার্থী হওয়ার যােগ্য বলে বিবেচিত হয়।

প্রাদেশিক শাসন : পুরাতনতন্ত্রের চিহ্ন লােপ করার জন্যেই নতুন করে প্রদেশগুলিকে ভাগ করা হয়। রাজতন্ত্রের যুগের প্রদেশের বিভাগ এবং প্রদেশের শাসনব্যবস্থার বিলোপ জনসাধারণ চেয়ছিল। সংবিধান সভা জনসাধারণের ইচ্ছাকে পূরণের জন্যেই প্রদেশের পুনর্গঠন করে। শাসনের সুবিধার জন্যে সমগ্র ফরাসী দেশকে সমান পরিধির ৮৩টি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। নতুন প্রদেশগুলির নাম হয় ডিপার্টমেন্ট। এই ৮৩টি প্রদেশকে ৫৪৭টি জেলায় এবং জেলাগুলিকে ক্যান্টনে বিভক্ত করা হয়। প্রদেশের শাসনের জন্যে পুরাতন ইন্টেন্ডেন্ট প্রথা ও প্রাদেশিক সভা লােপ করা হয়। এর স্থলে প্রদেশ, জেলা, গ্রাম প্রতি স্তরে নির্বাচিত শাসনকর্তা নিয়ােগের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতি প্রদেশে ও জেলায় একটি নির্বাচিত সাধারণ পরিষদের ব্যবস্থা করা হয়। সক্রিয় নাগরিকদের ভােটে শাসনকর্তা ও পরিষদের সদস্য নির্বাচনের বিধি চালু করা হয়। প্রতি কমিউনে একটি করে নির্বাচিত পরিষদের ব্যবস্থা করা হয়। সক্রিয় নাগরিকদের ভােটে দু বছরের জন্যে এই কমিউন বা পৌর পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদ স্থানীয় রক্ষী বাহিনী বা ন্যাশনাল গার্ডকে নিয়ন্ত্রণ, পৌরকর আদায় ও নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পায়। গ্রামসভা বা ক্যান্টন সভাগুলিকে অনুরূপ ক্ষমতা দেওয়া হয়।

বিচার ব্যবস্থা : বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে পুরাতন বিচার ব্যবস্থার অবলােপ করা হয়। পার্লেমেন্ট অফ প্যারিস এবং প্রাদেশিক সামন্ত বিচারসভাগুলি বিলােপ করা হয়। বিচারকদের নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়ােগের নিয়ম করা হয়। বিচারালয়কে আইন বিভাগ বা শাসন বিভাগের এক্তিয়ার থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দান করা হয়। বিচারকদের নিয়মিত বেতন প্রদানের নিয়ম করা হয়। বিচারপ্রার্থীদের নিকট হতে ফি বা উৎকোচ গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। বিচারপ্রার্থীকে বিনা খরচায় বিচার দান করার নিয়ম করা হয়। সারা দেশে নির্বাচিত বিচারক নিয়ােগ এবং বিনা খরচায় বিচার দ্বারা বিচার ব্যবস্থাকে জনমুখী করা হয়। স্থানীয় বিচারালয়গুলির উপরে আপীল আদালত বা হাইকোর্ট স্থাপন করা হয়। সরকারি কর্মচারীদের পরীক্ষার দ্বারা যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন করার নিয়ম করা হয়।

অর্থনৈতিক সংস্কার : সংবিধান সভা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করে। সকল প্রকার পরােক্ষ কর যথা গাবেল বা লবণ কর প্রভৃতি রদ করা হয়। জমি, আয় ও অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নূতনভাবে কর ধার্য করা হয়। গ্রামসভা ও স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটিগুলিকে এই কর আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বৈষম্যমূলক কর বিলােপ করে নায্য ভিত্তিতে আয়ের উপর লক্ষ্য রেখে সকল শ্রেণীর উপর কর ধার্য করা হয়। বাণিজ্য ও শিল্প থেকে আয়ের ওপর আয়কর বসান হয়। এছাড়া স্বদেশপ্রেমমূলক দাতব্য কর অর্থসঙ্কট দূর করার জন্যে আদায় করা হয়। এ সকল ব্যবস্থার ফলে অর্থসঙ্কটের সুরাহা না হওয়ায় গীর্জার ভূসম্পত্তি জাতীয়করণ করা হয়। এই সম্পত্তির মূল্যের ভিত্তিতে এ্যাসাইন্যাটি নামে এক প্রকার কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়। প্রায় ১২০ কোটি টাকা মূল্যের কাগজের এস্যাইন্যাট বাজারে ছাড়া হয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার জন্যে অবাধ বাণিজ্য চালু করা হয় এবং সংরক্ষণ শুষ্ক রাখা। ফরাসী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একচেটিয়া বাণিজোর অধিকার লোপ করা হয়। গিল্ড প্রথা লোপ করা হয়। কর্মহীনের কর্ম সংস্থান আইন আরা শ্রমিকের কর্ম সংস্থানের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। লা শেপালিয়ার আইন দ্বারা শ্রমিকের ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার হরণ করা হয়।

ধর্মীয় সংস্কার : সংবিধান সভা ফ্রান্সের ধর্মবিষয়ক ব্যাপারের সমাধানের জন্যে Civil Constitution of the Clergy নামে এক আইন পাশ করে। ফ্রান্সের গীর্জার নাম ছিল গ্যালিকান গীর্জা (Gallican Church)। ক্যাথলিক প্রথা অনুসারে এতদিন ফরাসী গীর্জা রােমের পােপর অধীনে ছিল — বিশপরা তার অনুমতি অনুসারে নিযুক্ত হত। নতুন আইনে পােপের নিয়ন্ত্রণ একেবারে লােপ করা হয়। গ্যালিকান গীর্জা জাতীয়করণ করা হয়। বিশপ ও অন্যান্য স্তরের ধর্মযাজকরা অতঃপর পোপ কর্তৃক নিযুক্ত না হয়ে, ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হবে বলা হয়। গীর্জার ভূসম্পত্তি সরকারে বাজেয়াপ্ত করা হয়। গীর্জা সরকারের একটি দপ্তরে পরিণত হয়। যাজকদের সরকার থেকে নিয়মিত মাহিনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খ্রিস্টধর্মের সকল সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সংবিধানের ত্রুটি : এইভাবে সংবিধান সভা ফ্রান্সের প্রথম বিপ্লবী সংবিধান রচনা (১৭৯১ খ্রীঃ) সম্পূর্ণ করে। সংবিধান সভা পুরাতনতন্ত্রকে ধ্বংস করে, রাজার স্বৈরশাসনের ক্ষমতা লােপ করে। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সামাজিক সাম্য প্রবর্তন করে এই সভা প্রগতিমূলক দৃষ্টির পরিচয় দেয়। ফ্রান্সের পুরাতনতন্ত্র যখন ভেঙে যাচ্ছিল, সেই ভাঙনের যুগে নতুন ব্যবস্থা গঠন করা সহজ কাজ ছিল না। সামন্তপ্রথার শােষণ, রাজকীয় স্বৈরশাসন ও গীর্জার কুসংস্কার দূর করে সংবিধান সভা এক নতুন সমাজব্যবস্থার পত্তন করে। কিন্তু সংবিধান সভার কাজে বহু ত্রুটি ছিল। এই কারণে ১৭৯১ খ্রীষ্টাব্দের সংবিধান কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে। ঐতিহাসিক মাদেলার মতে, এই বিরাট সংস্কারগুলি ইতিহাসে অদ্বিতীয় হলেও আসলে এগুলি ছিল জীর্ণ ও ভঙ্গুর।

রাজার প্রতি অবিশ্বাসবশতঃ ১৭৯১ খ্রীঃ সংবিধানে রাজার ক্ষমতা বিপুলভাবে হ্রাস করা হয়। অথচ শাসনকার্য চালাবার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। ফলে তার হাতে দায়িত্ব থাকলেও ক্ষমতা ছিল না। রাজার মন্ত্রীদের আইনসভাকে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার ছিল না। অথচ মন্ত্রীরা তাদের কাজের জন্যে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ ছিল। রাজা ছিলেন কেন্দ্রের প্রশাসনিক প্রধান। অথচ তার আদেশনামায় মন্ত্রীরা সই না করলে তা কার্যকরী হত না। এর ফলে রাজা ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হন। লেফেভার বলেন যে, সংবিধান অনুযায়ী ফ্রান্সে নিয়মতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র চালু হলেও আসলে রাজার প্রকৃত ক্ষমতা না থাকায়, এই সংবিধান একটি বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র ছাড়া আর কিছু ছিল। অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী যথা প্রাদেশিক শাসনকর্তা, বিচারপতি নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্ত হওয়ার ফলে তারা রাজার প্রতি আনুগত্য দেখাতে বাধ্য ছিল না। এদের নিয়ন্ত্রণ করার কোন ক্ষমতা রাজার ছিল না। ফলে প্রদেশগুলির ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। ফ্রান্স যেন এক ঐক্যবদ্ধ দেশের পরিবর্তে ৮৩টি আলাদা দেশে ভাগ হয়ে যায়।

ক্ষমতা বিভাজন নীতির প্রতি অন্ধ আস্থা বশতঃ সংবিধান রচয়িতারা আইন বিভাগ থেকে শাসন বিভাগকে বিচ্ছিন্ন করেন। শাসন বিভাগের কর্তা হিসেবে রাজার পক্ষে তার সমস্যগুলিকে আইন সভাকে বােঝাবার কোন উপায় ছিল না। এদিকে আইনসভা শাসনকার্যের দায়িত্ব না থাকায়, শাসন বিভাগের সমস্যাগুলিকে বুঝতে পারত না। কাজেই প্রশাসনিক ও আইন বিভাগের মধ্যে কোন সংযােগ ও বােঝাপড়া না থাকায় সংবিধান অচল হয়ে পড়ে।

সকল মানুষের সমান অধিকার স্বীকার করলে ফ্রান্সের সকল নাগরিকের ভােটদানের অধিকার থাকা উচিত ছিল। কিন্তু সংবিধান সভার বুর্জোয়া সদস্যরা সম্পত্তির অধিকারকেই একমাত্র পবিত্র অধিকার গণ্য করত। এজন্য এই সভা ফ্রান্সের সকল নাগরিককে ভোটদানের অধিকার না দিয়ে, কেবলমাত্র সক্রিয় নাগরিকদের সম্পত্তির ভিত্তিতে ভােটাধিকার দেয়। বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতা দরিদ্র নাগরিকদের ভােটাধিকারে বঞ্চিত করে। বুর্জোয়া শ্রেণীর ভােটের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্যে সম্পত্তিবান ব্যক্তিদেরই একমাত্র ভােটের অধিকার দেয়। এর ফলে ফ্রান্সে বুর্জোয় শ্রেণীর শাসন স্থাপিত হয়। অভিজাতদের বিতাড়িত করে বুর্জোয়ারা শাসন ক্ষমতা নেয়। এই কারণে অকসফোর্ডের অধ্যাপক টমসন মন্তব্য করেন যে, যাজক, অভিজাত ও সাধারণ লােকের পরিবর্তে এই সংবিধান পাউন্ড, শিলিং ও পেনীর ভিত্তিতে নতুন শ্রেণী গঠন করে। ভােটাধিকার নীতির এই বঞ্চনার ফলে ফ্রান্সের প্রায় ৩০ লক্ষ নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। মানব জাতির ঘােষণাপত্রে সংবিধান সভা রুশােকে অনুসরণ করে বলে যে সকল মানুষ স্বাধীনতা ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মায়। তাহলে এই ৩০ লক্ষ নাগরিককে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সংবিধান সভা পরস্পর বিরােধী কাজ করে।

ফ্রান্সকে ৮৩টি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক সরকারের সম্পর্ক সংবিধানে নির্ণীত হয়নি। প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও কর্মচারীরা স্থানীয় ভােটে নির্বাচিত হওয়ার ফলে তারা নিজ নিজ অঞ্চলে সর্বেসর্বা হয়ে দাড়ায়। কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ ও নির্দেশ তারা পালন করতে বাধ্য ছিল না। রাজার পক্ষে এদের নিয়ন্ত্রণ করা দুস্কর ছিল। ফলে শাসনব্যবস্থায় দারুণ বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফ্রান্স যেন ৮৩টি আলাদা রাজ্যে বিভক্ত হয়। নেপােলিয়নের আমলে গােটা দেশের ওপর পুনরায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। এই সংবিধানে নির্বাচনের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়ােগের ফলে তাদের যােগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যায়। ভােটে নির্বাচিত বিচারপতিরা নির্ভীক ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

সংবিধানে এক কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বিপ্লবের সময় উত্তেজনা বশতঃ নিম্নপরিষদ কোন হঠকারী আইন পাশ করলে উচ্চকক্ষে তা সংশােধন করার উপায় ছিল না। আইনসভার সদস্যদের পুনঃ নির্বাচন রদ করায় অভিজ্ঞ সদস্যরা তাদের আইনসভার গঠনে অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেননি। সর্বদা নতুন সদস্যদের দ্বারা কাজ চালান কষ্টসাধ্য ছিল। এ্যাসাইন্যাট নামে কাগজের নােট চালু করলে ফ্রান্সে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। এদিকে বিপ্লবী সরকার অর্থাভাব দূর করার জন্য গীর্জার বাজেয়াপ্ত জমি বিক্রয় আরম্ভ করে। ধনী কৃষক ও বুর্জোয়া শ্রেণী যাদের হাতে নগদ টাকা ছিল তারা এই জমি কিনে নেয়। দরিদ্র কৃষকেরা এই জমি থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে এক নতুন ভূম্যাধিকারী শ্রেণীর সৃষ্টি হয়।

Civil constitution of the Clergy ধর্মবিশ্বাসী ক্যাথলিকদের মনে দারুণ আঘাত দেয়। গীর্জার ওপর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং নির্বাচনের মাধ্যমে যাজক নিয়ােগে বহু লােক অসন্তুষ্ট হয়। ১৭৯১ খ্রীঃ সংবিধানে আইনসভার হতেই সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়। প্রকৃত ক্ষমতা বিভাজন নীতি প্রয়ােগ করলে আইন, প্রশাসন ও বিচার তিন বিভাগের মধ্যে সুষম ও সমতা রেখে ক্ষমতা বণ্টন করা হত। তাহলে সংবিধানের স্থিতিশীলতা বাড়ত। কিন্তু বুর্জোয়া সদস্যরা নিজেদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার জন্যে আইনসভার হাতে প্রধান ও মেীলিক ক্ষমতাগুলি রেখে দেয়। লেফেভার এজন্য মন্তব্য করেছেন যে, সংবিধান সভা নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের কথা বলে। কিন্তু আসলে বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়।

সংবিধান সভা ভূমিহীন দরিদ্র, দিনমজুর, ভাগচাষী, শ্রমিক প্রভৃতির স্বার্থে কোন আইন পাশ করতে বিরত থাকে। বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্যে সংবিধান সভা বিভিন্ন আইন করে। সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা সম্পর্কে অবহেলা দেখায়। কর্মহীনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, অথবা শ্রমিকদের জন্যে নিম্নতম মজুরী আইন প্রয়ােজনীয়তা রচনা, দ্রব্যমূল্যের উচ্চতম সীমা বেঁধে আইন রচনা করতে সংবিধান সভা বিরত থাকে। কারণ বুর্জোয়া প্রতিনিধিরা মনে করত যে, এর ফলে তাদের স্বার্থের ক্ষতি হবে। এমন কি তারা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার হরণ করে। লা শেপালিয়ার আইন দ্বারা শ্রমিকদের ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার হরণ করা হয়। সুতরাং ১৭৯১ খ্রীঃ সংবিধান চালু হওয়ার পর দরিদ্র শ্রেণী আর একটি বিপ্লবের দ্বারা এই বুর্জোয়া সংবিধানকে ভেঙে তাদের অধিকার স্থাপনের প্রয়ােজনীয়তা বোধ করে।

তথ্যসূত্র :
1. Goodwin - The French Revolution.
2. Lefebvre - The French Revolution. P. 149, 153.
3. Madelin - The French Revolution.
4. Aulurd - Political History of the French Revolution.
5. Mathied - The French Revolution ( English translation by C. A. Philips).
6. Thomson - The French Revolution.
7. David Thomson - Europe since Napoleon. P. 12.
8. Hampson - Social History of the French Revolution.
9. New Cambridge Modern History - Vol . VIII.
10. Morse Stephens - Revolutionary Europe.
11. M. Vovelli - The Fall of the French Monarchy.
12. Aftalion - The French Revolution An Economic Interpretation.