PayPal

ইউরোপীয় শক্তি সমবায় উদ্ধব ও কার্যাবলী

author photo
- Tuesday, August 27, 2019
ইউরােপীয় শক্তি সমবায় (Concert of Europe) ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয়। ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও ইউরােপের শান্তি বজায় রাখার জন্য ভিয়েনার নেতারা একটি সংগঠন গড়ে তােলার সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র চুক্তি এবং ঐ বছরই মেটারনিক চতুঃশক্তি চুক্তি পেশ করেন। এই দুই চুক্তি স্বাক্ষরের ভিত্তিতে ইউরােপীয় দেশগুলির মধ্যে যে ঐক্যবন্ধন বা সমবায় গড়ে ওঠে, তা ইউরােপীয় শক্তি সমবায় বা ইউরোপীয় কনসার্ট নামে পরিচিত। ইউরােপের শক্তি সমবায় গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল - (১) ভিয়েনা বন্দোবস্ত অক্ষুন্ন রাখা, (২) ফ্রান্সের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলি বজায় রাখা, (৩) পারস্পরিক সহযােগিতার ভিত্তিতে ইউরােপে শান্তি অব্যাহত রাখা এবং (৪) ইউরােপে উদ্ভূত সমস্যাগুলির যথােপযুক্ত সমাধান করা।
Concert of Europe 1815
পবিত্র চুক্তি : রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার সর্বপ্রথম পবিত্র চুক্তি (Holy Aliance) পরিকল্পনা রচনা করেন। জার প্রথম আলেকজান্ডার ২৬শে সেপ্টেম্বর, ১৮১৫ সালে এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য বিজয়ী শক্তিদের আহ্বান করে। পবিত্র চুক্তিতে বলা হয় - (১) ইওরােপের রাজাগণ পরস্পরকে খ্রীষ্টীয় সমাজের অধীন ভ্রাতা হিসেবে বিবেচনা করবেন। এর অর্থ হল যে, কেহ কাহারও স্বার্থ ক্ষুন্ন করবেন না এবং পরস্পরকে ভ্রাতার ন্যায় জ্ঞান করবেন। (২) তারা নিজ নিজ প্রজাপুঞ্জকে নিজ সন্তানের ন্যায় দেখবেন। অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের আদর্শকে কার্যকরী করবেন। (৩) খ্রীষ্টীয় রাজারা ন্যায়, মানবপ্রেম ও শান্তি-কে অবলম্বন করে রাজ্য শাসন করবেন। (৪) ইওরােপীয় রাজারা অঙ্গীকার করবেন যে, শাসনকার্যে তারা ধর্মের মহান তত্ত্বগুলিকে পালন করবেন। (৫) প্রাশিয়া, রাশিয়া ও অষ্ট্রিয়ার সম্রাট বিশেষভাবে পরস্পরকে ভ্রাতা জ্ঞান করে উপরােক্ত আদর্শগুলিকে নিজ নিজ রাজ্যে কার্যকরী করবেন।

পবিত্র চুক্তিতে ইংল্যান্ড যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়। এই চুক্তি ছিল অস্পষ্ট। তাই ইংল্যান্ড এই চুক্তিকে একটি মহান রহস্যপূর্ণ অর্থহীন পাগলামি বলেন। মেটারনিক পবিত্র চুক্তির সমালােচনা করে বলেন যে, পবিত্র চুক্তি হল একটি অর্থহীন উচ্চ ঘােষণা মাত্র এবং এটি হল ধর্মীয় ছদ্মবেশে একটি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। মেটারনিকতার দিনলিপিতে মন্তব্য করেন যে, রাশিয়ার জারকে খুশি করার জন্যে অষ্ট্রিয়া ও প্রাশিয়া এতে স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আন্তরিকতার অভাব ছিল, তাই বিফল হয়।

চতুঃশক্তি চুক্তি: ইউরোপীয় কনসার্টের প্রকৃত সংগঠন ছিল চতুঃশক্তি চুক্তি (Quadruple Allance)। ইওরােপীয় শক্তি সমবায় গঠনের জন্যে বাস্তবপন্থী মেটারনিক চতুঃশক্তি সন্ধির খসড়া রচনা করেন। শোমাের চুক্তি অনুকরণে চতুঃশক্তি সন্ধি রচিত হয় ২০শে নভেম্বর, ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে। অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, রাশিয়া, ইংলন্ড স্বাক্ষর করে। ইওরােপীয় শক্তি সমবায় প্রকৃতপক্ষে চতুঃশক্তি সন্ধির দ্বারা স্থাপিত হয়। এই সন্ধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলি অঙ্গীকার করে যে — (১) ভিয়েনা সন্ধিকে রক্ষা করা হবে। (২) ইওরােপে যুদ্ধ বিগ্রহ রদ করে শান্তি অব্যাহত রাখা হবে। বিভিন্ন শক্তির মধ্যে বিরােধ দেখা দিলে তা আলাপ আলােচনার দ্বারা মিটিয়ে ফেলা হবে। (৩) বিপ্লবী ভাবধারা ইওরােপের শান্তির বিঘ্ন সৃষ্টি করলে তা দমন করা হবে। (৪) চতুঃশক্তি সন্ধির ৬নং ধারায় বলা হয় যে, ইওরােপের পরিস্থিতি পর্যালােচনার জন্যে চার শক্তি মাঝে মাঝে কংগ্রেস বা বৈঠকে সমবেত হবেন।

চতুঃশক্তি সন্ধির গুরুত্ব আধুনিক যুগের ইতিহাসে অস্বীকার করা যায় না। গ্রান্ট ও টেম্পারলির মতে, কংগ্রেস কূটনীতি বলতে যা বােঝায় তা চতুঃশক্তি সন্ধির ফলেই সৃষ্টি হয়। ইওরােপীয় শক্তিগুলি পরস্পরের মধ্যে বিরােধীয় বিষয়গুলিকে যুদ্ধের দ্বারা সমাধান না করে কংগ্রেসের দ্বারা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করবে, এই মনােভাবকেই কংগ্রেস কুটনীতি বলা হয়। ইওরােপীয় শক্তি সমবায় প্রকৃতপক্ষে চতুঃশক্তি সন্ধির ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়। সকল শক্তি ঐক্যমত হয়ে কাজ করে বলে এই জোটকে শক্তি সমবায় বলা হয়।

ইউরোপীয় কনসার্ট/ ইউরোপীয় শক্তি সমবায়ের কার্যাবলী

ইউরোপের সমস্যা সমাধানের জন্য ইউরােপীয় শক্তি সমবায়ের মােট পাঁচটি বৈঠক বসেছিল - (১) ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে এই-লা-শ্যাপেল, (২) ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ট্রপাে, (৩) ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে লাইব্যাক, (৪) ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ভেরােনা এবং (৫) ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট পিটার্সবার্গ বৈঠক।

এই-লা-শ্যাপেলের অধিবেশন : ফ্রান্স ভিয়েনা সন্ধি অনুসারে তার প্রদেয় ক্ষতিপূরণ পরিশােধ করায় ফ্রান্স থেকে বিজয়ী সেনাদল অপসারণের প্রশ্ন আলােচনার জন্যে ১৮১৮ সালে শক্তি সমবায়ের বৈঠক এই-লা-শ্যাপেলে আহ্বান হয়। এছাড়া সুইডেনের রাজার বিরুদ্ধে নরওয়ে কুশাসনের অভিযােগ জানালে সুইডেনরাজ বার্নাদোতকে শক্তি সমবায় ভৎসনা করেন এবং পবিত্র চুক্তির আদর্শ অনুসরণ করতে পরামর্শ দেন। মােনাকো নামে ক্ষুদ্র দেশের প্রজাগণ তাদের রাজার বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযােগ আনলে তাকে ভৎসনা করা হয়। জার্মানীর ব্যাডেন রাজ্যের উত্তরাধিকারের সমস্যা এবং অষ্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার ইহুদী প্রজাদের সমস্যা সম্পর্কেও শক্তি সমবায় ঐক্যমতে উপস্থিত হয়। ইতিমধ্যে চতুঃশক্তির মধ্যে স্বার্থগত কলহ প্রকটিত হলে শক্তি সমবায়ের পতনের ঘন্টা বেজে ওঠে। ইংল্যান্ড কতৃক দাস ব্যবসায় অবসানের উদ্দেশ্যে পরস্পর পরস্পরের জাহাজ তল্লাশি করিবার প্রস্তাব উথাপিত হলে ইহা অগ্রাহ্য করা হয়। কারণ, তখনও কোন কোন দেশ তাদের জাহাজের কাজের জন্য ক্রীতদাস নিয়ােগ করত। এই অধিবেশনে ফ্রান্সের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়াছে বিবেচনায় ফ্রান্সকে ইওরােপীয় শক্তি সমবায়ের সদস্য হিসাবে গ্রহণ করা হয়।

ট্রপোর অধিবেশন : মেটারনিক ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে শক্তি সমবায়ের দ্বিতীয় বৈঠক ট্রপাে শহরে আহ্বান করে। এই অধিবেশনে সমবায়ের সদস্যদের মধ্য মনোমালিন্য দেখা দেয়। ১৮২০ সালে স্পেন, পর্তুগাল ও নেপলসের রাজাগণের বিরুদ্ধে সেই সকল দেশের অধিবাসীরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এদিকে জার্মানিতেও মেটারনিকের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনব্যবস্থার সমর্থক সংবাদপত্রসেবী কোট্জ়েবুয়ে (Kotzebue) কার্ল স্যাণ্ড নামে এক ছাত্রের হাতে নিহত হলে মেটারনিকের প্রােটোকোল অফ ট্রপো বা ট্রপোর ঘােষণাপত্র রচনা করা হয়।

ট্রপোর ঘােষণাপত্রে বলা হয় যে, কোন দেশে যদি বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয় অথবা বিপ্লবাত্মক আন্দোলনের ফলে যদি কোন দেশের রাজা উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয় এবং তার প্রভাব যদি অপরাপর দেশে বিস্তারলাভের আশঙ্কা থাকে তাহলে সেই দেশকে ইওরােপীয় শক্তি সমবায় অর্থাৎ কনসার্ট অব ইওরোপ বহির্ভূত বলে বিবেচনা করা হবে। শুধু তাই নয় এরূপ দেশের আভ্যন্তরীণ শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে ইওরােপীয় শক্তি সমবায় সামরিক ও বেসামরিক সর্বপ্রকার সাহায্য দান করবে। ইংলণ্ডের প্রতিনিধি ক্যাসেলরি অপরদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ইওরােপীয় শক্তি সমবায়ের হস্তক্ষেপের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ইংল্যান্ড ট্রপোর প্রেটোকল স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকে। এইভাবে ইওরােপীয় শক্তি সমবায়ের সদস্যবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য প্রকাশ্য মতবিরােধে রুপান্তরিত হয়।

লাইব্যাকের অধিবেশন : ১৮২১ খ্রীঃ লাইব্যাকে শক্তি সমবায়ের তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ট্রপাের ঘােষণাপত্রের নীতি অনুসারে নেপলসের বিদ্রোহ দমনের জন্যে অস্টিয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অষ্ট্রিয়ার সেনাদল বুরবো ফার্দিনান্দকে নেপলসের সিংহাসনে বসান। তারা পিডমন্টের উদারনৈতিক সংবিধান দমন করে এবং ইতালীতে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে সক্রিয় করে। কিছুদিনের জন্যে গােটা ইওরােপে মেটারনিকতন্ত্র জয়যুক্ত হয়।

ভেরেনার অধিবেশন : ১৮২২ সালে ভেরেনা নগরে শক্তি সমবায়ের তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভেরােনা বৈঠকে ইংল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী ক্যানিং ডিউক অফ ওয়েলিংটনকে ইংলণ্ডের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। ভেরােনায় মেটারনিক ইংলণ্ডের আপত্তি অগ্রাহ্য করে স্পেনের বিদ্রোহ দমনের জন্যে স্পেনে ফরাসী সেনা পাঠাবার প্রস্তাব পাশ করান। রক্ষণশীল শক্তিগুলির সমর্থন পেয়ে মেটারনিক ইংল্যান্ডকে কোণঠাসা করে শক্তি সমবায়কে নিজ ইচ্ছায় চালাতে থাকেন। ফরাসী সেনা স্পেনে প্রবেশ করে স্পেন ও পর্তুগালের উদারনৈতিক বিদ্রোহ দমন করে। এই স্থানে তারা স্বৈরশাসন পুনঃস্থাপন করে। আত্মতৃপ্ত মেটারনিক এইবার আমেরিকায় স্পেনে উপনিবেশের প্রশ্ন ভেরােনা বৈঠকে পুনরায় উত্থাপন করেন। এই প্রশ্ন লা-শ্যাপেলের বৈঠকে ইংলণ্ডের আপত্তির ফলে মূলতুৰী ছিল। এই প্রশ্ন পুনরায় উত্থাপিত হলে এর প্রতিবাদে ইংল্যান্ড ভেরেনা বৈঠক বর্জন করে। এই সময় থেকে ইংল্যান্ড শক্তি সমবায় থেকে চিরবিদায় নেয়। ইংল্যান্ডের পদত্যাগের ফলে চতুঃশক্তির সন্ধি ভেঙে পড়ে।

ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরাে তার ১৯২৩ সালে বিখ্যাত মনরাে নীতি ঘােষণা করে শক্তি সমবায়কে সতর্ক করেন। তিনি বলেন আমেরিকা হল আমেরিকাবাসীদের জন্যে। আমেরিকায় ইওরােপীয় শক্তির হস্তক্ষেপ মার্কিন দেশ সহ্য করবে না। আমেরিকায় ইওরােপের উপনিবেশ বিস্তারে মার্কিন দেশ বিরােধিতা করবে। আমেরিকা ইওরােপের ব্যাপারে জড়িত থাকবে না। মনরো নীতি ঘােষণার ফলে ও ক্যানিংয়ের সক্রিয় বিরােধিতায় শক্তি সমবায় দক্ষিণ আমেরিকায় হস্তক্ষেপে বিরত থাকে।

সেন্ট পিটার্সবার্গের অধিবেশন : ১৮২৫ সালে গ্রীসের বিদ্রোহের সমস্যা সমাধানের জন্যে জার প্রথম আলেকজান্ডার সেন্ট পিটার্সবার্গে শক্তি সমবায়ের পঞ্চম সম্মেলন আহ্বান করেন। ইংল্যান্ড এই বৈঠক বর্জন করে। তুরস্কের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা লাভের জন্যে গ্রিস বিদ্রোহ করলে জার গ্রীসের পক্ষ নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু মেটারনিক প্রভৃতি নেতারা মনে করেন যে, জার তুরস্ককে হটিয়ে নিজ ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টায় আছেন। সুতরাং তারা বলেন যে, ট্রপাের ঘােষণাপত্র অনুসারে বিদ্রোহী গ্রীসকে রাশিয়া সাহায্য দিতে পারে না। তাছাড়া গ্রীস হল তুরস্কের রাজ্য। তুরস্ক হল এশিয়ার দেশ। ইউরোপীয় শক্তি সমবায়ের সঙ্গে এশিয়ার কোন সম্পর্ক নেই। ফলে জারের সঙ্গে অপর সদস্যদের মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।

ইউরোপীয় শক্তি সমবায়/ইউরোপীয় কনসার্টের পতন : (১) ইওরোপীয় শক্তি সমবায়ের সদস্যরাষ্ট্রবর্গের স্বার্থের বিভিন্নতা, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সংঘাত ইহার দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। বিপ্লবের ভীতি এবং সেই হেতু বিপ্লবের বিরােধিতা অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী সদস্যবর্গের ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করাই ছিল এই সকল রাষ্ট্রের পারস্পরিক ঐক্যের একমাত্র ভিত্তি। এই স্বার্থপর নীতির ফলে শক্তি সমবায় পতন হয়।
(২) ১৮২৩ সালে আমেরিকাস্থ স্পেনীয় উপনিবেশগুলি বিদ্রোহ ঘােষণা করলে এবং স্পেন ইওরােপীয় কনসার্টের সাহায্যে এই বিদ্রোহ দমন করতে চাইলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনরাে নীতি (Monroe Doctrine) নামে তার বিখ্যাত ঘােষণা দ্বারা ইওরােপীয় শক্তিবর্গের আমেরিকার কোন অংশে হস্তক্ষেপ করা নিষিদ্ধ করে। এইরূপ হতক্ষেপ আমেরিকা শত্রুতামূলক কাজ বলে ধরে নিবে বলে জানাই। এই ঘােষণার পর কনসার্ট অফ ইওরােপ স্পানীয় উপনিবেশে হস্তক্ষেপ করতে সাহসী করে নী। প্রোটোকল অব ট্রপো নীতি স্বভাবতই এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতাও ইওরােপীয় কনসার্টের পতনের অন্যতম কারণ।
(৩) দমননীতি সাময়িকভাবে সাফল্যলাভ করলেও দীর্ঘকাল ইহা চলতে পারে না। ইওরােপে মেটারনিকের নিয়ন্ত্রণাধীনে কনসার্ট অব ইওরােপ গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ধারা দমনে সাময়িকভাবে সাফল্যলাভ করলেও কালের প্রভাবেই এই সকল আদর্শবাদী ধারা জয়যুক্ত হয়েছিল এং ইওরোপীয় কনসার্টের পতন ঘটেছিল।
(৪) ইওরােপীয় শক্তি সমবায় ফরাসী বিপ্লবের পূর্বেকার স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র পুনঃস্থাপন করে উহার ভিত্তি দঢ় করিতে সচেষ্ট হয়েছিল। কিন্তুু তদানীন্তন পরিস্থিতিতে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন অসম্ভব ছিল। এই মূল সত্যটি উপলব্ধি না করায় ইওরােপীয় শক্তি সমবায়ের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল।
(৫) নেপােলিয়নকে দমন করার উদ্দেশ্যে ইওরােপীয় শক্তিবর্গ সন্দেহ ও বিদ্বেষ ভুলে সাময়িকভাবে মিলিত হয়েছিল। কিন্তু নেপােলিয়নের পতনের পরই পুনরায় তাদের পরস্পর সন্দেহ ও বিদ্বেষ জেগে উঠেছিল। এইরুপ সন্দেহ ও বিদ্বেষ তাদের মধ্যে ঐক্য ও আন্তরিকতা বিনাশ করেছিল। ফলে ইওরােপীয় কনসার্ট দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পারে নাই নী।
(৬) কনসার্ট ও ইউরোপ দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে দমন করতে চেয়েছিল। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই বিপ্লব ও ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় কনসার্টের পতন হয়।
(৭) ইওরোপীয় শক্তি সমবায় ইওরােপীয় দেশসমূহের জনসাধারণের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত ছিলনা। ইহা ছিল ইউরোপের প্রতিক্রিয়াশীল দেশসমূহের সংগঠন। সকল সদস্য রাষ্ট্রই ছিল স্বৈরাচারে বিশ্বাসী। আন্তজাতিক ক্ষেত্রে শান্তিরক্ষার উদ্দেশ্যে গঠিত হলেও অল্পকালের মধ্যেই ইহা প্রকটিত হয় যে, সদস্যরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত পড়িলে তারা যেকোন সমস্যা এড়াইয়া যেতে দ্বিধাবােধ করবে না। এই স্বার্থপরতার নীতি ইওরোপীয় শক্তি সমবায়ের অন্যতম প্রধান ত্রুটি ছিল। গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী ধারাকে রােধ করতে গিয়ে মেটারনিকের হাতে ইওরােপীয় শক্তি সমবায় একটি আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল।

ইউরোপীয় শক্তি সমবায়/ইউরোপীয় কনসার্টের গুরত্ব : ইউরোপের শান্তি শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শক্তি সমবায় বা ইউরোপীয় কনসার্ট গঠিত হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে লা-শাপেল, ট্রপাে, লাইব্যাক, ভেরােনা ও সেন্ট পিটার্সবার্গ কংগ্রেসের মাধ্যমে বৃহৎ শক্তিবর্গ ঐক্যমত প্রতিষ্ঠার দ্বারা ইওরােপের সমস্যাবলী সমাধানের চেষ্টা করে। যদিও শক্তি সমবায় বিফল হয়, তবুও কংগ্রেস কুটনীতির মূল ছিল সুদূরপ্রসারী। পরবর্তীকালে ইওরােপের বহু সমস্যা কংগ্রেস কূটনীতির দ্বারা সমাধান করা সম্ভব হয়। ইওরােপীয় শক্তি সমবায় যুদ্ধ না করে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের নতুন পথ দেখায়। লন্ডন কংগ্রেসের দ্বারা ১৮৩২ খ্রীঃ বেলজিয়ামের স্বাধীনতার প্রশ্নের, প্যারিস কংগ্রেসের দ্বারা ১৮৫৪ খ্রীঃ পূর্বাঞ্চল সমস্যার, বার্লিন কংগ্রেসের দ্বারা ১৮৭৮ খ্রীঃ পুনরায় পূর্বাঞ্চল সমস্যার আপাততঃ সমাধান করা সম্ভব হয়। ল্যাংসামের মতে, কংগ্রেস প্রথা বিলােপের ফলেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটে।

শক্তি সমবায় কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করে। নরওয়ে ও সুইডেনের মধ্যে বিরােধে, মনাকোর রাজার সঙ্গে প্রজাদের বিরােধে, ব্যাডেনের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে, দাস ব্যবসায় নিষিদ্ধ করা এবং জলদসুতাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে ঘােষণা করে এই সমবায়কে সাময়িকভাবে কৃতিত্ব দেখায়। তবে শক্তি সমবায় ছিল কেবলমাত্র বৃহৎ শক্তির সংগঠন। ক্ষুদ্র শক্তিগুলিকে এতে যথাযােগ্য সমতা ও অধিকার দান করা হয়নি। তাছাড়া শক্তি সমবায় ইওরােপের বৃহৎ শক্তিগুলির মধ্যে শক্তিসাম্য স্থাপন করে ইওরােপের শান্তি রক্ষার নতুন পন্থা রচনা করে। পরবর্তীকালে এই নীতিকে গ্রহণ করা হয়।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. ডক্টর কিরণচন্দ্র চৌধুরী - ইউরোপ ও বিশ্ব ইতিহাস কথা
2. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
3. Langsham - World Since 1919
4. Jacques Droz - Europe Between Revolution
5. Ketelbey - History of Modern Times
6. Temperley - Cambridge History of British Foreign Policy
7. Gordon Craig - Europe Since 1815
8. A. Philips - Modern Europe