Advertise

পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রবাদের উৎপত্তি ও ফলাফল

ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের ফলে আধুনিক পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রবাদের (ইংরেজি: Capitalism) উৎপত্তি হয়। ইংল্যান্ডে ১৭৬০-৮০ খ্রিস্টাব্দে নাগাদ শিল্প বিপ্লবের বিকাশ হলেও ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পর এর দ্রুত বিকাশ ঘটে। ফ্রান্স ও জার্মান প্রভৃতি দেশে উনবিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে শিল্প বিপ্লবের দ্রুত বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। শিল্প বিপ্লবের যে বিরাট সম্পদের ও মূলধনের সৃষ্টি হয়, তা মুষ্টিমেয় মালিক শ্রেণীর হাতে থাকার ফলে ধনতন্ত্রের উৎপত্তি হয়। শিল্প বিপ্লবের আগে আধুনিক কল কারখানা না থাকায় উৎপাদন ব্যবস্থা কুটির শিল্পের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল। কুটির শিল্পে যে ব্যক্তি উৎপাদক সেই ব্যক্তি শিল্পদ্রব্যের মালিক হওয়ায় শােষণের সম্ভাবনা ছিল না। বিক্রিত মালের মূল্য উৎপাদকই পেত। শিল্প বিপ্লবের ফলে কল কারখানা স্থাপিত হলে কুটির শিল্প ধ্বংস হয়। শিল্প উৎপাদন কারখানাগুলিতে কেন্দ্রীভূত হয়। যাদের হাতে মূলধন ছিল তারা কারখানা স্থাপন করে উৎপাদিত শিল্পদ্রব্যের মুনাফায় ফুলে ফেপে উঠে। এইভাবে এক পুঁজিবাদী শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এই শ্রেণী শিল্পদ্রব্যের মূলধন এবং উদ্যোগ লাভ করে শিল্পদ্রব্য উৎপাদন করে এবং তার বিপণন দ্বারা মুনাফা কুক্ষিগত করে। এই শিল্প মালিকশ্রেণী শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরী দিয়ে তাদের মুনাফা বাড়াত। উৎপাদিত মাল ইচ্ছামত দামে বিক্রি করে লাভ বাড়াত।
পুঁজিবাদের উৎপত্তি ও ফলাফল
পুঁজিবাদের উৎপত্তির পশ্চাতে উনবিংশ শতকের ইওরােপীয় রাষ্ট্রগুলির ভূমিকা ছিল। যোগাযােগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া শিল্পের প্রকৃত বিকাশ হতে পারে না। কাঁচামালের পরিবহন ও তৈরি মাল দেশের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে হলে, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি বিশেষ প্রয়ােজন ছিল। পরিবহনের উন্নতি না হলে শিল্প উৎপত্তিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অকালে ঝরে যেতে বাধ্য ছিল। ইওরােপীয় সরকারগুলি রেলপথ নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ, খাল খনন করে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটালে পুঁজিবাদ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়। ফ্রান্সে সম্রাট তৃতীয় নেপােলিয়ন যে বিরাট রেলপথ নির্মাণ পরিকল্পনা রূপায়িত করেন তার ফলে ফ্রান্সে পুঁজিবাদী শিল্পগুলির প্রসার ঘটে। রাশিয়ার জার সরকারও রেলপথ নির্মাণ দ্বারা এবং জার্মানীর বিসমার্ক সরকারও অনুরূপ ব্যবস্থার দ্বারা পুঁজিবাদের বিকাশে সহায়তা করেন।

ফ্রান্স, জার্মানী ও রাশিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, শিল্প স্থাপনের জন্যে দেশে মূলধনের সরবরাহ যথেষ্ট ছিল না। এজন্য এই রাষ্ট্রগুলি ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার আর পুনর্গঠন করে শিল্পে মূলধন বিনিয়ােগের ব্যবস্থা করে। জার সরকার বৈদেশিক ঋণ যােগাড় করে শিল্পে লগ্নী করেন। কিন্তু এই শিল্পগুলির মুনাফা শিল্প মালিকদের হাতে যায়।

ইওরােপীয় সরকারগুলি পুঁজিবাদের বিকাশে আরও এক প্রকারে সহায়তা করে। তা হল সংরক্ষণ শুল্ক নীতির প্রবর্তন। কোন দেশের বিকাশশীল শিল্প যাতে শিল্পে উন্নত দেশের কারখানায় তৈরি সস্তা মালের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এই উন্নত দেশ থেকে আমদানি সস্তা মালের ওপর বাড়তি শুদ্ধ চাপিয়ে সেই মালের চাহিদা কমিয়ে ফেলা হত। ফলে স্বদেশের কারখানায় উৎপাদিত মাল বাজারে একচেটিয়া বিক্রয় হয়ে তার মুনাফা মালিকের হাতে পেীছাত। বিসমার্ক তার বিখ্যাত সংরক্ষণ নীতির দ্বারা জার্মানীর পুঁজিবাদী শিল্পগুলিকে এই অসাধারণ সুযােগ করে দেন।

মালিক শ্রেণী যদি কারখানার শ্রমিককে ন্যায্য হারে মজুরী দিত এবং কম সময় কারখানায় খাটাতে বাধ্য হত, তবে তাদের মুনাফার পরিমাণ বাড়তে পারত না। শিল্প বিপ্লবের গােড়ার দিকে পুঁজিবাদী শ্রেণী শ্রমিককে ন্যায্য মজুরী হতে বঞ্চিত করে এবং তাদের নিজ মুনাফা অবাধে বাড়াবার সুযােগ পায়। এই সময় বিভিন্ন সরকারগুলি শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার জন্যে কোন আইন রচনা করতে রাজী ছিল না। এরা Laissez faire বা হস্তক্ষেপ না করা নীতি গ্রহণ করায় পুজিবাদী শােষণ তীব্র হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে লুই ফিলিপের সরকার শিল্পে হস্তক্ষেপ না করার নীতি নিলে, ফরাসী মূলধনী ও শিল্পপতিদের মুনাফার জমাবার সুযােগ করে দেয়। লুই ফিলিপের নীতির বিরুদ্ধে শ্রমিক বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি তা কঠোর হাতে দমন করেন। এইভাবে সরকারের সহযােগিতায় পুজিবাদ উৎপাদন ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে।

শিল্প বিপ্লবের যথেষ্ট অগ্রগতি হলে বিভিন্ন শিল্প মালিকদের মধ্যে মাল বিক্রয়ের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরম্ভ হয়। ব্যাঙ্কগুলিও জনসাধারণের টাকা আমানত পাবার আশায় পরস্পরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। এই সময় একই প্রকার শিল্পের বিভিন্ন সংস্থাগুলিকে সংযুক্ত করে ট্রাষ্ট বা কমবাইন নামক বিরাট একচেটিয়া প্রথার প্রসার প্রতিষ্ঠান গঠনের রেওয়াজ দেখা দেয়। কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানী একত্রিত হয়ে শিল্প গঠন করলে তাদের সঙ্গে নতুন কোন কোম্পানীর প্রতিযােগিতায় জয়লাভ করা অসম্ভব হয়। ফলে একচেটিয়া উৎপাদন ব্যবস্থা বা মনােপলি ব্যবসার উদ্ভব হয়। ছােট শিল্পগুলি এর ফলে ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। একচেটিয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি শ্রমিককে ইচ্ছামত কম দরে মজুরী দিয়ে এবং মালের ইচ্ছামত দাম ধার্য করে বিরাট মুনাফা লাভের সুযােগ পায়। একে একচেটিয়া পুঁজি প্রথা বলা হয়। কোন যােদ্ধা যেরূপ বাহুবলে একের পর এক দেশ দখল করে সাম্রাজ্য স্থাপন করে, সেরূপ এই সকল একচেটিয়া পুঁজিবাদীরা একের পর এক শিল্পগুলিকে কুক্ষিগত করে শিল্প সাম্রাজ্য (Industrial Empire) স্থাপন করে। ইংলন্ড, মার্কিন দেশ, জার্মানীতে এরূপ বহু একচেটিয়া শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বটগাছ যেরূপ তার ঝুরি নামিয়ে চতুর্দিক ছেয়ে ফেলে সেরূপ এই সকল পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলি প্রথমে নিজ দেশ পরে অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করে বিরাট পুঁজি আহরণ করে। ইংলন্ডের বিভিন্ন কোম্পানীগুলি এরূপ জোটবদ্ধ হয়। জার্মানীতে এরূপ জোটবদ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল কার্টেল।

ব্যাংক শিল্পে এরূপ একচেটিয়া পুঁজিবাদের উদ্ভব বিশেষভাবে দেখা যায়। ১৮২৪ খ্রীঃ ইংলন্ডে প্রায় ৬০০ ব্যাঙ্ক কোম্পানী ছিল। ১৯১৪ খ্রীঃ এগুলি সংযুক্ত হয়ে ৫৫টি কোম্পানীতে পরিণত হয়। ১৯৩৭ খ্রীঃ পুনরায় জোটবদ্ধ হয়ে ১১টি কোম্পানী গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে পাঁচটি যৌথ ব্যাঙ্ক ইংলন্ডের সমগ্র মূলধনের ৫/৬ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই পাঁচটি পুঁজিবাদী ব্যাঙ্ক ছিল, (ক) মিডল্যাণ্ড ব্যাঙ্ক, (খ) ওয়েস্টমিনিষ্টার ব্যাঙ্ক, (গ) বার্কলেইজ ব্যাঙ্ক, (ঘ) লয়েডস ব্যাঙ্ক, (ঙ) ন্যাশনাল প্রভিন্সিয়াল ব্যাঙ্ক। জার্মানীতেও অনুরূপভাবে “ডি” নামধারী ব্যাঙ্কগুলি যথা ডয়েশ ব্যাঙ্ক, ড্রেসডেনার ডিসকন্টো গেসেল শাস্ট, ডামস্টাডার ব্যাঙ্ক প্রভৃতি কয়েকটি ব্যাঙ্ক সকল মূলধন একচেটিয়া করে।

পুঁজিবাদ সম্প্রসারণের প্রতিক্রিয়া: শিল্পের ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদী প্রথা প্রবল হয়ে ওঠ। ক্রমে দেখা যায় যে, একচেটিয়া পুঁজিবাদী শিল্পগুলি এত বেশী উদ্বৃত্ত মাল উৎপাদন করে তা ছিল দেশের চাহিদা অপেক্ষা অনেক বেশী। পুঁজিবাদী শিল্পের লক্ষ্য ছিল সর্বাধিক উৎপাদন ও সর্বাধিক মুনাফা। স্বদেশের চাহিদা পূরণের পর বাড়তি মাল বিক্রয় করার জন্যে এই শিল্পপতিরা বিদেশের বাজারের জন্যে উপনিবেশ দিকে নজর দেয়। নিজ দেশের সরকারকে এজন্য এই উপনিবেশ দখলের দখলের চেষ্টা জন্যে এই শিল্প মালিকরা চাপ দেয়। উপনিবেশের বাজারে মাল বিক্রয় করে এবং উপনিবেশের সস্তা দরের কাঁচামাল শিল্পে বিনিয়োেগ দ্বারা এই পুঁজিবাদী সংস্থাগুলি ফুলে ওঠে। লেনিনের মতে, বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশ এভাবে বাজার দখলের প্রতিযােগিতায় নামলে বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয় তা বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।

পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্য: ১) পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় উৎপাদন, বন্টন নিয়ন্ত্রনের কোন কর্তৃপক্ষ থাকে না। বাজারে কোন দ্রব্যের দাম, চাহিদা ও যোগানের ঘাত-প্রতিঘাত নিজ প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রিত হয়।
২) বেশি মুনাফা অর্জনের উদ্দ্যেশ্যে উৎপাদক শ্রেণী শ্রমিকদের অত্যধিক পরিমাণে শোষণ করে, কম মজুরি দেয়, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে এবং বেশি শ্রম আদায়ের চেষ্টা করে।
৩) ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় দেশের সম্পদের অধিকাংশ সমাজের পুঁজিপতিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। সমাজে আয়-ব্যয় বৈষম্য সৃষ্টি হতে থাকে। ধনীরা আরও ধনী এবং দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হতে থাকে।
৪) উৎপাদকদের মধ্যে নতুন কলাকৌশল, মুনাফা বৃদ্ধি, কম খরচে উৎপাদন ও কম মূল্যে ভোক্তাদের কাছে দ্রব্য সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিযোগীতা হয়।
৫) উৎপাদকদের প্রধান লক্ষ্য থাকে সর্বাধিক মুনাফা অর্জন, উৎপাদক বিভিন্ন ভাবে তার পণ্যকে ভোক্তার কাছে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করে। ক্রেতা তার ইচ্ছাঅনুযায়ী, রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী দ্রব্যসামগ্রী ভোগ করতে পারে, অর্থাৎ ক্রেতার ভোগের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।
৬) ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে এবং পূঁজি বিনিয়গের মাধ্যমে যে কেউ উৎপাদক হতে পারে।
ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সম্পদের মালিকানার ভিত্তিতে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ইত্যাদি শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এই উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বারা নির্ধারিত হয়।

পুঁজিবাদের সুফল: পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার সুফলগুলি হল -
(১) পুঁজিবাদ ব্যবস্থায় প্রতিযােগিতা থাকায় শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের ব্যয় অনেক কম পড়ে। কারণ শিল্প মালিকরা কম খরচে বেশী উৎপাদনের চেষ্টা করে। ফলে দেশের সামগ্রিক স্বার্থের দিক থেকে এতে লাভ হয়।
(২) কেহ কেহ বলেন যে, শিল্পে উদ্যোগ ও শিল্প গঠন করার জন্যে দরকার হল বিশেষ ধরনের প্রতিভা। এই প্রতিভা সকলের পক্ষে লাভ করা সম্ভব নয়। চাইল্ডস বা ফোর্ড বা ডেইমলার বা বােল্টন প্রভৃতির ন্যায় শিল্প প্রতিভা ব্যক্তিগত উদ্যোগের সুযােগ থাকলে তবেই এই প্রতিভার বিকাশলাভ সম্ভব। এর ফলে রাষ্ট্রের লাভ হতে বাধ্য।
(৩) শিল্প মালিকমাত্রেই শ্রমিক শােষণ করে মুনাফা বৃদ্ধি করে এই তত্ত্ব আদপেই ঠিক নয়। আধুনিক যুগে অধিকাংশ রাষ্ট্র শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার জন্যে বহু আইন প্রবর্তন করেছে। সুতরাং ব্যক্তিগত শিল্পগুলিতে মালিকদের পক্ষে শ্রমিক শােষণ করা সহজ কাজ নয়। তাছাড়া সার্থক ও প্রতিভাবান শিল্প উদ্যোগীরা শ্রমিকের সহযােগিতা লাভ করলে তবেই সফল হতে পারে। সুতরাং প্রকৃত শিল্প সংগঠনকারীরা শ্রমিকের স্বার্থ অবহেলা করে না।
(৪) রাষ্ট্র বিভিন্ন আইন যথা আয়কর প্রভৃতির দ্বারা মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করায় এবং কোম্পানী আইন দ্বারা একচেটিয়া প্রথা নিয়ন্ত্রণ করায় পুঁজিবাদী শিল্পগুলির খারাপ দিক এখন অনেকটা লােপ পেয়েছে।

পুঁজিবাদের কুফল: মধ্যযুগে সামন্ততন্ত্রের দ্বারা ধন বৈষম্য রক্ষা করা হত। আধুনিক যুগে ধনতন্ত্র দ্বারা এক শ্রেণীর হাতে সম্পদ ও অর্থ জমা হয়। বাকি সকলে বঞ্চিত হয়। সুতরাং সামন্ততন্ত্রের ন্যায় ধনতন্ত্র হল একটি বৈষম্যমূলক, অন্যায় সমাজ ব্যবস্থা -
(১) পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদ সমাজের মুষ্টিমেয় লােকের হাতে সীমাবদ্ধ হয়, বাকি লােকেরা পুঁজিবাদীদের দ্বারা নানাভাবে শােষিত হয়। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাম্যের বিরােধী।
(২) পুঁজিবাদী শ্রেণী তাদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্যে শ্রমিককে শােষণ করে এবং ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে। এরা শ্রমিক অসন্তোষের সম্মুখীন হলে শ্রমিক ছাটাই, লক আউট প্রভৃতি দমনমূলক নীতির সাহায্যে শ্রমিকদের পদানত করে। মালিকশ্রেণী জোটবদ্ধ হয়ে সরকারকে চাপ দিয়ে মালিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে আইন রচনা করতে বাধ্য করে।
(৩) মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের মতে, শিল্পের মুনাফা আদপেই মালিকের প্রাপ্য নয়। শিল্প গঠন ও পরিচালনায় মালিক বা পুঁজিপতিদের কোন ভূমিকা থাকাই আদপে বাঞ্ছনীয় নয়। মার্কসীয় মূল্যতত্ব (Marxian Theory of Value) অনুসারে শিল্পের উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে যে মুনাফা থাকে তা একমাত্র শ্রমিকেরই প্রাপ্য। কারণ শ্রমিকের শ্রমের ফলেই শিল্পদ্রব্য উৎপাদিত হয়। এতে মালিকের মুনাফার দাবী অযৌক্তিক।
(৪) ধনতান্ত্রিক প্রথায় একচেটিয়া পুঁজি ও শিল্পের উদ্ভব হয়। একচেটিয়া পুঁজিপতিরা শিল্পে উৎপাদিত মালের দাম মুনাফার লােভে ইচ্ছামত বৃদ্ধি করে। এর ফলে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মােট কথা, পুঁজিবাদী প্রথার ফলে ধনীরা ধনী হতে থাকে আর গরীবেরা আরও গরীব হয়। সমাজে ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়।
(৫) পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। ভারত, চীন ও আফ্রিকায় পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি উপনিবেশ স্থাপন করে।

ধনতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গী: কার্ল মার্কস তার কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-তে পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে বিত্তবান পুঁজিপতিশ্রেণী ও শােষিত শ্রমিক শ্রেণীর সঙ্গে শ্রেণী সংগ্রামের অনিবার্যতার কথা বলেছেন। এই শ্রেণীসংগ্রামই তার অর্থনৈতিক তত্ত্বের মূলকথা। শোষণে জর্জরিত শ্রমিকশ্রেণী বিপ্লবের মাধ্যমে শােষণের হাত থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করবে। লক্ষ্য রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রের উপর অধিকার স্থাপন। বস্তুত মার্কস বলেছেন, রাষ্ট্র শ্রেণীশোষণের যন্ত্র। সুতরাং সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে পুজিপতিশ্রেণীকে হঠিয়ে দিয়ে নিজেদের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে জন্য রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র অধিকার করবে। এর ফলেই প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বহাদের একনায়কতন্ত্র। শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লব যখন পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে, তখন পুঁজিপতিশ্রেণী ও ধনতন্ত্রের অবসান ঘটবে এবং এক শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে। রাষ্ট্র তখন অপ্রয়ােজনীয় হয়ে পড়বে এবং তার অস্থিত্বও বিলুপ্ত হবে।