PayPal

আলােকিত স্বৈরতন্ত্র বা উদারনৈতিক স্বৈরতন্ত্র

author photo
- Sunday, August 11, 2019

আলােকিত স্বৈরতন্ত্র বা উদারনৈতিক স্বৈরতন্ত্র ও বিফলতা

অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগ ছিল ইওরােপের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বন্ধ্যা যুগ। এই যুগে রাজনীতিতে কোন নতুন ভাবধারার প্রবাহ লক্ষ্য করা যায় না। রাষ্ট্রনেতাগণ এই যুগে কেবলমাত্র বাহুবলে রাজ্য জয়কেই কর্তব্য বলে মনে করতেন। ঐতিহাসিক হ্যাসাল এই যুগের অন্ধকারময় রাজনীতির জন্যে মন্তব্য করেছেন যে, “১৭৬৩ খ্রীঃ ইওরােপ যেন ধীরে ধীরে এক অবক্ষয়ের পথে চলছিল।”
18 Centuries Enlightened Despotism
অষ্টাদশ শতকের প্রকৃত অগ্রগতির ক্ষেত্র ছিল বিজ্ঞান, দর্শন এবং জ্ঞানদীপ্তি। ইতিহাসের দেবী এই যুগের সম্মানের উত্তরীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরিবর্তে চিন্তাবিদদের কাধে চাপিয়ে দেন। এজন্য অষ্টাদশ শতককে আলােকিত শতাব্দী ৰা জ্ঞানদীপ্তির যুগ বলা হয়। জ্ঞানদীপ্তির ফলে এই যুগের মনীষা নিউটনের বিজ্ঞান তত্ত্বে, দার্শনিক লক, ফেনেলন, মন্তেস্কুর দার্শনিক ও রাষ্ট্রতন্ত্রের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে। প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা অলৌকিক ৰা অতি প্রাকৃতকে নস্যাৎ করে বিজ্ঞান ও প্রমাণের সাহায্যে প্রকৃতির রহস্যগুলিকে ব্যাখ্যা করেন। এই যুগে যুক্তিবাদ অন্ধবিশ্বাসকে নস্যাৎ করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সাহায্য করে। দার্শনিকরা একথা প্রচার করেন যে, যুক্তি বা প্রমাণকে কোন কিছুর দ্বারা সীমাবদ্ধ করা যায় না।

এক শ্রেণীর দার্শনিকরা এই মত প্রচার করেন যে, সকল কিছুর পশ্চাতে নিয়ম বা যুক্তি কাজ করে। প্রকৃতি নিজেই নিয়ম বা Law মেনে চলে। সুতরাং মানব সমাজ ও রাষ্ট্র যাহা প্রকৃতির অধীন তাহা নিয়ম বা Law মেনে চলতে বাধ্য। দার্শনিকের কাজ হল সেই নিয়মকে খুঁজে বের করা। ইংরাজ দার্শনিক জন লক, ফরাসী দার্শনিক মন্তেস্কু প্রভৃতি রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ম আবিষ্কারের জন্যে তাদের গবেষণা ও যুক্তি প্রয়ােগ করেন। দার্শনিকরা সাধারণভাবে এই মত প্রচার করেন যে, মানব সমাজের মঙ্গলের জন্যে রাষ্ট্র গড়া হয়েছে। যিনি রাষ্ট্রের পরিচালনা করেন অর্থাৎ রাজা তার যেমন অধিকার আছে, সেই সঙ্গে তার কর্তব্যও আছে। রাজাগণকে অধিকার ভােগ করতে হলে এই সঙ্গে কর্তব্য করতে হবে। কর্তব্যহীন নিছক অধিকার ভােগ করা যুক্তিবাদ ও প্রাকৃতিক নিয়মের বিরোধী।

ইওরােপের রাজশক্তি সপ্তদশ শতক থেকে কেবলমাত্র অধিকার ভােগ করত। তারা স্বর্গীয় অধিকার (Divine Right) বলে শাসন করতেন। তাদের বক্তব্য ছিল যে, যেহেতু তারা ছিলেন ঈশ্বর প্রেরিত সেহেতু তারা পৃথিবীর কোন শক্তির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিলেন না। প্রজাদের কল্যাণের জন্যে কোন কাজ করতেও তারা বাধ্য নন বলে মনে করতেন। অষ্টাদশ শতকের যুক্তিবাদী দর্শন উপরােক্ত স্বীয় অধিকার নীতির দুর্বলতা উদঘাটন করে। দার্শনিকরা বলেন যে, কর্তব্য করলেই তবে অধিকার পাওয়া যায়। ঈশ্বর রাজাদের যেমন অধিকার দিয়েছেন তেমন কর্তব্য নির্দেশ করেছেন। অবিমিশ্র অধিকার যুক্তিসম্মত হতে পারে না।

যুক্তিবাদী বা আলােকিত দর্শনের ফলে অষ্টাদশ শতকের ইওরােপের রাজারা তাদের ভুল বুঝতে পারেন। দীর্ঘকাল ধরে ভগবানের দোহাই দিয়ে তারা যে স্বৈরশাসন চালান তার অন্যায় দিকটা ধরা পড়লে তারা ভয় পেয়ে যান। এজন্য এই যুগের রাজারা প্রজাহিতৈষী সংস্কার দ্বারা তাদের স্বৈর শাসনকে যুগের উপযােগী করার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিক লর্ড এ্যাক্টন (Lord Acton) এজন্য প্রজাহিতৈষী বা আলােকিত স্বৈরতন্ত্রকে রাজতন্ত্রের অনুতাপ বা প্রায়শ্চিত্ত (Repentance of the Monarchy) বলে বর্ণনা করেছেন। নির্ভেজাল স্বৈরাচারের বদলে এঁরা সংস্কারপন্থী স্বৈরাচার প্রবর্তন করেন। অধ্যাপক হেইজ (Hayes) এজন্য আলােকিত স্বৈরাচারকে, স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের সহিত যুক্তিবাদের সময় বলে অভিহিত করেছেন।

এই সকল প্রজাহিতৈষী শাসক দার্শনিকদের রচনা পাঠ করেন। কেহ কেহ দার্শনিকগণের সহিত ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন। তারা ছিলেন চতুর ও বুদ্ধিমান লােক। দার্শনিকদের ভাবধারা অনুযায়ী তারা প্রজার কল্যাণের জন্যে সংস্কার প্রবর্তন করলেও রাজার ক্ষমতা যাতে খর্ব না হয় সেদিকে নজর রাখতেন। আসলে সংস্কার নীতির আড়ালে তারা তাদের স্বাধিকার রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করলে এই স্বৈর শাসকদের গুড় উদ্দেশ্য ধরা পড়বে। মূলতঃ তারা ছিলেন স্বৈরাচারী। যুক্তিবাদ বা আলোকিত দর্শনের প্রতি অনুরাগ ছিল তাদের অলঙ্কার অথবা কৌশল মাত্র।

জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল এই যে (১) আজকে কোন মৌলিক অধিকার দান না করা। নির্বাচনমূলক শাসনব্যবস্থা বা প্রতিনিধিমূলক শাসনব্যবস্থাকে এড়িয়ে চলা। প্রজার জন্য সকল কিছু করলেও প্রজাদের শাসনব্যবস্থায় অংশ গ্রহণ করতে না দেওয়া। (২) রাজার কর্তব্য হল প্রজার মঙ্গলের জন্যে কাজ করা। আলােকিত রাজারা নিজেদের রাষ্ট্রের সেবক বলে মনে করতেন। প্রাশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডারিক নিজেকে রাষ্ট্রের প্রধান ভৃত্য বলে ঘােষণা করেন। (৩) জ্ঞানদীপ্ত শাসকরা বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্রই ছিল সকল কিছুর উর্ধ্বে। রাষ্ট্রের জন্যে রাজা প্রজা সকলের কাজ করা দরকার। রাষ্ট্র থাকলে তবেই জনসাধারণের নিরাপত্তা ও সুখ সুবিধা থাকবে। (৪) আলােকিত রাজারা নিজেদের রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন। তাদের নিকট রাজা ও রাষ্ট্রের অভিন্নতা ছিল না। দেহকে যেরূপ মস্তিষ্ক চালনা করে রাষ্ট্রকে রাজা চালনা করবেন। রাষ্ট্রের স্বার্থে রাজার আদেশ মান্য করা দরকার একথা তারা বলতেন। রাষ্ট্র যেরূপ সর্বশক্তিমান, সেইরূপ রাষ্ট্রের প্রতিভু রাজাও সর্বশক্তিমান। (৫) তবে রাষ্ট্র ও প্রজার মঙ্গলের জন্যে রাজা সংস্কার প্রচলন করতে বাধ্য। সংস্কার করাই রাজার কর্তব্য। দেহ যেরূপ মস্তিষ্কের নির্দেশ মানে, প্রজা সেরূপ রাজার প্রবর্তিত সংস্কার মেনে নিতে বাধ্য বলে তারা ভাবতেন।

Reddaway মতে, ১৭৬৩ খ্রীঃ পর যে ২৫ বছর অতিবাহিত হয় তাকে প্রধানতঃ আলােকিত স্বৈরাচারের যুগ বলা যায়। এই যুগের সংস্কারব্রতী রাজাদের মুখ্য ছিলেন প্রাশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডারিক। কৈশােরে ও যৌবনে তিনি ভলতেয়ার প্রভৃতি ফরাসী দার্শনিকদের রচনা পড়েন। তিনি সিংহাসনে বসে নিজেকে রাষ্ট্রের প্রধান ভৃত্য বলে ঘােষণা করেন। তিনি কেন্দ্রীভূত শাসন, বৈজ্ঞানিক প্রথায় কৃষি, সামরিক সংস্কার প্রচলন করেন। বিচার বিভাগে জুরী প্রথা, আইনের শাসন এবং উদার ফৌজদারী আইন প্রবর্তন করেন। তিনি ধর্মসহিষ্ণুতা ও ন্যায় বিচার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন।

রাশিয়ার জারিনা দ্বিতীয় ক্যাথারিন ছিলেন অন্যতম প্রখ্যাত আলােকপ্রাপ্ত শাসিকা। তিনি ভলতেয়ারের সহিত পত্রালাপ করতেন। তিনি রাজধানীকে সুশােভিত করার জন্যে বহু উদ্যান ও প্রাসাদ তৈরি করেন। তিনি রাশিয়ায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতা প্রসারের জন্যে চেষ্টা করেন। তিনি শাসনব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত করেন। পশ্চিম ইওরােপের অনুকরণে তিনি শিল্প বিস্তার এবং সমাজে আধুনিক আদব কায়দা প্রচলনের চেষ্টা করেন।

অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় যােসেফ ছিলেন আলােকপ্রাপ্ত স্বৈর শাসকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর সম্পর্কে বলা হয় যে, আলােকপ্রাপ্ত স্বৈরতন্ত্রের যুগে সর্বাপেক্ষা আলােকপ্রাপ্ত শাসক ছিলেন দ্বিতীয় যােসেফ। যুক্তিবাদের যুগে যুক্তিবাদে প্রভাবিত রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে তিনি চরম উৎকর্ষের পরিচয় দেন। যোসেফ বলেন, আমি দর্শন শাস্ত্রকে আমার রাজ্যের আইন রচনার ভার দিয়েছি। দর্শনের যুক্তিবাদী নীতি অষ্ট্রিয়ার জীবনধারাকে বদলিয়ে দেবে। তিনি যুক্তিবাদের ওপর নির্ভর করে শাসন, বিচার, অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রেই সংস্কার প্রবর্তন করেন। শেষ পর্যন্ত বাস্তব জ্ঞানের অভাবে অত্যধিক আদর্শবান এবং একসঙ্গে সকল সংস্কারগুলি দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করে তিনি বিফল হন।

দ্বিতীয় যােসেফ ছিলেন প্রকৃত জ্ঞানদীপ্ত শাসক। প্রাশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডারিক আলােকপ্রাপ্ত সংস্কার দ্বারা নিজ রাজতন্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। ম্যারিয়ট ও রবার্টসনের মতে, দ্বিতীয় ফ্রেডারিক কৌশলে তার স্বৈরতন্ত্রকে জ্ঞানদীপ্তির মােড়কে ভরে ফেলেন। মূলতঃ তিনি ছিলেন স্বৈরতন্ত্রী। রাজশক্তি ছিল তার প্রাণ, উদারতন্ত্র ছিল তার পােষাকী নীতি। সেই তুলনায় দ্বিতীয় যােসেফ ছিলেন প্রকৃত আদর্শবাদী। তিনি ধর্মসহিষ্ণুতা নীতি প্রবর্তন করে, ভূমিদাস প্রথা লােপের চেষ্টা করে, গিল্ড বা সমবায় প্রথা লােপের চেষ্টা করে, সমগ্র সাম্রাজ্যে জার্মান ভাষা প্রবর্তন করে প্রকৃত প্রগতিশীল দৃষ্টির পরিচয় দেন। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরােধিতায় তিনি বিফল হন। ফলে তার বিফলতা ছিল এক মহান প্রচেষ্টার ব্যর্থতা।

দ্বিতীয় যােসেফের সংস্কারের তুলনায় প্রাশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের সংস্কারগুলি ছিল গুরুত্বহীন। ফ্রেডারিক ভূমিদাস প্রথা লােপের চেষ্টা করেননি। প্রাশিয়ায় সামন্তপ্রথার প্রবলতা দূর করার চেষ্টাও তিনি করেননি। তিনি স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিকে লােপ করে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়ান। তার নিকট রাজাই রাষ্ট্র এই চিন্তা প্রবল ছিল। তাছাড়া তিনি প্রাশিয়ার প্রয়ােজন অপেক্ষা বহু বেশী সৈন্য রাখতেন। এই সৈন্যদলের খরচের জন্যে জনসাধারণকে করভারে জর্জরিত করেন। এজন্য ভলতেয়ার মন্তব্য করেন যে — “প্রাশিয়া হল সেই দেশ যেখানে সেনাদলই জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে, জনগণ সেনাদলকে নিয়ন্ত্রণ করে না।”

দ্বিতীয় যােসেফ ও দ্বিতীয় ফ্রেডারিকের সহিত তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় ক্যাথারিন ছিলেন অনেক অগভীর সংস্কারক। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজ সিংহাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করার দিকে। তিনি রুশী অভিজাতদেরও ক্ষমতা বাড়ান। তিনি একটি সংবিধান রচনার উদ্যোগ নিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা ত্যাগ করেন। ভূমিদাসদের রক্ষার কোন চেষ্টা তিনি করেননি। তিনি রুশী অভিজাতদের মধ্যে পশ্চিম ইওরােপীয় ফ্যাশন ও চালচলন প্রবর্তনের উদ্যম দেখান। তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক সংস্কার ছিল সখের ব্যাপার মাত্র। রাশিয়ার সমাজ জীবনে এই সংস্কারের কোন প্রভাব ছিল না। ঐতিহাসিক রাইকারের মতে, “দ্বিতীয় ক্যাথারিনের কোন সৃজনশীল প্রতিভা ছিল না।" অভিজাতদের সমর্থন হারাবার ভয়ে তিনি কোন মৌলিক সংস্কার প্রবর্তনে বিরত থাকেন।

আলােকপ্রাপ্ত স্বৈরতন্ত্রের বিফলতা : আলোকপ্রাপ্ত স্বৈরতন্ত্রের প্রধান ক্রটি বা বিফলতার কারণ ছিল -
১) শাসকরা সংস্কার প্রবর্তনের জন্য প্রজাদের কোন সহযােগিতা নিতেন না অর্থাৎ জনসাধারণের জন্যে সকল কিছু করা হলেও, জনসাধারণের দ্বারা কিছু করা হবে না, এটাই ছিল রাজাগণের মূল নীতি। এজন্য সিংহাসনে দ্বারা ওপর থেকে সংস্কারগুলি প্রজাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য সংস্কারগুলি জনপ্রিয়তা হারায়।
২) কেবলমাত্র সরকারের ইচ্ছায় কোন সংস্কারকে সফল করা সম্ভব ছিল না। প্রজাদের সহযােগীতা যে সংস্কারের সফলতার জন্যে দরকার স্বৈরশাসকগণ একথা বোঝেননি।।
৩) স্বৈরশাসনের চাপে দীর্ঘদিন ধরে পিষ্ট হওয়ার ফলে স্বৈরশাসকগণের সদিচ্ছা সম্পর্কে প্রজাদের আস্থা ছিল না। আলােকিত দর্শনের প্রভাবে ইউরোপের রাজাগণ যে প্রজাদের কল্যাণকামী হয়েছেন সেকথা প্রজারা জানত না। বিভিন্ন সংস্কারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রজাদের শিক্ষিত করে তােলা হয়নি। এজন্য রাজাদের দ্বারা প্রবর্তিত সংস্কার সম্পর্কে প্রজারা সন্দেহ পােষণ করত।
৪) দীর্ঘকাল ধরে স্বৈরশাসনের আওতায় থাকার ফলে জনসাধারণের উৎসাহ, উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে যায়। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে বেশীর ভাগ লােকের জীবনে হতাশা ও দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্বৈরশাসকরা ভূমিদাস প্রথা উচ্ছেদ ও জমির বণ্টনের কোন চেষ্টা না করায় সাধারণ কৃষকদের মধ্যে সংস্কার সম্পর্কে কোন উৎসাহ দেখা যায়নি।
৫) স্বৈরশাসকরা যে শাসনযন্ত্রের দ্বারা সংস্কার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন, তা ছিল দুর্নীতিযুক্ত এবং নিপীড়নমূলক। সরকারি কর্মচারীরা ছিল প্রধানতঃ সামন্তশ্রেণীর লােক। এরা দীর্ঘকাল ধরে প্রজাদের ওপর উৎপীড়ন করেছিল। নতুন সংস্কারের লক্ষ্য ছিল প্রজাদের সেবা করা। এই নীতিতে তারা অভ্যস্ত ছিল না। সরকারী লােকেরা নিজেদের জনসাধারণের প্রভু বলে মনে করতে অভ্যস্ত ছিল।
৬) দ্বিতীয় যােসেফের ন্যায় আদর্শবাদী শাসকেরা বাস্তব বুদ্ধির অভাববশতঃ বিফল হন। দ্বিতীয় যােসেফ এক শতাব্দীর কাজকে কয়েক বছরের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করেন। এজন্য তার সংস্কারগুলির মর্ম জনসাধারণ বুঝতে পারেনি।
৭) ঐতিহাসিক হেইজ মনে করেন যে, অষ্ট্রিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি রাজ্যগুলি ছিল বহু জাতির বাসস্থান। বিভিন্ন জাতিগােষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থগত ও ভাষাগত বিরােধ ছিল তীব্র। অসমাধান না করায় সংস্কারকে সফল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
৮) জ্ঞানদীপ্ত শাসকেরা ছিলেন সিংহাসনের ওপর বংশানুক্রমিক অধিকারে বিশ্বাসী। তাদের মৃত্যু হলে উপযুক্ত উত্তরাধিকারীর অভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যাবার লােক ছিল না।
৯) জ্ঞানদীপ্ত শাসকেরা তাদের উদ্যমকে দেশের আভ্যন্তরীন সংগঠন অপেক্ষা যুদ্ধ ও রাজ্য বিস্তারের কাজে বেশীর ভাগ নিয়ােগ করেন। যুদ্ধের ব্যায় মেটাতে রাজকোষ শূন্য হয়ে গেলে সংস্কার প্রবর্তনের জন্যে প্রয়ােজনীয় অর্থ পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র :
1. শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি - ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা
2. Hassal - Balance of Power
3. Hayes - Political, Social History of Europe
4. Hayes - Modern Europe
5. Reddaway, 239