PayPal

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সশস্ত্র শান্তির যুগ

author photo
- Thursday, August 08, 2019

সশস্ত্র শান্তির যুগ

১৯০৪ খ্রীঃ থেকে ১৯১৪ খ্রীঃ ইওরােপীয় ইতিহাসকে সশস্ত্র শান্তির যুগ বা Age of Armed peace বলা হয়। ডেভিড থমসন এই যুগকে Period of international anarchy বা আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যের যুগ বলে অভিহিত করেছেন। এই দশকের মূল কথা ছিল ইওরােপের প্রধান শক্তিগুলির দুই প্রধান শিবিরে বিভক্ত হওয়া। জার্মানী, অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরী ও ইতালী ত্রিশক্তি চুক্তি বা Triple Alliance গঠন করে। এই চুক্তিতে ক্রমে বুলগেরিয়া ও রুমানিয়া যােগ দেয়। অপর দিকে ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেন এই তিন শক্তি ট্রিপল আঁতাত বা ত্রিশক্তি জোট গঠন করে।
Age of Armed peace
দুই পরস্পর বিরােধী জোটের লক্ষ্য ছিল ইওরােপে শক্তিসাম্য স্থাপন করে শান্তি বজায় রাখা। এই দুই জোট প্রথমেই পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্যে গঠিত হয় নি। জামানীর স্থলশক্তি ও নৌশক্তি এত দ্রুত বাড়ছিল যে, এর সঙ্গে সমতা রক্ষার প্রয়ােজনে রাশিয়া ও ফ্রান্স জোটবদ্ধ হয় এবং পরে তাতে ব্রিটেন যােগ দেয়। কিন্তু গােড়ার দিকে এই জোট গড়ার যে উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবে তাহা সফল হয়নি। বাস্তবে দুই জোট গঠনের ফলে শক্তিসাম্য ও শান্তি স্থাপিত না হয়ে যুদ্ধের সম্ভাবনা আরও তীব্রতর হতে থাকে। বিভিন্ন শক্তিগুলি অস্ত্র নির্মাণ প্রতিযােগিতায় মত্ত হয় এবং গোপন কুটনীতির আশ্রয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার চেষ্টা করে। যে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বৈঠক ডেকে বিরােধীয় বিষয়গুলির শান্তিপূর্ণ মীমাংসা করা সম্ভব ছিল, বৃহৎ শক্তিগুলি করতে বিরত থাকে। তারা অস্ত্রের দ্বারা মীমাংসার কথা ভাবতে থাকে। এভাবে শক্তিসাম্যের দ্বারা শান্তিকে দৃঢ় করার পরিবর্তে শক্তির আস্ফালন দ্বারা শান্তিকে ধ্বংস করার চেষ্টা আরম্ভ হয়। প্রতি দেশ সাধ্যমত অস্ত্র নির্মাণ ও সৈন্য সংগঠনের কাজ করে।

অস্ত্র নির্মাণ এবং নৌ গঠনের মূলে ছিল প্রতি বৃহৎ শক্তির মনে অপর শক্তি সম্পর্কে ভয় এবং সন্দেহ। যদিও ব্রিটেনের নৌবহর ছিল শ্রেষ্ঠতম, তবুও ব্রিটেনের ভয় হয় যে, জার্মানী শীঘ্রই ব্রিটেন অপেক্ষা শক্তিশালী হবে। ফলে ব্রিটেন তার নৌশক্তি বাড়িয়ে চলে। জার্মানীও এর সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে। যদিও জার্মানীর স্থলসেনা ছিল খুবই শক্তিশালী, তবুও জার্মানীর আশঙ্কা ছিল যে, ফ্রান্স ও রাশিয়ার যুগ্মশক্তি তাকে ধ্বংস করবে। এই আশঙ্কা ও ভীতির ফলে নৌগঠন ও মারণাস্ত্র নির্মাণের প্রতিযােগিতা তীব্রতর হয়।

১৯০৫ - ০৬ খ্রীঃ কাইজার অকস্মাৎ মরক্কোর টাঞ্জিয়ার বন্দরে যান। তিনি মরক্কোর সুলতানকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সাহায্য দানের কথা বলেন। ১৯০৪ খ্রীঃ ইঙ্গ-ফরাসী আঁতাতের এবং ১৮৯৩-এ ফ্রাঙ্কো আঁতাতের ফলে কাইজার সরকারের মনে অশান্তি দেখা দেয়। ইঙ্গ-ফরাসী আঁতাত কতটা মজবুত জার্মানী তা পরীক্ষা করে দেখতে চায়।

কাইজার সরকারের ধারণা ছিল যে উপনিবেশের দখল নিয়ে ইংলন্ড-রুশ বিরােধ এত তীব্র ছিল যে, ইঙ্গ-ফরাসী জোট প্রকৃতপক্ষে হওয়া কঠিন। এই জোটের স্থিতিশীলতা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে কাইজার টাঞ্জিয়ারে আসেন। এর ফলে ফ্রান্সের আশঙ্কা হয় যে, মরক্কোয় ফরাসী প্রভাব বিনষ্ট করার জন্যে কাইজার চেষ্টা করছেন। জার্মানীর সঙ্গে মরক্কোর আধিপত্য নিয়ে যুদ্ধের ভয়ে ফ্রান্স নত হতে চেষ্টা করে। কিন্তু মিত্র ইংলন্ড ফ্রান্সকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলে ফ্রান্স জার্মান প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ করে। কাইজারর মরক্কো উপলক্ষে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত আলজেসিয়ার্স সম্মেলনে (১৯০৬ খ্রীঃ) কাইজার মরক্কোর ওপর ফরাসী আধিপত্য মেনে নেন। ইংলন্ডের চাপের কাছে জার্মানী নতিস্বীকার করে।

প্রথম মরক্কো সংকটে নাস্তানাবুদ হওয়ার পর কাইজার কিছুকাল মনমরা হয়ে থাকেন। বেটম্যান হলােওয়েন প্রধানমন্ত্রী হলে তার পরামর্শে কাইজার ইঙ্গ-ফরাসী জোটের ওপর পুনরায় এক হাত নিতে চান। ১৯১১ খ্রীঃ জার্মান যুদ্ধ জাহাজ প্যান্থার মরক্কোর আগাদির বন্দরে ঢুকে পড়লে ইঙ্গ-ফরাসী জাহাজগুলি প্যান্থারকে ঘিরে ফেলে। কাইজার দাবী করেন যে, ফরাসী অধিকৃত কঙ্গো জার্মানীকে ছেড়ে দিলে তবেই জার্মান যুদ্ধ জাহাজ আগাদির বন্দর থেকে চলে যাবে। ইঙ্গ-ফরাসী মিত্র সরকার জার্মানীর দাবীর বিরুদ্ধে অনমনীয় মনােভাব দেখালে কাইজার বাধ্য হয়ে প্যান্থারকে ফিরিয়ে নেন।

ইতালী ত্রিশক্তি চুক্তির সদস্য হলেও ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের সঙ্গে গােপন সম্পর্ক স্থাপন করে ত্রিপলি অধিকার করে। তুরস্কের নিকট থেকে বলপূর্বক ত্রিপলি গ্রাস করায় জোর যার মুল্লুক তার নীতি প্রকট হয়ে ওঠে।

বলকান জাতিগুলি দেখে যে, তাদের জাতীয়তাবাদী দাবীগুলি পুরণের জন্যে বৃহৎ শক্তিগুলি সমর্থন করবে না। সুতরাং তারা বলকান লীগ গঠন করে তুরস্কের বিরুদ্ধে দুটি বলকান যুদ্ধ ঘােষণা করে। তুরস্ককে পরাজিত করে বলকানকে মুক্ত করা হয়। অতঃপর বলকানের বিভিন্ন অঞ্চল অধিকারের জন্যে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়ার মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই বিরােধে বৃহৎ শক্তিগুলি জড়িয়ে পড়ে। জার্মানী ও অষ্ট্রিয়া বুলগেরিয়ার পক্ষ নিলে, রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষ নেয়।

ইতিমধ্যে বার্লিনের সন্ধির শর্ত অগ্রাহ্য করে, অস্ট্রিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগােভিনা নামে দুটি প্রদেশকে অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। এই প্রদেশ দুইটিতে স্লাভ জাতির লােক বসবাস করত। স্লাভদের সঙ্গে সার্বিয়ার জাতিগত ঐকা ছিল। সুতরাং এই দুটি প্রদেশ অষ্ট্রিয়া অধিকার করায়, সার্বিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এজন্য বলকান সমস্যাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিরােধ তীব্র হয়।

এই সময় অষ্ট্রিয়ার যুবরাজ ফার্দিনান্দ ও তার পত্নী সেরাজেভাে নামক স্থানে এক উগ্রপন্থী বসনিয় ছাত্র দ্বারা নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে সার্বিয়া সরকারের চক্রান্ত ছিল। ক্রুদ্ধ অষ্ট্রিয়া সরকার এজন্য সার্বিয়ার নিকট এক চরমপত্র পাঠায় এবং দুই দিনের মধ্যে দাবীগুলি পূরণের শর্ত দেয়। অস্ট্রিয়া সরকার এই চরমপত্র দ্বারা বারুদের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয়। সার্বিয়া চরমপত্রের কয়েকটি শর্ত মেনে বাকি শর্তগুলি অগ্রাহ্য করলে, অষ্টিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করে। এর ফলে বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যায়।

তথ্যসূত্র :
1. ইউরোপের ইতিহাসের রূপরেখা - শ্রী প্রভাতাংশু মাইতি।
2. Rene Carrle - Diplomatic History of Europe.
3. Gordon Caring. P. 307.
4. Thomson David - Europe Since Napoleon.