PayPal

বৈদিক যুগের সমাজ ব্যবস্থা

author photo
- Thursday, July 18, 2019

বৈদিক যুগের সামাজিক অবস্থা

আর্যদের সামাজিক জীবনের মূল ভিত্তি ছিল পরিবার। সমাজের ক্ষুদ্রতম বিভাগ ছিল পরিবার। পরিবারগুলি ছিল পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারকে বলা হত কুল। পরিবারের সর্বাপেক্ষা বয়স্ক পুরুষ ছিল সর্বপ্রধান ব্যক্তি। তাকে গৃহপতি বা কুলপ বলা হত। পিতা ছিলেন পরিবারের সর্বময় কর্তা। এই যুগে পুত্রের উপর পিতার নিয়ন্ত্রণ ছিল কঠোর। যৌথ পরিবার ছিল আর্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পিতা, মাতা, পিতামহ, পিতামহী এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে পরিবার গঠিত হত। পরিবারের প্রত্যেকের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
বৈদিক সমাজের বর্ণভেদ প্রথা
ঋকবৈদিক যুগের সভ্যতা ছিল গ্রামীণ সভ্যতা। প্রতি পরিবারের স্থায়ী গৃহ থাকত। সাধারণত গৃহগুলি বাঁশ, খড় ও শনের ছাউনি দ্বারা তৈরি করা হত। পরবর্তীকালে মাটির দেওয়াল দ্বারা গৃহ নির্মাণের প্রথা চালু হয়। প্রতি গৃহে একটি করে অগ্নিকুণ্ড থাকত। এই অগ্নিকুণ্ড পােড়া মাটির ইটের দ্বারা তৈরি করা হত। প্রত্যেক গ্রামে পুর বা দুর্গ ছিল। যুদ্ধের সময় নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সেখানে আশ্রয় নিত।

বৈদিক সমাজের বিবাহ : বৈদিক সমাজে সাধারণত এক পত্নী গ্রহণ প্রচলিত হলেও বহু বিবাহের প্রচলন ছিল। তখনকার সময়ে সমাজে বিধবা বিবাহের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। বাল্য বিবাহের প্রচলন একেবারেই ছিল না। প্রাপ্তবয়স্ক হলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হত। অনেক ক্ষেত্রে পাত্ৰপাত্রীর পরস্পরের পছন্দকে বিবাহের ক্ষেত্রে গুরত্ব দেওয়া হত। পণপ্রথা ও কন্যা পণপ্রথা উভয় নিয়মই প্রচলিত ছিল।

বৈদিক সমাজে নারীর অবস্থান : সমাজে নারীর স্থান ছিল সম্মানজনক। আর্য নারী মােটামুটিভাবে স্বধীন ছিলেন। অন্ত:পুরের যাবতীয় কাজ ওঁদের যেমন করতে হত, তেমনি অন্তঃপুরের বইকেও তারা পুরুষদের সহায়তা করতেন। তারা কেবল পুরুষের সহধর্মিণী ছিলেন না, স্বামীর সহধর্মিণীও ছিলেন। স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে ধর্মাচরণ অংশগ্রহণ করতে পারতেন। পিতৃগৃহে কন্যাদের শিক্ষাদানের রীতি ছিল। বেদ পাঠেও নারী অংশগ্রহণ করতে পারতেন। মমতা, বিশ্বৰাৱা, ঘােষা, অপালা, লােপামুদ্রা, শিকতা, নিভাৰৱী প্রমুখ বেদমন্ত্র রচনা করেছিলেন। মৈত্রেয়ী, গার্গী প্রমুখ দর্শনশাস্ত্রে প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য দেখিয়েছিলেন। আর্য নারীরা যুদ্ধবিদ্যা, অসি চালনা প্রভৃতি শিক্ষা করতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়। মেয়েরা অধ্যাপনার কাজ করে জীবিকা অর্জন করতেন এমন প্রমাণও আছে। আবার এমনও অনেক নারী ছিলেন যারা গণ পরিষদে নিয়মিত যােগদান করে শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করতেন। নারীদের নৈতিক চরিত্র পুরুষদের তুলনায় উঁচু ছিল। এযুগে স্ত্রী শিক্ষার প্রচলন ছিল। মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ বেদমন্ত্র রচনা, ধর্ম ও শাস্ত্রচর্চায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। লােপামুদ্রা, গার্গী, মৈত্রেয়ী প্রমুখ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বৈদিক যুগের সংগীত, খাদ্য ও আমােদ-প্রমোদ : আর্যদের খাদ্যাভ্যাস ছিল সাধারণ ও অনাড়ম্বর। আর্যদের খাদ্য ছিল দুধ, ঘি, ফলমূল, যব, গম ও নানা প্রকার পশুপক্ষীর মাংস। তারা চাল ও চালজাত দ্রব্যও খেত। পিঠা ছিল আর্যদের প্রিয় খাদ্য। তরিতরকারি ও ফলমূল ছিল আর্যদের দৈনন্দিন খাদ্য। তাৱা পানীয় জল নদী, কুয়াে এবং ঝরনা থেকে সংগ্রহ করত। সুৱা ও সােমৱস ছিল প্রিয় উত্তেজক পানীয়। যাগযজ্ঞের সময়ে বা উৎসবাদিতে সােমরস নামে একপ্রকার লতার রস মাদকদ্রব্য হিসেবে পানের রীতি ছিল। তবে সুরাপান সমাজে নিন্দনীয় ছিল। নাচ, গান, মৃগয়, রথের দৌড়, পাশাখেলা, মুষ্টিযুদ্ধ, ধনুর্বাণ প্রতিযােগিতা প্রকৃতি ছিল আর্যদের আমােদ প্রমােদের প্রধান উপকরণ। পাশাখেলার দ্বারা জুয়া খেলার প্রচলন হয়। তবে সমাজে জুয়া খেলা অপরাধজনক বলে মনে করা হত। তা সত্বেও বহুলােক এই প্রলােভন এড়াতে পারত না। বৈদিক যুগে সংগীত বিদ্যা ও চারুকলার খুবই উন্নতি হয়েছিল। বাঁশি, বীণা, ঢোল, ঢাকসহ তাল নৃত্যগীত করত। সামবেদকে গানের আকারে গাওয়ার রীতি ছিল। নৃত্য ও সংগীতে তাল, মাত্রা ও রাগরাগিনী পরিচয় পাওয়া যায়। এই যুগে ছিল অনেক পেশাদারি।

বৈদিক যুগের পােশাক-পরিচ্ছদ ও অলঙ্কার : বেশভূষার দিকে আর্যদের বিশেষ দৃষ্টি ছিল। পোশাক পরিচ্ছদে তাদের কোনাে আড়ম্বর ছিল না। কার্পাস, হরিণের চামড়া আর পশম দিয়ে নানা রঙের পােশাক তৈরি করা হত। আর্যদের পােশাক পরিচ্ছদ তিনটি সুস্পষ্ট অংশে বিভক্ত ছিল। নীৰি নামক এক খণ্ড কৌপিন জাতীয় বস্ত্রখণ্ডের উপর বাস বা পরিধান অর্থাৎ বাইরের পােশাক এবং অধিবাস অর্থাৎ উত্তরীয় আর্যগণ পােশাক হিসেবে ব্যবহার করত। বিশেষ উৎসব বা ধর্মীয় কারণে মােমবস্ত্র এবং দুকুল নামে মিহি রেশমের বস্ত্র ব্যবহার করত। এ যুগে অন্যান্য ধাতুর অলংকারের উল্লেখও পাওয়া যায়। স্ত্রীলােকদের মধ্যে কেশবিন্যাসের প্রচলন ছিল। মেয়েরা নানা ছাদে কবরী বাধত এবং তাতে চিরুনি ও তেল দিয়ে প্রসাধন করত।

বৈদিক যুগের বর্ণবিভাগ প্রথা : বৈদিক যুগের প্রথমভাগে ভারতে সমাজব্যবস্থার যে প্রভেদ ছিল তা মুলত বর্ণগত বা শ্রেণিগত নয়। আর্যরা প্রথম যখন ভারতবর্ষে আগমন করে, তখন তারা নিজেদের দেহের আকৃতি, গায়ের রং প্রভৃতি সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিল। আর্য ছিল গৌরবর্ণ। আর ভারতের অধিবাসীরা ছিল কৃষ্ণবর্ণ। বৈদিক যুগের প্রথম ভাগে সমাজ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল — গৌরবর্ণ বিজেতা আর্য ও কৃষ্ণবর্ণ বিজিত দাস চাকর। কিন্তু লােকসংখ্যা বৃদ্ধি ও সামাজিক জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুণ, কর্ম ও বৃত্তি অনুসারে সমাজে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়। যারা শাস্ত্র পাঠ ও যাগযজ্ঞ করত তারা ব্রাহ্মণ, যারা যুদ্ধ ও রাজ্যশাসন করত তারা ক্ষত্রিয়, যারা ব্যাবসাবাণিজ্য করত তারা বৈশ্য নামে অভিহিত হল। অনার্য দাসগণ শূদ্র নামে পরিচিত হল। উক্ত তিন শ্রেণির মানুষের পরস্পর বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতে কোনাে বাধা ছিল না। একসঙ্গে পান ভােজন ও মেলামেশা চলত। একবৃত্তীয় মানুষের অন্য বৃত্তি গ্রহণে কোনাে আপত্তি ছিল না। ঋগবেদে এমন একটি পরিবারের উল্লেখ আছে, যার গৃহকর্তা একজন চিকিৎসক, গৃহকর্তী শস্যদানা পেশক, পুত্র একজন কবি।

বৈদিক যুগের চতুরাশ্রম প্রথা : বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য — এই তিন বর্ণের প্রতিটি ব্যক্তির জীবন চারটি স্তরে বা আশ্রমে বিভক্ত ছিল। এই চার অবস্থাকে বলা হত চতুরাশ্রম, যথা-(১) গার্হস্থ্য, (২) ব্রহ্মচর্য, (৩) বানপ্রস্থ ও (৪) সন্ন্যাস। ব্রহ্মচর্যাশ্রম ছিল অধ্যয়নের কাল। এই সময়ে আর্য বালক গুরুগৃহে বাস করে ব্রম্মচর্য পালন ও বিদ্যাচর্চা করত। গার্হস্থ্যাশ্রম ছিল যৌবনে গৃহী হয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহের কাল। বানপ্রস্থাশ্রম ছিল প্রৌঢ় বয়সে সংসার ত্যাগ করে অরণ্যবাসী হয়ে ধর্মানুষ্ঠানে ও ঈশ্বর চিন্তায় কালযাপন, সন্ন্যাসাশ্রম হল শেষ জীবনে সন্ন্যাস অবলম্বন করে পরমাত্মার চিন্তায় নিজেদের ডুবিয়ে রাখা। এর নাম সন্ন্যাস বা যতি।