প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনে সাহিত্যিক উপাদান

- July 20, 2019
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে দু ভাগে ভাগ করা যায় (ক) সাহিত্যিক উপাদান এবং (খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। সাহিত্যিক উপাদানকে আবার দুভাগে ভাগ করা যায় — (১) ভারতীয় সাহিত্য ও (২) বিদেশি সাহিত্য। অনুরূপে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলিকে আবার (১) লিপি, (২) মুদ্রা ও (৩) স্থাপত্য ভাস্কর্য — এই তিনভাগে বিভক্ত করা যায়।
প্রাচীন ভারতের সাহিত্যিক উপাদান

ভারতীয় সাহিত্য

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান হিসেবে সাহিত্য বিশেষ স্থানের অধিকারী। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পূর্ববর্তী যুগ বা প্রাক বিম্বিসার যুগের কোনও লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। বেদ, মহাকাব্য ও পুরাণ থেকে এই যুগের কিছু কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব এই চারটি বেদ এবং সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ এবং সূত্র সাহিত্য নিয়ে বিশাল বৈদিক সাহিত্য গড়ে উঠেছে। কোনও কোনও পণ্ডিত ইতিহাসের উপাদান হিসেবে বেদ ও বৈদিক সাহিত্যের বিরুদ্ধে মতামত প্রকাশ করে। ঋগবেদ হল বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ। ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ খ্রিস্টপূর্ব মধ্যে এটি রচিত হয়। ঋগবেদ থেকে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে আর্যদের বসতি স্থাপন এবং তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়।

বৈদিক সাহিত্যের পর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল দুই মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত। এই দুই মহাকাব্যের মধ্যে কোনটি আগে এবং কোনটি পরে, তা নিয়ে পণ্ডিতরা একমত নন। এই গ্রন্থ দুটি থেকে প্রাচীন যুগের রাজৱংশগুলির কীর্তিকলাপ, আর্য অনার্য সংঘর্ষ, দাক্ষিণাত্যে আর্য সংস্কৃতির বিস্তার, এই যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন, বিভিন্ন সামাজিক প্রথা, বর্ণব্যবস্থা, সমাজে নারী অবস্থান প্রভৃতি নানা বিষয়ের পরিচয় পাওয়া যায়। মহাকাব্যে বর্ণিত ঘটনাবলী অতিরঞ্জনদোষে দুষ্ট হলেও সমকালীন যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে এদের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে পুরাণগুলিও যথেষ্ট মূল্যবান। আঠারােটি পুরাণের মধ্যে বিষ্ণুপুরাণ, বায়ুপুরাণ, মৎস্যপুরাণ, ব্রহ্মপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পুরাণগুলিতে কিংবদন্তির যুগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজবংশের উৎপত্তি, রাজাদের বংশতালিকা, রাজাদের কার্যকলাপ, প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা, বিভিন্ন নদ নদী, পাহাড় পর্বত, প্রাচীন শহর ও তীর্থস্থানগুলির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এ সত্ত্বেও পুরাণগুলি কিন্তু ত্রুটিহীন নয়। এতে বহু কিংবদন্তি ও লােককাহিনি মিশে আছে এবং এদের কালানুক্রমও বিভ্রান্তিকর।

হিন্দু স্মৃতিশাস্ত্র গুলিও ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান। স্মৃতিশাস্ত্রগুলির মধ্যে মনু স্মৃতি, নারদ স্মৃতি, বৃহস্পতি স্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, কাত্যায়ন স্মৃতি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এগুলি থেকে প্রাচীন ভারতের সামাজিক রীতি নীতি, সমাজ সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাবলী, রাষ্ট্রীয় কর্তব্য, বিভিন্ন বর্ণের মানুষের নিজ নিজ কর্তব্য এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনসমূহ সম্পর্কে জানা যায়।

বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিপিটক, দীপবংশ, মহাবংশ এবং জাতক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিপিটক অর্থাৎ বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক ও অভিধর্ম পিটকে বৌদ্ধ ধর্ম ও সঙ্ঘ সংক্রান্ত তথ্যাবলী পাওয়া যায়। পালি ভাষায় লিখিত সিংহলের ইতিবৃত্ত দীপবংশ ও মহাবংশ থেকে বুদ্ধদেব, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও অশােক সংক্রান্ত তথ্যাদি মেলে। জাতক থেকে বুদ্ধদেবের পূর্ববর্তী জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। গৌতম রূপে জন্মগ্রহণ করার পূর্বে বুদ্ধদেব ৫৪৭ বার বােধিসত্ত্ব রূপে জন্মগ্রহণ করেন। এক একটি জন্মকাহিনিকে নিয়ে মােট ৫৪৭ টি জাতক গড়ে উঠেছে। জাতক এবং উল্লিখিত সগ্রন্থগুলি থেকে সমকালীন যুগের সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম, বর্ণব্যবস্থা, নগর জীবন, কৃষি ও বাণিজ্য সম্পর্কে নানা তথ্য জানা যায়। বৌদ্ধগ্রন্থ ললিতবিস্তার, বৈপুল্য সূত্র এবং অশ্বঘােষ রচিত বুদ্ধচরিত বুদ্ধদেবের জীবনী সংক্রান্ত মূল্যবান গ্রন্থ। প্রাকৃত ভাষায় রচিত জৈন ভগবতী সূত্র, আচারঙ্গ সূত্র, ভদ্রবাহু রচিত জৈন কল্পসূত্র জৈন আচার্য হেমচন্দ্র রচিত পরিশিষ্টপার্বণ এবং মেরুতুঙ্গ সম্পাদিত প্রবন্ধচিন্তামণি ও রাজশেখর সম্পাদিত প্রবন্ধকোষ ইতিহাসের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাকরণ, অভিধান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং আইন সংক্রান্ত গ্রন্থাদি থেকেও ইতিহাসের মূল্যবান তথ্যাদি পাওয়া যায়। এ সম্পর্কে গার্গীসংহিতা নামক জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ, পাণিনির ব্যাকরণ অষ্টাধ্যায়ী, অষ্টাধ্যায়ীর টীকা পতঞ্জলি-র মহাভাষ্য, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কামন্দকের নীতিসার, বাৎস্যায়নের কামসূত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। এছাড়া মহাকবি কালিদাসের বিভিন্ন নাটক যথা - রঘুবংশম, অভিজ্ঞানশকুন্তলম এবং বিশাখদত্তের দেবী চন্দ্রগুপ্তম থেকে গুপ্ত যুগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানা যায়।

প্রাচীন ভারতে রচিত বিভিন্ন জীবনচরিত থেকেও ইতিহাসের তথ্যাদি পাওয়া যায়। বাণভট্ট রচিত হর্ষচরিত, কাশ্মীরের বিখ্যাত কবি বিহূন-এর বিক্রমাঙ্কদেব চরিত (কল্যাণের চালুক্য বংশীয় রাজা যষ্ঠ বিক্রমাদিত্য), সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত, জয়সিংহ রচিত কুমারপালচরিত (চালুক্য রাজ কুমারপাল), পদ্মগুপ্ত রচিত নবসাহসঙ্কচরিত, বাক্‌পতিরাজ রচিত গৌড়বাহ, ন্যায়চন্দ্র রচিত হামিরকাব্য, চাদবরদৈ রচিত পৃথ্বীরাজচরিত, বল্লাল রচিত ভােজপ্রবন্ধ ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান।

কাশ্মীর, গুজরাট, সিন্ধু, নেপাল প্রভৃতি স্থানের কিছু আঞ্চলিক ইতিহাস থেকেও ঐতিহাসিকরা নানাভাবে সাহায্য পান। দ্বাদশ শতকে কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ কলহন রচিত রাজতরঙ্গিনী হল কাশ্মীরের ইতিহাস। এই গ্রন্থে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত কাশ্মীরের ধারাবাহিক ও প্রামাণিক ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। কিছু ত্রুটি সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতে এটিই একমাত্র গ্রন্থ যাকে প্রকৃত অর্থে ইতিহাস বলে আখ্যায়িত করা যায়। গুজরাটের ইতিহাস জানা যায় সােমেশ্বর রচিত রাসমালা ও কীর্তিকৌমুদী, অরিসিংহের সুকৃতি সংকীর্তন, মেরুতুঙ্গের প্রবন্ধ চিন্তামণি, রাজশেখরের প্রবন্ধকোষ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে। বালাজুরি রচিত চাচনামা গ্রন্থ থেকে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের বিবরণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস রচনায় তামিল সঙ্গম সাহিত্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশি সাহিত্য

বিদেশি লেখকদের মধ্যে সর্বপ্রথম হেরােডোটাস এর রচনায় ভারতের উল্লেখ পাওয়া যায়। ইতিহাসে জনক হিসেবে স্বীকৃত হেরােডোটাস কখনো ভারতে আসেননি। তার রচনা থেকে ভারতের উত্তর পশ্চিম সীমান্তে পারসিক বিজয়ের কথা জানা যায়। পারস্যর দরবারে দীর্ঘ সতেরো বছর অবস্থানকারী গ্রীক চিকিৎসক টেসিয়াস ভারত সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেন ইন্ডিকা নামে। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে জনৈক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক রচিত পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সী (Periplus of the Erythrean Sea) বা ভারত মহাসাগর ভ্রমণ, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত গ্রিক লেখক টলেমি-র ভূগােল (Geography) এবং খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে লিখিত রােমান পণ্ডিত প্লিনি রচিত প্রাকৃতিক ইতিহাস (Natural Histoy) ভারত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই তিনটি গ্রন্থ থেকে ভারতের বিভিন্ন বন্দর, পােতাশ্রয়, আমদানি রপ্তানি দ্রব্য, জীবজন্তু, লতা গুল্ম, খনিজ সম্পদ এবং রােম ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে নানা মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পলিবিয়াস লিখিত সাধারণ ইতিহাস (General History) থেকে বাহ্রিক গ্রিকদের আক্রমণ সম্পর্কে জানা যায়।

ভারতে শক, পল্লব ও কুষাণ ইতিহাসের ক্ষেত্রে চৈনিক বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিন দেশীয় ইতিহাসের জনক সুমাকিয়েন রচিত ইতিহাস, ফা হিয়েন রচিত ফো কুও কি, হিউয়েন সাঙ রচিত সি ইউ কি, ইং সিং এর বিবরণী এবং তিব্বতীয় পণ্ডিত লামা তারানাথ রচিত ভারতে বৌদ্ধধর্মের জন্ম গ্রন্থ থেকে ভারত ইতিহাসের নানা তথ্যাদি জানা যায়।

মুসলিম ঐতিহাসিকগণ ভারতে মুসলিম আধিপত্য বিস্তারের কাহিনি সুবিস্তৃতভাবে আলােচনা করেছেন। সুলেমান, অল মাসুদি, অল বিলাদুরি, হাসান নিজামি প্রমুখের রচনায় এর বিস্তৃত বিবরণ মিলবে। মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন অল বিরুনি। এই বিশিষ্ট আরবীয় পণ্ডিত গজনির অধিপতি সুলতান মামুদের সঙ্গে ভারতে আসেন। তিনি দীর্ঘকাল ভারতে বসবাস করে ভারতীয় ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কে অনুশীলন করেন। ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার তহকোক ই হিন্দ বা কিতাব উল হিন্দ গ্রন্থে সমকালীন ক্ষয়িষ্ণু ভারতের সমাজ ও ধর্মের এক জীবন্ত চিত্র ফুটে উঠেছে।