জৈন ধর্মে নারীর অবস্থান - Women in Jainism Religion

- July 26, 2019
জৈন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শাস্ত্র ও চর্যাগত বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছিল সম্ভবত মহাবীরের মৃত্যুর কিছুকাল পর থেকেই। কিন্তু শেষ অবধি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে দিগম্বর ও শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছিল জৈন ধর্মের মধ্যে বিভাজন ঘটিয়ে। ঘটনাটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনকালে ঘটেছিল এবং মহামতি ভদ্ৰবাহু তখন জৈন ধর্মের প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন। এই বিভাজনের প্রথম সাহিত্যিক উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতকে প্রাকৃত ভাষায় রচিত কুণ্ডকুণ্ডের সুত্তপাহুদা গ্রন্থে। এই দুই সম্প্রদায় একে অপরের তত্ত্বগত অবস্থান ও শাস্ত্র ব্যাখ্যার সিদ্ধতা অস্বীকার করে এবং এদের মধ্যে দ্বন্দ্বের মূল বিষয় ছিল দীক্ষিত জৈন শিষ্যদের বস্ত্রপরিধানের প্রশ্নকে ঘিরে। স্বাভাবিকভাবেই যেহেতু সে সময়ে ভিক্ষুণীরাও জৈন ধর্মে প্রবেশ করেছেন বস্ত্র পরিধান এবং তার সাথে সাথে স্ত্রী নির্বাণ অথবা স্ত্রী মােক্ষ বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। বস্তুত এই বিতর্ক সংক্রান্ত নানা বিষয় ও মতামত যেভাবে জৈন সাহিত্যে ব্যাখ্যা হয়েছে সেই সূত্র ধরেই জৈন ধর্মের চোখে নারীর অবস্থান সম্পর্কে চিন্তাধারা সম্বন্ধে জানতে পারা যায়।
Jain religious woman
প্রথমত বস্ত্র পরিধানের ক্ষেত্রে বিতর্কটি যেভাবে এগিয়েছিল তা লক্ষ্য করা যাক। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত একই ছিল — যে মহাবীর নিজে অচেলক বা চেলিহীন অবস্থাতেই থাকতেন। কিন্তু শ্বেতাম্বর মতে সে সময়েও বস্ত্র পরিধান বা নগ্নভাব গ্রহণ সম্পর্কে শিষ্যকে নিজস্ব বিচারই বহাল থাকত শারীরীক চর্যা বা উপবাস সম্পর্কেও শেতাম্বর সম্প্রদায় এই মতামতেই বিশ্বাসী ছিলেন। অন্যদিকে দিগম্বর সম্প্রদায় নগ্নতা ও মুনি লিঙ্গ উন্মুক্ত রাখাই ধর্মচর্যার মুখ্য বৈশিষ্ট্য রূপে গ্রহণ করেছেন। তারা মহাবীরের নগ্নভাব সংক্রান্ত ধর্মাদর্শের প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত সামনে রেখে তাকেই মােক্ষলাভের মূল উপায় রূপে স্বীকৃত দিয়েছেন। শ্বেতাম্বর মতে মহাবীরের সময়কালে যে চৰ্যা সম্ভব ছিল তা সমকালীন সময়ে (খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক) পালন করা সমীচীন নয় । তাদের শাস্ত্রে দাবী করা হয় যে মহাবীবের মৃত্যুর পরেই নগ্নতা চর্যা অপ্রচলিত হয়ে গিয়েছিল এবং পরিবর্তিত সময়ে, নতুন সমাজ ব্যবস্থায় সেই চর্যার পুনঃপ্রচলন যথাযথ নয়। এই ব্যাখ্যায় বরং দিগম্বর জৈনরা যে নগ্নভাবকে পুনরায় প্রচলিত করলেন তা শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলে দাবী করা হল।

নগ্নভাব চর্যার এই বিষয়টি ভিক্ষুণী ধর্মীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দিগম্বর জৈন ভিক্ষুণীদের বস্ত্রাবৃত থাকার কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এর অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ তাদের মতে তিক্ষুণীগণ মােক্ষলাভের অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলেন। ভিক্ষুণীদের যদিও আর্যিকা, সাধ্বী ইত্যাদি নানা সম্মানজনক অভিধা দেওয়া হত কিন্তু তারা ভিক্ষু সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশের অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃতি পাননি। কেবলমাত্র কুমারী এবং সাধনার পথগামী উৎকৃষ্ট শ্রৰিকা রূপেই তার মর্যাদা পেতেন। শ্বেতাম্বর ভিক্ষুদের প্রতিও একই কারণে দিগম্বর ধর্মাবলম্বীগণ এই মত পােষণ করতেন। কি স্ত্রী কি পুরুষ বস্ত্র পরিত্যাগ না করতে পারলে দেহ ও মনের মধ্যে অন্তর্নিহিত যৌনতা যা কিনা লজ্জার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় তা দুর হয় না।

অন্যদিকে শ্বেতাম্বর সম্প্রদায় যেহেতু বস্ত্রকে সাংসারিক সম্পদ বলে গণ্য করেনি বরং ধর্ম উপকরণ বলেই গ্রহণ করেছে তাই ভিক্ষুণীদের বস্ত্রপরিধানের নির্দেশ দিলেও তাদের ভিক্ষুদের মত একইরকমভাবে মর্যাদা দেওয়া হত এবং মােক্ষলাভের পূর্ণ অধিকার ও স্বীকৃত হয়েছে।

আদিতে মােক্ষলাভের ক্ষেত্রে নিগ্রন্থি চর্যা প্রধান বিধিরুপে গণ্য হওয়ায় নারীর মােক্ষলাভ সংক্রান্ত বিষয়টি আলােচনাতেই আসেনি। কিন্তু নারী সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত হয়েছে নানাভাবে। মহাবীবের বক্তব্য অনুযায়ী সমাজে নারীর নগ্নতা স্বীকার্য নয় সুতরাং নারীর মােক্ষলাভও সম্ভব নয়। মহাবীর এও বলেছেন যে নারী পৃথিবীর সবচাইতে বড় মােহের কারণ এবং জৈন ভিক্ষুণের প্রতি তার কঠিন নির্দেশ ছিল নারীর সাথে বাক্য বিনিময়, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত বা সম্পর্ক স্থাপন অথবা তাদের জন্য কোনরূপ কর্মসাধন থেকে বিরত থাকার। নারীর সংশ্রব সাধনার পথে চরম বিপত্তিরুপে গণ্য করেছেন জৈন ও বৌদ্ধ দুই ধর্মেই। তার সবচাইতে বড় কারণ হিসাবে ব্রহ্মচর্যার উপর গুরুত্ব আরােপের প্রথাকেই চিহ্নিত করা যায়। এই বিশেষ কারণেই জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মে নারী এবং বিশেষত নারীদেহের প্রতি তীব্র ঘৃণা ও অনীহা সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। দিগম্বর জৈন মতে নারী স্বভাবতই ক্ষতিকারক। নারীর রজস্বলা অবস্থার প্রতি ঘৃণাজনিত নানা বক্তব্য জৈন শাস্ত্রীয় সাহিত্যে পাওয়া যায়। কুণ্ডকুণ্ড রচিত সুত্তপাহুদাতে নারীদেহের অপবিত্রতা সম্পর্কে স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে নারীর যৌনাঙ্গ, নাভি ও বক্ষদেশে নানা জীবাণুর জন্ম হওয়ার কারণে নারীর মধ্যে চিত্তচাঞ্চল্য ও যৌণ বাসনা জন্মায়।

শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের সাথে জপনীয় সংঘের ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং পরবর্তীকালে দিগম্বর সম্প্রদায়ের সাথে পরিব্রজালাভের ক্ষেত্রে নগ্নভাৰ এর বিরােধীতায় তারা বক্তব্য রেখেছিলেন জপনীয় সম্প্রদায়েরই অনুসরণ করে। শ্বেতাম্বর দার্শনিক যথা হরিভদ্র, অভয়দেব, শান্তিসুরি, মলয়গিরি, হেমচন্দ্র প্রমুখ এই বিতর্ক জারী রেখেছিলেন, তাঁদের রচনায় তার প্রমাণ রয়েছে। অপরদিকে দিগম্বর তাত্ত্বিকদের মধ্যে ছিলেন বীরাসন, দেবসেন, নেমিচন্দ্র, প্রভাবচন্দ্র, জয়সেন প্রমুখ নারী জন্মগতভাবে পুরুষের থেকে হীন অর্থাৎ ‘হীনত্বং'। তারা পুরুষের মত তাদের বস্তু সম্পদ তথা বস্ত্র ত্যাগে অসমর্থচ বিতর্ক ইত্যাদি নানা বিদ্যায় পারদর্শীতাহীন, ধর্মীয় শাস্ত্র ও সামাজিক বিধিমতে মর্যাদাহীন এবং সর্বোপরি নিকৃষ্টতম পাপকর্মজনিত অপরাধে অপারগ, এই শেষ কারণে তারা সবথেকে নিকৃষ্ট সপ্তম নরকলােকে কখনােই গমন করতে পারেন না। দিগম্বর সম্প্রদায়ের অদ্ভুত বিচারে এই একই মুক্তিতে নারীর এই অক্ষমতার অপরদিকে তাদের চরম উৎকৃষ্ট পূণ্য অর্জনে অক্ষমতার কথাও বলা হয়েছে, এবং তার ফলে সংকর্মজনিত কারণে সর্বার্থসিদ্ধি স্বরূপ উত্তর স্বর্গলাভ থেকেও তারা যুক্তিপূর্ণভাবেই বঞ্চিত।

Advertisement
শ্বেতাম্বর সম্প্রদায় দিগম্বর দার্শনিকদের মতােই বিশ্বাস করেন যে নারী স্বভাবগতভাবেই হীনতম পাপকর্মে লিপ্ত হতে অক্ষম সুতরাং তারা সবথেকে নিম্নে অবস্থিত সপ্তম নৱকলােকে গমন করেন না। কিন্তু তাদের মতে নারী স্বর্গের পূণ্য সাধনে সক্ষম এবং ফলত সর্বার্থসিদ্ধি রূপ উৎকৃষ্ট সাধনালভ্য স্বর্গে গমন করতে পারেন। তবে এই দুই সম্প্রদায়ের বিচারেই নারী পুরুষের মধ্যে নীতিবোধ গত অসামঞ্জস্য স্বীকৃত। এই যুক্তি ধরেই দিগম্বর সম্প্রদায়ের তাত্ত্বিকগণ শ্বেতাম্বর মতকে খণ্ডনে উদ্যত হয়েছেন। তাদের বক্তব্য শ্বেতাম্বর মতে যখন স্বীকার করা হচ্ছে যে নারী চূড়ান্ত পাপ সংগঠনে অসমর্থ এবং সত্তম নরকলােকে গমন করেন না তখন একই যুক্তিতে এও মেনে নিতে হবে যে চুড়ান্ত পুণ্য অর্জনেও তারা অসমর্থ। সুতরাং নারী সর্বার্থসিদ্ধি ও মােক্ষও অর্জন করতে পারেন না। চুড়ান্ত নৈতিক অবস্থান থেকে চুড়ান্ত উৎকর্ষ ও অপকর্ষ লাভ করা যায়। নারীরা কোন ক্ষেত্রেও সেই অবস্থানে পৌছন না।

ধর্মীয় বাদানুবাদের সাথে সাথে সাধারণভাবে নারীর চরিত্র ও দেহ সংক্রান্ত নানা ধারণার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। কুণ্ডকুণ্ডেৰ দ্বারা ব্যক্ত নারীদেহ, জীবাণু ও যৌনতা সংক্রান্ত পূর্বে আলােচিত বিষয়টির রেশ টেনে পরবর্তীকালে শ্বেতাম্বর তাত্ত্বিকেরাও বক্তব্য রেখেছেন। খ্রিস্টিয় সপ্তদশ শতকে শ্বেতাম্বর উপাধ্যায় মেঘবিজয় তার রচিত 'যুক্তি প্রবােধ' এ লিখছেন যে দেহের ঐ সৰ অংশে জীবাণু জন্মানাের কারণেই নারীরা ঐ অংশ সম্পর্কে সজাগ হন ও পরে কামনা বােধ করেন। মেঘবিজয় দিগম্বর সম্প্রদায়ের নানা মতামত ব্যক্ত করলেও তা খণ্ডনে অনেক ক্ষেত্রেই বিরত থেকেছেন। তবে পুরুষদেহে সাধ্বী তীর্থঙ্কর মল্লি' র বিগ্রহ পূজার পিছনে শাস্ত্রীয় ও সাধারণ মতামত কাজ করেছিল। শ্বেতাম্বর সম্প্রদায়ের যুক্তি ছিল যে শাস্ত্রমতে নারীর উন্মুক্ত বক্ষদেশ প্রদর্শন বৈধ নয়। সুতরাং দেহ সংক্রান্ত নিষিদ্ধতা দুই সম্প্রদায়ের চোখেই নারী পুরুষের সাম্য স্বীকারের অন্তরায় ছিল। মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে শ্বেতাম্বররা নারী এগারােটি অতি প্রয়ােজনীয় প্রতিম সংস্কারে অঙ্গীকারের সামর্থ্য স্বীকার করেছেন।

সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতে সর্বধর্ম মতেই নারীর রজস্বলা অবস্থা অপবিত্র গণ্য হয়েছে। জৈন মতে মনে করা হত যে নারীর মাসিক রক্ত ক্ষরণের ফলে দেহের মধ্যেকার জীবাণুর মৃত্যু ঘটে। চরম অহিংসবাদী জৈনধর্মে নারীদেহের এই জৈবিক প্রক্রিয়াগত হিংস্রতার লক্ষণ নারীর মােক্ষলাভের চরম অন্তরায় রূপে দৃষ্ট, তবে অন্য একটি অপেক্ষাকৃত কুসংস্কারমুক্ত যুক্তিপূর্ণ মত অনুযায়ী নারী সংসারধর্ম ও শিশুদের লালন পালনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার ফলে সংসার ত্যাগ ও মােক্ষলাভের পথ তাদের ক্ষেত্রে যথাযােগ্য নয়।
Advertisement