PayPal

সিন্ধু সভ্যতার অর্থনৈতিক অবস্থা

author photo
- Saturday, July 13, 2019
ভারতের প্রাচীন সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা। সিন্ধু নদের তীরে হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠে। এই সভ্যতা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণিত হয় যে, বৈদিক যুগ থেকে নয়, তার আরও অনেক আগে আনুমানিক আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশে লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদারো এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে দয়ারাম সাহানি পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলায় হরপ্পার খননকার্য চালিয়ে এই উন্নত সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেন। এই সভ্যতার অর্থনৈতিক জীবন ছিল অনেক উন্নত।
হরপ্পা সভ্যতার অলঙ্কার চিত্র
হরপ্পা সভ্যতার কৃষি : হরপ্পা সভ্যতার আর্থিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে তার সন্নিহিত গ্রামীণ অঞ্চলের উন্নত কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল ছিল। কৃষি - অর্থনীতির বিকাশ না হলে নাগরিক সভ্যতার উদ্ধব সম্ভব নয়। প্রচুর বৃষ্টিপাত এবং সিন্ধু ও তার শাখানদীর বন্যায় এই অঞ্চল যথেষ্ট উর্বর ছিল। ফসল উৎপাদনের জন্য সার, জলসেচ বা দক্ষতার বিশেষ প্রয়ােজন হত না। রবিশস্য হিসেবে গম ও যবের চাষ হত। খারিফ শস্য হিসেবে তুলাে, তিল উৎপন্ন হত। সম্ভবত সমগ্র পৃথিবীতে ধানের চাষ সিন্ধু উপতাকাতেই প্রথম শুরু হয়। লােথাল ও রংপুর থেকে ধানের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। মুরগি পালনের সুত্রপাতও সিন্ধু উপত্যকায়। এখানে উন্নত জাতের কার্পাস তুলাের চাষ হত — তুলাের চাষেরও শুরু এখানেই। বৈদেশিক বাণিজ্যের বিরাট অংশ জুড়ে ছিল সুতিবস্ত্র এবং 'সিন্ধু' নাম থেকে মেসােপটেমিয়া, প্যালেস্টাইন, মিশর, গ্রিস ও রােমে সুতিবস্ত্র যথাক্রমে সিন্ধু, সিন্ডন, সাদিন, সেন্ডাটাস ও সাতিন নামে পরিচিত ছিল। ডঃ কোশান্ধী, অলচিন এবং অতুল সুর এর মতে সিন্ধুবাসী লাঙলের ব্যবহার জানত না। কালিবঙ্গানে প্রাক্-হরপ্পা যুগের লাঙলের সন্ধান মিলেছে। সম্ভবত এ যুগে কাঠের লাঙল ব্যবহৃত হত তবে তা মানুষে টানা, না ষাঁড়ে - টানা তা বলা দুরূহ।

হরপ্পা সভ্যতার শিল্প : হরপ্পা সভ্যতায় নানা ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছিল। এইসব শিল্পগুলির মধ্যে বয়নশিল্প, প্রস্তরশিল্প, ধাতুশিল্প, মৃৎশিল্প, গজদন্তশিল্প, কাঠের কাজ, চিনামাটির কাজ, ইটশিল্প, অলংকার শিল্প, চুনাপাথরের কাজ বিশেষ উল্লেখযােগ্য ছিল। বস্ত্ৰৰয়ান ছিল হরপ্পা সভ্যতার প্রধান শিল্প। এই অঞ্চল থেকে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সুতিবন্ত্র রপ্তানি করা হত। প্রস্তর শিল্পেরও যথেষ্ট উন্নতি হয়। এই অঞ্চল থেকে পাথরের নানা হাতিয়ার ও বিভিন্ন ভঙ্গির নানা মূর্তি পাওয়া গেছে। এছাড়া জেড, কানেলিয়ন, ল্যাপিস লাজুলি ও এ্যাগেট প্রভৃতি দামি পাথরের তৈরি নানা শৌখিন দ্রব্যাদি মিলেছে। ধাতুশিল্পীরা তামা, ব্রোঞ্জের নানা দ্রব্যাদি যথা কাস্তে, কুঠার, প্রদীপ, কলসি, ছুরি, বাসন, মুর্তি প্রভৃতি তৈরি করত। সােনা ও রূপার অলংকার নির্মাণেও শিল্পীরা দক্ষ ছিল। মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। কুমােরের চাক ব্যবহার করে নানা আকারের ও নানা ধরনের মৃৎপাত্র তৈরি হত, সেগুলি আগুনে পুড়িয়ে মজবুত করা হত এবং তাদের গায়ে নানা রং দেওয়া হত। পাত্রগুলির গায়ে আঁকা থাকত লতা-পাতা, ফুল এবং পশু-পাখির ছবি। এছাড়া এখানে মাটির তৈরি নানা মূর্তি ও শিশুদের নানা খেলনা মিলেছে। হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত পােড়ামাটি বা চুনাপাথরের তৈরি সিলগুলিতে বিভিন্ন গাছপালা, পশুপাখি ও দেবতাদের মূর্তি উৎকীর্ণ আছে।

হরপ্পা সভ্যতার ব্যাবসা বাণিজ্যি : হরপ্পার নগর সংস্কৃতির বিকাশের অনাতম কারণ হল এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি। ভারত ও ভারতের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে হরপ্পার বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল। সিন্ধু উপত্যকার এক প্রান্তের সঙ্গে অন্য প্রান্তের বাণিজ্য চলত। শিল্পের প্রয়োজনে বিভিন্ম স্থান থেকে কাচামাল আমদানি করা হত। হিমালয় থেকে দেবদারু কাঠ, কর্ণাটক থেকে সােনা, রাজপুতানা থেকে তামা ও সিসা, দক্ষিণ ভারত থেকে সিসা, রাজপুতানা - গুজরাট থেকে দামি পাথর, কাথিয়ওয়াড় থেকে শখ আসত। ভারতের বাইরে বেলুচিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান থেকে আমদানি করা হত সােনা, রূপা, সিসা, টিন ও দামি পাথর। সিন্ধু উপত্যকা থেকে রপ্তানি করা হত তুলাে, সুতিবস্ত্র, তামা, হাতির দাঁতের তৈরি নানা জিনিসপত্র। সুতিবস্ত্র ও তুলো ছিল রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান উপকরণ।

মার্শাল মনে করেন যে ইরান, পশ্চিম এশিয়া ও মিশরের সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ওইসব স্থানে খননকার্য চালিয়ে হরপ্পার কিছু সিল ও দ্রব্যাদি এবং অনুরূপভাবে ওইসব অঞ্চলের সিল ও দ্রব্যাদি হরপ্পায় পাওয়া গেছে। আঙ্কাদের একটি প্রাচীন লিপিতে বলা হয়েছে যে, সেখানকার বণিকরা দিলমুন, মাগান ও মেলুহা অঞ্চলে বাণিজ্য করতে যেত। অনেকে বাহরিন - কুয়েত অঞ্চলকে দিলমুন বলে মনে করেন। অনেকে আবার হরপ্পার অন্তর্গত কয়েকটি অঞ্চলকে ওই স্থান বলে মনে করেন। অনেকে মাগান বলতে বেলুচিস্তানের একটি জায়গা এবং মেলুহাকে খােদ মহেঞ্জোদারাে বা ভারতের পশ্চিম উপকুলের কোনও স্থান বলে চিহ্নিত করেছেন। বলা বাহুল্য, এ সমস্যার এখনও কোনও সমাধান হয় নি। লােথালের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার বিশাল বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রমাণ দেয়। লােথাল হল বিশ্বের প্রাচীনতম বন্দর ও পােতাশ্রয়। এখানে একটি প্রকাণ্ড জাহাজঘাট, আগন্তুক জাহাজ রাখার উপযােগী ডক এবং পাথরের তৈরি নােঙর মিলেছে। তখনও মুদ্রার প্রচলন হয় নি। বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বাণিজ্য চলত।

যানবাহন ও সামুদ্রিক যোগাযোগ : স্যার মর্টিমার হুইলার মনে করেন যে, সিন্ধুবাসী পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে উট, গাধা ও ঘােড়া ব্যবহার করত। প্রত্নতত্ত্ববিদ অলচিন বলেন যে, হরপ্পা সভ্যতায় উটের কিছু হাড়গােড় পাওয়া গেলেও গৃহপালিত পশু হিসেবে উটের কোনও নিদর্শন পাওয়া যায় নি। ঘােড়ার ব্যবহারও ছিল খুব সীমিত। সিন্ধুবাসী দুচাকাবিশিষ্ট ঠেলাগাড়ি এবং গরু, খাড় ও গাধায় টানা গাড়ি ব্যবহার করত। সিন্ধুবাসী সমুদ্রের সঙ্গে সুপরিচিত ছিল। কিছু সিলে নৌকা, মাঝি, মাস্তুল, নােঙর ও জাহাজের ছবি আছে। হরপ্পার ধংসাবশেষের মধ্যে ঝিনুকের বালা, হাতা, চামচ এবং মুক্তাখচিত অলঙ্কার পাওয়া গেছে। বলা বাহুল্য, ঝিনুক বা মুক্তা গভীর সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করতে হত। ড: ম্যাকে - মত সিন্ধুবাসী সমুদ্রপথেই মিশর, এলাম ও সুমারের সঙ্গে যােগাযােগ রাখত। এছাড়া লোথালের ধ্বংসবশেষ হরপ্পাবাসীর সামুদ্রিক তৎপরতার সাক্ষ্য বহন করে।

হরপ্পা সভ্যতার ওজন ও মাপ : ওজন ও মাপের ব্যাপারেও সিন্ধুবাসী যথেষ্ট দক্ষ ছিল। এখানে নানা ওজনের বিভিন্ন বাটখারা, ব্রোঞ্জনির্মিত কয়েকটি দাড়িপাল্লা এবং ধাতুনির্মিত গজকাঠি পাওয়া গেছে। ওজনের সময় সাধারণত ১৬ ও তার গুণিতক ব্যবহৃত হত, যথা — ১৬, ৬৪, ১৬০, ৩২০, ৬৪০ প্রভৃতি। ওজনের ক্ষেত্রে ১৬-র ব্যবহার আধুনিক যুগ পর্যন্ত চলে এসেছে। কিছুদিন আগেও ১৬ আনায় ১ টাকা ছিল। মনে হয় সমগ্র এলাকা জুড়ে একই ধরনের ওজন ও মাপ প্রচলিত ছিল।

গ্রন্থপঞ্জি:
1. সুনীল চট্টোপাধ্যায় - প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
2. দিলীপকুমার চক্রবর্তী - ভারতবর্ষের প্রাগিতিহাস
3. Romila Thapar - History of India
4. Sen, Shailendra Nath - Ancient Indian History and Civilization
5. S. Ratnagar - The Harappan Civilization
6. Basham - The Wonder That was India