সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক/নাগরিক জীবন

author photo
- Tuesday, July 09, 2019

হরপ্পা সভ্যতার সামাজিক/নাগরিক জীবন

ভারতের ইতিহাসে প্রাচীন সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা। এই সভ্যতা আবিষ্কারের সঙ্গে প্রমাণিত হয় যে, বৈদিক যুগ থেকে নয়, তার আরও অনেক আগে আনুমানিক আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে ভারতীয় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশে লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদারো সভ্যতা এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে দয়ারাম সাহানি পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলায় হরপ্পা সভ্যতার নিদর্শন আবিষ্কার করেন। এই সভ্যতার নাগরিক জীবন ছিল অনেক উন্নত।
সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতার সিল

খাদ্য ও গৃহপালিত পশু:

এই সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক হলেও তার মূলভিত্তি ছিল কৃষিব্যবস্থা। সিন্ধু উপত্যকার অধিবাসীগণের প্রধান খাদ্য ছিল গম, যব ও বার্লি। খেজুর, বাদাম, তিল, মটর, নানারকম শাকসবজি, ফল - মূল, মাছ, মাংস, ডিম প্রভৃতি ছিল তাদের সাধারণ খাদ্য। তারা পানীয় হিসাবে দুধ গ্রহণ করত। গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল গােরু, মহিষ, ভেড়া, হাতি, ছাগল ও শূকর। বেলুচিস্তানে মাটির অনেক গভীরে ঘােড়ার কঙ্কাল পাওয়া গেলেও ঘােড়া সেদিন পােয় মেনিেছল বলে বিশ্বাস করা যায় না।

পোশাক ও অলংকার:

স্ত্রী পুরুষ সুতি ও পশমের কাপড় পরিধান করত। অধিবাসীরা দু-খণ্ড বস্ত্র ব্যবহার করত। শালের ন্যায় একখণ্ড বস্ত্র ঊর্ধ্যবাস হিসেবে কাধে থাকত অপর বস্ত্রটি ছিল আধুনিক ধুতির মতাে। মহিলাদের পােশাক ছিল একই ধরনের। নারী - পুরুষ উভয়েই লম্বা চুল রাখত। উভয়ের মধ্যে অলংকার ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ধ্বংসবশেষের মধ্যে গলার হার, বালা, আংটি, নাকছাবি, কানের দুল, পায়ের মল, কোমরের বিছা, বাজুবন্ধ ও রঙিন পাথরের নানারকম অলংকার পাওয়া গেছে। স্ত্রীলোকেরা সুরমা ও ঠোঁট রং করবার পালিশ ও নানা ধরনের সুগন্ধি প্রসাধনী দ্রব্যও ব্যবহার করত।

আসবাবপত্র:

চেয়ার, খাট, টুল, পালিশ করা মৃৎপাত্র, চিরুনি, ছুচ, মাছ ধরবার বড়শি নানা মাপের বাটখারা প্রভৃতি দৈনন্দিন জীবনে প্রয়ােজনীয় নানা ধরনের আসবাবপত্র পাওয়া গেছে। হরপ্পাতে লাল ও কালাে রঙের কারুকার্য করা অনেক মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে। মৃৎপাত্রগুলি কুমােরের চাকে তৈরি বলে অনুমান করা হয়।

খেলনা:

নানা ধরনের খেলনা যথা — চাকার উপরে বসা জন্তু, ছােটো গাড়ি, রথ ইত্যাদি উল্লেখযােগ্য। এছাড়া গােরু, হরিণ, মহিষ, বাছুর, কুকুর, মুরগি প্রভৃতি এবং অন্য কিছু কিছু মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। মাটির তৈরি একটি গােরুর গাড়ি ও খেলনা চেয়ার পাওয়া গেছে।

অস্ত্রশস্ত্র:

পাথর, তামা ও ব্রোঞ্জের তৈরি বর্শা, ছােরা, তির, ধনুক, কুঠার, কাস্তে, মুষল, ক্ষুর প্রভৃতি অস্ত্রশস্ত্র তারা ব্যবহার করত।

সমাজে শ্রেণিব্যবস্থা:

মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় পাওয়া নিদর্শনগুলি পরীক্ষা করলে সে যুগের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক কথা জানা যায়। ধ্বংসাবশেষ থেকে মহেঞ্জোদারো জনসংখ্যাকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যথা (১) শিক্ষিত সম্প্রদায়, (২) যােদ্ধ, (৩) বণিক ও শিল্পী, (৪) সাধারণ শ্রমিকশ্রেণি। পুরােহিত, উল্লেখযােগ চিকিৎসক ও জ্যোতিষগণ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যােদ্ধা শ্রেণির উপর দেশরক্ষার দায়িত্ব অর্পিত ছিল। কুম্ভকার, রাজমিস্ত্রি, স্বর্ণকার, তাতি প্রভৃতি ছিল শিল্পী শ্রেণিভুক্ত। কৃষক, ভৃত্য, জেলে, শ্রমিক প্রভৃতি ছিল চতুর্থ শ্রেণিভুক্ত। সমাজে বর্ণবৈষম্য ছিল। অভিজাত শ্রেণি ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক অবস্থার নানা তফাত ছিল। পণ্ডিতরা অনুমান করেন, এই শহরগুলিতে ক্রীতদাস প্রথাও চালু ছিল। অধ্যাপক ব্যাসম মনে করেন, হরপ্পা সভ্যতার মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যাধিক্য ছিল।

শান্তি ও শৃঙ্খলা:

সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল; শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল শাসকদের।

মৃতের সৎকার:

হরপ্পায় প্রাপ্ত কঙ্কাল ও করােটি দেখে বােঝা যায় যে এখানে নানাজাতির লােক বাস করত। এখানে শব সৎকারের নানারূপ ব্যবস্থাও ছিল। অনেকে শব দাহ করতেন। অনেকে মৃতদেহ কবর দিতেন। এছাড়া আরও এক শ্রেণীর কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেগুলিতে মৃতদেহ পূর্বে দাহ করে পরে ভস্মাবশেষ রক্ষিত হত।

সিল ও লিপি:

সিন্ধু উপত্যকায় পােড়ামাটি, তামা ও ব্রোঞ্জের প্রচুর সিল আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলির সংখ্যা প্রায় দু'হাজার। পণ্ডিতদের অনুমান প্রধানত ব্যবসা - বাণিজ্যর জন্যই ওইসৰ সিল তৈরি হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যর ক্ষেত্রেও এগুলি ব্যবহৃত হত, কারণ সুসা এবং মেসােপটেমিয়ার নগরগুলিতেও হরপ্পার সিল আবিষ্কৃত হয়েছে। এইসব সিলে বিভিন্ন জীবজন্তু ও জলযানের চিত্র অঙ্কিত আছে। এ থেকে মনে হয় যে, এইসব জীবজন্তু ও জলযান তাদের সুপরিচিত ছিল। আবার কিছু সিলে কিছু কিছু চিত্র উৎকীর্ণ আছে। হরপ্পাবাসী ছবি এঁকে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করত। এগুলিই হল 'সিন্ধু লিপি’ বা ‘হরপ্পা লিপি'। এই লিপি চিত্রলিপি-বর্ণলিপি নয়। চিত্রলিপির স্তর অতিক্রম করা সিন্ধু লিপির পক্ষে সম্ভব হয় নি। এইসব লিপি এখনও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি—তবে এ কথা ঠিক যে, এই লিপি ডানদিক থেকে বাঁদিকে পড়া হত। পণ্ডিতরা এই লিপির সঙ্গে সুমেরীয়, এলামীয়, হিট্রাইট, মিশরীয়, ক্রটিীয়, ব্রাহ্মী, সংস্কৃত প্রভৃতি বহু লিপির সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন। সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়।