হরপ্পা সভ্যতার ইতিহাস - Harappan Civilization History

- July 12, 2019
যুগে যুগে নদীর তীরে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল । যেমন নীলনদের উপর গড়ে উঠেছিল মিশর সভ্যতা, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরে মেসােপটেমিয়া সভ্যতা, টাইবার নদীর তীরে ইতালীয় সভ্যতা, হােয়াংহাে নদীর তীরে চিনের সভ্যতা, তেমনি ভারতবর্যে গঙ্গা নদীর তীরে গাঙ্গেয় সভ্যতা ও সিন্ধুনদের তীরে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতা।
হরপ্পা সভ্যতার নগর
সিন্ধু/হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার ও অবস্থান (Harappan/Indus Valley Civilization Discovery and location): সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অন্তর্গত মহেঞ্জোদারো এবং পশ্চিম পাঞ্জাবের মন্টগােমারি জেলায় ইরাবতী বা রাভী নদীর তীরে হরপ্পা নামক স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যের ফলে এক সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। এই খননকার্যে অগ্রণী ছিলেন ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যক্ষ স্যার জন মার্শাল, বিখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, দয়ারাম সাহানি, হুইলার, ম্যাকে, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও ননীগােপাল মজুমদার। সিন্ধু উপত্যকাকে আশ্রয় করে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে পণ্ডিতগণের নিকট এটি সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilisation) নামে পরিচিত। মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের গৌরব প্রধানত বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তার চেষ্টায় ও খননকার্যের ফলে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয়। এবং ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে দয়ারাম সাহানি হরপ্পা সভ্যতা আবিষ্কার করেন। মহেনজোদারাে শব্দের অর্থ ‘মৃতের স্তুপ (mound of the dead)'। ইরাবতী নদীর তীরে হরপ্পা নামক স্থানে দয়ারাম সাহানির চেষ্টায় প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার আরও নানা নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে । জন মার্শাল মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পাকে প্রাচীনতম সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন।

হরপ্পা/সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল (Indus Valley/Harappan Civilization Time Period): মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা আবিষ্কারের ফলে ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। ঐতিহাসিকদের ধারণা ছিল আর্য সভ্যতা হল ভারতের প্রাচীনতম সভ্যতা, আর্য জাতি ভারতে এসেছিল খ্রিস্টপূর্ব দু-হাজার অব্দে আর সিন্ধু সভ্যতার উদ্ভব হয়েছিল জিশুখ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছরেরও অধিককাল পূর্বে। ওই অঞ্চলে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকগণ এই মত পােষণ করেন যে, সিন্ধুসভ্যতা লৌহ যুগের পূর্বে বিকশিত হয়েছিল অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতা আর্য সভ্যতার পূর্ববর্তী। সম্ভবত খ্রিস্টের জন্মের ২৫০০-৩০০০ বছর আগে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। খনন কার্যের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে এই সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাসমূহের অন্যতম ও প্রায় সমকালীন। বর্তমানে রেডিয়াে কার্বন-14 পরীক্ষার মাধ্যমে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২৩০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ এর মধ্যে স্থিরীকৃত হয়েছে। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক Will Durant লিখেছেন, "The Indus Valley Civilization was older than that which flowered out of the mud of the Nile." জন মার্শাল সর্বপ্রথম সিন্ধু সভ্যতা কথাটি ব্যবহার করেন।

সিন্ধু সভ্যতা/হরপ্পা সভ্যতার ব্যাপ্তি (Indus Valley/Harappan Civilization Extent): সিন্ধুনদের এলাকা থেকে বহুদূরে অবস্থিত বহু স্থানে সিন্ধু সভ্যতার বিশিষ্ট নিদর্শনের অনুরূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। গুজরাটের রংপুর, লােথাল প্রভৃতি স্থানে সিন্ধু সভ্যতার অনুরূপ ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। লােথালে আবিষ্কৃত একটি পােতাশ্রয় থেকে অনুমিত হয় যে, তখনকার ভারতীয়রা সমুদ্রপথে বাণিজ্য করত। পূর্ব পাঞ্জাবে অবস্থিত রুপার অঞ্চলে, রাজস্থানের বিকানিরের কাছাকাছি কালিবঙ্গান অঞ্চলে, বেলুচিস্তানের নাল, উত্তরপ্রদেশের মিরাট শহরের কাছাকাছি আলমগিরপুর প্রভৃতি স্থানে মাটি খুঁড়ে যেসব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে তাতেও সিন্ধু সভ্যতার ছাপ পাওয়া গেছে। পুরাে এলাকাটি একটি ত্রিভুজের মতাে এবং এর আয়তন হল প্রায় ৭৩ লক্ষ বর্গ কিলােমিটার। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার দূরত্ব প্রায় ৪৮৩ কিলােমিটার।

হরপ্পা সভ্যতার নদনদী (Indus Valley Civilization Rivers): হরপ্পা সভ্যতার বিভিন্ন গুরত্বপূর্ণ স্থানগুলি বিভিন্ন নদীর নিকটবর্তী স্থানে গড়ে উঠেছিল। সেগুলি হল-
হরপ্পারাভী
দেশালপুর, রােজদিভাদর
মহেঞ্জোদারাে, কোটদিজি, আলহাদিনাে, বালাকোটসিন্ধু
লােথালভােগাবর
মান্দাচন্দ্রভাগা
কালিবঙ্গানঘর্ঘরা
দিমাবাদপ্রভার
সূক্তাজেন্দোরআরবসাগর
বনওয়ালিসরস্বতী
রােপারশতদ্রু
আলমগীরপুরহিন্দন

সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা (Harappan Civilization Authors): সিন্ধু সভ্যতা কারা গড়েছিল এ সন্বন্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। খনন কার্যের ফলে সিন্ধু উপত্যকায় যে সমস্ত নরকঙ্কাল উদ্ধার হয়েছে সেগুলি নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা করে পণ্ডিতগণ চারটি জাতিগােষ্ঠীর মানুষের সন্ধান পেয়েছেন। তাদের মতে, এই নরকঙ্কালগুলি হল প্রােটো অস্ট্রালয়েড, ভূমধ্যসাগরীয়, অ্যালপাইন ও মােঙ্গালীয়। কিন্তু এই নরকঙ্কালগুলি সংখ্যায় এত কম যে পণ্ডিতগণ এগুলির মাধ্যমে কোনাে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। অনেকের মতে, আর্যরা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা। অনেকে আবার বলেন, আর্য জাতির ভারতে আসার বহু আগে দ্রাবিড় নামে এক জাতি এ সভ্যতার সৃষ্টি করে। আবার আর - এক শ্রেণির পণ্ডিতের মতে ঋগবেদীয় আর্যদের ভারতে প্রবেশের অনেক আগে আর্যদেরই একটি শাখা সমুদ্রপথে সিন্ধুনদের মােহনা দিয়ে ভারতে বসতি স্থাপন করে। জন মার্শাল অবশ্য সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে আর্যদের কোনাে সম্পর্ক মেনে নিতে চাননি। কারণ, তার মতে আর্যরা এসেছে সিন্ধু সভ্যতার অনেক পরে। এ সভ্যতার কারা স্রষ্টা এ সম্পর্কে কোনাে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কারণ এ সভ্যতায় ঘটেছিল নানা জাতীয় সমন্বয়। তবে অধ্যাপক ব্যাসাম ও কে. এম. পানিক্কর মন্তব্য করেন, এই সভ্যতা ছিল সম্পূর্ণ দেশজ এবং তার স্রষ্টা ভারতীয়রাই।
Advertisement

হরপ্পা সভ্যতা বা সংস্কৃতির নামকরণ (Indus Valley/Harappan Civilization Culture): সাম্প্রতিক কালে প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রাগৈতিহাসিক সিন্ধু সভ্যতাকে হরপ্পা সংস্কৃতি বা হরপ্পা সভ্যতা নামে অভিহিত করেছেন। "The civilisation of the Indus known to the archaeologists as the Harappan culture" সিন্ধু সভ্যতার এই নুতন নামকরণের কারণ হল সিন্ধু সভ্যতায় অবস্থিত অপরাপর শহর অপেক্ষা ঐতিহাসিক বিচারে হরপ্পা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হরপ্পায় খনন কার্যের ফলে যেসব প্রত্নতাত্তিক নিগর্শন পাওয়া গেছে, তার আশেপাশে আরও অনেক জায়গা খুঁড়ে প্রায় একই ধরনের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। আধুনিক ঐতিহাসিকগণের মতে উক্ত জায়গাগুলি হরপ্পা সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত প্রায় ২৫০টি কেন্দ্র এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। হরপ্পা থেকে মহেঞ্জোদারো প্রায় ৩০০ মাইল দূরত্বে অবস্থিত। উভয় স্থানের ভূপ্রকৃতি প্রায় একই রকমের। উভয়ের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য খুব একটা নেই। ১৯৭৫ সালে আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম হরপ্পায় একটি সিলমোহর আবিষ্কার করেছেন।

Advertisement
সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র (Harappan Civilization Cities): সিন্ধু সভ্যতার প্রধান কেন্দ্রগুলি হলঃ (১) সিন্ধু প্রদেশের মহেঞ্জোদারাে, চানহুদারো, কোটদিজি, (২) পাঞ্জাবের হরপ্পা, (৩) রাজস্থানের কালিবাঙ্গান, (৪) গুজরাটের লােথাল, ধোলাবিরা, দেশালপুর, রংপুর, (৫) পাঞ্জাবের শতদ্রু নদীর তীরে রুপার, (৬) উত্তরপ্রদেশের আমগিরপুর, (৭) হরিয়ানার বানওয়ালি, (৮) আরব সাগরের তীরে সুৎকাজেনদোর প্রভৃতি।

হরপ্পা সভ্যতার জীবিকা (Indus Valley Civilization Occupation): সিন্ধু সভ্যতা নগরকেন্দ্রিক হলেও কৃষি ছিল সিন্ধু অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা। শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য পশুপালন ছিল সিন্ধুবাসীর প্রধান জীবিকা। ধানের কথা জানা না গেলেও গম, যব, কার্পাস ইত্যাদি উৎপন্ন হত। কর্মকার, কুম্ভকার, স্বর্ণকার প্রভৃতি কারিগর শ্রেণির শিল্পক্ষেত্রে বিশিষ্ট স্থান ছিল। লােহার ব্যবহার না হলেও সােনা, রূপা, তামা, ব্রোঞ্জ এর ব্যবহার ছিল। স্থলপথে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং জলপথে সুমের, আক্কাদ, ব্যাবিলন প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চলত।

সিন্ধু লিপি (Indus Valley Civilisation Script): সিন্ধু উপত্যকায় আবিষ্কৃত লিপি সম্বন্ধে নানামত প্রচলিত আছে। ওয়াডেল-এর মতে সিন্ধু লিপির মূল উৎস ছিল সুমেরীয় হস্তলিপি এবং হান্টারের মতে মিশরীয় হস্তলিপি। প্রাণনাথের মতে সিন্ধু লিপির উৎস হল সংস্কৃত। আবার, সােভিয়েত গবেষকগণ ও ফিনিসিও ভারততত্ত্ববিদরা একসময় মন্তব্য করেছেন সিন্ধু লিপি আসলে চিত্রলিপি এবং তাতে কমপক্ষে ৪০০টি চিহ্ন বা চিত্র আছে। কিন্তু সম্প্রতি ড. এস. আর. রাও তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে সিন্ধু লিপি ধ্বন্যাত্মক এবং তা মােটেই চিত্রলিপি নয়। তিনি বহু পরিশ্রম করে ৯০০ শীলমােহরের পাঠোদ্ধার সক্ষম হয়েছেন। তাঁর মতে খ্রি: পূ: ১৫০০ অব্দের মধ্যে সিন্ধু উপত্যকার লিপিগুলি আক্ষরিক স্তর থেকে বর্ণমালায় এসে পৌঁছায়। প্রকৃতপক্ষে লিপির ক্ষেত্রে ড. রাও-এর গবেষণামূলক তত্ব বিশেষ গুরত্বপূর্ণ।

হরপ্পা সভ্যতার শিল্প ও স্থাপত্য (Harappan Civilization Art and Architecture): মহেঞ্জোদাড়াের শিল্পীরা যে সকল জীবজন্তুর মূর্তি নির্মাণ ও অঙ্কন করেছে তা ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় তাদের অসামান্য প্রতিভার পরিচায়ক। হাতে বালা, গলায় হার পরিহিতা চার ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট নৃত্যরতা বালিকার যে ব্রোঞ্জ মূর্তিটি মহেঞ্জোদাড়ােত পাওয়া গেছে তা হরপ্পা যুগের শিল্প নৈপুণ্যের (Carft) এক অনবদ্য পরিচয় বহন করে। শীলমােহরের (Seals) ওপর অঙ্কিত পশুর প্রতিকৃতি এমন জীবন্ত যে প্রাচীন শিল্পে তার তুলনা পাওয়া কঠিন। মহেনঞ্জোদাড়ােতে প্রাপ্ত মনুষ্য মুর্তিগুলি শিল্প রসিকগণের প্রশংসা লাভ করেছে।
Advertisement